১২৫০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে বেতন ৩০ হাজার করার জন্য বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আশ্চর্যজনক ভাবে যারা এক সময় ঝাঁপিয়ে পড়ত শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তারা নীরবতাই হিরণ্ময় নীতি গ্রহণ করেছে। মধ্যবিত্ত সমাজ এই আন্দোলন প্রত্যাখ্যান করেছে কারণ তারা তাদের মাথায় নিতেই পারছে না শ্রমিক কেন ৩০ হাজার বেতন চাইবে! মাস্টার্স পাস পুলা আমার বিশ বাইশ হাজারেও ঢুকতে পারে না চাকরিতে, আর শ্রমিক হয়ে চাকরি শুরু করবে ৩০ হাজারে? কাজেই এই আন্দোলন ভুয়া, এই আন্দোলনকে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাক...!
জীবনে অল্প যে কয়দিন চাকরি করছি তা গার্মেন্টস সেক্টরেই করেছি। মার্চেন্ডাইজার নামে একটা পদে ছিলাম। বায়ারের অর্ডার কনফার্ম হওয়ার পরে আমাদের মত লোকদের ঘাড়ে অর্ডারটার ফাইল তুলে দেওয়া হত। আমরা তখন দিন রাত ভুলে ওই অর্ডারটাকে জাহাজে তুলে দেওয়া পর্যন্ত ঘাম ঝরাতাম। তাই গার্মেন্টস কেমনে চলে, অর্ডার কেমনে আসে, টাকা কেমনে আসে যায় এগুলা একটু হলেও বুঝি। নিজে শ্রমিক আন্দোলনে দুই তিনবার করে জীবন হাতে নিয়ে বেঁচে ফিরেছি। কানের পাশ দিয়ে গুলি যাওয়ার মত করে জান বাঁচছে কয়েকবার।
আমি চাকরি যখন করি তখনই বুঝে ছিলাম বেতন বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনের মান উন্নত করবে না। এরা ফ্যাক্টরির আশেপাশেই থাকে। ছোট ছোট কবুতরের খোপের মত বাসা। একেকটা রুম এত ছোট যে একটা খাট ফেলার পরে আর কিছুই রাখার উপায় থাকে না। গণ বাথরুম, গোসলখানা! এগুলা দেখে আমার মনে হয়েছে যে এদের জন্য যদি সরকারি কোয়াটারের ব্যবস্থা থাকত তাহলে এরা একটা মানসম্পন্ন বাসায় থাকতে পারত, চড়া মূল্য দিয়ে বস্তিতে থাকতে হত না। এদের জন্য যদি রেশনের ব্যবস্থা করা যেত, যদি এদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত তাহলে এই বেতনেই তারা সুস্থ সুন্দর থাকতে পারত। যদি ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা থাকত তাহলে কেউ নিজের জীবন, পরিবারের জীবন নিয়ে চিন্তিত থাকত না। বেতন যা পাচ্ছে তা দিয়েই তাদের চলতে কোন সমস্যাই থাকত না। কিন্তু এগুলা অলৌকিক বলে মনে হয় কর্তাব্যক্তিদের। আমি যে ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতাম সেখানে বলার চেষ্টা করেছিলাম, ওরা যেন জীবনেও এমন অদ্ভুত কথা শুনে নাই! এখনও এই বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন দেখে হাসিই আসে আমার। ইচ্ছাকৃত এই জিনিস এখনও টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যে টাকা বেতন বাড়ালে দিতে হবে তার চেয়ে কম খরচেই আমি যা যা বলেছিলাম তা করা সম্ভব হবে বলে আমার ধারনা।
অন্তর্বর্তী সরকার নানান কমিশন তৈরি করেছিল। শ্রমিকদের জন্যও একটা কমিশন গঠন করে। নানান ধরনের সুপারিশ ছিল সেখানে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে প্রতি তিন বছর পরে পরে শ্রমিকদের বেতন নতুন করে সামঞ্জস্য করতে হবে। খুব ভালো। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম এইটা দেখে। এই কমিশনে আমার কাছের বন্ধু ছিল। তাকেও বলেছিলাম যে শ্রমিকদের জন্য আবাসন, চিকিৎসা, রেশন ইত্যাদির ব্যবস্থা করার কথা ও প্রস্তাব করতে পারে কি না। ও কী করছে সে অন্য আলাপ। যাই হোক, বিএনপি সরকার কিছুদিন আগে এইটার আইন পাশ করিয়েছে। এরপরে করেছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি! সরকার নিজেই নিজের উপরে নিয়ে আসছে না এই বিপদ? ২৩ সালে সর্বশেষ বেতন সামঞ্জস্য করা হয়েছিল। তিন বছর এই বছরই পূরণ হচ্ছে। তাহলে শ্রমিকেরা নতুন বেতন কাঠামো চাইবে না? না বুঝে কেন এখনই এই তিন বছরের বেতন সামঞ্জস্য করার আইন পাশ করতে গেল? গেল আবার পরে সরকারি চাকরিজীবীদেরও বেতন বৃদ্ধি করে দিল! বাজারে তো আগুণ সরকার নিজেই লাগিয়ে দিয়েছে? দোষ দিবে কাকে? এলপিজির দাম দুই তিন দফায় ৭০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা শেষ! মানুষ যাবে কই?
দোষ দিবে কাকে এইটার উত্তর অবশ্য সরকারের কাছে আছে। সব দোষ লীগের! লীগ এই শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে রাস্তায় নামিয়েছে। সহজ সমাধান না? তিন বছর আগে যারা রাস্তায় ছিল, বেতন বৃদ্ধিকে ন্যায্য দাবি বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিল। তারা এখন শুধুই ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছে। জুনায়েদ সাকি, যার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে যেতাম এক সময়। সেই লোক বাম রাজনীতি করত। তিনি এখন সরকারের মন্ত্রী। একজন বামপন্থি নেতা সরকারের মন্ত্রী পরিষদে থাকার পরে আমাদের সমুদ্র বন্দর চলে যাচ্ছে বেসরকারি কোম্পানির হাতে, আরও লাইন লেগেছে নানান প্রতিষ্ঠান যারা বেসরকারি হওয়ার পথে, আমাদের শ্রমিকেরা রাস্তায় পুলিশের বেধুম লাঠিচার্জের শিকার হচ্ছে। এগুলা দারুণ লাগে না? দুনিয়ার বুকে এবারই প্রথম যখন বিরোধীদল সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে বলছে আন্দোলন যেন কেউ দখল না করতে পারে সেই দিকে সতর্ক থাকতে হবে! একের ক একটা বিরোধীদল পাইছি আমরা!
আচ্ছা, দোষ দেওয়ার তালিকায় কিন্তু ভারতও আছে। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই বেশ কিছু লেখা পড়লাম যার সহজ বক্তব্য হচ্ছে ভারত সামনে ইইউয়ের সাথে চুক্তি করছে। তখন ভারতীয় পণ্য বিনাশুল্কে ইউরোপে ঢুকবে। আমাদের বাজার তো ইউরোপে ধরাই আছে, তাহলে ভারত ঢুকবে কীভাবে? আমাদের অর্ডার যেন ইউরোপে না ঢুকতে পারে তাই এখন এই নাশকতা করা হচ্ছে। সামনে যে সিজন আসছে তা তাহলে আর আমাদের ফ্যাক্টরি গুলো ধরতে পারবে না। তখন ওই জায়গায় ভারত ঢুকে যাবে! এর মধ্যে কে কে ক্রিয়েশন নামে এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ডকুমেন্টারি বানিয়েছে। সেখানে দেখিয়েছে জারা ব্র্যান্ডের কাপড় কীভাবে সস্তায় তৈরি হচ্ছে। ডকুমেন্টারি নাম - "Inside world's LARGEST fashion slum! এইটাও নাকি আমাদের বাজার ধরার জন্য ভারতের চাল! কেন? জারা ব্র্যান্ডের কাজ নিয়েই কেন? জারার বড় একটা অংশের কাজ হয় বাংলাদেশে। মানে হচ্ছে জারাকে এখান থেকে সরানো, ভারত পরে জারার কাজ করবে...!
এমন সরলীকরণ চিন্তা ভাবনা দেখে অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু করার আছে? ইইউয়ের সাথে চুক্তি হবে, কিন্তু এই জিনিস এখনই বাস্তবায়ন হবে না। সময় লাগবে। ২৭ সালের কোন এক সময় হয়ত এইটা কার্যকর হবে। তাই ওই জন্য এখনই এখানে নাশকতার যুক্তি খাটে না। আর ভারতের ষড়যন্ত্র করতে হবে কেন? আমরা কী করতেছি? আমাদের ফ্যাক্টরি গুলো পূর্ণ ক্ষমতায় রান করতে পারছে না জ্বালানির অভাবে। আমার ভাইগ্না টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং করছে, পাকিজা নিট কম্পজিট ফ্যাক্টরিতে গেছিল ইন্টার্ন করার জন্য। পাকিজা বড় বিশাল গ্রুপ গুলোর একটা।ও বলল আমাকে যে প্রচুর কাজের চাপ কিন্তু এত বড় ফ্যাক্টরি বিকাল পাঁচটায় একদম তালা মেরে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। কারণ বিদ্যুৎ, জ্বালানির অভাবে তারা সন্ধ্যার পরে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে পারে না। ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে এইটা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। ফ্যাক্টরি অন্তত আটটা পর্যন্ত চালু না থাকলে বুঝা যাবে এইটা সমস্যা! এমন কত ফ্যাক্টরি তাহলে জ্বালানির অভাবে বন্ধ করে রাখছে? বিদ্যুৎ নাই, গ্যাস নাই উৎপাদন হাওয়া দিয়ে হবে? এক ছাতার আন্দোলনে এমনেই দেশের সেরা সেরা অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়েছে। এগুলার প্রভাব নাই? ভারতের নাশকতা করে আমাদের অর্ডার কমাইতে হবে? এমনেই তো আমরা অর্ডার রাখতে পারছি না! আমাদের এত এত সমস্যা অন্য দিকে ভারতে অর্ডার ঢুকলে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারবে বায়ার। আমাদের প্রতিযোগী সব গুলো রাষ্ট্রেই গার্মেন্টস খাতকে নিছিদ্র নিরাপত্তা দিয়ে দেওয়া হয়। কোন রকমের ভণ্ডামি দেখা যায় না ভিয়েতনামে, চীনে কিংবা ভারতে। আমাদের অর্ডার কেমনে কমে এইটা বুঝতে খুব বড় বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার আছে?
আর জারাকে লক্ষ্য করা নতুন না। জারা নিজেও এর আগে আমাদের এখানের কর্ম পরিবেশ নিয়ে নানান সময় কথা বলেছে। এগুলা আন্দোলন যারা করে তারাও সব সময় জারাকেই আগে বেছে নেয়। তাই বাংলাদেশেকে ধ্বংস করার জন্যই এগুলা করা হচ্ছে এমন কথার আসলে ভিত্তি পাওয়া যায় না।
শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বেলায় সব সময় দেখা যায় নানা মানুষ নানা বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছে। কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে, কেউ অর্থনীতিবিদ, কেউ রপ্তানি বিশেষজ্ঞ! মূল কথা হচ্ছে শ্রমিককে টাকা দেওয়া যাবে না। আমি যখন চাকরি করি তখন একজন উপরের লেবেলের কর্মকর্তা (প্রডাকশন ডিজিএম) বলেছিল শ্রমিকদের সব সময় একটু আধপেটা করে রাখতে হয় না হলে ফ্যাক্টরি চলবে না! এইটাই হচ্ছে কথা। আমাদের ফ্যাক্টরির মালিকের ছেলে একটা স্পোর্টস কার কিনল, একদিন আনল ফ্যাক্টরিতে। তিনি খুব বিরক্ত এসে! কেন? ফ্যাক্টরির রাস্তাটা এই গাড়ির জন্য অনুপযুক্ত! ওই বছরই ইদের বেতন নিয়ে গণ্ডগোল হল, সময় মত বেতন দেওয়া গেল না বলে। আমি তো এগুলা দেখে আসছি, যে রাজসিক জীবন মালিক পক্ষ যাপন করে চলে তার জন্য রক্ত চোষা হওয়া ছাড়া কোন গতি আছে? দেশের আরেক বড় গ্রুপ পদ্মা। রাজধানীর বুকে তাদের বিশাল বড় ফ্যাক্টরি। আমি যোগ দিলাম এসিস্টেন্ট মার্চেন্ডাইজার পদে। দুই সপ্তাহ কাজ করার পরে একদিন দেখি আমার মতই আরেক এসিস্টেন্ট মার্চেন্ডাইজার ম্যানেজার বা এমডি এমন কারও বরাবর মেইল লিখতেছে তার বেতন যেন চালু করা হয়! আমি তো অবাক, কাহিনী কি? বেতন চালু মানে? তখন জানলাম এদের এখানে দুই মাস বেতন দেয় না কোম্পানি। এই ছেলে মেইল করতেছে যে আমার দুই মাস হয়ে গেছে আমার বেতন চালু করে দেন প্লিজ! আমার আর কিছু না হোক, চাকরির কপালে লাথি মেরে বের হয়ে যাওয়ার বিখ্যাত রেকর্ড ছিল। পরেরদিন থেকেই আমি নাই। এমন কোম্পানিতে করলাম না চাকরি!
এমনে করেই বড়লোক বড়লোক হয়। আর মারা যায় তৌফিকেরা! ( গতকাল মারা গেছে যে শ্রমিক তার নাম তৌফিক।) বেচারার কপাল খারাপ, এমন এক সময় মারা গেল যখন এই আন্দোলনকে ভারতের ষড়যন্ত্র, লীগের আন্দোলন ইত্যাদি ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই যে নেতারা শ্রমিক মরলে অনলাইন থেকে অফলাইন গরম করে ফেলত তারা শীতনিদ্রায় চলে গেছেন। সামান্য শোক প্রস্তাবও হয়ত জুটবে না তাঁর কপালে। শ্রমিকের জীবন, এর আর মূল্য কী?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।