এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  রাজনীতি

  • খবর গড়ার কারিগর

    হীরেন সিংহরায়
    আলোচনা | রাজনীতি | ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • ছবি : রমিত

    খবর গড়ার কারিগর

    ডক্টর ভিকটর মিহালি অরবান

    ডক্টর ভিকটর মিহালি অরবান



    রবিবার ২৫শে অক্টোবর সার্বিয়ার নির্বাচনে আলেকজান্দার ভুচিচের হেরে যাওয়ার খবরটা অন্য অনেক দেশের কাছে হয়তো ছিল আরেকটি রাজনৈতিক পালা বদল মাত্র, দক্ষিণ থেকে বাঁয়ে। কিন্তু নানান নিউজ মিডিয়া, সার্বিয়া ও বলকান সংবাদ থেকে জানলাম সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্টের নামে সবচেয়ে বেশি অভিনন্দনের বন্যা এসেছে যে দেশ থেকে তার নাম হাঙ্গেরি; ঠিক সাত মাস আগে মার্চ ২০১৬ তারা ষোলো বছরের অরবান অপশাসনের অবসান ঘটিয়েছেন। কোনো এক জায়গায় ভুচিচ ও অরবানের কর্মকাণ্ডে একটা মিল দেখেছেন তাঁরা। তফাৎ শুধু এই যে হাঙ্গেরির পট পরিবর্তনে ছাত্ররা নেতৃত্ব দেননি, সেটি দিয়েছিলেন অরবানের এককালের সহযোগী পেটার মাজর। তাঁর সঙ্গ দিয়েছেন অন্তহীন দুস্প্রচার দুর্নীতিতে ক্লান্ত হাঙ্গেরিয়ান মানুষ। তাঁরা দলে দলে ভোট দিয়ে অরবান ও তাঁর দলকে আস্তাকুঁড়ে পাঠিয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

    পেটার মাজর



    এটিও কারো অজ্ঞাত নয় যে অরবান ২৫শে এপ্রিল ও ভুচিচ ২৫শে অক্টোবর ঠিক একই সময়ে, রাত সাড়ে নটায় টেলিভিশনে তাঁদের আপন হার স্বীকার করেন। শোনা যায় ভুচিচ পদত্যাগের আগে অরবানের পরামর্শ চেয়েছিলেন, অরবান কোন বল প্রয়োগে মানা করেন।

    সার্বিয়ার দুর্বার ছাত্র আন্দোলনকে হাঙ্গেরিয়ান যুবক যুবতীরা শুধু সমর্থন জানাননি, ভাগ করে নিয়েছিলেন তাঁদের নিজেদের দেশের ভোটে কারচুপির কিছু অভিজ্ঞতা। যেমন অরবানের ফিদেস দলের পর পর চার বার নির্বাচন জয়ে একটি বিশেষ ট্রেনড তাঁরা লক্ষ করেন – পোলিং বন্ধ হবার ঠিক দু ঘণ্টা আগে ভোট কেন্দ্রে অকস্মাৎ মতদাতার সংখ্যা বেড়ে যায়, জালি ভোটার বা বাহুবলিদের আগমন ঘটতে থাকে। পেটোয়া হাঙ্গেরিয়ান মিডিয়া এর কোন ছবি দেখাননি, প্রতিবাদ অনেক দূরের কথা। এবারের নির্বাচনে হাঙ্গেরিয়ান ভলান্টিয়াররা সেটি রেকর্ড শুরু করামাত্র এই আচমকা হাজির হওয়া ‘ভোট দাতারা’ পশ্চাদপসরণ করেন। হাঙ্গেরির বেশ মানুষ সার্বিয়াতে গিয়ে ছাত্রদের এ বিষয়ে সচেতন করেছেন- সার্বিয়ার ছাত্ররা দেশের ৮২১০টি ভোট দান কেন্দ্রে ক্যামেরা সহ হাজির ছিল। জালি ভোট একেবারেই পড়েনি এমন বলা যায় না তবে সার্বিয়াতে স্টুডেন্ট লিস্টের বিজয় ঠেকানো যায়নি।

    প্রাক কথন

    ধান ভানতে শিবের গীত গাইবার অপরাধের মার্জনা চেয়ে নিয়ে বলতেই হয় আমার একান্ত স্বার্থপর বৈষয়িক বা কর্ম জীবনে হাঙ্গেরি দেশটি এবং ১৩ই মে শুক্রবার ১৯৯৪ দিনটি স্মরণীয়। সেদিন দানিউবের ওপরে একটি বজরায় বসে সিটি ব্যাঙ্কের তরফে আমরা বুদাপেস্ট বাঙ্কের জন্য কমিউনিজম উত্তর হাঙ্গেরির প্রথম আন্তর্জাতিক ঋণপত্রে স্বাক্ষর করি; মেয়াদ তিন বছরের, পরিমাণ মাত্র ৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু পশ্চিমের অর্থনৈতিক জগতে তার গুরুত্ব অপরিসীম। চল্লিশ বছর লৌহ যবনিকার আড়ালে থাকা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির অচেনা অজানা ব্যাঙ্ক ও কর্পোরেটের সঙ্গে বাকি ইউরোপ আমেরিকার পরিচয় হয়েছে আমাদের লন্ডন ফ্রাঙ্কফুর্ট প্যারিসের নানান হোটেলের রোড শোতে। অনেক দুয়োরে প্রত্যখ্যাত হয়েও ডলার জোগাড় করেছিলাম। সে ছিল এক গল্প বলার দিন, এক উত্তাল সময়। মৎপ্রণীত পূর্ব ইউরোপের ডায়েরিতে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।*

    দানিয়ুবের বজরায় ঋণ পত্র স্বাক্ষর
    বুদাপেস্ট ১৩ মে ১৯৯৪



    আজ হঠাৎ সার্বিয়ার নতুন দিনের প্রসঙ্গে হাঙ্গেরির কথা উঠলো কেন?

    আমরা সেই নব্বুইয়ের দেওয়াল ভাঙ্গার ফলে নতুন বাজার পাওয়া গেছে এই উল্লাসে যখন ব্যাংকিং ডিল, বন্ড নিয়ে মত্ত, সে সব দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে কি ঘটছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন কারণ ছিল না। বরং বলা যাক যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন সরকার আমাদের ব্যবসায় বাধা না দিচ্ছে ততক্ষণ বুদাপেস্ট বা ওয়ারশর সংসদে কোন দল ছড়ি ঘোরাচ্ছে সেটা আমাদের মত ডলারের ব্যাপারীদের হুঁশ ওড়াতো না। ডিলের ম্যানডেটে সই করেন ব্যাঙ্ক বা কোন সরকারি কোম্পানির অধিকর্তা, সরকারি আমলা নন। নব্বুইয়ের দশকে পূর্ব ইউরোপে প্রাইভেট কোম্পানি প্রায় অমিল। আমাদের বা ঋণদাতার পক্ষের আইনজ্ঞরা যখন লোন ডকুমেন্ট নিয়ে চুলচেরা বিচার বিবেচনা করেছেন, বুদাপেস্ট ওয়ারশয় ঋণ গ্রহীতাদের আইনজীবীরা তাতে বিশেষ বাগড়া দেননি, প্রশ্ন তোলেননি কেন সেটা ইংলিশ ল অনুযায়ী হতে হবে কেন জার্মান বা সুইস আইন নয়। নিউ ইয়র্ক লন্ডন ফ্রাঙ্কফুর্টের ব্যাঙ্কারদের কর্মকাণ্ডে সরকারের হস্তক্ষেপ দেখিনি। সরকারি বাজেট নয়, নতুন সোর্স থেকে টাকা উঠছে এই ঢের; বুদাপেস্টে স্টক মার্কেটের অধ্যক্ষ, জাগ্রেবে ক্রোয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রী স্বয়ং সাইনিং সেরিমনিতে যোগ দিয়েছেন।

    হাঙ্গেরি তার ব্যতিক্রম ছিল না। জাইলা হর্ন তখন সে দেশের সার্বজনীন ভোটে জিতে আসা মাত্র দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী; ফর দি রেকর্ড তিনি আবার হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট সরকারের শেষ বিদেশ মন্ত্রী। ৯ই নভেম্বর ১৯৮৯ বার্লিনের বিভাজক দেওয়াল পড়াটা যতোই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, তার তিন মাস আগে সলতে পাকানোটা শুরু হয়েছিল হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তবর্তী সোপরান গ্রামে। আজ কেউ মনে রাখে না ১৯শে আগস্ট ১৯৮৯ তৎকালীন অস্ট্রিয়ান প্রতিনিধি অটো ফন হাবসবুরগ এবং হাঙ্গেরির বিদেশ মন্ত্রী জাইলা হর্ন আনুষ্ঠানিক ভাবে দুই দেশের মধ্যের কাঁটাতারের বেড়া কাটেন সোপরানে, রাশিয়ান ট্যাঙ্ক দেখা দেয়নি – সেটি ছিল তথাকথিত প্যান ইউরোপিয়ান পিকনিকের দিন। হাঙ্গেরির সীমান্তে একটি ছোট গ্রামে লৌহ না হোক কণ্টক যবনিকার অবসান ঘটেছিল।

    সবে আমাদের ব্রাঞ্চ খুলেছে বুদাপেস্টের পথচারী এলাকার একপ্রান্তে, ভাসি উতসায়। হাঙ্গেরি আসা যাওয়া শুরু করেছি, আমাদের সহকর্মীদের কাছে জেনেছি একদা কমিউনিস্ট পার্টি ডাকসাইটে সদস্য জাইলা হর্ন তরুণদের কাছেও অবিসম্বাদিত হিরো- লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান আমলে বানানো পার্লামেন্টে এই প্রথম সরাসরি জনতার দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের আইন প্রণয়নের অধিকার পেলেন।

    সে যে কি দিন ছিল, খোলা হাওয়ায় ভেসে যাবার দিন। সীমান্ত চুরমার, কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা। এখানে আর ভাবনা চিন্তা কিসের? সেই যে ইংরেজিতে একটি তির্যক মন্তব্য আছে, নাও হোয়াট ক্যান গো রং?

    ইট ক্যান।

    দানিউব



    ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে ফিদেস (FIDESZ- Fiatal Demokratak Szövetsege; তরুণ ডেমোক্র্যাট সঙ্ঘ) নামের একটি ভুঁইফোড় দল নির্বাচনে জিতলে প্রধানমন্ত্রী হলেন পেশায় আইনজীবী ৩৫ বছর বয়েসের ডক্টর ভিকটর অরবান; তাঁর গায়ে কমিউনিস্ট পার্টির কোন ছাপ নেই; তিনি নতুন যৌবনেরই দূত। তাঁর গবেষণার থিসিস ছিল ১৯৮১ সালের কমিউনিস্ট রেজিম বিরোধী পোলিশ সলিডারিটি আন্দোলন; পরে অক্সফোর্ডে রিসার্চ করেছেন সোরোস ফাউনডেশনের অর্থে, হ্যাঁ সেই হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি বিলিওনেয়ার জর্জ সোরোস! হাঙ্গেরির তরুণ তরুণী উদ্বুদ্ধ, তাদের সামনে অন্তহীন নতুন যুগের ট্রাম্পেট বাজালেন ভিকটর অরবান।

    এই পালা বদলের দিন দ্রুত অন্য চেহারা নিলো; ভিকটর অরবানের সরকার কিছু নতুন আইন জারি করলেন, কিছু করতে চাইলেন, কিছু প্রথা প্রচলনের অবসান ঘোষণা করলেন, যেমন

    • হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্টের অধিবেশন হবে তিন সপ্তাহ অন্তর অর্থাৎ মাসে একবার বিরোধীরা প্রতিবাদ জানালেন, এতে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা কমে যাবে। অরবান ঠিক লেনিনের শুয়োরের খোঁয়াড় মন্তব্যটি সরাসরি উল্লেখ না করে বললেন বক্তৃতার ফ্যাক্টরি না হয় কম দিন চলুক, আমার দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় দিব্যি আইন পাস হয়। আগে বছরে গড় পড়তা একশো দিন সংসদের কাজ কর্ম চলত, অরবানের শেষ টার্মে সেটি তার অর্ধেকের চেয়েও কম দিনে নেমে আসে।
    • তাঁর সরকার বললেন এমন অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় আছে যেখানে দুই তৃতীয়াংশ ভোট নয়, নমিনাল সংখ্যা গরিষ্ঠতায় আইন পাস হবে -পরে অবশ্য সাংবিধানিক আদালত এটি নাকচ করেন
    • একাধিক পার্টি মেম্বার লকহিড বিমান কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন, কারো সাজা হয় না, ফিদেস পার্টির লোকেদের কোন সাজা হয় না।
    • দেশের অনেক প্রধান প্রতিষ্ঠানে ফিদেস দলের পেয়ারা ব্যক্তি শীর্ষ আসন গ্রহণ করলেন, যেমন হাঙ্গেরিয়ান ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, বুদাপেস্ট শহরের চিফ প্রসিকিউটর, হাঙ্গেরিয়ান রেডিও চিফ এমনি আরও অনেকে
    • পার্লামেন্টে ভিকটর অরবান কদাচ উপস্থিত হয়েছেন। এমনও রেকর্ড আছে টানা দশ মাস তিনি বিরোধীদের কোন প্রশ্ন উত্তর সেশনে আসেননি। তিনি রেডিও টেলিভিশনে সরাসরি জনতাকে তাঁর বার্তা দিয়ে থাকেন; বিরোধীদের কোন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চান না; তিনি চলেন আপন মতে।
    • প্রেস কনফারেন্স করেন কিন্তু জবাব দেওয়া না দেওয়া তাঁর ইচ্ছে।

    চার বছর বাদে নির্বাচনে ফিদেসের হার হলো কিন্তু ২০১০ সালে অরবান আবার ক্ষমতায় ফিরলেন; ঠিক কীভাবে এ নিয়ে বিসম্বাদ আছে, ভোটে কারচুপির অভিযোগ শোনা গেছে, তদন্ত হয়নি। অচিরেই বোঝা গেল ১৯৯৮-২০০২ সময়কাল ছিল ট্রেলার, এবারে শুরু হলো মেন ফিচার ফিলম, ভিকটর অরবানের যুগ।

    সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় তিনি হাঙ্গেরির রাজনীতি অর্থনীতি দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে দখল নিলেন। প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং চার বছর বাদে দলের পরাজয় থেকে তিনি একটি শিক্ষা নিয়েছিলেন - ক্ষমতায় আসতে গেলে ভোটে জিততে হয়, সে ভোট দেয় কিছু ধোঁয়াটে জনতা। তাদের কোন নির্দিষ্ট প্যাটার্ন চেহারা পোশাক নেই। তাদের কোন খোপে ফেলা যায় যায় না; তারা হাটে বাজারে যা শোনে যা বোঝে সেই ভিত্তিতে ভোট দেয়। তাদের বশে আনার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো সেই মাধ্যমকে বশে আনা যা এই আপামর জনতাকে সংবাদ বা টি ভি চিত্র পরিবেশন করে, সে প্রিন্ট মিডিয়া হোক আর টি ভি হোক। এর কোন রিসেন্ট প্লে বুক বা চিত্রনাট্য অরবানের হাতের কাছে ছিল না। এককালে গোয়েবলস রেডিওকে সরকারের মুখের বাণী প্রচারের বাহন করে তুলেছিলেন, রেডিওর জার্মান নাম ছিল ফোলকসএমফেঙ্গার, জনতার শ্রবণযন্ত্র, কেবল শুনিবার; বলিবার নহে! গোয়েবলসের কাজটা সহজ ছিল, ইন্টারনেট আসেনি, টি ভি নেই, সকল রেডিও সরকারি, যা শোনাবেন তাই জনতাকে শুনতে হবে। তাঁরা প্রশ্ন করেন না উত্তর দেবার বা সত্যাসত্য যাচাই করার কোন সুযোগ ছিল না। ফুয়েরার মাঝে মধ্যে যা বলেন ভেবে চিন্তেই বলেন, সেটাই সত্য।

    সংবাদ মাধ্যমকে হাতের মুঠোয় রেখেছে উত্তর কোরিয়া, চিন কিন্তু আজকের এই উঠিতে বসিতে গণতন্ত্র জপার সময়ে অরবানের অভীষ্ট সিদ্ধি আপাত দৃষ্টিতে কঠিন। ঢাক বাজতে থাকে - চার দশকের কমিউনিস্ট একনায়কি শাসনের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা গণতন্ত্র অত্যন্ত মূল্যবান ধন, ব্রাসেলস থেকে সেটা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়।

    তাহলে প্রিন্ট মিডিয়া, রেডিও টি ভি ইন্টারনেটকে কি প্রকারে সামলানো যায়? এদের বেতন বুদাপেস্টের খাজানা থেকে আসে না, এডিটর অ্যাংকররা স্বাধীন সচেতন মানুষ।

    পারিব না একথাটি বলিও না আর! এইতো মাত্র দু দশক আগে কমিউনিস্ট প্রেস, রেডিও বুদাপেস্ট এই জনতাকে যা বলেছে তারা সেটাই শুনেছে। সেই কবে ১৯৫৬ সালে একবার প্রতিবাদ করেছিল তারপর কেউ আর পথে নামেনি। বিনা রক্তপাতে কমিউনিস্ট শাসনের উচ্ছেদ হল; গণতন্ত্র তো মাত্র কয়েক বছরের অর্জিত একটা বিলাসী ব্যাধি।

    ২০১০ সালে ক্ষমতায় ফেরার পরে ভিকটর অরবান যে চিত্রনাট্য লিখলেন তার শিরোনাম দেওয়া যেতে পারে – হাও টু কন্ট্রোল দি মিডিয়া অথবা হাও টু মেক দেম সিং ইয়োর সং। গোয়েবলস বা কিম ইল জঙের স্টাইলে নয়, সংবিধান মেনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সঙ্গে গোল বিবাদ না করে কীভাবে সংবাদ, তার প্রচার, বিশ্লেষণ ও বিস্তারকে সরকারি আওতায় আনা যায় অরবানের সেই সিগনেচার পন্থাটি প্রণিধানযোগ্য।

    হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট



    তার মূল বিধিগুলি একবার দেখে নেওয়া যাক

    • হাঙ্গেরিতে সব মিলিয়ে চারশো সত্তরটি রেডিও স্টেশন, টি ভি চ্যানেল, প্রিন্ট টাইটেল নিউজ ওয়েব সাইট সেগুলোকে জাতীয় করণ করা যায় না কিন্তু তাদের তাঁবে আনা যায় এর জন্য প্রয়োজন অর্থশালী বিত্তবান আদেশ পাওয়া মাত্র এগিয়ে এলেন ভিকটর অরবানের কতিপয় শুভানুধ্যায়ী –

    যেমন লরিঞ্চ মেসজারোস – ইনি অরবানের লঙ্গওটিয়া ইয়ার, ফেলসুত গ্রামে একত্র স্কুলে গেছেন। কমিউনিস্ট আমলে গ্যাস কোম্পানিতে ফিটার মিস্ত্রীর কাজ করতেন, ১৯৯৮ সালে অরবান প্রধানমন্ত্রী হলে কোন আশ্চর্যজনক ভাবে কন্সস্ত্রাকশন ব্যবসায় নেমে প্রভূত অর্থ অর্জন করলেন, অরবান গদি হারালে পর তাঁর নামে দুর্নীতির কারণে কিছু মামলা রুজু হয় ২০১০ সালে অরবান আবার প্রধানমন্ত্রী – পরের দশকে ফেলসুতের সেই গ্যাস ফিটার বিশাল ধন অর্জন করলেন- এনার্জি ব্যাংকিং ট্যুরিজম ( হুনগেস্ট হোটেল – মন্তেনেগ্রোতে সেই গ্রুপের হোটেল ছুটি কাটিয়েছি), এমনকি ব্যাংকিং, মাজর ব্যাঙ্কহোল্ডিং মেসজারোস আজ হাঙ্গেরির ধনীর তালিকায় এক নম্বরে বিরাজ করেন

    লরিঞ্চ মেসজারোস

    হুনগেস্ট রিসর্ট, মন্তেনেগ্রো



    যেমন লাসলো সি – মেসজারোসের সাথি, সরকারি কনস্ট্রাকশন, হাঙ্গেরির মোটরওয়ে বানানোর কাজে নিয়মিত কন্ট্রাক্ট পেয়ে থাকেন। ধনীর লিস্টে টপ ফাইভে থাকেন।

    যেমন ইস্তভান সারাজ – হাঙ্গেরিয়ান ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক সার্কেলের গুরু, মাজর ব্যাক হোল্ডিঙে শেয়ার আছে

    যেমন সান্দর সানি – ও টি পি ব্যাঙ্কের মাথায় আছেন বহু বছর; স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের হয়ে আমরা যখন ও টি পির সিনডিকেটেড লোন জোগাড় করেছি, সান্দর তখন সে ব্যাঙ্কের শীর্ষে লোন সই করেছেন। অবশ্য আমাদের সহযোগী ছিলেন আতিলা বোগারু তাঁকে চিনতাম লন্ডন থেকেই।

    যেমন জর্জি গাতিয়ান – অরবান ক্ষমতায় আসার পরেই টেক জগতে অসম্ভব দ্রুত অগ্রগতি করেন, তিনি এখন ডলার বিলিওনেয়ার

    যেমন ইস্তভান (অ্যাংলো সাক্সন জন) টিবরস, ভিকটর অরবানের জামাতা
    যিনি হাঙ্গেরির প্রায় ষাট শতাংশ রিয়াল এস্টেট ব্যবসার অংশীদার।

    যদিও প্রমাণ করা শক্ত কিন্তু অনুমান করতে অসুবিধে নেই অরবানের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসীন হবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নির্দেশে এই সব ধনী ব্যক্তি বা অলিগারক মিডিয়া কোম্পানি কেনা শুরু করলেন। বিচ্ছিন্নভাবে নয় – সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান প্রেস এবং মিডিয়া ফাউনডেশন নামক একটি বিশাল ছাতার তলায় -সকলই আইনসম্মত সাংবিধানিক।
    • এই বিশেষ ফাউনডেশনের কর্তারা, অলিগারকরা বসলেন দেশের বিভিন্ন মিডিয়া গ্রুপের মালিক, এডিটরদের সঙ্গে। একত্র দু পাত্তর টোকাই মদ্যপানের সময় এঁরা জানালেন, মনে রাখবেন সরকারি বিজ্ঞাপন কোন মোচ্ছব নয়, সেটা ট্যাক্স পেয়ারের টাকা হলেও তার বণ্টন ব্যবস্থা নির্ধারণ করবেন নির্বাচনে জিতে আসা ফিদেস পার্টি; তাঁরাই বিজ্ঞাপনরূপী ফ্রি মদ্য পাবেন যারা সদা সর্বদা সরকারের লাইনটি মেনে চলবেন। যে কোন সমালোচনা বা সরকারের অহেতুক বিড়ম্বনা ঘটানোর অর্থ তৎক্ষণাৎ বিজ্ঞাপন বাতিল।
    • কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতর, আইন রক্ষক বিভাগ, ইনকাম ট্যাক্স কর্তৃপক্ষ এবং এমনকি বেতার তরঙ্গ নির্ণায়ক (রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি) -সবার ওপরে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল এতত সত্ত্বেও বেয়াড়া আচরণকারী সংবাদ পত্র বা টি ভিকে মিডিয়াকে ভয় দেখিয়ে শায়েস্তা করার।
    • কর্পোরেট মিডিয়া যখন প্রতিদিন তাদের পুতুল খেলায় ব্যস্ত, কেবলমাত্র করদাতার অর্থে চালিত স্টেট রেডিও টেলিভিশন অরবান সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হল; সঞ্চালকদের কাছে প্রতিদিন সরকারি স্ক্রিপ্ট পাঠানো হয় যেটি সাজিয়ে গুছিয়ে দর্শকের কাছে পেশ করাটা তাঁদের দৈনিক জব ডেসক্রিপশন। যে কোনো ডিবেটে দুর্বিনীত প্রতিপক্ষকে অবাধে নিন্দা করা এমনকি একধাপ এগিয়ে তাদের অনেককে এয়ার টাইম থেকে নির্বাসিত করা নিত্যিকার খেলা।
    • ইসরায়েলি পেগাসাস স্পাইওয়ের দিয়ে বিরোধীদের সদা সর্বদা নজরে রাখা, দেশরক্ষা আইনে তাদের আটকানো দৈনন্দিন ঘটনা।
    • অরবান বিরোধীরা দেশদ্রোহী, তাঁরা বিদেশি শক্তি এবং অর্থ দ্বারা চালিত এই মর্মে রাত্রিদিন হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুকে বার্তা প্রচারিত হতে থাকে।

    তবু কোথাও কোন খানে বিদ্রোহী সুর শোনা গেছে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়নি। হাঙ্গেরিতে সমস্ত মিডিয়া যখন নতমস্তকে লুটিয়ে পড়েছে সরকারের পায়ে, অরবানের সকল পদক্ষেপকে মাস্টার স্ট্রোক হিসেবে বন্দনা করা হয়, কিছু মানুষ তাঁদের বিবেককে বিসর্জন দেননি গড়া খবরকে আমল না দিয়ে সকল বাধাকে তুচ্ছ করে খবরের সন্ধানে ঘুরেছেন।

    আন্দ্রাস পেথো



    তিনজন সাংবাদিক, আন্দ্রাস পেথো, গেরগো সালিং এবং বালাস অইয়ার ডিরেক্ট ৩৬ নামক একটি ইন্টারনেট চ্যানেল চালিয়ে গেছেন অনেক বাধা সত্ত্বেও অরবান বিদায়ে এদের ভূমিকা কিছু কম নয়। হোয়াটসঅ্যাপে, সমস্ত চ্যানেলে নিরন্তর প্রচারিত সংবাদের বিরুদ্ধে অন্য মত ও তথ্য পেশ করতে বুকের পাটা লাগে। একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে আন্দ্রাস বলেছেন অরবান ক্ষমতায় এসেই একটি মিডিয়া কানুন জারি করেছিলেন, সাংবাদিকতার স্থান ছিল না সেখানে। তার পরিচালনায় ছিলেন অরবানের নিজের পালিত লোক- প্রথম স্টেপ সরকারি রেডিও টেলিভিশনকে দাবে আনা, প্রোমোশনের লোভ বদলি বা বরখাস্তের ভয় দেখিয়ে সে উদ্দেশ্য সহজেই সিদ্ধ হয়েছে। এর পরে অরবান যখন প্রাইভেট মিডিয়া দখলের কাজে নামলেন সেখানে গায়ের জোর নিতান্ত অগণতান্ত্রিক বিবেচিত হতে পারে তাই পুলিস পাঠিয়ে নয়, অপটিক বজায় রেখে অলিগারকরা ফিল্ডে নামলেন। এটি ছিল পলিটিকাল অপারেশন, অরওয়েলিয়ান দুঃস্বপ্ন; নির্বাচিত সংবাদের জয়যাত্রা।

    প্রেস স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক লিগ টেবিলে কুড়ি নম্বর থেকে তিরাশিতে নেমে আসে অরবানের কালে।

    ২০২৬ সালে অরবান চতুর্থ বার প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থী হলেন, আমেরিকান উপ রাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স তাঁর সমর্থনে প্রকাশ্য সমাবেশে দাঁড়ালেন; ফিদেস পার্টির স্লোগান ছিলো –

    “এবারের নির্বাচন হাঙ্গেরির অস্তিত্বের এবং সেই সঙ্গে ইউরোপীয় শান্তির নির্বাচন। ফিদেস ক্ষমতায় না এলে শুধু হাঙ্গেরি নয়, ইউরোপের সামুহিক বিপদ আসন্ন “

    ২০২৬ সালের নির্বাচনে ফিদেস হেরে যায়। স্বচ্ছতার প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে পিটার মাজর জিতেছেন তাঁর অন্যতম প্রধান অ্যাকশন পয়েন্ট -আইন দ্বারা মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

    *পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি তৃতীয় খণ্ড, গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনা এবং Syndicated Lending in Emerging Market, Euromoney Publication 1997


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন।