এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • কাজার ডায়েরি - ১২

    দ লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৫৭ বার পঠিত
  • ০ | ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ | ১২
    দেমুল গ্রাম


    রুক্ষ পাহাড়ের কোলে ছোট্ট দেমুল

    আগেরদিন যেমন কথা হয়েছিল আমি ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে তৈরী হয়ে ৬.২০ থেকে অপেক্ষা করছি। মন্যিয়া কাল রাত একটা নাগাদ ঘরে এসে সব গুছিয়ে গাছিয়ে নিয়ে চলে গেছে। রসিকা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আমি দরজার ফাঁকে তোয়ালে গুঁজে দরজা টেনে বেরোই। এদিকে গাড়ি আর আসে না। সোনমকে কয়েকবার ফোন করে দেখা গেল ও ঘুমোচ্ছে, ওর ভাইয়া গাড়ি নিয়ে আসছে। তা এলো প্রায় ছটা পঞ্চাশে। লেমন গ্রিন জিমনি নিয়ে সেই তাশি ছেলেটি যে আমাকে প্রথম দিন ওডিন হোস্টেল থেকে ওসেল রুমে পৌঁছে দিয়েছিল।

    তাশিও আমায় দেখে কিছুটা অবাক। 'আরে তুমি তো দেখি অনেকদিন কাজায় আছো! নাকি কোথাও গিয়ে আবার ঘুরে টুরে কাজায় ফিরে এলে?' বললাম না বাপু আমি এখানেই ছিলাম। এই তো তোমার ছোটভাই আমায় কীগোম্পা ঘুরিয়ে আনল গত সপ্তাহে। এইসব টুকটাক কথা বলতে বলতে আমরা ততক্ষণে কাজার সীমানা ছাড়িয়ে NH505 ধরে এগোচ্ছি। সামনে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সুজ্জিমামা উঠছে আড়মোড়া ভেঙে। কাজার পূর্বদিকে ১৪১৭০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত দেমুলের দূরত্ব কাজা থেকে ৩২ কিমির মত।

    মিনিট কুড়ি যাবার পরে NH 505 একটা শার্প টার্ন নিয়ে আমরা দেমুল রোড ধরে নিলাম। এমনিতে এত সকালে হাইওয়েতেও গাড়ির দেখা বিশেষ নেই। যাও বা দু'একটা গাড়ি দেখা গিয়েছিল দেমুল রোডে ওঠার পরে পৌঁছানো অবধি বাকী রাস্তায় আর কোন গাড়ি দেখি নি। শুধু এক জায়গায় একটা থর (মাউন্টেন থর নয়, গাড়ি থর) দাঁড়িয়েছিল। একেবারে খালি। সম্ভবত কিছু সমস্যা হয়েছে। তাশি বলল কাজা থেকে পার্টস এনে সারিয়েই চলতে পারবে। এসব জায়গায় গাড়ি খারাপ হলে এছাড়া কোন উপায় নেই।

    কাজায় বসে যে তুষারমুকুট পর্বত দেখি সে ক্রমেই সামনে চলে আসছে। তাশি বলে ওই পাহাড়টার পিছনেই দেমুল। আমরা ঘুরে ঘুরে পুরোটা উঠবো তারপর ওপাশে একটু নামলেই পৌঁছে যাবো। দেমুলের সবচেয়ে কাছের শহর কাজা। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় HRTC র কাজা ডিপো থেকে একটা বাস দেমুলে আসে। পরেরদিন সকাল সাড়ে সাতটায় সেই বাসটা আবার কাজায় ফেরত যায়। বাসে দেমুল এলে অন্তত দুই রাত থাকার প্ল্যান করতে হয়। নাহলে দেমুলকে আবছাভাবেও চেনা হবে না।

    দেমুলের লোকসংখ্যা শ তিনেকের মত, ষাটটার মত বাড়ি তার অর্ধেক হোমস্টে। দেমুলে কম্যুনিটি ট্যুরিজম চালু আছে। মোটামুটি সবাই যাতে প্রায় সমান রোজগার করতে পারে তাই প্রত্যেক বছর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব পরিবারকে হোমস্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রামপ্রধান এই দায়িত্ব বন্টনের কাজটা করেন।


    পাথরে প্রাণের উদ্ভাস
     
    তুষারমুকুটের কাছাকাছি পৌঁছে এক জায়গায় দেখি রুক্ষ কালো পাথরের উপরে থোকা থোকা সাদা ফুল কুশনের মত বিছিয়ে রয়েছে। দেখে ভারী অবাক লাগে। হয়ত পাথরের নীচে কোথাও ভূমিজ জলের অস্তিত্ব আছে, অথবা হয়ত এরা পাথরেই হয়, কে জানে! আটটা নাগাদ দেমুল গ্রামের নীচের চত্বরে পৌঁছে যাই আমরা। Hrtcর বাসখানা দেখি চুপচাপ দরজা জানলা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, লোকজন নেই। এর তো অনেকক্ষণ ছেড়ে যাবার কথা।

    গ্রামে পৌঁছে জানা গেল বাসটা খারাপ হয়ে গেছে তাই ড্রাইভার আর কন্ডাকটার একজন গ্রামবাসীকে ধরে তাঁর গাড়ি চেপে কাজা চলে গেছেন। বিকেলের বাসে মেকানিক সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন তাঁরা। এবড়ো খেবড়ো পাথরে ভরা ছোট্ট একটা চড়াই বেয়ে গ্রামে উঠতে হয়। খানিকটা উঠে তাশি আমায় বলে তোমাদের ইকোস্ফিয়ারের কিছু লোক এখানে থাকে। তুমি এখানেই দাঁড়াও আমি দেখে আসি ওদের ওখানে এখন যাওয়া যাবে নাকি। প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম যেমন হয়, একেবারে শান্ত চুপচাপ চারিদিক।


    ওঠার সিঁড়ি পাশে শীতের জ্বালানি জমা করা

    মিনিটখানেকের মধ্যে তাশি উপর থেকে মুখ বাড়িয়ে বলে এইদিক দিয়ে উঠে এসো, ওরা ডাকছে তোমাকে। 'ওরা' কারা? কে জানে গিয়েই দেখি। এদিকটায় একটু সিঁড়িমত বানানো আছে তাই সহজেই উঠে পড়ি। এতক্ষণ কনকনে হাওয়ায় জ্যাকেটশুদ্ধ কেঁপে যাচ্ছিলাম। উঠে গোটা দুই দরজা ও আরো কিছু পাথরের সিঁড়ি পেরিয়ে একটা ঢাকা ছাদে পৌঁছাই। অস্বচ্ছ প্লাস্টিক জাতীয় কিছু দিয়ে ঘেরা ফলে সূর্য্যের আলো যদিও বোঝা যাচ্ছে কিন্তু সরাসরি আসছে না আর বেশ গরম, আরামদায়ক।

    তাশি বলে গ্রিনহাউস বানানো এখানে তাই এত আরামের। বেশ লম্বা চওড়া ছাদ, কিছু গাছও আছে কাঠের আর পাথরের পাত্রে বসানো। একটি অল্পবয়সী মেয়ে স্বাগত জানিয়ে শেষপ্রান্তের ঘরে নিয়ে যায়। এটাই ওদের রান্না কাম বসার ঘর। পুরো ঘরে গদি পাতা, একধার বরাবর অল্প উঁচু করে কাঠের পাটাতন, খাবার খাওয়া বা লেখাপড়া করার জন্য। লাদাখ ও স্পিতির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই রান্নাঘরই বসার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ঘরের তিনদিক জুড়ে বসার জায়গা ও থালা রাখার নীচু পাটাতন থাকে।
     
    চাতক বা বাকু (দোলতক)

    ঘরে ঢুকে আরাম করে বসি। একটা পুঁচকে হামাগুড়ি দেওয়া বাচ্চা চলা থামিয়ে অপার কৌতহলে আমাকে দেখতে থাকে। অল্পবয়সী মেয়েটির নাম গিতুক। ঘরের মাঝখানে পাথরের উনুন, জ্বালানি কাঠ, শুকনো পাতা, ইয়াকের শুকনো গোবর দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। ঢিমে আঁচে রান্না হয়। লাদাখে একে দোলতক বলে। উনুন থেকে একটা কাঠের ফাঁপা নল উঠে গেছে ছাদ অবধি। উনুনের ধোঁয়া এই পথেই বাইরে যায়। তাশি জানায় এখানে ওরা এটাকে চাতক বা বাকু বলে আর কাশ্মীরে বলে বুখারি।


    টায়রা জাতীয় শিরোভূষণ

    কিন্তু নাহ বুখারি একটু অন্য জিনিষ। তাছাড়া সেটা পুরো কাঠের তৈরী হয়। তাশি অবশ্য মানতে চায় না, ঘাড় নেড়ে বলে না না কাশ্মিরে এটাকেই বুখারি বলে। এখন অবশ্য দোলতক বা চাতক স্লো কুকিঙের জন্য ব্যবহার হয়। আর ব্যবহার হয় শীতকালে, ঘর গরম রাখতে। ঘরের স্বাভাবিক রান্নার জন্য গিতুক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে, আসে কাজা থেকে। অন্যান্য বাড়িতেও বেশিরভাগ গ্যাস সিলিন্ডার, দুয়েক ঘর পাথরের ছোট উনুন ব্যবহার করে। গিতুক ঝপাঝপ দুই কাপ গ্রিন টি বানিয়ে বিস্কুটসহ নিয়ে আসে।


    কানের দুল

    প্রাতরাশ করব কিনা জিজ্ঞাসা করে। আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি, ভোরবেলা বিনা নোটিশে সম্পূর্ণ অপরিচিত কারো বাড়ি চড়াও হয়ে খাওয়া দাওয়া করতে কুন্ঠা হয়। তাশি অবশ্য জোর দিয়ে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ বানাও, ঢাংকর পৌঁছানোর আগে আর কিছু পাওয়া যাবে না। এখান থেকেই খেয়েদেয়ে যাবো আমরা। তাশি আর গিতুক ক্লাসমেট ছিল, একইসাথে ক্লাস টেন অবধি পড়েছে। তাশি, সোনমও দেমুলের ছেলে, তবে ওদের বাবা ২০০৮এ কাজা চলে যান। ওদের বাড়িঘর এখনো দেমুলে আছে,তালাবন্ধ।


    বক্ষভূষণ - পোষাকের উপরে বাঁ কাঁধ থেকে শালের মত ঝুলিয়ে নেওয়া হয়

    এক বয়স্কা মহিলা আসেন, গিতুকের মা। তিনি হিন্দী একেবারেই বলতে পারেন না তবে খানিকটা বুঝতে পারেন। তাশি দোভাষীর কাজ করে, বুঝিয়ে বলে আমি তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক দেখতে চাই, জানতে চাই রাসায়নিক ও প্ল্যাস্টিকবর্জিত তাঁদের দৈনন্দিন যাপনের কথা। তিনি মহা উৎসাহে তাঁদের বিয়েতে ব্যবহৃত পোষাক, গয়নার ভান্ডার এনে মেলে ধরেন সামনে। পোষাক গায়ে মেলে ধরে দেখান এই যে এমনভাবে পরতে হয় এগুলো। গয়না প্রায় সবই ঝকঝকে রূপোর, তাতে টারকোয়েজ, লাপিস লাজুলি ও অন্যান্য সেমিপ্রেশাস স্টোন বসানো। অপূর্ব শিরোভূষণ, কানজোড়া কর্ণাভরণ দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।


    শিরোভূষণ - কপাল দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়

    গিতুক আলুর পরোটা ভেজে আনে সাথে নুন মাখনের তিব্বতী চা। সে আলুর পরোটা টিপিকাল নর্থ ইন্ডিয়ান মোটা মোটা তেল বা মাখন চপচপে পরোটা নয় যার পেটে প্রচুর তেল মশলা দেওয়া ক্যাতক্যাতে আলুর পুর ভরা থাকে। এ পরোটা প্রায় বাঙালি পরোটার মতই পাতলা, বাকহুইটের আটা আর গমের আটা মিশিয়ে তৈরী। ভেতরে জিরে ফোড়ন দেওয়া ধনেপাতা দিয়ে নাড়াচাড়া করা লুডোর ছক্কার মত ছোট ছোট আলুর টুকরোর পুর। আর তার স্বাদ... আহাহা অমনটি আর কোথাও খাই নি গো। গিতুক আমার মুখ দেখে বলে ভাল লাগছে? সে আর বলতে!


    কন্ঠভূষণ - এই মুক্তো আর সোনার তৈরী


    রূপোর তৈরী লকেট

    বলে হবেই তো আমরা তো কোন কেমিকাল সার দিই না। এই জিরে, ধনেপাতা, আলু, বাকহুইট, গেঁহু সব আমাদের ক্ষেতের ফসল। আমাদের এখানে পোকাও হয় না যে পোকা মারার ওষুধ দেবো। আন্টিজি তড়বড়িয়ে কিছু বলেন ভোটি ভাষায়। তাশি বুঝিয়ে দেয় উনি গিতুকের মা, বলছেন পোকা একেবারে হয় না তা নয়। কোন কোন বছর, যেবারে শীতে বরফ খুব কম পড়ে সেবারে পোকা হয়। তখন ওঁরা পাতা জ্বালিয়ে বা কোন একটা বিশেষ গাছের পাতা থেঁতো করে তার জল দিয়ে স্নান করিয়ে পোকা তাড়ান।


    রূপোর তৈরী লকেটজাতীয় অলঙ্কার। মালার সাথে আটকে পরা হয়

    চায়ে দেওয়া মাখনও ডেমুর ( মাদী ইয়াক) দুধের মাখনের সাথে অল্প আমুল বাটার মেশানো। পরোটায় মাখানোর জন্য ডেমুর দুধের ঘিয়ের ইয়াব্বড় বয়াম সামনে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। একটা পরোটা খেয়ে আর পারছি না বলায় গিতুক ছোট।ছোট তিনকোণা পরোটা খানকয়েক ভেজে এনে বলেন এগুলো ছোট আছে খেয়ে নাও। খাবারের গন্ধেই বোধহয় এক ছাইরঙা ডোরাকাটা বেড়াল এসে গম্ভীরমুখে দোলতকের পাশে বসে। বেড়ালটাকে অবিকল আনুবিসের মত দেখতে।



    ইতোমধ্যে আরো দুজন স্থানীয় মহিলা এসে চা নিয়ে বসেছেন। আমি আস্তে আস্তে তাশিকে বলি এই দেমুলেই নরবুজিরও বাড়ি শুনেছি। ওমা ঘরভর্তি সবাই হই হই করে হেসে ওঠে। তাশি আর গিতুকের হাসি তো থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে একটু দম নিয়ে তাশি বলে এটাই নরবুজির বাড়ি, গিতুক নরবুজির ছোট বোন, ইনি নরবুজির মা। বোঝো কান্ড! আন্টিজি গিয়ে আবার একটা বাটি ভরতি খইয়ের মত দেখতে কি একটা নিয়ে আসেন। তাশি বলে খাও খাও, ছুরপি, এটা আমাদের স্ন্যাক্স।


    শুকানো ছুরপি
     
    আরে ছুরপি জানি বৈকি, ডেমুর দুধের পনির শুকিয়ে হয়। সিকিমে তো লম্বা স্ট্রীপ দেখেছি। এ বেশ ছোট ছোট মুড়কির মত। খেতেও খাসা। একটু শক্ত, কড়মড়িয়ে ভেঙে খেলে মুখে একটা হালকা টকমিষ্টি স্বাদ ছড়িয়ে পড়ে। আন্টিজি আরেক বাটি নিয়ে আসেন, এটা বেশ নরম আর টক, হালকা একটা গন্ধও আছে। এটা ফ্রেশ ছুরপি, এখনো মিষ্টি মিশিয়ে শুকানো হয় নি। আর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই শুকিয়ে ফেলতে হবে। শীতের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।


    টাটকা ছুরপি

    দেমুলেও কিছুদিন আগে পর্যন্ত আটা বা মশলা পেষাইয়ের জন্য তুর্তুকের মত পানিচাক্কি ব্যবহার হত। তুর্তুকে হিমবাহ গলা জলে চাক্কি ঘুরে পেষাই করে, শীতকালে হিমবাহ জমে থাকে বলে ৬ -৭ মাস কিচ্ছু পেষাই হয় না। দেমুলে এখন বেশী জিনিষের জন্য পাথরের হামানদিস্তা আর অল্পস্বল্প জিনিষের জন্য পাথরের খল নুড়ি ব্যবহার হয়। গোটা গ্রামে এখন একটাই পানিচাক্কি আছে গ্রাম থেকে অনেকটা নীচে নদীর পাড়ে। সে আর বিশেষ ব্যবহার হয় না। গিতুকদের বাড়ির পানিচাক্কিটা ওরা কমিক গোম্পায় মিউজিয়ামের জন্য দান করেছে।


    পানিচাক্কি মিউজিয়ামে গেছে পাটাখানা রয়ে গেছে

    এইটা একটা নতুন খবর। কমিক গোম্পার অধীন গ্রামগুলো থেকে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নানা জিনিষ সংগ্রহ করে এই বছর থেকে গোম্পায় একটা মিউজিয়াম চালু হয়েছে। আহা আগে জানলে একবার ঘুরে আসা যেত। ২০২৩ এ যখন গিয়েছিলাম তখন তো এসব ছিল না। সাড়ে দশটা বাজে, এবারে ওঠা যাক। নাহলে এরা মধ্যাহ্নভোজ খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। খাবার দাবারের দাম নিতে তো কিছুতেই রাজী নয়। শুনেছিলাম স্পিতির ঐতিহ্য অনুসারে অতিথির থেকে দাম নিতে এঁরা তিনবার মানা করেন। চতুর্থবার বললে কিছু নেন। অন্তত চার থেকে পাঁচবার অনুরোধ করাই ভদ্রতা।
     
    দেমুলের একটা বাড়ি

    তাইই হল। চতুর্থবারে গিতুক বলে ওই হামাগুড়ি দেওয়া শিশুটির চকোলেট খাবার জন্য ৫০ টাকা আমি দিতে পারি। ঢাংকর পৌঁছাতে দেড় থেকে দুই ঘন্টা লাগতে পারে। একটু বাথরুম যাওয়া দরকার। দেমুলের সব বাড়িতেই ড্রাই টয়লেট। একটা গর্ত আর দুপাশে দুটো পাথর। গরমের ছয়মাস নিজেকে পরিস্কার করার জল থাকে, শীতে তাও প্রায় থাকেই না, যেহেতু জমে যায়। গর্তটা অনেক গভীর, প্রায় ওঁদের ক্ষেতিজমির লেভেলে। প্রতি বছর নভেম্বর ডিসেম্বরে কয়েক রাউন্ড তুষারপাত হয়ে গেলে গর্তে জমা মনুষ্যবর্জ্য ও মাটির মিশ্রণ টেনে ক্ষেতে ফেলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

    এরপরে জানুয়ারি থেকে মার্চ এপ্রিল পর্যন্ত আরো বরফ পড়ে, তারপরে বরফ গললে যখন শস্যবীজ বপন হয় তখন জমি উৎকৃষ্ট জৈবসার পেয়ে একেবারে তৈরী। যত বেশী বরফ পড়ে তত ভাল মাটিতে সার জমে। গিতুক আমায় নিয়ে যায় এক নিকষ অন্ধকার কুঠুরির সামনে। বলে এই দরজাটা বন্ধ করে গোটা কুড়ি পঁচিশ সিঁড়ি নেমে যেখানে পৌঁছাবে সেখানেই একটা গর্তের দুপাশে দুটো পাথর আছে। ব্যাস বসে পড়ো।

    অ্যাঁ এই অন্ধকারে নামবো কী করে? সিঁড়ি দেখি সোজা ৮৫ ডিগ্রি কোণে নেমেছে, কোন ধাপেই আমার ৩ নম্বর সাইজের পায়ের পাতাও পুরো আঁটছে না। বললাম না বাপু দরকার নেই আর। এই দরজা বন্ধ করে ওই নিকষ আঁধারে কুড়ি পিচিশ ধাপ নামতে আমি পারবো না। গিতুক ব্যস্ত হয়ে বলে ওই তো আরো দোতলা উপরে একটা গর্ত করা আছে ওখান দিয়ে আলো আসছে তো। দেখি অনেকটা উপরে একটা ২ ইঞ্চি ব্যাসের গর্ত আছে বটে তাতে আলো কিছুই হচ্ছে না।

    আমি তাশিকে বলি চল যাই। তাশি বলে নীচের পার্কিঙ চত্বরে মোবাইল টয়লেট আছে, ওখানে যেতে সুবিধে হবে। আন্টিজি কিসব বলতে বলতে আমার একহাত শক্ত করে ধরে যে পথে উঠেছিলাম সে পথে নামতে থাকেন। কিন্তু নাহ অর্ধেক নেমে আমাকে টেনে বাঁদিকের একটা চ্যাটালো পাথরের উপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে আরেকটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে একটা জীর্ণ তালা খুলে দরজাটা খুলে ধরেন। আরেকটা ড্রাই টয়লেট, তবে সিঁড়ি টিড়ি নেই, সরাসরি একটা গর্ত আর দুপাশে বেশ প্রশস্ত পাথর।

    গর্তটা কত গভীর বোঝা যায় না, তবে কোনরকম বাজে গন্ধ নেই। তো এটা ব্যবহারে অসুবিধে নেই। বেরিয়ে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে জানলাম এটা ওঁদের গ্রামের অতিথিদের জন্য বানানো, চারটে বাড়ির শেয়ারড টয়লেট। জানলাম আমাকে আপন ভেবে প্রথমে ওঁরা নিজেদের বাড়ির টয়লেটই খুলে দিয়েছিলেন। এবাবা! খুবই লজ্জিত হয়ে আন্টিজির হাত ধরে বারেবারে দু:খ প্রকাশ করি উনিও অনেক কিছু বলেন। কিছুই বুঝি না।

    তাশি অনুবাদ করে দেয়, ওঁদের বিখ্যাত কালো কড়াইশুঁটি শেষ হয়ে গেছে, চারদিকের সব ফসল তোলা হয়ে গেছে, চারদিকের দৃশ্য আর তেমন মনোরম নেই, আমি এত দেরীতে এসেছি! আগামী মে জুন মাসে যেন অতি অবশ্য একবার আসি। তখন ভাল করে যত্ন করতে পারবেন। তাশিকে বলেন আমার হাত ধরে ওই পাথর আর সিঁড়ি নামায় যেন। আরো বলেন ঢাংকর গোম্পায় অনেক হাঁটতে হয় অনেক সিঁড়ি চড়তে হয়, তাশি যেন আমায় হাত ধরে নেয়। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বলি আরে আমি চলতে পারি, হাত ধরতে হবে না।


    দেমুল গ্রামের তোরণ

    তাশি বলে আসলে আমার হাতের হাইকিং স্টিকটা দেখে উনি ভেবেছেন আমার পায়ে বা কোমরে কোন সিরিয়াস সমস্যা আছে, তাই গ্রামের ছেলে তাশিকে দায়িত্ব দিচ্ছেন আমাকে নিরাপদে কাজা পৌঁছে দেবার। এইসব অকারণ ভালবাসা, উদ্বেগ তো আর কোন যুক্তি মানে না, তাই চুপচাপ নেমে আসি। কথা দিয়ে আসি একবার মে জুন মাসে আসবো হরিয়ালি দেখতে। আরেকবার তো আসতেই হবে। দেমুলে রতনজোট গাছ হয়, শ্রুতি নিয়ে গিয়েছিল। এখন তো আর নেই, এটা দেখতে আসতে হবে। সেবার বাসে করে আসবো, দুই তিনদিন থেকে বাসে করেই ফেরত যাবো। কিম্বা কে জানে হয়ত ট্রেক করে পারাং-লা হয়ে সোমোরিরি চলে যাবো। স্বপ্ন দেখতে তো বাধা নেই।
     
    গ্রামের রক্ষাকর্তা দেবতা - বৌদ্ধদের শাক্য সেক্টের কোন এক অবতার
     
    (চলবে)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ০ | ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ | ১২
  • ভ্রমণ | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৫৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Джошита | ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৫৪743580
  • বাহ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন।