এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • কাজার ডায়েরি - ৩ 

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩৯ বার পঠিত
  • | | |
    ১৫/০৯/২৬


    ওসেল রুমে সকাল

    আজকের দিনটা বেশ চ্যালেঞ্জিং গেল। সকালে যখন ঘুম ভাঙল জেনজিদ্বয় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কাল রাত দেড়টাতেও তারা ঘরে ফেরে নি, কাজেই স্বাভাবিক। এদিকে আজ তো নাকি আমাদের দুজনের চালানোর কথা। বুঝলাম চাপ আছে। এদিকে আমাদের রুমের গিজার থেকে লিক করছে আর জল গরমও হচ্ছে না। শুনেছিলাম হাউসকিপিঙের বিশালকে বললে ছাদের সোলার গিজার থেকে বালতি ভরে এনে দেবে।

    তা বিশালভাই বিশাল হাসি হেসে বলল ৫ মিনিট কল খুলে রাখো এসে যাবে গরম। ঘন্টা! ২৫ মিনিট খুলে রেখেও কিস্যুই হল না। এদিকে দেরী হচ্ছে। ঠান্ডা জলে স্নান করার চেষ্টা করে মাথায় ১ মগ জল ঢালতেই মাথাটা জাস্ট জমে গেল। কোন সাড় নেই। তাড়াতাড়ি ঘষে ঘষে সাড় ফিরিয়ে কোনমতে কাকস্নান সেরে কয়েক চামচ পোহা আর কফি খেয়ে সল ক্যাফের দিকে রওনা।

    কাজা মার্কেটটা লেহ মার্কেটের মত ঝলমলে ঝকঝকে নয়। একটু মলিন একটু অগোছালো এলোমেলো। সরু সরু কাশীর মত গলি, শুধু একফোঁটাও সমতল নয়। হয় চড়াই উঠছি নয় উৎরাই নামছি। গলির মাঝ বরাবর জালি ঢাকা নর্দমা। গরু বা ইয়াক এগুলো পেরোতে পারে না। অজস্র গরম পোশাকের দোকান মাঝেমধ্যে একটা দুটো মনিহারি দোকান। আর আছে বাইক রেন্ট আর ট্যুরিজম এজেন্সির দোকান। গলির মধ্যে দামড়া জাইলো কি ইনোভা আসতে দেখে দোকানের ধাপে উঠে দাঁড়াই। বয়স্কা দোকানি একগাল হেসে বলেন জুলে জুলে। নাকের নোলক দুলে উঠে ঝিকিমিকি ছড়ায়। দোকানির চোখের চারপাশে কত বছরের শীতের গল্প জমে আছে।

    ক্যাফেতে ঢুকতে ঢুকতেই দেখি জনা ছয়েক খদ্দের চিলুবিলু করছে। ইগা হাসিমুখে অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। একজন আবার খাবার দাবার ছাড়াও সোয়েট টিশার্ট নিতে চায়। অতএব তাকে ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা, রান্নাঘরে তাশি জুনিয়ারকে অর্ডার বোঝানো আবার এনে সার্ভ করা, বিলিং করা, সে যাকে বলে পুঁদিচ্চেরি অবস্থা। ইগার অন্য কাজে থাকার কথা, আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছাই নি দেখে ও এসে গেছে সামলাতে। আমাকে ঝড়ের বেগে বুঝিয়ে চলে গেল। তারপর একঘন্টা হাবুডুবু হাবুডুবু। অ্যাপটায় বিলিঙে এমন হাবুডুবু খাচ্ছিলাম যে একদল পোলিশ পর্যটক মেনু দেখে দেখে পকেট থেকে ক্যাশ গুণে গুণে কাউন্টারে রেখে বাই বলে হাওয়া। laugh



    এদিকে অ্যাপে বিল না হওয়ায় ট্যাক্স যোগ হয় নি। ব্যপারটা বুঝে তো আমার একগাল মাছি। প্রথমদিনই টাকা ভরতে হবে! তাশি বলল না না ওটা আমরা ক্যাশ ডিসকাউন্ট করে দেবো। রাতে নুরবুকে বলে দিও। ও ঠিক করে দেবে। মন্যিয়া এলো দশটা চল্লিশে। আধঘন্টাখানেক কাউন্টারে বসেই ভেতরের ঘরে গিয়ে অন্য একজন ভলান্টিয়ারের সাথে গপ্প জুড়ল। ক্রমে আরো একজন এলো, শ্রুতি এলো। ভেতরের ঘরে তারা হইহই করে আড্ডা দিতেই লাগল। ওদেরই একজন রান্নাঘরে গিয়ে এক কড়াই পাস্তা বানাল। রুমে ফিরে ডালভাত খাবার চেয়ে এটা বেটার অপশান। খেয়েদেয়ে পৌণে দুটো নাগাদ রুমে ফিরলাম বিশ্রাম করতে।



    এক বাঙালি মা তার ছানাকে নিয়ে এসেছিলেন। ম্যাগি আছে কিনা বলায় বললাম না নেই। হিন্দিতেই জিজ্ঞাসা করছিলেন। তাকে সল স্পেশ্যাল স্যান্ডউইচ অফার করতেই ছানাটা লাফিয়ে উঠল আর আমার ইমনের কথা মনে পড়ল। তখনই বাংলা শুনে জিজ্ঞাসা করলাম, ভদ্রমহিলা ভারী খুশী হলেন। নদীয়া জেলায় বাড়ি, গ্রুপের সাথে এসেছেন। ছেলের উঠতে দেরী হুওয়ায় গ্রুপের ব্রেকফাস্ট মিস হয়েছে। এখন গাড়িতে মাল লোড হচ্ছে তাই এসেছেন ছেলেকে খাওয়াতে। অবশেষে টোস্ট আর অমলেট খেয়ে গেল ছানাটা।

    আরেকজন অর্ডার করে একটু পরে জিজ্ঞাসা করে মুধ ভিলেজের হোমস্টের খবর দিতে পারবো কিনা। টুকটাক সার্চ করে দিলাম। তার পোষাল না, আরো সস্তা চাই। বললাম গ্রামের কোন বাড়িতে গিয়ে থাকতে। অনেক কম টাকায় হবে। সে ভারী খুশী। কথায় কথায় জানা গেল ইজরায়েল থেকে এসেছে। ইজরায়েলের সবাই কাসোল যায় তাই ও স্পিতি এসেছে। ইজরায়েল শুনেই মনের মধ্যে এমন একটা বিতৃষ্ণা হল... নিজেকে শাসন করি দেশটা জেনোসাইডাল সব মানুষ তো নয়। আরেক ডাচ মহিলা জিজ্ঞাসা করছিলেন হিক্কিম কিব্বের আর লাংজার কোন একটায় গিয়ে আর দুটোতে হেঁটে হেঁটে যাওয়া যায় কিনা। তাকে প্ল্যান বানিয়ে দিলাম সকালের বাস ধরে লাংজা যাও। তারপর হাঁটাহাঁটি করে ঘুরে ফিরে আবার লাংজায় ফিরে বাস ধরে ফেরত এসো। সে মহিলা বেদম খুশী। আমিও খুশী। হিমবাস চ্যানেলটা ফলো করা সার্থক।

    মন্যিয়াকে বলে এসেছিলাম। ও বাবা সেও দেখি আড়াইটে নাগাদ রুমে ফিরল। আর সোয়া তিনটে নাগাদ লাফাতে লাফাতে কী মনাস্টারি বেড়াতে চলে গেল। আমায় বলে গেল আজ রাতে ক্যাফেটা তুমিই বন্ধ করো। যাচ্চলে! এরকম তো কথা ছিল না। এই গেঞ্জিগুলো কি জিনিষ মাইরি! আরেকটু শুয়ে বসে সাড়ে তিনটে নাগাদ ভাবছি এবার যাওয়া যাক। ওব্বাওয়া প্রোজেক্ট কোঅর্ডিনেটর বৈশালীর ফোন। তুমি আর মন্যিয়া ঝটপট যাও অনেক লোক এসে গেছে। বললাম মন্যিয়া তো শ্রুতির সাথে কী মনাস্টারি বেড়াতে গেল, আমি এমনিই বেরোচ্ছি। ৩ মিনিটে পৌঁছে যাবো।


    স্পিতিনদীর এক ঝলক

    গিয়ে দেখি ওরে বাবা সাত আটজন খদ্দের। কেউ জিজ্ঞাসা করছে সিবাকথর্ন টি কেমন খেতে? কেউ বলে আমার সাম্পায় বার্লিটা বেশী দিও কেউ বলে ওই টিশার্টের মত ফুলহাতা সোয়েট শার্ট দেখাও। একি তোমাদের আয়না নেই? তার বন্ধু বলে আয় এদিকে তোর ছবি তুলে দিই দেখে নে। তার সেটা মন:পুত নয়। কারো দাবী হোয় মিল্ক দিয়ে হট চকোলেট করে দিতে হবে। আরেকজনের বক্তব্য আপনাদের চকোলেট হুইস্কি টফিটায় তেমন ঝাঁজ নেই। সেই ঝড় থামল বিকেল পৌণে ছটায়।


    চোখ তুললেই এই দৃশ্য দেখার লোভেই তো এখানে আসা

    এরপরে আর তেমন কেউ আসে নি। একজন এসেছিল এখানে ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে কিনা জানতে, আরেকজন রাতের ডিনারে দাল চাওল বানিয়ে দেবো কিনা জানতে। ঘর খুঁজিয়েকে ওসেল রুমের খোঁজ দিলাম। এদিকে তাশি আজ বাড়ি গেছে। বিকেল পাঁচটায় বাস তাই চারটে চল্লিশে বেরিয়ে গেছে। ইগা এসে রান্নাঘর সামলাচ্ছিল। পৌনে নটা নাগাদ দোকান বন্ধ করে আমাতে ইগাতে গপ্প করতে করতে রুমে ফিরলাম। কোনমতে ব্যাগ নামিয়েই চারতলায় খেতে দৌড়। আজ নুরবুকে হিসাব বুঝিয়ে ট্যালি করাতে হবে।

    নুরবুর সাথে আলাপ হল, নাম শুনেই বললেন কাজায় এক খুব তেজীয়ান রানী ছিলেন দময়ন্তী নামে। তা আমি তো জানিই আমি আসলে রানী, সে আপনারা না মানলে বয়েই গেল। আমি ভুলটুলগুলো বললাম এক এক করে আর উনি বসে বসে তাতে কিসব ডিসকাউন্ট যোগ করে মিলিয়ে দিলেন। শেষমেষ হাতে ৭টাকা অতিরিক্ত ক্যাশ রয়েছে দেখা গেল। এটা যে কী করে হল কিচ্ছু জানি না, মাক্কালি বলছি।



    সব মিলিয়ে ঘটনাবহুল এক্সাইটিং দিন একটা।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | |
  • ভ্রমণ | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন