এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নাম নেই তবু কাম আছে 

    শ্রীমতী রীনা লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪৯ বার পঠিত
  • ১ | ২
    যে কথাগুলো আমাদের সামনে বলা হত না

    ছোটবেলায় একটা জিনিস খুব লক্ষ করতাম—বড়রা আমাদের সামনে সব কথা বলত না।
    আমরা ভাবতাম, বড়রা বোধহয় এমনিই আস্তে কথা বলে। এখন বুঝি, কথারও বয়স হয়। কিছু কথা শিশুদের বয়সে বলা যায় না, কিছু কথা পাড়ার দেওয়ালের বয়স পেরোলেও বলা যায় না। আর কিছু কথা এমন, যেগুলো বললে পাশের বাড়ির লোক শুনে ফেলতে পারে।
    সেই সময় পাড়ার দেওয়ালগুলোও যেন কথা বলত। কোথাও সাদা রঙের ওপর কালো অক্ষর, কোথাও লাল রঙে লেখা কিছু শব্দ। আমরা পড়তে পারতাম, কিন্তু সব বুঝতাম না। বড়দের মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করতাম, লেখাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
    রাজনীতি শব্দটাও তখন আমার কাছে খুব পরিষ্কার ছিল না। জানতাম, কিছু লোক মিছিল করে। কিছু লোক দেওয়ালে লিখে। কিছু লোক খুব জোরে কথা বলে। আবার কিছু লোক কথা বলার সময় দরজা বন্ধ করে দেয়।
    আমার সবচেয়ে কৌতূহল ছিল সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে।
    দরজা বন্ধ করে কী এমন কথা বলা যায়?
    বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটিকে কেউ অবশ্য কোনওদিন তা বলেনি।
    বাড়িতে বাবার কথাবার্তাতেও মাঝে মাঝে রাজনীতি ঢুকে পড়ত। বাবা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসেছিলেন। তাঁর মতো আরও কত মানুষ তখন নতুন করে সংসার গড়ছেন। কারও মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই, কারও চাকরি অনিশ্চিত, কারও ছেলেমেয়ের পড়াশোনার চিন্তা। দেশভাগ আমাদের বাড়ির কাছে ইতিহাসের কোনও অধ্যায় ছিল না; সেটা ছিল মানুষের মুখের রেখা।
    তখন বুঝিনি, উদ্বাস্তু হওয়াও এক ধরনের রাজনীতি।
    আমরা শুধু জানতাম, ওপার বাংলার কথা উঠলে বড়রা একটু অন্যরকম হয়ে যান।
    কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
    কেউ বলেন, “ওই সময়টা যদি না আসত…”
    তারপর থেমে যান।
    কথাটা আর শেষ হয় না।
    আমাদের পাড়ায় তখন নানা মতের মানুষ। কেউ কংগ্রেসের, কেউ বামপন্থী, কেউ কোনও দলের নয়—কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনা থেকে কেউ পুরোপুরি বাইরে ছিল না। চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে, বাড়ির বারান্দায়—দেশ, চালের দাম, কাজ, জমি, সরকার—সবই আলোচনার বিষয়।
    আমরা শিশুরা অবশ্য এসবের চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম কখন কার বাড়িতে লুচি হচ্ছে, কার ঘুড়ি সবচেয়ে উঁচুতে উঠেছে, আর পুজোর নাটকে কে নায়ক হচ্ছে।
    সময়ের সঙ্গে আমাদের অগ্রাধিকার বদলায়নি; শুধু শব্দের অর্থ বদলেছে।
    যে ছেলেটাকে আমরা নাটকে নায়ক হতে দেখতাম, সে হয়তো কয়েক বছর পর অন্য কোনও মিছিলে হাঁটছে। যে দাদা সন্ধেবেলা প্যান্ডেলের আলো লাগাচ্ছে, তাকে পরদিন কোথাও নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কারও নাম খুব আস্তে উচ্চারণ করা হচ্ছে। কারও নাম আর উচ্চারণই করা হচ্ছে না।
    আমরা তখনও পুজোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।
    নিউল্যান্ডের প্যান্ডেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া চলছে। কবিতা আবৃত্তি হবে, নাটক হবে। দাদারা ব্যস্ত। হেনাদি ব্যস্ত। আমিও তাদের আশেপাশে ঘুরছি।
    বাইরের পৃথিবী তখন আমাদের পাড়ার চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠছে, অথচ প্যান্ডেলের ভেতরে আমরা যেন একটা ছোট পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছি।
    সেখানে কারও মতবাদ নেই।
    কারও পোস্টার নেই।
    সেখানে শুধু মহড়া আছে।
    কেউ সংলাপ ভুলে গেলে হাসি আছে।
    কেউ কবিতা ভুল উচ্চারণ করলে আবার শুরু করা আছে।
    আর সন্ধে নামলে আলো জ্বলে।
    আজ ভাবি, পুজোর প্যান্ডেলগুলো হয়তো তখন আমাদের অজান্তেই একটা কাজ করত। তারা মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য একই জায়গায় দাঁড় করাত। যে মানুষটি সকালে অন্য মতের জন্য তর্ক করেছে, সন্ধেবেলায় সেও ভোগের লাইনে দাঁড়াত। যে বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির রাজনৈতিক মত মিলত না, তাদের ছেলেমেয়েরা একই মঞ্চে নাটক করত।
    সময় তখনও আমাদের শেখায়নি—একসঙ্গে থাকা আর একমত হওয়া এক জিনিস নয়।
    আমরা নিজেরাই শিখেছিলাম।
    পরে অনেক কিছু বদলেছে। রাজনীতির ভাষা বদলেছে। দেওয়ালের রং বদলেছে। মিছিলের স্লোগান বদলেছে। এমনকি পুজোর প্যান্ডেলের চেহারাও বদলেছে।
    কিন্তু আমার মনে রয়ে গেছে সেই সময়ের একটা দৃশ্য।
    দেওয়ালে লাল অক্ষর।
    তার ঠিক পাশেই প্যান্ডেলের বাঁশ।
    আর তার নিচে আমরা কয়েকজন শিশু দাঁড়িয়ে আছি—কেউ কিছু বুঝছি না, অথচ সবকিছু দেখছি।
    সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী তারাই, যারা তখন ইতিহাস বুঝত না।
    তারা শুধু দেখে রাখে।
    অনেক বছর পরে, বড় হয়ে, সেই দেখা জিনিসগুলোর অর্থ খুঁজতে বসে।
    আমিও বসেছি।
    এই ডায়েরি সেই খোঁজেরই শুরু।
    —শ্রীমতী রীনা
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ১ | ২
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন।