

অলংকরণ: রমিত
অম্লানকুসুম নামটা অম্লানের চেহারার সঙ্গে ঠিক যায় না। কেন যায় না বলা মুশকিল, তবে ওকে দেখলেই মনে হয় ফিনফিনে একটা বিষণ্ণতার চাদর ছেলেটা যেন জড়িয়ে রেখেছে নিজের গায়ে। নামটা তাই ম্লানকুসুম হলেই ওকে বেশি মানাতো। ওর ওই উদাস-বাউল ভাবটার জন্য বন্ধুরা অনেকে ওকে নাকউঁচু ভাবে। তবে আমার মনে হয়েছে, ও ঠিক নাকউঁচু নয়, বেচারা সবার সঙ্গে মিশতে পারে না। লোকের আর কী? যেটা বোঝে না সেটাতেই একটা নেগেটিভ ট্যাগ চিপকে দেয়।
গত নভেম্বরে জয়, উত্তম আর আমি অম্লানদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাড়িটা মেদিনীপুরের একটা গ্রামে। কলকাতায় তো হেমন্ত তেমন পাত্তাটাত্তা পায় না, অম্লানদের গ্রামে গিয়ে দেখে এসেছিলাম হেমন্ত কাকে বলে! দারুণ এনজয় করেছিলাম আমরা ট্রিপটা।
অম্লানদের বাড়িটা আবার ‘রাজবাড়ি’। অমন ঝুরঝুরে রাজবাড়ি অবশ্য বঙ্গদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এক-আধটা থাকে। ওই বাড়িরই একটা দিক সারিয়েসুরিয়ে নিয়ে বাস করে ওরা। অবশ্য বাসটা করেই বা কে? অম্লানের ভাই-বোন নেই, মা-বাবা মারা গেছে; ঐ ভূতের বাড়িতে থাকার মধ্যে কেবল অম্লান আর হরিকাকা, যার হাতে অম্লান মানুষ। অম্লানের রান্নাঘর টু ‘রাজ এস্টেট’ সবটাই এখন সামলায় ওই হরিকাকা।
খুব যত্নআত্তি পেয়েছিলাম সেবার! সক্কালবেলা চিলড্ খেজুর রস খাওয়াতো হরিকাকা, একেবারে স্ট্রেট ফ্রম গাছ। ওহ, সে যে কী জিনিস! একটু বেলায় রসটা হালকা গেঁজে গেলে সেটা টেনে টুল্লুও হতাম।
তিনজনেই তখন কাঠ বেকার। যাওয়া-আসার খরচাটা শুধু পকেট থেকে গিয়েছিল। বাকি সবটাই টেনে দিয়েছিল অম্লানদের ‘রাজ এস্টেট’। হরিকাকা একজন দলাই-মালাই করার লোক দিয়েছিল। তার ম্যাসাজ নিতে নিতে আরামে ঘুমিয়ে পড়তাম। অম্লানটা ম্যাসাজ নিত না। কেন নিত না কে জানে! সেবার অম্লান আর হরিকাকার দৌলতে কয়েকটা দিন খুব নবাবি করে কেটেছিল আমাদের।
সন্ধেবেলা ওদের দরজা-জানলা হাওয়া হয়ে যাওয়া ভূতপূর্ব নাচঘরটায় বসে আড্ডা দিতাম আমরা। ভূত হয়ে যাওয়া নর্তকীদের নাচ দেখার বদলে মাঝে মাঝে অম্লানের বাঁশি শুনতাম। বাঁশির এবিসিডি কিছু না বুঝলেও শুনতে বেশ লাগত; আর মনে হত, বাঁশিটা কী যেন বলছে, একটু মন দিয়ে শুনলেই ধরে ফেলব কথাটা। কিন্তু ওই, ‘ধরি ধরি মনে করি’ অব্দিই রয়ে যেত, তার বেশি এগোতো না। আমাদের মধ্যে উত্তমই ছিল গানবাজনা জানা পাবলিক। খেটে তবলা শেখা ওস্তাদ। সে-ই হঠাৎ হঠাৎ বলে উঠত, ‘আঃ, এইখানে শুদ্ধ নি-টা লাগাতে গেলি কেন’ কিংবা ‘বাহ, কোমল রে-র টাচটা দারুণ দিলি তো’। অম্লান হেসে বলত, দূর, কী লাগাচ্ছি আমিই ছাই জানি নাকি!
আসলে অম্লানের কোনও ফর্মাল ট্রেনিং ছিল না বাঁশিতে, যা খুশি তাই বাজাত। জয় একদিন অম্লানকে হিন্দি গান বাজাতে বলায় উত্তম-ওস্তাদ জয়কে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, না না, ও যা বাজাচ্ছে সেটাই বাজাতে দে। খুব ইন্টারেস্টিং ওর বাজনাটা। ভুলভাল জিনিসগুলোও হেবি নামায়।
অম্লানদের বাড়ির আরেকটা জিনিসও আমাদের চোখ টেনেছিল, ওদের ‘ফ্যামিলি ফোটো গ্যালারি’। বড় একটা ঘরের চার দেওয়াল জুড়ে শুধুই পূর্বপুরুষদের পোর্ট্রেট আর ফোটোগ্রাফ। তাদের দু-চারজনের ছবি দেখে মনে হতো, হ্যাঁ, রাজাগজা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় বটে এদের। ওদের ‘রাজবংশে’র চোদ্দ পুরুষের ছবি আছে সেখানে। অম্লান নাকি বংশের পঞ্চদশ পুরুষ।
হ্যাঁরে, কোনও মেয়ের ছবি নেই কেন তোদের গ্যালারিতে? শুধিয়েছিল জয়। চোখ নামিয়ে নিয়ে অম্লান বলেছিল, নেই। এটাই এ বংশের নিয়ম। বংশ বলতে আমরা শুধু ছেলেই বুঝি।
উত্তম হুঙ্কার দিয়ে বলেছিল, এত নারীবিদ্বেষী তোরা! তারপর উত্তম মনে হয় পেট্রিয়ার্কি নিয়ে একটা লেকচার দিতে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে দিয়ে জয় বলেছিল, আহা, অম্লানকে ঝাড়ছিস কেন? ও বেচারা কি নিয়মটা বানিয়েছে? উত্তম তবু থামেনি, বলেছিল, বানায়নি তো কী? মেনে তো চলছে। ও কেন শুধু ওর বাবার ছবি রেখেছে? মায়ের রাখেনি কেন? নিয়মটা অম্লানও তো বদলাতে পারত। অম্লানকে ঘিরে থাকা ম্লান ম্লান ভাবটা সেই মুহূর্তে আরো ঘন হয়ে উঠেছিল। দেখে খারাপ লেগেছিল আমার। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে তাড়াতাড়ি বলেছিলাম, চল, তোর একখানা ছবি ঝুলিয়ে দিই গ্যালারিতে।
না, বেঁচে থাকা লোকের ছবি ওঠে না দেওয়ালে। মারা গেলে ছবি টাঙানো হয়, বলেছিল অম্লান।
মস্ত এক সাবেকী পালঙ্কে শুতাম আমরা। অম্লান শুতো নিজের ঘরে। অনেক রাত অবধি বাঁশিও বাজাত। উত্তম একদিন ঘুমজড়ানো গলায় বলেছিল, শালা, বাঁশিতে এমন দরবারী কানাড়া শোনা যায় না বড়! আমি দরবারী ফরবারি বুঝি না, আমার কেবল মনে হত, জমে থাকা অনেক কান্না যেন বাঁশির ফুটোগুলো দিয়ে সুর হয়ে বেরিয়ে আসছে। জয় আর উত্তম আউট হয়ে যেত এক সময়, আমারই ঘুম আসত না।
ট্রিপটা খুব লাকি হয়েছিল সেবার। ফিরে আসার পর টপাটপ হিল্লে হয়ে গিয়েছিল আমাদের। নামী এক সরোদিয়ার সঙ্গে লম্বা বিদেশ ট্যুরে চলে গেল উত্তম। জয় কোয়ালিফাই করে বসল রাফটাফ নেট পরীক্ষায়, আর আমার জুটে গেল লোভনীয় পে-প্যাকেজের এক চাকরি। আজ যদিও বুঝি, মাইনের টোপ দিয়ে শালার চাকরি জাস্ট চুষে নিচ্ছে আমাকে। মোটকথা, সবাই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজেদের নিয়ে। অম্লানের ওই উদাস-বাউল চেহারা আর বাঁশির সুর কিন্তু মাঝে মাঝে মনে পড়ত আমার। কয়েকবার ফোনও করেছি, কিন্তু প্রতিবারই শুনেছি ‘পরিষেবা সীমার বাইরে’। এভারেস্টের চুড়োটা পর্যন্ত যেখানে আন্ডার কভারেজ, সেখানে এসব জায়গা পরিষেবা সীমার বাইরে থাকে কী করে কে জানে বাবা!
তারপর হঠাৎ একদিন অম্লানই ফোনে ধরে ফেলল আমায়; বলল, কেমন আছ? এসো না আর একবার। আসবে?
তুই-তোকারি করতে পারে না ছেলেটা। জয় আর উত্তম পুরোনো বন্ধু বলে ওদের তবু মাঝেমধ্যে তুই বলত, আমায় একবারও বলেনি। আমি আসলে ছিলাম উত্তমের বন্ধু।
ছোট একটা ব্রেক চাইছিলামই, অম্লানের ডাকে মনটা লাফিয়ে উঠল। এমন রেস্ট কোথায় আর পাব? মুখে লাফালাম না অবশ্য। এক বছরে কর্পোরেট চাকরি অনেক কেতা শিখিয়ে দিয়েছে। শিখিয়েছে, উল্লাসের এক্সপ্রেশন হবে মাপা, এমনকি কখনও কখনও তাকে হতে হবে একেবারে উলটো।
গলাটা একটু ভারিক্কি করে বললাম, তাহলে উত্তম আর জয়ের সঙ্গে কথা বলি?
ও বলল, বলে লাভ নেই, ওরা পারবে না। আমি ফোন করেছিলাম ওদের। তুমি একাই চলে এসো। অসুবিধা কিছু হবে না।
ওর গলাতে একটু যেন অনুনয়ের সুর। দিলাম হ্যাঁ বলে। আসলে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে দিন দুয়েক কাটানোর লোভটাই হ্যাঁ বলিয়ে দিল।
শুক্রবার অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা স্টিল এক্সপ্রেস।
ট্রেন ছাড়লে কল করে দেখি অম্লানের ফোন সুইচড অফ। এ কী রে বাবা, এখন কেউ ফোন বন্ধ রাখে! কলাইকুন্ডা পেরোচ্ছি যখন তখন দেখি অম্লানবাবুই ফোন করলেন, সরি গো, একটু প্রবলেম হয়েছে। মাস্টারমশায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একবার যেতে হচ্ছে তাই। কিছু মনে কোর না, প্লিজ। তোমাকে রিসিভ করার জন্য স্টেশনে গাড়ি থাকবে। আর হরিকাকা তো রয়েইছে। তোমার কোনো অসুবিধে হবে না।
বেশ বোর হলাম। তবে বুড়োমানুষের এসওএস কল অ্যাটেন্ড করতে যাচ্ছে যে তাকে আর কী বলি? নিজেকেই হালকা ধমকালাম, ফোকটে ছুটি কাটাবার মওকা পেয়েই দৌড়লি যেমন, বেশ হয়েছে! ওই ভূতের বাড়িতে রাত কাটা এবার একা একা।
এই মাস্টারমশায়ের কথা আগেরবারেই শুনেছি। উনিই নাকি অম্লানের হাতে বাঁশি তুলে দিয়েছিলেন। ওর অনারারি অভিভাবকও উনি। ভদ্রলোক থাকেন কাছাকাছি অন্য একটা গ্রামে।
স্টেশনে নামতেই দেখি একজন এসে নমস্কার ঠুকে ব্যাগটা নিয়ে নিল হাত থেকে। বুঝলাম ড্রাইভারকে ভাল ট্রেনিং দিয়ে রেখেছে অম্লান। বাড়ি পৌঁছতে রাত নটা বেজে গেল। ঝুপসি অন্ধকারের মধ্যে অম্লানদের বাড়িটা আরও জমাট অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশেপাশে লোকবসতিও খুব কম। এমন বাড়িতে দিনের পর দিন কীভাবে যে কাটায় অম্লান!
ড্রাইভার আমাকে তুলে দিলো হরিকাকার হাতে, আর হরিকাকা আমায় এনে ফেলল সাজানো গোছানো একটা ঘরে। সে ঘরের খাটে পরিপাটি বিছানা পাতা, জানলায় নেটের পর্দা ঝোলানো, লাগোয়া বাথরুমে রেডি গরমজল, একধারে জলচৌকিতে নতুন তোয়ালে সাবান, পাশে সুন্দর পিতলের সাজিতে একগুচ্ছ নাম না জানা ফুল, যার গন্ধে চানঘরটা ম ম করছে। খাতিরদারির নমুনা দেখে তাক লেগে গেল। এসব কে করল! হরিকাকা? হরিকাকার এত ক্যালি!
এত সব কে করল, কাকা?
কে আবার? সে-ই করেছে। এসব কি আমার কম্মো? ওই সরবতটাও সে বানিয়ে রেখে গেছে আপনার জন্যে। একটা টিপয়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাল হরিকাকা, আগে ওটা খেয়ে নিন।
খাব কী, গেলাসটাই দেখলাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। কারুকাজ করা আর ঢাকনা দেওয়া ভারি রূপোর গ্লাস একখানা। মনে পড়ে গেল, বসের নাতির অন্নপ্রাশনে অফিস থেকে চাঁদা তুলে রূপোর থালা-বাটি-গেলাস কিনতে গিয়ে স্রেফ বাটি আর চামচ কিনে ফিরে এসেছিলাম। রূপোর দামের আইডিয়া খানিকটা আছে তাই।
এই বাড়িতে এমন দামী জিনিসপত্র রাখে এরা! সাহস নয়, এটাকে দুঃসাহস বলব।
সরবতটা একেবারে ইউনিক! চুমুক মারতে পান, গুলকন্দ এইসবের গন্ধ পেলাম। কিন্তু খাতিরদারির এত বাড়াবাড়ি কেন বাপু? নিজে থাকতে পারলি না তাই? আর্জেন্ট কল পেয়ে যাবার আগে এত সব করলিই বা কখন? তাছাড়া, একটা ছেলের এতো পরিপাটি কাজ! যে ছেলে নাকি আবার ‘রাজপুত্তুর’! ভাবা যায়!
সরবতটা খেতে খেতে আর একবার ফোনে ধরবার চেষ্টা করলাম অম্লানকে। এবার দেখি বলছে, সুইচড অফ। বেশ বিরক্ত হলাম।
খাওয়াদাওয়া সেরে শুতে যাবার আগে একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। শীত পড়ে গেছে এখানে। হিমেল একঝলক হাওয়া কপাল ছুঁয়ে গেল। চাঁদের ম্লান আলোয় চারদিকটা দেখাচ্ছে সাদাকালো ওয়াশপেন্টিং-এর মতো। আলোর একটা বিন্দুও কোথাও নেই। সম্মোহিতের মত কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম কে জানে। রাতচরা এক পাখির ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে অবশেষে ঘরে এলাম।
শুতে গিয়ে দেখি বালিশের পাশে উঁকি মারছে ভাঁজ করা একটা কাগজ। খুলে দেখি, চিঠি। আমাকেই লেখা। ডেকেডুকে এনে না থাকতে পারার জন্য আবার একদফা ক্ষমা প্রার্থনা। তারপর একা থাকা, একাকীত্ব ইত্যাদি নিয়ে ফিলোজফিক্যাল কথাবার্তা ক’লাইন এবং সবশেষে লেখা, ‘তবে না থেকেও আমি আছি এখানে, সুরে সুরে আছি’।
টেবিলে রাখা মিউজিক সিস্টেমে একটা পেনড্রাইভ গুঁজে দিয়ে গেছে অম্লান, সেটাতে ওর বাঁশির রেকর্ডিং আছে। চাইলে শুনতে পারি। রিমোট কন্ট্রোলটাও রাখা আছে পাশে। ছেলেটার জন্য এবার মনখারাপ করে উঠল আমার। এত কিছু করে গেছে আমার জন্য, আর আমি কিনা বিরক্ত হচ্ছি! যন্ত্রটা চালাতেই বাঁশির শব্দে ভরে গেল ঘর। সেই ওর কান্নাকান্না সুর। বাঁশুরিয়াদের আইকন কেষ্টঠাকুর যেখানে বাঁশিতে গোপিনীদের সিডিউস করে ফাটিয়ে দিয়েছেন, সেখানে এ ব্যাটা এত কাঁদে কেন জিজ্ঞেস করতেই হবে এবার। তবে কান্নাভেজা হলেও অদ্ভুত একটা আবেশ আছে সুরটায়। মনটা ক্রমশ বাঁধা পড়তে থাকে সুরের কাছে। একেই হয়ত বলে সুরের মায়াজাল।
ঘুম ভাঙল তখন সকাল ন’টা। ভেবেছিলাম অম্লানই ঘুম থেকে তুলবে। কিন্তু না, সামনে হরিকাকা।
অম্লান এসেছে কাকা?
না তো। ফোনেও পাচ্ছি না। হরিকাকার মুখে চিন্তার আঁকিবুঁকি।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে কফিটা নিয়ে বসেছি, হরিকাকা একটা প্যাকেট এনে ধরিয়ে দিল হাতে। বলল, দশটার মধ্যেও এসে না পৌছলে এটা আপনাকে দিতে বলে গেছিল অমু।
অম্লানকে হরিকাকা অমু বলে ডাকে।
আবার প্যাকেট! এ ছেলে তো মহা রহস্যবাজ দেখছি!
যত্ন করে আঠা দিয়ে সাঁটা প্যাকেটটা খুলতেই বেরুলো কয়েকটা খাম, যার একটা আবার বেশ মোটাসোটা। একটা খামে আমার নাম লেখা ছিল, সেটাই খুললাম আগে। কী ব্যাপার বোঝার জন্য দ্রুত চোখ বোলাচ্ছিলাম। সেই ক্ষমা চাওয়া দিয়ে এ চিঠিরও শুরু। লিখেছে, পৃথিবীতে এত লোক থাকতে কেন যে তোমার ওপরেই এ দায় চাপিয়ে যেতে ইচ্ছে হল জানি না। তোমাকে খুব আপন মনে হতো, হয়ত তাই। তবে তোমার মনে যে আমার জন্য বিশেষ কোনও জায়গা নেই তা আমি জানি। (এসব কী কথা রে বাবা!) তার জন্য কোনও অভিযোগও নেই আমার। ভাল তো জোর করে বাসাবার জিনিস নয়। তাছাড়া, আমার মতো একটা অভিশপ্ত মানুষের (সে আবার কী!) জীবনে ভালবাসা আসার পথগুলোও যে সব বন্ধ, দোষ দেব কাকে?
আমাকে আর খুঁজে পাবে না তোমরা। (অ্যাঁ!!)। ভাল হয়, খোঁজার চেষ্টা না করলে...
আরও পড়ার আগে অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠি আমি, হরিকাকাআআ...
...কিছু কাজ রয়ে গেল যেগুলো করে যেতে পারলাম না। তোমাকেই করে দিতে হবে সেগুলো। ধরে নাও, সেইজন্যেই ডেকে আনা তোমাকে। মোটা খামটায় একটা দানপত্র আছে। সেই অনুযায়ী আমাদের সম্পত্তির, যেটুকু এখনও রয়েছে, বিলিব্যবস্থা হবে। সেটা যাতে ঠিকঠাক হয় সেইটুকু শুধু তুমি দেখো। হরিকাকা সবটা পারবে না।
এবার আমার হাত-পা কাঁপতে লেগেছে।
হরিকাকা ততক্ষণে ছুটে এসেছে। আমি বাড়িয়ে ধরি চিঠিটা।
আপনিই পড়ুন দাদাবাবু, আমার চোখে চশমা নেই।
অগত্যা আমার চিঠিটা গোড়া থেকে আবার পড়ি আমি। এবার জোরে জোরে। শুনতে শুনতে হরিকাকা ধপ করে বসে পড়ে মেঝের ওপর, তারপর নিজের জামার গলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে টেনে বের করে একটা সোনার চেন, বেশ ভারি চেন। কোনরকমে বলল, কাল এইটা পরিয়ে দিয়ে গেল কি তাহলে এইজন্য!
হরিকাকার নামেও একটা খাম ছিল। না বলে চলে যাবার জন্য সেখানেও হরিকাকার কাছে ক্ষমা চেয়েছে অম্লান; লিখেছে, ছেলেবেলায় তোমার গলা ধরে ঝুলতাম, এখন না হয় আমার হারটা ঝুলবে। এটা পরে থেকো তুমি। তাহলে আমিও থাকব তোমার সঙ্গে সঙ্গে। আর এ বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যাবে না তুমি। নিজের অধিকারেই থাকবে। এ বাড়ি এখন তোমার। কেউ যাতে তোমাকে সরাতে না পারে তার ব্যবস্থা আমি করে দিয়ে গেছি।
দুটো চিঠি লিখে গেছে থানার ওসি আর অঞ্চলপ্রধানের নামেও। বক্তব্য দুটো চিঠিতেই এক, কলকাতা থেকে আসা তার বন্ধুকে যেন কোনভাবে হেনস্থা করা না হয়।
আমার চিঠিটাতে আরও ক’টা লাইন ছিল। লিখেছে, আমি যে ঘরে শুয়েছিলাম তার দেওয়াল আলমারির তাকে দুটো ডায়েরি আছে, সে দুটো যেন আমি নিয়ে গিয়ে সময় করে পড়ি। সবশেষে রয়েছে আর একটা কাজের অনুরোধ। ঘরের কোনে ব্রাউন পেপারে মোড়া ওর ছবি রয়েছে একটা। সেটা যেন আমি টাঙিয়ে দিয়ে যাই ওদের সেই গ্যালারিতে। শ্রাদ্ধশান্তির পরোয়া করার দরকার নেই। নিজের শ্রাদ্ধ ও নিজেই সেরে রেখেছে।
হরিকাকা মাটিতে মাথা ঠুকে ঠুকে কাঁদছে। বৃদ্ধ মানুষটার গলা দিয়ে যে আওয়াজটা বেরোচ্ছে, অমন কাতর শব্দ আগে কখনও শুনিনি আমি।
বুদ্ধিসুদ্ধি এতটু থিতোলে হরিকাকাকে শুধোই, মাস্টারমশায়ের নম্বর আছে নিশ্চয় তোমার কাছে? হরিকাকা পকেট হাতড়ে নিজের মোবাইলটা দেয় আমাকে। এক ডায়ালেই রিং। বয়স্ক একজন বলে ওঠেন, বলো, হরি -
আপনি এখন কেমন আছেন মাস্টারমশাই?
ভালই তো আছি, কেন বলো তো?
কাল রাতে অম্লান গেছিল আপনার কাছে?
হ্যাঁ, এসেছিল তো। কিছুক্ষণ থাকল, গল্প করল, তারপর চলে গেল।
কটার সময়? প্রশ্ন করি আমি।
সন্ধে ছ’টা হবে। যাবার সময় আবার প্রণাম করে গেল; বলল, কোথায় নাকি বাঁশি বাজাতে যাচ্ছে, তাই প্রণাম।
অম্লানের আর কোনও আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কেউ নেই হরিকাকা?
উত্তরে সজোরে বুক চাপড়ালো হরিকাকা, বলল, কেউ নেই গো, কেউ নেই। বন্ধু বলে যে দু একজন ছিল তারাও আর বন্ধু ছিল না! এই জমিটাতে কী সব হোটেল মোটেল খুলবে বলে প্রায়ই এসে ঝামেলা পাকাচ্ছিল তারা। কটাদিন আগে কী অশান্তিটাই না করে গেল! ওরা কি বন্ধু? শত্রু, সব শত্রু...।
আমার হাত-পা কিছুই আর স্ববশে নেই, থরথর করে কাঁপছে। মোটা খামটা খুলে দেখেছি ওখানে আছে এক দানপত্র। আইনটাইন যতটুকু জানি তাতে বুঝেছি পাকা কাজ ওটা। রীতিমত রেজিস্ট্রি করা কাগজ। এক ঝলক দেখে মনে হয়েছে, হরিকাকাকে বাড়ি ভোগদখলের অধিকার সত্যিই দিয়ে গেছে। আর নিচতলা সহ বাকি কম্পাউন্ডে বাচ্চাদের স্কুল, খেলার জায়গা ইত্যাদি আরো কী কী সব করার কথা লিখে গেছে। এখানে এখন রিসর্ট ব্যাবসার খুব ধুম। একশ্রেণীর মানুষের বেলেল্লাপনার ভারি সুবিধে হচ্ছে তাতে। এই প্রপার্টিতে সেটা যেন কিছুতে না হয় সে কথাগুলো বিশেষভাবে লিখে গেছে অম্লান।
কাঁপাকাঁপা হাতে আলমারি খুলি এবার। দেখি সত্যিই দুটো ডায়েরি রাখা। পড়ার স্থৈর্য এখন নেই। ডায়েরির মধ্যে কতকগুলো ভাঁজ করা কাগজ ছিল, দেখে মনে হলো প্রেসক্রিপশন। ঘরের কোনে ব্রাউন পেপারের বড় মোড়কও দেখতে পেলাম একটা। উত্তেজনায় ছিঁড়েই ফেললাম মোড়কটা। দেখি, শাড়ি পরা এক মহিলার অয়েলপেন্টিং, মুখটা যার এক্কেবারে অম্লানের মতো।
ছবিটা এনে দেখালাম হরিকাকাকে। বুকে আঁকড়ে ধরে হা হা করে আবার কেঁদে উঠল কাকা।
এটা কার ছবি, কাকা?
কী আর বলব দাদাবাবু? আর তো লুকোবার কিছু নেই। এইটেই সত্যি। অমুরই ছবি এটা। সেই ছেলেবেলা থেকে কী যন্তন্নাটাই না সইল ছেলেটা! আর ছেলে বলে কী করব, মেয়েই বলি... হাহাকারের মধ্যে জড়িয়ে গেল হরিকাকার কথা।
গ্যালারি ঘরের তালা খুলে দিলো হরিকাকা। সেখানে টাঙিয়ে দিলাম ওর ছবিটা। কাকা ফের তালা মেরে দিল ঘরটায়। আমাকে লেখা চিঠিটার একেবারে শেষে লেখা ছিল, চেষ্টা কোর’ ছবিটার কথা এখুনি কাউকে না জানানোর। একদিন সকলেই জানবে জানি, তবু...। ডায়েরিদুটোও পুলিশের হাতে দেওয়ার দরকার নেই। আমার শেষ কাজে যে সাহায্য করবে, এই অকপটতা শুধু তার জন্য। ধৈর্য্য থাকলে পোড়ো, না থাকলে জ্বালিয়ে দিও। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার ব্যথাও হারিয়ে যাক চিরদিনের মতো।
এইখানেই শেষ আমাকে লেখা চিঠিটা।
ট্রেনে বসে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম ডায়েরিদুটো। তার পাতায় পাতায় যন্ত্রণাদগ্ধ একজন মানুষের কাতর স্বগতোক্তি। ডাক্তার দেখিয়েছিল অম্লান। কলকাতার একাধিক ডাক্তারবাবু আর মনোবিদের সঙ্গে কনসাল্ট করেছিল। কিন্তু ভরসা দেবার মতো কারোকে পাশে পায়নি বলে সেক্স চেঞ্জ করার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারেনি। আজন্মের পুরুষ-ছদ্মবেশটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেয়ে হয়ে বাঁচতে চাইছিল অম্লান, অথচ পারছিল না কিছুতেই। ‘খুঁতো’ ছেলের জন্ম দিয়ে অম্লানের মা নাকি মরমে মরে থাকতেন। স্বামী আবার বিয়ে করবে এই আশঙ্কাও কম ছিল না। এই মনস্তাপে দশ বছরের ছেলেকে রেখে আত্মহত্যা করেছিলেন মা। অল্প পরে বাবাও চলে যান হার্ট অ্যাটাকে। মাস্টারমশাই আর হরিকাকাই কেবল জানতেন ওর ব্যাপারটা। কিন্তু সেক্সচেঞ্জ বিষয়টা তাঁদের কাছেও ছিল ঘোর অন্ধকার এক জগত। ও কাজে পাশে দাঁড়াবার মনোবল যোগাতে পারেননি তাঁরা। কুসুম হতে চাওয়া মানুষটাকে দুজনেই সমানে বুঝিয়ে গেছেন অম্লান হয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে। কিন্তু এই দ্বৈত জীবনের ভার আর বইতে পারছিল না অম্লান।
যে চেহারায় নিজেকে দেখার তীব্র ইচ্ছে চিরদিন বুকে লালন করে এসেছিল, তারই একটা পোর্ট্রেট আঁকিয়েছিল অম্লান। সেই ছবি গ্যালারিতে ঝুলিয়ে দেবার মধ্যেও হয়ত নিরুচ্চার এক প্রতিবাদও ছিল। পূর্বপুরুষদের বোধহয় বলতে চেয়েছিল ও, যে মেয়েদের কোনদিন মর্যাদা দাওনি তোমরা, তেমন একটা মেয়ের হাতেই শেষ হয়ে যাক তোমাদের বংশ।
ট্রেন হাওড়ায় ঢুকছে। ডায়েরি দুটো সযত্নে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখি আমি। আমার জন্য অম্লান একটা হীরের আঙটি রেখে গেছে ওর দানপত্রে। সে আঙটিটা নয়, আমার পেতে ইচ্ছে করছে ওর সেই বাঁশিটা।
কেন আরও একটু বোঝার চেষ্টা করলাম না ওর বাঁশির ভাষা?
আমার তো কোনও মানসিক বাধা ছিল না অম্লানকে কুসুম হয়ে ওঠার পথে বন্ধুর মত পাশে দাঁড়ানোতে।
kk | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৫743323
Bratin Das | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০০:০৫743325