
পশ্চিমবঙ্গের আরশোলারা | ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫১748564আব্দুল হাফিজকে চেনেন? এই সেই ছেলে, যে বাঁকুড়া থেকে সোজা চলে গিয়েছিল যন্তরমন্তরে। নিট আন্দোলনে। তারপর এলাকায় স্কুলের হাল ফেরাতে চাওয়ায় প্রাণ দিতে হয়েছিল তার বাবাকে। বাবার মৃত্যুর কোনো কিনারা হয়নি, হবে কেউ আশাও করেনা। কিন্তু খবর হল, এর মধ্যে গতকাল তাকে নিউটাউনে আটক করে পুলিশ। অপরাধ? কেউ জানেনা, পুলিশও না। একা নয়, আরও কয়েকজন আরশোলাকে তোলা হয় একই সঙ্গে। হাফিজের বর্ণনা অনুযায়ী একদল পুলিশ হঠাৎ উদয় হয়ে চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে তাদের নিয়ে যায় ইকো পার্ক থানায়। সেখানে একদফা নির্যাতন চলে। মেয়েদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। ভিডিওয় হাফিজ দেখিয়েছে মেয়েদের পায়ে আঘাতের দাগ। একটি আঠারো বছরের মেয়ে প্যানিক অ্যাটাকের শিকার। তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় আরেকটা থানায়। শখানেক পুলিশের উপস্থিতিতে জোর করে লেখানো এবং ভিডিও করানো হয়, যে, তাদের শুধু আটক করা হয়েছে, আর কিছু করা হয়নি। এবং তেরো ঘন্টা পরে ছাড়া হয়।
মোটের উপর, বাংলায় এক বিরাট মামারবাড়ির সূচনা হয়েছে। আগে শুধু রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ আছে এরকম লোকজনের উপর এসব হচ্ছিল। এখন, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও নেই, স্রেফ কোথাও কেউ প্রতিবাদ করে ফেলতে পারে, হয়তো যন্তরমন্তরে চলে যেতে পারে, স্রেফ এই আশঙ্কায়ই পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। নির্যাতনও করছে। যদিও সবাই জানে, প্রতিবাদ করা অপরাধ না। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা অপরাধ না। অপরাধ তো না ই, বরং ওটা সাংবিধানিক অধিকার, গণতন্ত্রের স্তম্ভ। পশ্চিমবঙ্গে এমন একটা ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে, যেখানে সেই অধিকার তো রক্ষিত হচ্ছেই না, বরং কেউ কোথাও বেফাঁস কথা বলে ফেলতে পারে, এইরকম আন্দাজের উপরেই ধরপাকড় চলছে। ভেবে দেখুন, আপনি হয়তো ভাবছেন, এই মোদিতন্ত্র জিনিসটা ভালো না, শুধু ভাবছেন, কিছু করেনওনি, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের এখন অধিকার আছে, আপনাকে তুলে নিয়ে যাবার। মোদির বিরুদ্ধে ভাবছিস কেন, অ্যাঁ?
এটা যে শুধু স্বৈরাচার তাইই নয়, মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা। শাসক দলের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এর কোনো ব্যাখ্যা পাবেন না। একজন কার্টুন ভট্টাচার্য মাঝেমধ্যে "এগুলো আমাদের সংস্কৃতি নয়" বলে ম্যানেজ দেবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বাকি যা আছে, তা আবর্জনা। আরএসএস বলে একটা বস্তু ছিল, যতই অপছন্দ করি, তাদের একটা আদর্শ ছিল, সেসব নিয়ে তর্কবিতর্ক করা যেত কিন্তু এখন যারা মাথায়, তারা আগে ছিল নানা দলের ধান্দাবাজ, এখন ভয়ে বা ভক্তিতে স্রেফ নন্দী-ভৃঙ্গীতে পরিণত। এদের সঙ্গে সংলাপে যাবারই কোনো মানে নেই। দরকার স্রেফ এই আবর্জনা পরিষ্কার। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, এই আবর্জনা পরিষ্কারের লড়াইয়ে ওই কুড়ি-বাইশের আব্দুল হাফিজ আমার নমস্য। তার বাবা শেখ মহম্মদ মাফিক এই লড়াইয়ের প্রথম শহীদ। এসআইআর বিরোধী গণআন্দোলন প্রথম শুরু হয়েছিল মালদার কালিয়াচক আর মোথাবাড়িতে। ওই মাটি আমার পুণ্যভূমি। মোফাক্কেরুল ইসলাম এই আন্দোলনের প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া নেতা। আর ভোটচুরির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে গ্রেপ্তার হওয়া প্রথম নেতা গর্গ চট্টোপাধ্যায়।
এই নামগুলো কোনো বিজ্ঞ জমায়েতে শুনতে পাবেন না। কিন্তু আর কিছু করতে পারি না পারি, এই নামগুলো ভুলতে দেবনা। এদের সবার চিন্তাভাবনাই আলাদা হবে, হাফিজের হয়তো তেমন দানাও বাঁধেনি, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়না। যখন কেউ কোত্থাও ছিলনা, এরা আওয়াজ তুলেছিল। বাংলা থেকে। নিপীড়ন ঘাড় পেতে নিয়েছিল। স্রোত যখন প্রতিকূলে, তখন যে আওয়াজ তোলে, সেই তো নেতা। অন্তিম জয়ের দিন পর্যন্ত সেটা মনে রাখব।
পুঃ এই খবরটা একটু ছড়িয়ে দেবেন। শেষাংশটা নেহাৎই ব্যক্তিগত, ইচ্ছে হলে সেটা বাদ দিয়েই দেবেন। পশ্চিমবঙ্গের আরশোলার এখনও নিজেদের খবর ছড়ানোর জায়গায় আছে বলে মনে হয়না।