এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • তসলিমা এবং জয়

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১১৬ বার পঠিত
  • জয় গোস্বামী কেন ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন জানিনা, কিন্তু যা ঘটেছে, তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত না। যেখানে ডিম ছোঁড়াকে জনরোষ আর বিরোধী স্বরকে জেলে ভরাকে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা বলে চালানো হয়, সেই অসভ্যদের জমায়েতে এসব হবেনা তো কী হবে। এসব তো টানা চলছে, গৌরবান্বিত করাও চলছে, এর মধ্যে কীসের অনুষ্ঠান, কে কাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে, সৌজন্য, এসব আবার কী, ও তো মঙ্গলগ্রহের জিনিস।

    এবং এটা আজকের ব্যাপারও না। বোধহয় বছর দুই আগে একটা কর্পোরেট পত্রিকাগোষ্ঠী কী একটা 'বিতর্কসভা' করেছিল, সেখানে কুনাল ঘোষ বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন, সেখানেও একই কান্ড হয়েছিল। ভিডিওতে দেখেছি, কিছু দর্শক চিৎকার করে কুনাল ঘোষকে বলতে দেবেন না বলে চেঁচাচ্ছেন, স্বনামধন্য সঞ্চালক হাবার মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, পত্রিকাগোষ্ঠীর পরিচালকরা কোথায় ছিলেন দেখা যায়নি। কে কাকে বোঝায়, কুনাল ঘোষ খুব বাজে লোক হতে পারেন, কিন্তু আমন্ত্রিত অতিথি, বলতে এসেছেন, তাঁকে ওরকম করে আটকানো যায়না।

    তারও আগে, জয় গোস্বামীই একটা চটি বই লিখেছিলেন, বগটুইয়ের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। বইয়ের নাম দগ্ধ। গুরুচণ্ডালিই ছেপেছিল। যেই না বেরোলো, সেই একই গল্প। একটা বিশেষ দলের সমর্থকরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন হই হই করে। তাঁরা আবার বগটুইয়ের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদই করছিলেন। কিন্তু বক্তব্য হল, আমরা বলছি বলছি, কিন্তু জয় গোস্বামীকে বলতে দেবনা। ইন্টারনেট জুড়ে যেটা হয়েছিল তখন, সেটাকে অসভ্যতা বললে খুবই কম বলা হয়। এবং এই অসভ্যতার দায়, সংস্কৃতিকে এই জায়গায় নিয়ে পৌঁছিনোর দায় স্রেফ হিন্দুত্ববাদীদের না। ঢাকের বাঁয়া হিসেবে অন্যরা না থাকলে এটা হতনা।

    বলাবাহুল্য, ডিম্মিডিয়াও অনেকদিন ধরে যথাযোগ্য সঙ্গত করেছে। তাদের সংস্কৃতিটাই এই। সংবাদপাঠক বা সঞ্চালকরা এমন গলায় চেঁচান, যেন যাত্রা করছেন। 'বিশেষজ্ঞ' বা প্যানেলিস্ট বলে যাদের ধরে আনেন, পাড়ার চায়ের দোকানেও তার চেয়ে ভালো বক্তা পাওয়া যায়। আর সন্ধ্যেবেলায় যে মাছের বাজারটা বসান, সেখানে বলতে না দেওয়াটাই হল মূল থিম।
    ফলে সব মিলিয়ে বহু লোকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় 'আমার অপছন্দের লোককে বলতে দেবনা', এটা একটা সংস্কৃতি হিসেবে চালু করা গেছে। বলতে দেবনা, কুচ্ছো করব, এইসব দিয়ে শুরু। এই আমাকেই দেখুন না, থামানোর কত চেষ্টাই না হল। 'চটিচাটা' কুচ্ছো দিয়ে শুরু। বিপুল একটা চ্যানেল গোষ্ঠী সোশাল মিডিয়া থেকে নির্বাসিত করার চেষ্টা করলেন। এইসব। তারই ধারাবাহিকতায় এইসব ডিম-কালচার। উচ্চফলনশীল বিষবৃক্ষ পোঁতা হয়েছে, এখন ফল দিচ্ছে। আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

    এর মধ্যে কেউ কেউ তসলিমাকে দোষ দিচ্ছেন। দেখুন কথা খুব স্পষ্ট, জয় গোস্বামী তৃণমূলের লোক হন না হন, কিন্তু তাঁর বলার অধিকার আছে। তসলিমা নাসরিন ভারত সরকারের অনুগ্রহপুষ্ট হন না হন, তাঁরও বলার অধিকার আছে। একজন নির্বাসিত মানুষ, যিনি স্রেফ বাংলায় কথা বলতে চান বলে কলকাতায় ফিরতে চান, তাঁর ঘাড়ে এই পুরো সংস্কৃতির দায় চাপানোর কোনো মানে নেই। এটা পুরো ব্যবস্থাটার ভেঙে পড়া। তসলিমাকে কলকাতায় আনা যায়নি, ফিদা হুসেনকে মুম্বাইতে ফেরত আনা যায়নি, দুবাইতে ভগ্নহৃদয়ে মারাই গেছেন। গোটা উপমহাদেশেই এই অবস্থা। দুই বাংলার মধ্যে মুক্তচিন্তা আদানপ্রদানের একটা জায়গা আগে ছিল। সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তসলিমা কেন, প্রতিটি বুদ্ধিজীবীর দুই বাংলার সর্বত্র অবাধে গিয়ে নিজের কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। কেউ কাউকে ঢুকতে দেবেনা, বলতে দেবেনা, বিবাদী স্বরকে বন্ধ করে দেবে, এইটাই বন্ধ করা উচিত। এইটার পক্ষে আমরা মাঝে-মধ্যে মিনমিন করিনি তা নয়, কিন্তু জোরে কোনো আওয়াজ তুলতে পারিনি। এই আমিই মাঝে মাঝে দুই বাংলার মধ্যে অবাধ যাতায়াতের কথা বলেছি, কোথাও কোনো সাড়া পাইনি। জয় গোস্বামীর বই ছাপতে গিয়ে চটিচাটা আখ্যা পেয়েছি। আমরাই যদি এইসব করি, আমরাই যদি আওয়াজ না তুলি তো উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তি তার সুযোগ নেবে। তার ফলও এইরকমই হবে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ০৩ আগস্ট ২০২৬ ০২:৪২742085
  • "এই আমাকেই দেখুন না, থামানোর কত চেষ্টাই না হল। 'চটিচাটা' কুচ্ছো দিয়ে শুরু। বিপুল একটা চ্যানেল গোষ্ঠী সোশাল মিডিয়া থেকে নির্বাসিত করার চেষ্টা করলেন। এইসব।"
     
    এই ব্যাপারটি একটু বিশদে লিখতে পারতেন। সোস্যাল মিডিয়া থেকে কাউকে নির্বাসিত করা যায় কি?
     
    আপনার লেখাটির মধ্যে দুটো বিষয় আসছে, প্রথমত জয় গোস্বামীকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করা একটা টকিং পয়েন্ট, যা হচ্ছে ক্যানসেলিং এর থেকেও বিশ্রী | জয় গোস্বামীদের মত লোকের কথা শুনব না এক রকম, আর তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিযে অপমান করার সংস্কৃতি (যদি তাকে আদৌ সংস্কৃতি বলা যায়), অন্য রকম। এটা মনে হয় ভারতের টিভি চ্যানেলের অবদান। এঁরা এইটাই দেখতে অভ্যস্ত | বিজেপির আমলে বাক স্বাধীনতায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় নিরন্তর হস্তক্ষেপ হচ্ছে, অনভিপ্রেত। টিভি চ্যানেলে যখন গর্গকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অর্ণব গোস্বামী অপমান করেছিলেন, আমার মনে হয় না কেউ গর্গর বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে প্রতিবাদ করেছিলেন, এই লোক ডেকে নিয়ে এসে অপমান করাটাই এদের ইউএসপি। আটা মারি বালোচের মত কেউ কেউ আবার একই রকম দুর্মুখ, এবং দেখা যায় কিছু লোক আবার সেসব বিস্তর ফলাও করে রিল বানিয়ে প্রচার করেন। দুটিই আপত্তিকর, কিন্তু এই চলছে, এর বিশ্রি বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল জয় গোস্বামীর বিরুদ্ধে আচরণে।
     
    "শুধু তসলিমা কেন, প্রতিটি বুদ্ধিজীবীর দুই বাংলার সর্বত্র অবাধে গিয়ে নিজের কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত।"
     
    আপনার এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি পুরোপুরি সহমত, এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে সমস্যা এক নয়, বহু, সব দেশের তরফেই |
     
    আজ থেকে ২৫ বছর আগে আমি নিজে ভুক্তভোগী, ভারতে থাকার সময় করাচির আগা খাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত থেকে আমন্ত্রিত হয়ে লেকচার দেবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি | পাকিস্তানের ভিসা পাওয়া নিয়ে প্রচুর ঝামেলা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত ভিডিও কনফারেনস করে লেকচার দিয়েছিলাম, অথচ সেই একই ওয়ার্কশপে যারা আমেরিকা বা বিলেত থেকে এসেছিলেন, তাদের বেলায় কোন সমস্যা হয়নি। এই সমস্যা উপমহাদেশের সমস্যা, এর সমাধানের দায় সব পক্ষের। ভিসা পেয়েছিলাম, ওয়ারকশপ শেষ হবার পরের দিন |
  • জনসাধারন  | ০৩ আগস্ট ২০২৬ ১৬:২৯742102
  • জয় গোস্বামীর র কেস টাতে দারুন আনন্দ পেয়েছি কর্মফল
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন