

অলংকরণ: রমিত
৩
একটুখানি স্তব্ধতা।
সবাই কিছুটা চুপচাপ। হেলেনের চোখ তখনো আটকে আছে দরজায়, দুই দাদার চলে যাওয়া পথের দিকে।
কিরণময়ী নীরবতা ভাঙলেন।
- কী আর করা যাবে দিদি। ছোটোবেলা থেকেই বিজয়ের স্বদেশীদের সাথে হৈচৈ, ঘুরে বেড়ানো। কলেজে গিয়ে আরও বেড়ে গেলো। আর ভাইগুলোও সব দাদার ভক্ত৷ চার ভাইয়ের নামেই পুলিশে নানারকম নালিশ লেগেই আছে। মিহির তো কৃষ্ণনগর কলেজে ছাত্রনেতা হয়ে নাগপুর চলে গেল কংগ্রেস সম্মেলনে যোগ দিতে। গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন --- আর দুই ভাই সবার আগে কলেজ ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ল পথে। স্কুলে স্কুলে, অফিস আদালতের সামনে গিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। আর সময়টাই তো অন্যরকম -- অফিস ছেড়ে দিয়ে, কোর্ট ছেড়ে দিয়ে অনেক উকিল-মোক্তারও বেরিয়ে চলে এলো!
"মাসিমা, বিজয়ের কথায় যাদু আছে। আর সে যখন কথা বলে তখন অন্তর থেকেই বলে, খুব জোরের সঙ্গেই বলে।" নজরুল মন্তব্য করলেন।
- তা খুব একটা ভুল বলোনি বাবা। ও যখন কথা বলে, সেটা এমন ভাবে বলে যে তা ঠেলে ফেলা মুশকিল হয়। আর এই যে ভাইবোনগুলো, এরাও হয়েছে তেমনি! দাদা যদি আগুনে ঝাঁপ দিতে বলে তো তাই করবে! ছেলেগুলো নাহয় তবু বড় হয়েছে, ছোটো ছোটো মেয়ে দুটোও রাস্তায় নেমে হৈচৈ করে, পিকেটিং করে বেড়ায়! ওর বাবার তো এই নিয়েই রাগ।
প্রায় নিঃশব্দে কখন হেলেনের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেকটি কিশোরী। খোলা চুল, মুখে একটা লাজুক ভাব। দেখেই মনে হয় বেশ শান্ত-শিষ্ট।
- এই যে আরেকজন। আমার বড় মেয়ে আশা, আশালতা।
আশা গিয়ে প্রণাম করতেই গিরিবালা দেবী তার হাত ধরে টেনে পাশে বসালেন, দোলন আর তার মাঝখানে। জড়িয়ে ধরে বললেন --"যাক, এখানে এসে আমার আরেক মেয়েকে পেলাম। আমার দোলনের নামও আশালতা। বিয়ের দিন নুরু সেই যে ওকে প্রমীলা নাম দিল, তার পরে সেই নামটাই প্রচার হয়ে গেল। আজ মনে হচ্ছে অনেক দিন পরে আশালতাকে ফেরত পেলাম"।
নজরুল আশার দিকে তাকিয়ে ভারিক্কী গলায় বললেন --" কই, আমাকে প্রণাম করলে না তো!"
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। অপ্রস্তুত আশা উঠে গিয়ে নজরুলকে প্রণাম করে এলো। গিরিবালা দেবী কপট ধমক দিয়ে বললেন -- "নুরু কী যে করে মাঝে মধ্যে! বাচ্চা মেয়েটা কেমন লজ্জা পেয়ে গেছে দ্যাখো! "
- বাচ্চা কি বলছেন মাসিমা, ওরা সব পাকা বিচ্ছু! শুনলেন না, এই খুকীরা পিকেট করে বেড়ায়!
হেলেন সাথে সাথে কলকল করে উঠলো।
- জানেন কাজিদা, আমরা হাই স্ট্রীটে মদের দোকান, গাঁজার দোকান সব বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের দেখে পুলিশও ভয় পায়!
- তাই নাকি! তোমরা তো বেশ ভয়ংকর মহিলা দেখছি!
নজরুল তো হো হো করে হেসে উঠলেন। কিরণময়ী বললেন -- "এসব দেখেই ওদের বাবা রেগে যায়। আমার বাড়ির মেয়েরা রাস্তায় গিয়ে চেঁচামেচি করবে, পুলিশের সাথে ঝামেলা করবে, নেদেরপাড়ায় বিটকেল বামুনদের বাড়ি বাড়ি পয়সা চেয়ে বেড়াবে - এসব ও সহ্য করতে পারেনা।"
হেলেনের কথা থামে না।
"বড়দা কী বলে জানেন কাজিদা -- আমার বোনেরা যদি বাইরে না বেরিয়ে আসে, পথে না নেমে আসে, তাহলে আমি কোন মুখে অন্যের বোনকে দেশের দুঃসময়ে পথে নেমে আসতে বলব?" হাত-পা নেড়ে বিজয়ের গলা নকল করে এমন করে কথাগুলো বলল যে দোলনও হেসে লুটোপুটি। আশাও হাসতে হাসতে বলে উঠলো --- দোকানের সামনে পিকেটিং করার সময় পুলিশ লাঠি নিয়ে তেড়ে এলে হেলেন করল কি, রাস্তায় ধুলোবালির উপরেই শুয়ে পড়ল। আমরাও একে একে বসে পড়লাম। বড়দা গান ধরিয়ে দিল 'বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ!' পুলিশ এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গান শুনতে লাগল।
নজরুল হাসতে হাসতে বললেন --- বিজয়ের যা গলা তাতে দূর থেকে একশো লোক দাঁড়িয়ে শুনতে পাবে!
- বড়দা তো এখন গান লেখে, কবিতাও লেখে, আপনার মতো করে।
- আমার মতো করে! তাই নাকি?
- হ্যাঁ, তাই তো। আগে তো শুধু বক্তৃতাই লিখতো। বড়দার বক্তৃতা লেখা বই "স্বরাজ সাধন"কেই তো পুলিশ ব্যান করেছিল। এখন বলে -- গান হবে তো কাজির মতো, কবিতা হবে তো কাজির মতো! সর্বহারাদের নিয়ে কবিতা, সর্বহারাদের জন্য গান। আপনার সব বই তো আমাদের বাড়িতে আছে। 'বিষের বাঁশি' 'ভাঙার গান'ও আমার পড়া হয়ে গিয়েছে।
নজরুল ভারি অবাক হলেন।
- তাই নাকি? এই দুখানা বই তো পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই বাজেয়াপ্ত করে দিয়েছে। তুমি পেলে কী করে?
- তা জানি না। অনন্তদা কোথা থেকে ঠিক জোগাড় করে আনত।
- অনন্ত, মানে অনন্তহরি মিত্র? ওকে তো গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দক্ষিণেশ্বরে এক বাড়িতে বোমার মশলাপাতি কিসব নাকি পেয়েছে।
কিরণময়ী একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন।
- হ্যাঁ বাবা। এই মাস দুয়েক হলো। আসলে তো বোমার মামলা নয়, একটা ডাকাতির কেসে পুলিশ ওকে খুঁজছিল। এই অনন্তহরির জন্যই তো আমাদের পরিবারে এতো সমস্যা এসে দাঁড়ালো।
- অনন্তহরির কথা বিজয় বহরমপুর জেলে খুব বলত বটে। কিন্তু তার জন্য আপনাদের পারিবারিক সমস্যা? কিরকম?
- গান্ধীজীর অসহযোগের ডাকে সাড়া দিয়ে দুই ভাই তো সবার আগে কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে এলো। বেরিয়ে এসে হাই স্ট্রীটে ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে নিজেরা একটা স্কুল খুলল। বড়োরা ছোটদের পড়ায়। আমার সেজো ছেলে অজিতও স্কুল ছেড়ে দিয়ে দাদাদের স্কুলে ছাত্র হয়ে গেল। ওরা বলে 'স্বরাজ আশ্রম', লোকে বলে স্বদেশীদের আখড়া। তো সেখানে মাস্টারি করার জন্য বিজয় কলকাতা থেকে অনন্তহরিকে ধরে নিয়ে এলো। পড়াশোনায় ভালো ছেলে, কিন্তু স্বদেশী করার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে দিনরাত কংগ্রেসের অফিসেই থাকত।
- মাস্টারি করার জন্য এসেছিল অনন্তহরি?
- আমরা কি আর ওদের ব্যাপার স্যাপার অত জানি বাবা। আমার এখানেই থাকত। দিনরাত কখন আসে কখন যায়, কোথায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায় -- সে সব আমরা জানতেও পারতাম না। তোমার মেসোমশায় তো গান-বাজনা নাটকের হুল্লোড় নিয়ে থাকা মানুষ, তার উপর কোর্টের বন্ধুবান্ধবরা ছেলেমেয়েদের স্বদেশী করে বেড়ানো নিয়ে নানা কথা বলে। তবু আমাকে খোঁটা দেওয়া ছাড়া তিনি তেমন আপত্তি করতেন না, বাধা দিতেন না। কিন্তু অনন্তহরির চালচলন ক্রমশ কেমন আলাদা হতে লাগলো। ওর খোঁজে নানারকম অচেনা মানুষের আনাগোনা হতে লাগলো বাড়িতে। বিজয়ের সাথেও বোধহয় অনন্তহরির একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। পুলিশেও বোধহয় কানাকানি হচ্ছিল কিছু। তোমার মেসোমশায় আর সহ্য করতে পারছিল না। ছেলেদের সাথে তর্কাতর্কি আর রাগারাগি শুরু হয়ে গেল। উনি বললেন 'আমার চাকরির সুবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া অন্নে প্রতিপালিত হবে, আর আমার বাড়িতে বসেই তোমরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিল্পবী আন্দোলন করে বেড়াবে --- সেটা চলবেনা!' সঙ্গে সঙ্গে বিজয় উঠে পড়ল --'ঠিক আছে, আমি এখনি এই বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি। তোমার ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া অন্ন আমি আর গ্রহণ করব না।' এই বলে তক্ষুণি সে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। আর রামের ভাই লক্ষ্মণের মতো মিহিরও চলে গেল দাদার পিছু পিছু।'
- তাই? তারপর?
৪
বিস্ময়ে অবাক হচ্ছিলেন নজরুল। এতো কথা তো জেলে থাকার সময় বলেনি বিজয়। - তারপর আর কি বাবা। হাই স্ট্রীটের সেই স্কুলের ঘরেই থাকে ওরা। এতোদিন পার হয়ে গেল, প্রায় রোজই একবার করে আসে, গল্প করে, হৈচৈ করে - কিন্তু এক গ্লাস জল পর্যন্ত খায় না। একবার ভাবেন তো দিদি, আমি বাড়িতে রোজ রান্না করি। আমার ছেলেরা চোখের সামনে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যায়, সে ভাত মুখে তুলতে আমার কেমন লাগে?
কিরণময়ী মাথা নিচু করলেন। পরিবেশটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেল। কারো মুখেই কথা নেই। এ কথার উপরে কী আর মন্তব্য করা যায়। কিরণময়ীই কথা বলে বাতাসটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন - "আমিও বলেছি - হয় তুমি তোমার চাকরি ছাড়ো, না হয় আমিও এই গৃহত্যাগ করে চলে যাবো। তোমার ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া যে অন্ত আমার ছেলেরা মুখে দিতে পারে না, সে অন্ন আমিই বা মুখে দিই কী করে? তোমার বাবা তো কম সম্পত্তি রেখে যাননি? বুঝতে পারি, তোমার মেসোমশায় ছেলেদের জন্য ভিতর ভিতর কষ্ট পায়। আমার কাছে খবর নেয়, কিন্তু নিজে থেকে কিছু বলবে না। কী বলব দিদি - কথায় আছে না, ঢাকার বাঙাল, তাদের গোঁ তো কম যায় না!"।
বলতে বলতেই বাইরে পায়ের আওয়াজ, হেলেন লাফিয়ে উঠল - বাবা চলে এসেছে। বৈঠকখানা ঘরে প্রবেশ করেই নজরুলের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করলেন কিশোরীলাল - "শুনলাম আমার ঘরে বাংলার বিখ্যাত বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম এসেছেন। আমার কী সোভাগ্য!" সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পরিহিত গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহ সৌম্যকান্তি সুপুরুষ। গায়ে একখানি কাশ্মীরী শাল জড়ানো, এতো শীতেও অন্য কোনো শীতবস্ত্র নাই। চেহারায় একটা জমিদার সুলভ ব্যক্তিত্ব। কিশোরীলাল ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াতেই নজরুল সোফা ছেড়ে উঠে তাঁকে প্রণাম করলেন। কিশোরীলাল একটু হতচকিত বিরত স্বরে বলে উঠলেন, "সেকি! আপনি কত উঁচু মাপের গুণী মানুষ। ব্রিটিশ রাজ আপনার ভয়ে কম্পমান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপনাকে নাটক উৎসর্গ করেন। আপনি আমাকে প্রণাম করলে বড়ো অস্বস্তি হবে।" - মেসোমশায়, আপনার সম্পর্কে শুনেছি, আপনিও যথেষ্ট গুণী মানুষ। আর আমি তো বিজয়ের সমবয়সী। আমাকে আপনি বললে সেটা ভারি অন্যায় হবে। হেলেন সঙ্গে সঙ্গে কলকল করে উঠলো - "না বাবা, বড়দার চেয়ে কাজিদা তিন মাসের বড়ো। আমি শুনেছি!"
ওর কথা এবং তা বলার ধরনে ঘরে একটা হাসির ঢেউ ছড়িয়ে গেলা কিশোরীলাল হাসতে হাসতে বললেন, "ঠিক আছে বাবা, বোসো।"
- তুমি তো অনেক খবর রাখো দেখছি! নজরুল হেলেনের দিকে তাকিয়ে বললেন।
কিশোরীলাল উত্তর দিলেন - "হেলেন তো খবরের গেজেট। পাঁচ রকম খবর জোগাড় করা ছাড়া তো ওর কোনো কাজ নেই। শুধু বকবক করা আর দাদাদের পিছন পিছন বিপ্লব করে বেড়ানো। তা সে বিপ্লবীরা কই?
হেলেনের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর - তুমি আসার আগেই ওরা চলে গেছে বাবা।
নজরুলের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অনুযোগের সুরই ঝরে পড়ল কিশোরীলালের কন্ঠে - আমার অন্ন গ্রহণে না হয় আপত্তি বুঝলাম, কিন্তু কথা বলতেও আপত্তি?
"তোমরা এবার কথা বলো। দিদি চলুন, আমরা ভিতরে যাই। আশা এসে চা দিয়ে যাচ্ছে।" কিরণময়ী উঠলেন। আশাও দোলনের হাত ধরে ভিতরে চলে গেল।
"তুমি আমাদের বাড়ি আসছ শুনে থেকে আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে আছি। তোমার সাথে কথা বলা, তোমার নিজের কন্ঠে গান শোনার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের।" বললেন কিশোরীলাল।
- কেউ আমার গান শুনতে চাইলে আমি সর্বাপেক্ষা বেশি আনন্দ পাই।
- হ্যাঁ, তার সঙ্গে যদি চা এবং পান থাকে।
এক হাতে চায়ের ট্রে আর আরেক হাতে গরম ডালের বড়া নিয়ে আশার প্রবেশ। পিছনে হেলেনের হাতে চিনেমাটির প্লেটে সাজানো পানের খিলি।
আশার কথায় নজরুল ঘর কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন।
"গান, পান আর চা - এই তিন হচ্ছে আমার নেশার বস্তু।
কিশোরীলাল বললেন - এক সময় আমার এই ঘরেই কত গানের আসর বসেছে। নাটকের রিহার্সালও করেছি। বাইরে কাঁঠাল তলায় মঞ্চ সাজিয়ে ঘরোয়া পালাও হতো।
- এখন আর হয়না?
- দেখতেই তো পাচ্ছ বাবা, দিনকাল কেমন বদলে গিয়েছে। স্বদেশী আন্দোলন তো সারা দেশেই হচ্ছে, কিন্তু কৃষ্ণনগরে যেন সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন তো ব্রিটিশ সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। তুমিও তো এতো আবেগ দিয়ে চরকার গান লিখেছ, মানুষের মনকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কৃষ্ণনগরের ছেলে ছোকরাদের তাতে মন ভরে না। অহিংসা দিয়ে নাকি কিছু হবেনা! তুমি বিপ্লবী মনের মানুষ, দেশ ও দশ নিয়ে অনেক জ্ঞান, অনেক অভিজ্ঞতা। তোমার লেখা পড়ে যুবকেরা উদ্দীপিত হয়। তোমাকেই আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় - দু'চারটে গুলি-বোমা বন্দুক দিয়ে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়? তোমারও কি তাই মনে হয়? নজরুল মন দিয়েই শুনছিলেন কিশোরীলালের কথা। একটুখানি চুপ থেকে বললেন - "মেসোমশায়, এক কথায় এর কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। গান্ধীজির অহিংসা-মন্ত্রের কী জাদুশক্তি তা আমি নিজেও অন্তর দিয়ে অনুভব করেছি। তাঁর ডাকের সততা, জাতি-ধর্ম-অস্পৃশ্য নির্বিশেষে মানুষকে মর্যাদা প্রদান - সত্যি সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর আবেদনের শক্তি দেখে কেঁপে উঠেছে ব্রিটিশ শাসক। কিন্তু ইদানীং আমার মনে হয়েছে, কেঁপে উঠলেও গান্ধীজিকে ব্রিটিশ শক্তি আর ভয় পায়না।
- গান্ধীকে ভয় পায়না ব্রিটিশ? বলো কি? হ্যাঁ মেসোমশায়, তারা বুঝে ফেলেছে যে কংগ্রেস দলের নেতারা গান্ধীর চরকার শক্তিটাকে ব্যবহার করছে শুধু নিজেদের রাজনীতি আর দেশের ধনিক-বর্ণিক জমিদার এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে। গতবছর ভোটের সময় বসিরহাটের গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি কুতবউদ্দিনের হয়ে প্রচারের জন্য। দেখেছি কৃষক-শ্রমিক কামার-কুমোরের মতো সাধারণ গরিব মানুষের মধ্যে ভোট বা রাজনীতি নিয়ে কোনো হেলদোল নাই, উৎসাহ নাই।
তাদের তো ভোট নাই, সুতরাং তাদের নিয়ে দেশের রাজনীতি কিছু ভাবে না, ওরাও দেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু ভাবে না। কংগ্রেসের এই আপোষ আর দরাদরির প্রতি যুবসমাজের ক্ষোভ জন্মানো তো স্বাভাবিক। - কিন্তু তাই বলে বোমা-বন্দুক নিয়ে ডাকাতি করা আর দু'একজন সাহেবকে মেরে কি সেই উন্নতি হবে? এই যে অনন্তহরির মতো কত গুণী, কতো দেশসেবী ছেলে - এরা জেলের বাইরে থাকলে কি দেশের বেশি উপকার হতো না?
নজরুল কিছু বলার আগেই স্বমহিমায় হেলেনের প্রবেশ - "আর আলোচনা চলবে না! সব স্থগিত! ভিতরে ডাক পড়েছে!"