এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ক্ষণিকের সহযাত্রী: পোড়ামাটির দেশে!

    অভ্রদীপ লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • এভাবেই কেটে যায় কত রাত -

    বহু ক্রোশ দূর হতে ভেসে আসে আবছা এক টুকরো শব্দ। তারপর ধীরে ধীরে তার ঘনত্ব বাড়ে—মহাধাতব ছন্দে, ইস্পাতের গর্জনে, আর কালো ঘন অন্ধকার চিরে ছুটে চলে এক অদৃশ্য যাত্রার ঘোষণা—রেল!

    দুর্গম থেকে অতিদুর্গম পথে ক্লান্তিহীনভাবে প্রতিনিয়ত একই পথে এগিয়ে চলে। দৈনিক গন্তব্যের অতিক্রমন শেষে সে ফিরে আসে নিজের বাসায়, নতুন দিনের পুরোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আবার রওনা দিতে। তবে তার অন্তিম গন্তব্য কোথায়, সে কারোর জানা নেই। ফিরে আসার জন্যই তো সে রোজ যায়, রোজ ফিরে আসে আবার যেতে।

    সে একা যায় না, সাথে করে নিয়ে যায় কত সহযাত্রী—অসংখ্য মানুষ! কেউ বাড়ি ফিরছে, কেউ বা ছেড়ে যাচ্ছে নিজের বাড়ি। নতুন স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছে কেউ, কেউ বা আবার পুরোনো স্মৃতি থেকে পালাতে চেষ্টা করেও বিফল। কারও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে এক টুকরো হাসি, কারও চোখের কোণে জমে থাকা এক বিন্দু জল—রেল সব বয়ে নিয়ে যায়।

    এই শান্ত শহর দিয়ে কত মানুষ নিঃশব্দে পেরিয়ে যায় নিজেদের পরবর্তী গন্তব্যে। কত মানুষ তন্দ্রাচ্ছন্ন; আবার সেই ট্রেনের মধ্যেই কোনো এক ক্লান্ত পথিক গভীর রাতের মায়া কাটিয়ে এখনও জেগে। জানলার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই সে হয়তো এক ঝলক অনুকূল আলোতে স্টেশনের সাইনবোর্ড দেখে নিজের মনেই বলে ওঠে—

    “বিষ্ণুপুর।”
    হয়তো বা একবার ভাবতেও পারে—
    “খুব ঐতিহাসিক শহর একখানা।”

    তারপর সে ভুলে যায়! রেলও তার নিজ ছন্দে পরবর্তী সিগন্যাল ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়।

    কিন্তু সে জানে না, এই শহরেও তার এক অজ্ঞাতপরিচয় বন্ধু আছে। এমন একজন—যে তার পরিচয় জানে না, তার মুখ চেনে না, কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়নি, আর কোনোদিন চিনবেও না। তবু সে ট্রেনের হুইসেল শুনে কল্পনা করে তার গল্প, তার গন্তব্য, তার স্বপ্নের কথা, তার ভালোবাসা, দুঃখ, কষ্ট, বেদনা।

    খোলা জানালাগুলোই দূরত্বের বোঝা কমিয়ে আনে, বিশ্বকে নিজের দোরগোড়ায় আনার ক্ষমতা আর কারই বা আছে! জানালায় ধাবমান রেল, আবার জানালাতেই ধাবমান বাড়িঘর—একান্তে মিলিয়ে দেয় দুই পৃথিবীকে। নির্দিষ্ট সময়ে ভাবনাগুলো এক স্রোতে মিশে যায়, আবার মোহনায় গিয়ে মিলিয়ে যায় কোনো অসীমে।

    অথচ যে মুহূর্ত আমাদের নিজের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধল, সে নিজেই ছুটে চলেছে বিস্ময় গতিবেগে! কেবল কয়েক মুহূর্তের জন্য তাদের জীবন এই একই মাটি, একই আকাশ আর একই রাতের নীচে এসে মিলিত হলো—কেউ জানলো না। ঘুমন্ত শহরে হঠাৎ করে কেউ যেন আপন করে নিল সেই অপরিচিত বন্ধুদের, আবার ক্ষণিকের মধ্যে ফিরিয়ে দিলো সেই প্রবীণ দূরত্ব। ক্ষণের মধ্যে মানুষ আপন হয়, ক্ষণের মধ্যে অপরিচিত।

    কিন্তু ট্রেন ছুটে যায় নিজের গন্তব্যের দিকে।

    শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল—ওই দূরে, আরও দূরে, শূন্যে! কত পরিচয় সময়ের কাঁধে ভর করে ক্ষণিকের শব্দের মতো হারিয়ে যায় রাতের গভীরে। আর এভাবেই ট্রেনের গতিতে ছুটে যায় কত সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। সবুজ আর লালের মাঝখানে জীবনের কত রং!

    রেললাইনের সেই লাল আলোতে স্মৃতি হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে নিজেকে কিছুক্ষণ থামিয়ে, স্থিতাবস্থায় গল্পগুলোকে ঐতিহাসিক কাব্য বানিয়ে নাড়া দেয়; আর ওই সবুজ রং মনে করিয়ে দেয়—থামা নিষেধ! অতীতের ক্লান্তি ছেড়ে ভবিষ্যতের সকালে নতুন সূর্যোদয়ের উদ্দেশ্যেই এই যাত্রা।

    কিন্তু আলো ফোটার আগে সব শব্দ মিলিয়ে যায়।

    আর একটু পরেই ভোর হবে—

    আর ভোর হলেই সবাই ঘুম থেকে উঠেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজের নিজের জীবনে। ভাবতে গেলে এক টুকরো অন্ধকার লাগে, লাগে এক টুকরো নীরবতা, একটু শান্তি। হয়তো পরের রাত এলে, দূরে আবার কোনো ট্রেনের হুইসেল শোনা যাবে।

    আবার হয়তো আমি ভাববো—
    সেই ট্রেনে আবারও ছুটে চলেছে অসংখ্য গল্প, অসংখ্য অনুভূতি, অসংখ্য অচেনা মানুষ।

    তাদের কেউ জানে না আমি আছি, আমিও জানিনা তারা কেমন। কিন্তু তারা কেউ আমার অচেনা নয়। কারণ আমি জানি, তাদেরও কোনো প্রিয় মানুষ আছে, কোনো অপূর্ণতা আছে, কোনো স্বপ্ন আছে। তাদেরও আমার মতোই কখনও হাসি পায়, কখনও চোখ ভিজে ওঠে কষ্টে। মানুষ হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা জানার থাকে?

    কত লোক উঠেছিল সে ট্রেনে, কত লোক উঠবে!
    আজ হয়তো জানালার পাশে আমি দাঁড়িয়ে, কাল হয়তো অন্যকেউ দাঁড়াবে।

    কিন্তু এই যাত্রা কোনোদিন শেষ হবে না।

    মানুষ বদলাবে, মুখোশ বদলাবে, গল্প বদলাবে—কিন্তু সময় আমাদের সবাইকে অবচেতনভাবে বয়ে নিয়ে যাবে আবার কোনো এক অদৃশ্য গন্তব্যে।

    কেউ উঠবে,
    কেউ নামবে,
    কেউ বা হারিয়ে যাবে স্মৃতির অন্ধকারে।
    ছেঁড়া সেই টিকিট তার যাত্রীকে আজীবন মনে রাখবে। নশ্বর এই পৃথিবীতে এটাই হয়তো আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে।

    আর আমরা?
    আমরা সবাই এই অবিচল সময়রেখার কোনো এক অচিন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষণিকের সহযাত্রী!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন