প্রথম পর্বের বক্তব্য ছিল, বাংলা নিজের সঙ্গে দুটি ভুল করেছিল, এবং দুটোই সক্ষমতার ভুল নয়, আখ্যানের ভুল। প্রথমটি দায় ভুল জায়গায় বসানো। দুর্ভিক্ষকে দেখানো হল মজুতদারের কীর্তি হিসেবে, সেই প্রশাসনের নয় যে মজুতদারিকে একইসঙ্গে যুক্তিসঙ্গত আর প্রাণঘাতী করে তুলেছিল; যে অভিযোগ মন্ত্রিসভার ঘর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ছিল, তা থেমে গেল বাজারের দোকানে। দ্বিতীয়টি নায়কতালিকা সংকুচিত করে ফেলা। যে সমাজ প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা, বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোগী, সংস্কারক, প্রশাসক আর ক্রীড়াবিদ তৈরি করেছে, সে মনে রাখতে বেছে নিল গুটিকয় নাম আর একজন মহীরুহ কবিকে, বাকিদের ভাগে রাখল এক প্যারাগ্রাফ করে। এই পর্বে দেখব সেই দুই ব্যর্থতার দাম কী দাঁড়াল, দশকের পর দশক, ইংরেজ চলে যাওয়ার পরে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের অজুহাতটাও আর হাতে নেই।
ভদ্রলোকের দৃষ্টি এবং তার দাম
রাজনৈতিক ইতিহাসে ঢোকার আগে একটা সাংস্কৃতিক গঠনের কথা, যা সমস্যার একেবারে কেন্দ্রে। বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি নিজেকে কীভাবে দেখতে শিখল, ইংরেজের সাপেক্ষে এবং অন্য বাঙালির সাপেক্ষে।
ঔপনিবেশিক শাসনের দরকার ছিল এমন এক ভারতীয় শ্রেণির, যারা সাম্রাজ্য চালাবে, ব্রিটিশ মাপকাঠি আত্মস্থ করবে, আর নিজের মূল্য মাপবে ব্রিটিশ দাঁড়িপাল্লায়। বাংলা, ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশের প্রথম ও গভীরতম ক্ষেত্র হিসেবে, সেই শ্রেণিটিকে তৈরি করেছিল সবচেয়ে পূর্ণ রূপে। ভদ্রলোক ইংরেজি শিক্ষিত, পেশা আর আমলাতন্ত্রে নিযুক্ত, ভিক্টোরীয় উদারনীতি আর বাঙালি ঐতিহ্যের এক মিশ্রণে গড়া।
সেরা অবস্থায় এই শ্রেণি জন্ম দিয়েছে বাংলার নবজাগরণের। নিকৃষ্টতম অবস্থায় জন্ম দিয়েছে এক বিশেষ আত্মঘৃণার, যাকে পরিশীলিততার পোশাক পরানো হয়েছে: ইংরেজের প্রতি এক অটুট শ্রদ্ধা, আর ব্যবসা, শ্রম বা গ্রামজীবনে যুক্ত নিজের লোকদের প্রতি করুণা, যা প্রায় অবজ্ঞার কাছাকাছি।
এক পাঠক আমাকে এমন একটা কথা মনে করিয়েছেন যাকে আমি কম গুরুত্ব দিয়েছিলাম। ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান। বাংলা সাহিত্যে তার চিহ্ন প্রায় নেই। এক শতাব্দী পরে বঙ্কিমের বাবুর উপন্যাস বাদ দিলে এবং তাতেও ওনার চাকরি বাঁচিয়ে লেখার কতটা দায় ছিল তা নিয়ে ডিবেট হতে পারে। কিন্তু গভীরতর সমস্যা অন্য জায়গায়। কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজ গ্রামের গরিব মানুষের কষ্ট নিয়ে গভীরভাবে ভাবেনি, কারণ ভাবার দরকার পড়েনি। বাংলার প্রতিটি মন্বন্তরে মৃতদের বিপুল অংশ ছিল গ্রামের মানুষ। যাঁরা গল্পটা লিখতেন, তাঁরা তাঁদের মধ্যে ছিলেন না।
এতে অভিযোগের পরিধি বাড়ে। আখ্যানের ব্যর্থতা শুধু আসামির নাম না নেওয়ার ব্যর্থতা নয়। এটা ভুক্তভোগীকে দেখতে না পাওয়ার ব্যর্থতাও। যে শ্রেণি গল্পের নিয়ন্ত্রণ রাখে, সে যদি একদিকে সেই সভ্যতার দ্বারা আংশিক অধিকৃত হয় যে সভ্যতা তাদেরই দেশবাসীর কষ্টের জন্য দায়ী, আর অন্যদিকে যারা কষ্ট পাচ্ছে তাদের থেকে সামাজিকভাবে দূরে থাকে, তাহলে গল্পটা দুই প্রান্তেই বিকৃত হয়ে বেরোবে।
আরও একটি পরিণামের নাম করা দরকার, কারণ এক পাঠক প্রশ্নটি তুলেছেন এবং আমার মনে হয় তিনি ঠিক। তামিল পরিচয় নিজেকে গড়েছে আলাদাভাবে, আর তার সিনেমা, রাজনীতি ও ভাষা আন্দোলন সবই সেই আত্মপ্রতিষ্ঠাকে খাইয়েছে। বাঙালি পরিচয় তা করেনি, কারণ বাংলা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং নিজেকে কেন্দ্র বলেই ভাবত, প্রান্ত বলে নয়, যার আত্মরক্ষার দরকার হয়। নেতৃত্বের অভ্যাসটা নেতৃত্বের চেয়ে বেশিদিন টিকে গেল। যে সমাজ নিজেকে কেন্দ্র মনে করে, সে প্রান্তের আত্মরক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে না; আর কেন্দ্র যখন সরে যায়, তার হাতে দুটোর কোনওটাই থাকে না।
দিল্লি যা করল ও তার সাথে ব্যাঙ্কিং এর পতন
পরের চার দশককে এমনভাবে লেখা অসৎ হবে যেন সবটাই বাঙালির নিজের হাতে বাঙালির সঙ্গে ঘটেছে। কেন্দ্রের তিনটি সিদ্ধান্ত সত্যিকারের ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছিল, এবং তিনটিই বামফ্রন্টের জন্মেরও আগের।
১৯৫২ সালের ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন নীতিতে কয়লা, ইস্পাত আর সিমেন্টের পরিবহণে ভরতুকি দেওয়া হল, যাতে ভারতের যেকোনও জায়গায় এদের দাম সমান পড়ে। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সুষম শিল্পায়ন। ফল হল, এক ঝটকায় মুছে গেল সেই একটিমাত্র সুবিধা যা ভূগোল পূর্ব ভারতকে দিয়েছিল, অর্থাৎ নিজের খনিজের কাছে থাকা। দুর্গাপুরের পাশের ইস্পাত কারখানা আর বম্বের পাশের ইস্পাত কারখানার কাঁচামালের খরচ এক হয়ে গেল। বাংলার অবস্থানগত যুক্তিটাই উবে গেল, আর তার সঙ্গে এখানে কিছু গড়ার বড় কারণটাও। নীতিটি চালু ছিল চার দশক।
দ্বিতীয়টি নিয়ে আলোচনা কম হয়: বাঙালি ব্যাঙ্কিংয়ের পতন। ১৯৪৭ থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝির মধ্যে একের পর এক বাঙালি মালিকানার ব্যাঙ্ক বসে গেল বা জোর করে মিলিয়ে দেওয়া হল: কুমিল্লা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক, কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, হুগলি ব্যাঙ্ক, নাথ ব্যাঙ্ক, ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক এবং আরও অনেকে। দেশভাগে তাদের পূর্ববঙ্গের আমানত আর শাখাজাল আটকে গিয়েছিল, আর ১৯৪৯-এর ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন আইন ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একীকরণ অভিযান বাকিটা শেষ করল। ১৯৫০ সালে এদের চারটিকে মিলিয়ে যা তৈরি হয়, তা পরে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। ব্যালান্স শিটে যতটা দেখায়, ব্যাপারটা তার চেয়ে বড়। দেশি বাঙালি ব্যাঙ্কই ছিল সেই পথ যেখান দিয়ে বাঙালি ব্যবসা, এমনকি সিনেমার প্রযোজনাও, পুঁজি তুলত। পথটা বন্ধ হয়ে গেলে বাঙালি উদ্যোগ নির্ভরশীল হয়ে পড়ল এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর যাদের সদর দপ্তর অন্যত্র এবং জবাবদিহিও অন্যত্র।
তৃতীয়ত, লাইসেন্স ব্যবস্থা বিনিয়োগকে চালাল সুবিধা অনুযায়ী নয়, অনুমতি অনুযায়ী, আর অনুমতি দেওয়া হত দিল্লিতে। রণজিৎ রায়ের The Agony of West Bengal, প্রকাশিত ১৯৭১, এই যুক্তিই সাজিয়েছিল যে কেন্দ্রীয় নীতি ষাটের দশকেই রাজ্যের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। তাঁর রাজনীতি নিয়ে যে যা-ই ভাবুন, সময়রেখাটাই আসল কথা। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার অনেক আগেই বাংলার পতন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাম একটি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকারে পেয়েছিল। সেই অর্থনীতির সঙ্গে তারপর তারা কী করল, সেটা আলাদা এবং গুরুতর অভিযোগ। দুটোকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বামপন্থী উত্তরাধিকার: প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসভঙ্গ
বামের উত্থান আকস্মিক ছিল না, আর প্রথম দিকের কাজও কৃতিত্বহীন ছিল না। দেশভাগ পশ্চিমবঙ্গে এনে ফেলেছিল বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু, ভূমিহীন মানুষ, যাঁদের সম্পত্তিব্যবস্থার বিরুদ্ধে ন্যায্য ক্ষোভ ছিল। উদ্বাস্তু সংকট সামলাতে কংগ্রেস সরকারকে বহু মানুষ নির্মম ও অপদার্থ বলে দেখেছেন। সেই শূন্যস্থানে ঢুকল একটি সংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও মতাদর্শগতভাবে সুসংহত বাম, যাদের হাতে ছিল কষ্টের একটা স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং ক্ষোভের একটা বাহন।
সত্তরের শেষ ও আশির দশকের ভূমিসংস্কার, বিশেষত অপারেশন বর্গা, বর্গাদারদের আইনি নিরাপত্তা দিয়েছিল এবং স্বাধীন ভারতের অন্যতম কার্যকর ভূমিসংস্কার কর্মসূচি ছিল। প্রথম দিকের পঞ্চায়েতগুলিও দেশের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয়দের একটি। এই কৃতিত্ব স্বীকার করা দরকার। পূর্ণতর ছবিটা হল, বর্গা বাস্তব ফল দিলেও যা তৈরি করল তা প্রকৃত হস্তান্তরযোগ্য মালিকানা নয়, একটি নতুন পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো। এটা একইসঙ্গে উন্নয়ন নীতি এবং রাজনৈতিক সংহতির যন্ত্র ছিল, আর দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব খুব কমই বেধেছে।
কাঠামোগত স্ববিরোধ দ্রুত সামনে এল। জেলা, ব্লক আর গ্রাম পর্যন্ত ছড়ানো দলীয় যন্ত্র উন্নয়নের নয়, পৃষ্ঠপোষকতার যন্ত্র হয়ে উঠল। স্থানীয় নেতারা নিয়ন্ত্রণ করতেন ঋণ, জমির নথি, সরকারি চাকরি আর ঠিকাদারির নাগাল। জমিদারের হাত থেকে মুক্ত চাষি নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন বুথ কমিটির ওপর। পঞ্চায়েত, যা গ্রামীণ প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের প্রধান হাতিয়ার হতে পারত, হয়ে উঠল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার।
শিল্পের পতন, এবং দুটি সাইকেল এর তুলনা
একই সময়ে বাংলার শহুরে শিল্প-অর্থনীতির দীর্ঘ পতন শুরু হয়। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, যা সত্যিকারের শ্রমশোষণের বিরুদ্ধেই ন্যায্যভাবে গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে দখলের যন্ত্রে পরিণত হল। ১৯৬৭ থেকে ঘেরাওয়ের বছরগুলি, যখন ম্যানেজারদের দাবি না মানা পর্যন্ত আটকে রাখা হত, পুঁজির কাছে একটি নির্দ্বিধ বার্তা পাঠাল। পুঁজি যুক্তিসঙ্গত উত্তরই দিল। সে চলে গেল।
হাওড়া এই প্রক্রিয়ার সারাংশ। এই জেলা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলার ও ভারতের রাজস্বভিত্তিতে বিপুল অবদান রেখেছে। এর কারখানা বানিয়েছে রেল ইঞ্জিন, ইস্পাতের কাঠামো আর যন্ত্রপাতি, যা গোটা উপমহাদেশে গেছে এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়েছে। এখানে তৈরি দক্ষ শ্রমিকদের যোগ্যতা সারা দেশে স্বীকৃত ছিল। সেই শিল্পাঞ্চলকেই ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত করা হল প্রাথমিক পরিকাঠামো থেকে: রাস্তা, নিকাশি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নাগরিক পরিষেবা। এই ঘাটতি আকস্মিক ছিল না। এর পিছনে ছিল একটি হিসেব, যেখানে সংগঠিত শ্রমিক ভোটারের ঘন জমায়েতকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়, আর রাজনৈতিক বিনিয়োগ যায় সেইসব এলাকায় যাদের সক্রিয়ভাবে বাগে আনতে হয়। সল্ট লেক গড়ে উঠল। দক্ষিণের উদ্বাস্তু কলোনিতে পরিষেবা পৌঁছল। যে শিল্পাঞ্চল এসবের টাকা জুগিয়েছিল (ট্যাক্স মানি ), তাকে ক্ষয়ে যেতে দেওয়া হল।
যা ঘটেছিল তার জন্য যদি একটা ছবি চাই, সেটা দুটি সাইকেল কোম্পানি।
সেন র্যালে তৈরি হয় ১৯৪৯ সালে, আসানসোলের কাছে কন্যাপুরে, নটিংহ্যামের র্যালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। এটাই ছিল ভারতের প্রিমিয়াম সাইকেল। ওটার মালিক হওয়ার একটা মানে ছিল। প্রায় ওই সময়েই মুঞ্জল পদবির চার ভাই, সদ্য পাকিস্তান হয়ে যাওয়া কামালিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তু, প্রায় শূন্য হাতে লুধিয়ানায় পৌঁছে সাইকেলের যন্ত্রাংশের কারবার শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে একটি ছোট লাইসেন্স আর সামান্য ব্যাঙ্কঋণ নিয়ে তাঁরা গোটা সাইকেল বানাতে শুরু করেন। ১৯৮৬ সাল নাগাদ হিরো সাইকেলস পৃথিবীর বৃহত্তম সাইকেল নির্মাতা।
একই ধাক্কা, একই বছর, উল্টো ফল। সেন র্যালের ব্র্যান্ড ভালো ছিল, প্রযুক্তি ভালো ছিল, শুরুটাও ভালো ছিল। তার প্রযুক্তি ছিল বিদেশি অংশীদারের লাইসেন্সে, একটিমাত্র বড় কারখানায়, আর শ্রমসম্পর্ক ক্রমে বৈরী হয়ে ওঠে। সংস্থাটি রুগ্ণ হয়ে পড়ে, রাজ্য তার দায়িত্ব নেয়, এবং শেষে বন্ধ হয়ে যায়। হিরো ছিল পরিবারের হাতে, লুধিয়ানায় নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছিল কয়েকশো ছোট যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীর একটা বাস্তুতন্ত্র, আর মুনাফা ফিরিয়ে দিত ব্যবসাতেই, লভ্যাংশে বা রাজনীতিতে নয়।
একই দেশভাগের দুই দল। একদল গড়ল পৃথিবীর বৃহত্তম সাইকেল কোম্পানি। অন্যদল দেখল একটি প্রিমিয়াম জাতীয় ব্র্যান্ড কীভাবে সরকারি ফাইল হয়ে যায়। পার্থক্যটা প্রতিভার ছিল না, পুঁজির ছিল না, দুর্ভাগ্যেরও ছিল না। পার্থক্যটা ছিল, যারা কিছু গড়তে চায় তাদের নিয়ে দুই সমাজ কী করল।
প্রতিষ্ঠানের ভিতর থেকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া
সমাজ এগোয় তার প্রতিষ্ঠানের (Institution) নিরপেক্ষওতা ও শক্তির অনুপাতে। নিরপেক্ষভাবে কাজ করা আদালত, ক্ষমতার সেবা নয় আইন প্রয়োগ করা পুলিশ, জ্ঞান উৎপাদন করা বিশ্ববিদ্যালয়, মান বজায় রাখা নিয়ন্ত্রক সংস্থা: এগুলোই সভ্যতার অদৃশ্য পরিকাঠামো, রাস্তার চেয়ে কম চোখে পড়ে আর অনেক বেশি মৌলিক।
বামফ্রন্টের সময়কালে বাংলার প্রতিষ্ঠানগুলি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে। বিচারব্যবস্থা প্রকাশ্যে দখল হয়নি, কিন্তু প্রশাসনিক ঔদাসীন্য আর বিলম্বের স্বাভাবিকীকরণে তার কার্যকারিতা ক্ষয়ে গেছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যত অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ জনমানসে যুক্ত হয়ে গেল, পুরোপুরি অন্যায্যভাবে নয়, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রয়োগের সঙ্গে। বিংশ শতকের গোড়ায় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সত্যিই বিশ্বমানের ছিল, সেখানে গবেষণা কমল, শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার পাশে রাজনৈতিক বিবেচনা ঢুকল, আর প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে ক্ষয় করল ঠিক সেই পৃষ্ঠপোষকতার যুক্তি যা পঞ্চায়েত চালাত।
বিশেষ ট্র্যাজেডিটা এই যে এটা ঘটল এমন এক সমাজে, যার স্মৃতির মধ্যেই ছিল সত্যিকারের বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট ছিল পরিসংখ্যানবিজ্ঞানের একটি বিশ্বকেন্দ্র। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সে সি ভি রামন যে কাজ করেছিলেন তা নোবেল পেয়েছে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো মাঝারি প্রতিষ্ঠানের আরও মাঝারি হয়ে যাওয়া নয়। এগুলো উৎকর্ষ থেকে নেমে আসা, যা গুণগতভাবে আলাদা ক্ষতি এবং ফেরানো অনেক কঠিন।
নিষ্ক্রমণ এবং তার যৌগিক যুক্তি
যে সমাজ তার শিক্ষিত ও উদ্যোগী শ্রেণিকে ধরে রাখতে পারে না, সে এমন এক নিম্নগামী চক্রে ঢোকে যা ফেরানো অত্যন্ত কঠিন। বাংলার চক্রটি শুরু হয় ষাটের দশকে, গতি পায় সত্তর ও আশিতে।
ব্যবসা গেল প্রথমে। মাড়োয়ারি, গুজরাটি আর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বাণিজ্যিক পরিবার, যারা কলকাতায় প্রতিষ্ঠান গড়েছিল, প্রথমে নথিভুক্ত দপ্তর, তারপর কারবার, তারপর পরিবার সরিয়ে নিল বম্বে, দিল্লি আর মাদ্রাজে। বাঙালি ব্যবসায়ী পরিবারও পিছু নিল। বেসরকারি পুঁজির কাছে বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: তোমার উদ্দেশ্য সন্দেহজনক, তোমার সম্পত্তির অধিকার অনিরাপদ, আর রাষ্ট্র তোমাকে কাজ করতে সাহায্য করবে না।
পেশাজীবী শ্রেণি গেল তারপর। কলকাতার চমৎকার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি বাঙালিরা দেখলেন ঘরের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে আর বাইরের সুযোগ বাড়ছে। আশির দশকের মধ্যে বাঙালি মেধা ও পেশাজীবীর দেশত্যাগ এতটাই সর্বব্যাপী হয়ে গেল যে তা সাংস্কৃতিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াল, উদ্বেগের কারণ নয়, সমাজের একটি সংজ্ঞাসূচক বৈশিষ্ট্য।
সিনেমায় ধরনটা ছোট আকারে দেখা যায়। কলকাতার নিউ থিয়েটার্স ছিল ভারতের সেরা স্টুডিও। ১৯৫০ সালে বিমল রায় তাঁর গোটা দল নিয়ে বম্বে চলে যান, আর তিন বছরের মধ্যে বানান দো বিঘা জমিন, উচ্ছেদ নিয়ে ছবি যেখানে কারণটা পর্দাতেই স্পষ্ট। ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন, শক্তি সামন্ত, সলিল চৌধুরী, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, এবং আরও বহু মানুষ একই পথে গেছেন। বাংলা প্রতিভা তৈরি করা বন্ধ করেনি। বাংলা এমন জায়গা হওয়া বন্ধ করেছিল যেখানে প্রতিভা কিছু গড়তে পারে।
প্রতিটি প্রস্থান পরেরটাকে আরও সম্ভাব্য করে তুলেছে। কম উদ্যোগপতি মানে কম চাকরি, কম রাজস্ব, সামাজিক পরিকাঠামোয় কম বেসরকারি বিনিয়োগ। কম পেশাজীবী মানে দুর্বল হাসপাতাল, স্কুল আর কারিগরি প্রতিষ্ঠান। দুর্বল প্রতিষ্ঠান মানে শিক্ষিত মানুষের থেকে যাওয়ার আরও কম কারণ।
দ্বিতীয় ভাঙন: ১৯৭১
১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তি, যাকে বাংলা যথার্থই ন্যায়ের ও গভীর সভ্যতাগত আত্মীয়তার মুহূর্ত হিসেবে উদযাপন করেছে, পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে এল উচ্ছেদের এক বিশাল দ্বিতীয় ঢেউ। আগত মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছয়। এটা অর্থনৈতিক পরিযান ছিল না। এটা ছিল হিংসা থেকে পালানো, আর তা অসাধারণ চাপ ফেলল এমন এক রাজ্যের ওপর যে তখনও দুই দশক আগের প্রথম উদ্বাস্তু সংকটের অমীমাংসিত ফল বয়ে বেড়াচ্ছে।
এতে রাজকোষ, আবাসন, পয়ঃপ্রণালী আর শ্রমবাজারের ওপর চাপ পড়ল। এর সঙ্গে গভীর হল বারবার উচ্ছেদ হওয়ার মানসিক ভার। দুই প্রজন্মে দুটি দেশভাগ, দুবারই গণউচ্ছেদ আর অপ্রক্রিয়াকৃত ক্ষত, তৈরি করল এমন এক সমাজ যে নিজেকে বোঝে ক্ষতির চোখে, নির্মাণের চোখে নয়। সভ্যতার আখ্যান হয়ে দাঁড়াল টিকে থাকা আর শিকার হওয়ার আখ্যান, গড়া আর আকাঙ্ক্ষার নয়। আত্মবোধের এই বদল বদলে দিল কী সম্ভব মনে হয় আর কী চেষ্টা করার যোগ্য মনে হয়।
যে ভারসাম্য কোনওদিন পাওয়া গেল না
নানা ঐতিহ্যের রাজনৈতিক দর্শন একটি বিষয়ে মেলে: সমাজ বিকশিত হয় যখন রাষ্ট্রশক্তি আর সামাজিক শক্তি ঠিক সম্পর্কটি খুঁজে পায়। রাষ্ট্রকে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে নিরাপত্তা দিতে, চুক্তি বলবৎ করতে, পরিকাঠামো রাখতে, গণপণ্য জোগাতে। আবার এত প্রবল হওয়া চলবে না যে সেই সমাজ, উদ্যোগ আর সংগঠনগুলোকে পিষে দেয় যাদের ভিতর দিয়ে মানুষ রাজনীতির বাইরে জীবন গড়ে। নাগরিক সমাজ কেবল অলংকার নয়। ওটাই সেই প্রধান পথ যা দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়।
আধুনিক ইতিহাসের কোনও পর্বেই বাংলা এই ভারসাম্য পায়নি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ছিল লুণ্ঠক ও নিষ্কাশক, যা সক্ষমতা নয়, ক্ষত তৈরি করেছে। স্বাধীনতা এনেছে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা সমাজতান্ত্রিক ভাষার নিচে মূলত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক: ধরে নেওয়া হল উন্নয়ন দেবে দল-রাষ্ট্র, সক্ষম সমাজের শক্তি থেকে উন্নয়ন উঠে আসবে না। বামফ্রন্ট একে বাড়িয়েছে ও গভীর করেছে, সঙ্গে যোগ করেছে সমাজজীবনের প্রতিটি কোণে দলীয় অনুপ্রবেশের নির্দিষ্ট ব্যাধি।
যে ব্যবসায়ী শ্রেণি নাগরিক সমাজকে ভিত দিতে পারত, তাকে তাড়ানো হল। যে শিক্ষিত পেশাজীবী শ্রেণি স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় আর সাংস্কৃতিক সংগঠন টিকিয়ে রাখতে পারত, সে দেশ ছাড়ল। যে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বিকল্প দৃষ্টি দিতে পারত, সে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীরভাবে বসানো ছিল যা প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে সন্দেহের চোখে দেখত। রইল কেবল একটি দল-রাষ্ট্র, ভিতর থেকে ফাঁকা, যা না পারে সেই সংগঠন যা তাকে শক্তিশালী করেছিল, না পারে সেই শাসন যা সেই সংগঠনকে অর্থ দিত।
একটি সৎ হিসেবের দিকে
বাংলার পতন রহস্য নয়। এটি একটি নথিভুক্ত ধারাবাহিকতা: একটি দুর্ভিক্ষ যা তৈরি করা হয়েছিল এবং যার দায় কোনওদিন ঠিক জায়গায় বসেনি; একটি আখ্যান যা শ্রেণির ভাষায় সাজানো হল আর যন্ত্রণার পিছনের যন্ত্রটি অভিযুক্ত হল না(a mistake in the telling, in my opinion), এবং যে শ্রেণি সেই আখ্যান সাজাল তারা গ্রামের মৃতদের নিজেদের লোক ভাবেনি; একটি দেশভাগ যা বোঝাপড়ায় আসেনি; কেন্দ্রীয় নীতি যা রাজ্যের সুবিধাগুলো কেড়ে নিয়েছিল নিজের রাজনীতি বাকিটা শেষ করার আগেই; উদযাপিত নায়ক যাঁদের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষাগুলি প্রশংসিত হল কিন্তু সঞ্চারিত হল না; একটি সমাজ যে প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা, বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোগী, সংস্কারক, প্রশাসক আর ক্রীড়াবিদ তৈরি করেছে কিন্তু মনে রাখেনি; একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা ন্যায্য সামাজিক শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ে রূপান্তরিত করল; আর ঠিক সেই মানুষদের যৌগিক নিষ্ক্রমণ যাঁরা গতিপথটা ঘুরিয়ে দিতে পারতেন।
বাংলার যা দরকার ছিল, একাধিক মোড়ে, তা প্রতিটি সফল সমাজেরই দরকার হয়। এমন প্রতিষ্ঠান যা রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে কাজ করে। এমন ব্যবসায়ী সমাজ যাকে আইন দিয়ে জবাবদিহি করানো হয়, মতাদর্শ দিয়ে তাড়ানো হয় না। এমন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যা নিজের গল্প সততা আর গর্বের সঙ্গে বলে। এমন রাষ্ট্র যা গণপণ্য জোগানোর মতো শক্তিশালী, কিন্তু সেই নাগরিক সমাজকে চেপে মারে না যা বাকি সব স্থায়ী জিনিস তৈরি করে।
কাঁচামালের অভাব কোনওদিন ছিল না। যে বিজ্ঞানীরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, যে শিল্পোদ্যোগীরা আধুনিক উদ্যোগ তৈরি করেছেন, যে শিল্পীরা সত্যিকারের বিশ্বমাপের, আর অসাধারণ বৌদ্ধিক প্রাণশক্তির একটা জনগোষ্ঠী: কোনওটারই অভাব ছিল না। বাংলার ট্র্যাজেডি সক্ষমতার ট্র্যাজেডি নয়। এটা দিকভ্রমের ট্র্যাজেডি, আর সেইসব নির্দিষ্ট পরিস্থিতির, যা দিকভ্রমকে এত দীর্ঘস্থায়ী আর এত ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
এটি তিন পর্বের প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্ব আসবে সেই প্রশ্নে, কী করা যায়, এবং যুক্তি সাজাবে সেই বদলের পক্ষে যা বাংলা কোনওদিন করেনি: ভোগের সংস্কৃতি থেকে নির্মাণের সংস্কৃতিতে।
সূত্র প্রসঙ্গে
প্রথম পর্বের মতোই, এই তালিকায় যুক্তির সমর্থক এবং বিরোধী, দুরকম কাজই রাখা হয়েছে।
Ranajit Roy, The Agony of West Bengal (1971). বামফ্রন্টের আগেই কেন্দ্রীয় নীতি বাংলাকে স্থবির করেছিল, এই যুক্তি।
Ross Mallick, Development Policy of a Communist Government: West Bengal since 1977 (Cambridge, 1993). বামফ্রন্ট শাসনের সমালোচনামূলক বিবরণ।
Atul Kohli, The State and Poverty in India (Cambridge, 1987). সহানুভূতিশীল বিবরণ, বিশেষত অপারেশন বর্গা নিয়ে।
অপারেশন বর্গা ও তার সীমা নিয়ে মৈত্রীশ ঘটক ও মৈত্রেয় ঘটক।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষি পরিবর্তন নিয়ে প্রণব বর্ধন।
Amiya Kumar Bagchi, Private Investment in India 1900-1939 (Cambridge, 1972).
Joya Chatterji, The Spoils of Partition (Cambridge, 2007).
Prafulla K. Chakrabarti, The Marginal Men (Naya Udyog, 1990).
ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন ও পূর্ব ভারতে তার প্রভাব নিয়ে শিল্প-অবস্থান সংক্রান্ত সাহিত্য এবং নব্বইয়ের দশকে তা প্রত্যাহারের আগের বিতর্ক।
দেশভাগ-পরবর্তী বাঙালি ব্যাঙ্কের একীকরণ নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইতিহাস, ১৯৪৯-এর ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন আইন ও ১৯৫০-এর সংযুক্তিকরণ প্রসঙ্গে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।