শুনুন মশাই, আপনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা কি হেলিকপ্টার চেপে কৈলাস থেকে নেমেছিলেন? না, তাও না, উনি বোধহয় স্বর্গীয় ডানাওলা রথে চড়ে সটান বঙ্গোপসাগরের তীরে অবতরণ করেছিলেন, তারপর প্রথম কাজ হিসেবে একখানা ধুতি পরে "আমি খাঁটি বাঙালি" বলে ঘোষণা করেছিলেন! ব্যাপারটা এরকমই তো দাঁড়ায়, যখন কেউ বুক চিতিয়ে বলে "আমাদের বংশে খাঁটি রক্ত, ফরেন মিক্সচার নেই"। আরে দাদা, বাঙালি কোনো স্পেশাল চার্টার্ড ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জার নয়, বাঙালি হলো শেয়ালদা লোকাল ট্রেনের একটা কামরা—যেখানে হাজার বছর ধরে হাজারো স্টেশন থেকে মানুষ উঠেছে, নেমেছে, ঠেলাঠেলি করেছে, পাশের লোকের টিফিন থেকে মুড়ি চেয়ে খেয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একটাই কামরা—বাঙালি জাতি। এই "আদিম খাঁটি রক্ত" জিনিসটা অনেকটা ফুচকার জলের মতো—সবাই বলে "আমারটাই আসল রেসিপি", অথচ প্রত্যেকটা দোকানের জলেই তেঁতুল, ধনেপাতা, পুদিনা সব গুলিয়ে-মিশিয়ে একাকার। বাঙালি একটা ডেলিভারি অ্যাপের কম্বো মিল, যেখানে বায়োলজি নিজেই লিখে দিয়েছে "একাধিক আইটেম একত্রে প্যাক করা হয়েছে, রিফান্ড চলিবে না"।
এবার আসুন আসল রেসিপিটায়—নৃতাত্ত্বিক ঝালমুড়ির কারিকুরি। প্রথমে আসছে অস্ট্রিক বা আদি অস্ট্রেলয়েডরা, যাঁরা আসলে আমাদের বাড়ির বেসমেন্ট, ফাউন্ডেশন, ভিত—বলতে পারেন বহুতলের পাইলিং। এঁরা কারো কাছে ধার করেননি, নিজেরাই এই পলিমাটিতে প্রথম উনুন জ্বালিয়েছিলেন, প্রথম ডোবার জলে চান করেছিলেন, প্রথম গানের সুর ভেঁজেছিলেন। বলা ভালো, এঁরাই সেই "ওরিজিনাল বাসিন্দা", যাঁদের নামের পাশে ট্রেডমার্ক চিহ্ন বসানো উচিত ছিল। তারপর ঢুকলেন দ্রাবিড়রা—দক্ষিণ আর মধ্য ভারত থেকে হেঁটে হেঁটে, যেন এক ট্রাভেলিং মশলার দোকান। এঁরা এসে অস্ট্রিকদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারলেন, রক্তে-সংস্কৃতিতে বেশ একচোট গোলমাল পাকালেন, আর বাংলার হাঁড়িতে ফেলে দিলেন এক্সট্রা তেঁতুল-মশলা, মানে নতুন জিনগত ফ্লেভার। এরপর এলেন মঙ্গোলয়েড বা ভোটচীনীয়রা, পাহাড় ডিঙিয়ে, নদী পেরিয়ে, একেবারে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিস্টের মতো। এঁদের ছাপ আজও স্পষ্ট—আমাদের চোখের গড়নে, ত্বকের রঙে, এমনকি পুজোর মণ্ডপে ঢাকের বোলেও কোথাও না কোথাও এঁদের সিগনেচার লেখা আছে। এঁরা যেন বাড়ির সেই আত্মীয়, যাঁকে সবাই ভুলে যায় অথচ যাঁর হাতের রান্না ছাড়া উৎসব জমেই না।
সবশেষে, বিশাল বিনয়ী ভঙ্গিতে এলেন ইন্দো-আর্যরা। এঁরা ভাবতেন নিজেরাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত, বেদ-উপনিষদ বগলদাবা করে এসেছিলেন যেন বাংলাকে জ্ঞানদান করতে। কিন্তু বাংলার মাটি বড় ত্যাঁদড়, সে এঁদের এমন আত্মসাৎ করে ফেলল যে শেষমেশ এঁরাও সেই মহাখিচুড়ির কড়াইতে নিছক একটা ফোড়ন হয়ে রইলেন—একটু তেজপাতা, একটু জিরে, ব্যস, ফুরিয়ে গেল সাম্রাজ্য! যাঁরা এখনও "আমরা খাঁটি আর্যবংশোদ্ভূত" বলে টেবিল চাপড়ান, তাঁদের বলি, আপনারা আসলে সেই ফোড়নটুকু, যেটা খিচুড়ি নামিয়ে ফেলার পর প্লেটের কোণে পড়ে থাকে, কেউ খায়ও না, ফেলেও দেয় না।
আর ঠিক এই জায়গাতেই সেই বিখ্যাত খোঁচাটা এসে পড়ে—"জাতের ঠিক নেই, এরা আবার দুর্গা পূজা নিয়ে কথা বলে!" আহা, কী অপূর্ব ঐতিহাসিক অজ্ঞতা! যে দুর্গাপুজো নিয়ে এত গর্ব, সেই উৎসবের মণ্ডপেই তো দাঁড়িয়ে আছেন অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড আর আর্য—চার হাতে চারখানা অস্ত্র নিয়ে, একই শরীরে মিশে থাকা এক জ্যান্ত জেনেটিক কোলাজ। ঠাকুর গড়া হয় যে মাটিতে, তার এক ভাগ আসে গণিকালয়ের দুয়ার থেকে—সেখানেও তো "জাত" প্রশ্ন তোলা হয় না, বরং পুণ্যিমাটি বলে পুজো করা হয়। তাহলে রক্তের বেলায় হঠাৎ এত খুঁতখুঁতে হবার কী দরকার? দুর্গাপুজো নিজেই তো এক মহা-সংকর উৎসব—ঢাকিরা আসেন এক জেলা থেকে, পুরোহিত আরেক ভাষাগোষ্ঠী থেকে, প্রতিমাশিল্পী তৃতীয় কোনো ঐতিহ্য থেকে, আর ভোগ রান্না হয় এমন এক রেসিপিতে যার শিকড় খুঁজতে বসলে গোটা উপমহাদেশ ঘুরে আসতে হবে। যাঁরা রক্তের বিশুদ্ধতা খোঁজেন, তাঁদের উচিত পুজোয় অঞ্জলি না দিয়ে বরং ল্যাবরেটরিতে গিয়ে নিজের ডিএনএ টেস্ট করানো—ফলাফল দেখে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি চমকাবেন।
তাই শেষ কথা এটাই—বাঙালি কোনো সিঙ্গল-অরিজিন কফি নয়, খাঁটি "এস্টেট ব্লেন্ড" তো নয়ই। বাঙালি একখানা মারকাটারি মিশ্র ভেলপুরি, যেখানে টক-ঝাল-মিষ্টি সব একসঙ্গে মিলে তবেই স্বাদ খোলে। যাঁরা রক্তের শুদ্ধতা নিয়ে গলা ফাটান, তাঁরা আসলে সেই ভেলপুরির একটা বাসি মটর, যেটা কোনোদিনই জলে ভিজে নরম হয়নি—শক্ত, একগুঁয়ে, আর বাকি স্বাদের সঙ্গে বেমানান। বাকিটা নিছকই ফাঁপা ইগো, আর সেই ইগো নিয়েই তাঁরা প্রতি বছর পুজোর মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলেন, ভুলে যান যে যাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, তিনি নিজেই এক চলমান মিশ্র-জাতির প্রতিমূর্তি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।