এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • খাঁটি বাঙালি ও অন্যান্য রূপকথা

    হারামির হাতবাক্স লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত
  • শুনুন মশাই, আপনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা কি হেলিকপ্টার চেপে কৈলাস থেকে নেমেছিলেন? না, তাও না, উনি বোধহয় স্বর্গীয় ডানাওলা রথে চড়ে সটান বঙ্গোপসাগরের তীরে অবতরণ করেছিলেন, তারপর প্রথম কাজ হিসেবে একখানা ধুতি পরে "আমি খাঁটি বাঙালি" বলে ঘোষণা করেছিলেন! ব্যাপারটা এরকমই তো দাঁড়ায়, যখন কেউ বুক চিতিয়ে বলে "আমাদের বংশে খাঁটি রক্ত, ফরেন মিক্সচার নেই"। আরে দাদা, বাঙালি কোনো স্পেশাল চার্টার্ড ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জার নয়, বাঙালি হলো শেয়ালদা লোকাল ট্রেনের একটা কামরা—যেখানে হাজার বছর ধরে হাজারো স্টেশন থেকে মানুষ উঠেছে, নেমেছে, ঠেলাঠেলি করেছে, পাশের লোকের টিফিন থেকে মুড়ি চেয়ে খেয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একটাই কামরা—বাঙালি জাতি। এই "আদিম খাঁটি রক্ত" জিনিসটা অনেকটা ফুচকার জলের মতো—সবাই বলে "আমারটাই আসল রেসিপি", অথচ প্রত্যেকটা দোকানের জলেই তেঁতুল, ধনেপাতা, পুদিনা সব গুলিয়ে-মিশিয়ে একাকার। বাঙালি একটা ডেলিভারি অ্যাপের কম্বো মিল, যেখানে বায়োলজি নিজেই লিখে দিয়েছে "একাধিক আইটেম একত্রে প্যাক করা হয়েছে, রিফান্ড চলিবে না"।
     
    এবার আসুন আসল রেসিপিটায়—নৃতাত্ত্বিক ঝালমুড়ির কারিকুরি। প্রথমে আসছে অস্ট্রিক বা আদি অস্ট্রেলয়েডরা, যাঁরা আসলে আমাদের বাড়ির বেসমেন্ট, ফাউন্ডেশন, ভিত—বলতে পারেন বহুতলের পাইলিং। এঁরা কারো কাছে ধার করেননি, নিজেরাই এই পলিমাটিতে প্রথম উনুন জ্বালিয়েছিলেন, প্রথম ডোবার জলে চান করেছিলেন, প্রথম গানের সুর ভেঁজেছিলেন। বলা ভালো, এঁরাই সেই "ওরিজিনাল বাসিন্দা", যাঁদের নামের পাশে ট্রেডমার্ক চিহ্ন বসানো উচিত ছিল। তারপর ঢুকলেন দ্রাবিড়রা—দক্ষিণ আর মধ্য ভারত থেকে হেঁটে হেঁটে, যেন এক ট্রাভেলিং মশলার দোকান। এঁরা এসে অস্ট্রিকদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারলেন, রক্তে-সংস্কৃতিতে বেশ একচোট গোলমাল পাকালেন, আর বাংলার হাঁড়িতে ফেলে দিলেন এক্সট্রা তেঁতুল-মশলা, মানে নতুন জিনগত ফ্লেভার। এরপর এলেন মঙ্গোলয়েড বা ভোটচীনীয়রা, পাহাড় ডিঙিয়ে, নদী পেরিয়ে, একেবারে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিস্টের মতো। এঁদের ছাপ আজও স্পষ্ট—আমাদের চোখের গড়নে, ত্বকের রঙে, এমনকি পুজোর মণ্ডপে ঢাকের বোলেও কোথাও না কোথাও এঁদের সিগনেচার লেখা আছে। এঁরা যেন বাড়ির সেই আত্মীয়, যাঁকে সবাই ভুলে যায় অথচ যাঁর হাতের রান্না ছাড়া উৎসব জমেই না।
     
    সবশেষে, বিশাল বিনয়ী ভঙ্গিতে এলেন ইন্দো-আর্যরা। এঁরা ভাবতেন নিজেরাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত, বেদ-উপনিষদ বগলদাবা করে এসেছিলেন যেন বাংলাকে জ্ঞানদান করতে। কিন্তু বাংলার মাটি বড় ত্যাঁদড়, সে এঁদের এমন আত্মসাৎ করে ফেলল যে শেষমেশ এঁরাও সেই মহাখিচুড়ির কড়াইতে নিছক একটা ফোড়ন হয়ে রইলেন—একটু তেজপাতা, একটু জিরে, ব্যস, ফুরিয়ে গেল সাম্রাজ্য! যাঁরা এখনও "আমরা খাঁটি আর্যবংশোদ্ভূত" বলে টেবিল চাপড়ান, তাঁদের বলি, আপনারা আসলে সেই ফোড়নটুকু, যেটা খিচুড়ি নামিয়ে ফেলার পর প্লেটের কোণে পড়ে থাকে, কেউ খায়ও না, ফেলেও দেয় না।
     
    আর ঠিক এই জায়গাতেই সেই বিখ্যাত খোঁচাটা এসে পড়ে—"জাতের ঠিক নেই, এরা আবার দুর্গা পূজা নিয়ে কথা বলে!" আহা, কী অপূর্ব ঐতিহাসিক অজ্ঞতা! যে দুর্গাপুজো নিয়ে এত গর্ব, সেই উৎসবের মণ্ডপেই তো দাঁড়িয়ে আছেন অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড আর আর্য—চার হাতে চারখানা অস্ত্র নিয়ে, একই শরীরে মিশে থাকা এক জ্যান্ত জেনেটিক কোলাজ। ঠাকুর গড়া হয় যে মাটিতে, তার এক ভাগ আসে গণিকালয়ের দুয়ার থেকে—সেখানেও তো "জাত" প্রশ্ন তোলা হয় না, বরং পুণ্যিমাটি বলে পুজো করা হয়। তাহলে রক্তের বেলায় হঠাৎ এত খুঁতখুঁতে হবার কী দরকার? দুর্গাপুজো নিজেই তো এক মহা-সংকর উৎসব—ঢাকিরা আসেন এক জেলা থেকে, পুরোহিত আরেক ভাষাগোষ্ঠী থেকে, প্রতিমাশিল্পী তৃতীয় কোনো ঐতিহ্য থেকে, আর ভোগ রান্না হয় এমন এক রেসিপিতে যার শিকড় খুঁজতে বসলে গোটা উপমহাদেশ ঘুরে আসতে হবে। যাঁরা রক্তের বিশুদ্ধতা খোঁজেন, তাঁদের উচিত পুজোয় অঞ্জলি না দিয়ে বরং ল্যাবরেটরিতে গিয়ে নিজের ডিএনএ টেস্ট করানো—ফলাফল দেখে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি চমকাবেন।
     
    তাই শেষ কথা এটাই—বাঙালি কোনো সিঙ্গল-অরিজিন কফি নয়, খাঁটি "এস্টেট ব্লেন্ড" তো নয়ই। বাঙালি একখানা মারকাটারি মিশ্র ভেলপুরি, যেখানে টক-ঝাল-মিষ্টি সব একসঙ্গে মিলে তবেই স্বাদ খোলে। যাঁরা রক্তের শুদ্ধতা নিয়ে গলা ফাটান, তাঁরা আসলে সেই ভেলপুরির একটা বাসি মটর, যেটা কোনোদিনই জলে ভিজে নরম হয়নি—শক্ত, একগুঁয়ে, আর বাকি স্বাদের সঙ্গে বেমানান। বাকিটা নিছকই ফাঁপা ইগো, আর সেই ইগো নিয়েই তাঁরা প্রতি বছর পুজোর মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলেন, ভুলে যান যে যাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, তিনি নিজেই এক চলমান মিশ্র-জাতির প্রতিমূর্তি।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন