এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বই

  • বাংলায় ইসলামী সত্তার নানা রূপের তালাশ (ঈপ্সিতা হালদার কৃত ছাপার অক্ষরে কলব –এর ধ্বনি – কয়েকটি প্রবন্ধ -- বইয়ের আলোচনা)

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বই | ১২ আগস্ট ২০২৬ | ৩৮ বার পঠিত
  • আঠেরোশো আটান্নর মহাবিদ্রোহের লিখিত বয়ান আছে সাহেবদের রাষ্ট্রীয় আর ঐতিহাসিক নথিতে। নিম্নবর্গের দিগদর্শন সেসব ঔপনিবেশিক তরফের নথির ঢিপিতে সিঁধ কেটে বিদ্রোহের স্বর শোনানোর পন্থা চেনালো। নানা প্রসঙ্গে সেসব মালুম হয়। বিদ্রোহ আর বিদ্রোহীর প্রত্যক্ষ ধ্বনি শুনিয়ে যেসব ইস্তেহার লভ্য তাতে দেখা যাচ্ছে হিন্দুস্থানের হিন্দু আর মুসলমানের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মানসিকতায়, উপনিবেশের লাভার্থী কলকাতা, চেন্নাই আর মুম্বাইয়ের প্রেসিডেন্সির দেশীরা তার কিছুদিনের মধ্যেই আমদানী করে জাতীয়তাবাদের - প্রথমে সুরেন্দ্রনাথের ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কনফারেন্স আর পরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। সেখানে হিন্দুস্থানের হিন্দু আর মুসলমানকে আলাদা ধরে একজোট করার কর্তব্য নেই, এক ধরে নিয়ে এগোনোর প্রস্তাবনা আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে যা হিন্দু জাতীয়তাবাদের কোল ঘেঁষে চলে কারণ তাতে, তার চলিষ্ণুতায় সে মোটেই ইসলামী সত্তাকে কেন্দ্রীয় সহযোগী করে না মহাবিদ্রোহের ইস্তেহারের মতো। এইভাবে অতিদেশীয় প্রেক্ষিতে ভদ্রলোকের জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভ প্রান্তে সরিয়ে রেখেছে ইসলামী অনুষঙ্গ।

    দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম মূলত সুফি চিহ্ন বহন করে। সকলই আল্লার অংশ নাকি সকলই আল্লার থেকে উৎপন্ন এই ছিল মধ্য বা প্রাক আধুনিক যুগে তার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। আবার বারবারই তার অন্তরে সময়োপযোগীতার টানাপোড়েন চলতে থাকে। ফিকহ বা বিচারবিধির ওস্তাদ উলেমাগণও এই সময়ের টান অস্বীকার করতে পারেন না। ঔরঙ্গজেবের ফতোয়া ই আলমগীরি সংকলনের সময়ও তখনকার নির্দিষ্ট সময় বিবেচনায় ছিল। এর কারণ শুধু মানকুলাত বা প্রথাগত জ্ঞানই ইসলামী জ্ঞান পদ্ধতির অঙ্গ ছিল না কোন কালেই, মাকুলাত বা বহির্বিশ্ব সঞ্জাত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ভাণ্ডারের সুপ্রাচীন পরম্পরা সাধারণভাবে ইসলামের ও দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের শরীরে অন্তর্লীন। লখনৌয়ের ফিরিঙ্গিমহল মাদ্রাসাকে ঘিরে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে এক ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রসঙ্গে ফ্রান্সিস রবিনসনের কাজ ও রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায় প্রমুখের প্রস্তাবনা গুরুত্বপূর্ণ। এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে ছিল ইসলামী ঐতিহ্যের আধারে পাশ্চাত্যের আধুনিক প্রকল্পের আত্মীকরণ আকাঙ্খা একথা কি অস্বীকার করা চলে ? এসব কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই – আধুনিককালে সংস্কারযানী ইসলামের উদ্ভবের বস্তুগত ভিত্তি অনুসন্ধান।

    ছাপার অক্ষরে কলব –এর ধ্বনি –কয়েকটি প্রবন্ধ ( প্রকাশক – কেতাব–e, কলকাতা ) বইতে অধ্যাপক ঈপ্সিতা হালদার জাতীয়তা-আধুনিকতা সম্পৃক্ত অতি দেশীয় জনপরিসর নির্মাণ সংক্রান্ত আলোচনাকে বাংলা প্রদেশের নিরিখে দেখে, নানাত্ব আরোপের দায়ে নির্দিষ্ট অর্থে সংস্কারযানী ইসলাম কেমন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল থেকে নিজস্ব পরিচিতি অর্জন করলো তার তালাশ করেছেন। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচিতি বোঝার এই মূলত সাহিত্যিক প্রকল্প যে রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে তা আবার আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে বহুভাষী অতিদেশীয় প্রেক্ষিতে ভদ্রলোকের ন্যারেটিভের প্রতিস্পর্ধী সংযুক্ত জাতীয়তাবাদী প্রকল্পও (composite nationalistic) বটে।

    বইটার নামের তাৎপর্য উপনিবেশের হাত ধরে আসা প্রিন্ট ক্যাপিটালিজমের প্রেক্ষাপটে মুসলিম মন বা কলবের লেখ -চিহ্ন অনুসন্ধান। কলব কথাটার ধর্মীয় তাৎপর্য হলো আত্মার প্রকাশ, বোধ ও বোধির কেন্দ্র। তাই ইসলামী আত্মপরিচয় আর আধুনিকতার গমনপথ যে উপনিবেশের বাস্তবতার অভিঘাতে শুধু নয় স্বতোৎসারিত প্রবণতার ফলেও নির্ধারিত হচ্ছে এমন একটা প্রস্তাবনা নামকরণেই আছে। অধ্যাপক হালদার বলছেন যেহেতু তাঁর নাড়াচাড়ার উপাদানগুলো নানা পরস্পরবিরোধীতায় ভরা তাই নানা সূত্রগুলোকে সমন্বিত করে কোন নিটোল ন্যারেটিভ নির্মাণ তাঁর অভীষ্ট নয়। স্বভাবতই সাহিত্যিক এই প্রকল্পে ছাপাখানার বিকাশ জাতীয় সাহিত্য সম্পৃক্ত আধুনিকতার জন্ম দিলেও, লেখক সেই জাতীয় সাহিত্য নির্মাণের পথ বেয়ে সংযুক্ত জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নির্মাণের অন্তিম বিন্দু ছোঁয়ার চেষ্টাও করেননি কারণ তাঁর উদ্দেশ্য পরস্পরবিরোধীতাকে মননগড়া কথনে বাঁধা নয়, তার নানাত্বে পেশ করা।

    সংস্কারযানী ইসলামের সূচনা বিন্দু অনুসন্ধান করতে গিয়ে লেখকের প্রস্তাবনা হলো যে শুরু করতে হয় অষ্টাদশ শতকের হানাফি উলেমা শাহ ওয়ালি আল্লাহ দেহলভীর থেকে, যিনি ছিলেন ঔরঙ্গজেব আলমগীরের বিচারবিধির মহাগ্রন্থ ফতোয়া ই আলমগীরির অন্যতম প্রণেতা উলেমা শাহ আব্দুল রহিমের ছেলে। সে মূলসূত্র ধরে, তার থেকে সরে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আর বিনিময়ের সঙ্গে আধুনিক সাহিত্য রচনার সঞ্চলন আর ক্রমে আরবি-ফার্সি-উর্দু থেকে দোভাষী বা তৎসম বাংলার ব্যবহারের দিকে সরে এসে মুসলমানের বাঙালিত্ব আর বাঙালি হিসেবে তার মুসলমানত্ব বোঝাই লেখকের অভীষ্ট। অতিদেশীয় স্তরে খিলাফত আন্দোলনের নিরিখে হিন্দু -মুসলমানের সম্পর্ক বোঝার বাইরে এইভাবে ইসলামের নানা প্রশাখাগুলোর অণুসমীক্ষা করেছেন লেখক। ইসলামী সংস্কারযানী আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল এই উপমহাদেশের বহুমুখী সুফি ইসলামের সংস্কার করে সনাতন শরিয়তি বাঁধনে বাঁধা। কিন্তু দেশের মাটির গভীরে প্রোথিত লোকজ, রিচ্যুয়াল নির্ভর দক্ষিণ এশীয় ইসলামও কেতাবি ইসলামের পাশাপাশি সামাজিক বাধ্যতায় সহাবস্থান করতে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের এই মধ্যবর্তী থাকার বাধ্যতা, যাকে পরিভাষায় লিমিন্যালিটি বলা চলে, মেনে নিয়েই ইতিহাসকার এম আর পীরভাইয়ের মতো অধ্যাপক হালদারও এগিয়েছেন। তাঁর এই প্রকল্প তাই শাহাব আহমেদের পন্থায় কেতাবি ইসলামের পূর্ব অনুমানকারী কর্তৃত্বের (extrapolatory authority) নানা অনুমিত, তির্যক, প্রভাবিত, গৃহীত নানা রূপ অনুসন্ধান করে ওই কর্তৃত্বের লিমিন্যালিটি – মধ্যবর্তী থাকার সামাজিক বাধ্যতাকেই ইসলামী বাংলা সাহিত্যে খোঁজে।

    অধ্যাপক হালদার তাঁর এই প্রবন্ধ সঙ্কলনটা ছয় ভাগে ভাগ করেছেন। সেই ছটা ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক।

    ১) বঙ্গে উনিশ শতকে সংস্কারযানী সুফিবাদ

    এই পর্বের বৈশিষ্ট্য হলো আরবি-ফার্সি-উর্দু সমন্বিত বাংলার এক দোভাষী রূপের বিকাশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শাহ মুহম্মদ আব্দুর রহিমের ছন্দে লেখা বইটার কথা যেখানে গজলে সুফি ভাব আর গদ্যে সুফি বোধ-তাসাওউফ তত্ত্ব পেশ করেছেন লেখক। বইটার নামও মিশ্র অথর্ব মোহাম্মাদী বেদ, লেখা আঠেরোশো একানব্বই। সূচনায় বলা হচ্ছে -
    হকিকত তরিকত মারিফত আর
    বাতুনের শরিয়তি আশক আল্লাহর
    আর যত ভেদ বাত আছে ফকায়েতে
    বহুত হয়েছে লিখা এই কেতাবেতে


    এই দোভাষী মাধ্যমে লোকজ ইসলামের দরগা-মাজার কেন্দ্রিক ভক্তিযাপনের ঝাড় ফুঁকের পির-ফকিরি চাল থেকে সংস্কার করে গ্রহণীয় শরিয়তি বাঁধনে বাঁধা শুরু হয়, যা হুগলি থেকে ছড়িয়ে গোটা দক্ষিণ বঙ্গের মুসলমানের ধর্মীয় যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। লক্ষ্যণীয় এই লেখার অংশে হকিকত-হক কথা, তরিকত-সুফি পন্থা, মারিফত-লব্ধ অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার নির্যাস, ফকায়তে-ফিকহ-বিচারবিধি সম্মত করে পেশ করার কথা বলা আছে। সংস্কারযানী উলেমা-আলিমদের লেখা এই সংক্রান্ত বই বটতলায় ছেপে বিলি হতো।

    সংস্কারযানী ইসলামের বাংলায় প্রথম পদচারণা হলো ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় - আঠেরোশো আঠাশ সালে সৈয়দ আহমেদ বেরেলভীর প্রতিষ্ঠিত তারিকাহ-ই-মুহম্মদিয়ার খালিফাদের প্রচারের ফলে। এই তারিকার মূল কথা ছিল যে ব্রিটিশ শাসিত হিন্দুস্থান হলো শত্রুর দেশ -দার অল -হরব এদেরই মুরিদ মীর নিসার আলি আর হাজি শরিয়তআল্লার নেতৃত্বে মূলত ব্রিটিশের তাঁবেদার হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ফরায়েজি আন্দোলন, যা গ্রামীণ মুসলমান সমাজে শরিয়তি আচরণ বিধি পালনের অবশ্য কর্তব্য-ফরজের ধারণা ছড়িয়ে দিলো। ব্রিটিশরা এই সব সশস্ত্র আন্দোলনকে আঠেরোশো ষাট, সত্তরের ওয়াহাবি ট্রায়ালের মাধ্যমে নৃশংস ভাবে দমন করলেও মুসলমান সমাজকে পির -ফকিরির রিচ্যুয়াল নির্ভরতা থেকে আরো বেশি করে ফরজ মোতাবেক করার চেষ্টা মধ্যে দিয়ে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যায়। তারই ফলশ্রুতিতেই মুহম্মদের উম্মাহ-অনুসারী হবার শিক্ষে দিতে প্রথমে দোভাষীতে তারপর তৎসম বাংলায় ইমান আদাবের বই রচনা হতে থাকে। কারবালায় হজরত মুহম্মদের দৌহিত্র হজরত হুসেনের শাহাদতের কাহিনি এইসব প্রচারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ব্রিটিশ ভারতকে দার আল -হারাব না বলে দার অস-সালাম-শান্তির রাজ্য বলে ফরজ অনুশীলনের পথে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের পক্ষেও সংস্কারযানীদের কেউ কেউ ছিল।

    চিশতি, কাদিরি, নস্কবন্দী সব সুফি সিলসিলার আলিমরা এই বৃহৎ ভাষিক কর্মে সামিল ছিলেন। মহাবিদ্রোহের পর প্রথমে উত্তর ভারতের আর তারপর ক্রমে বাংলায় ছাপাখানার বিপুল প্রসারও এই আন্দোলনে গতি আনে। ব্রাহ্ম ধর্মের একেশ্বরবাদী টেক্সটে যে ভাষার চল আছে তার সঙ্গে মুসলিম সংস্কারযানীদের ভাষিক সাযুজ্য পাওয়া যায়।

    ২) শিয়া দাবি ভেঙে দোভাষী কারবালা পুঁথিতে সুন্নি সংস্কার যানী হুসেন-ভক্তি

    আঠেরোশো ষাটের দশক থেকে দোভাষী পয়ার ছন্দে লেখা ইসলামী পুঁথিতে বটতলা ছেয়ে যায়, এর পাঠক আর প্রমিত বাংলার পাঠক এক ছিল না। আশির দশক থেকে মুসলমান সমাজের মধ্যে তৎসম প্রমিত ভাষায় আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে শুরু করলো। এসব এক আধুনিক জনপরিসরে নির্মাণ করছে বটে কিন্তু দোভাষী সাহিত্যও উবে যায় না। এই দোভাষী পুঁথির আলোচনাতেই লেখকের মূল জোর। আরো নির্দিষ্ট ভাবে এই অধ্যায়ে তিনি কারবালার কাহিনীগুলোকে ধরে আধুনিক জনপরিসরে নির্মাণে মূলত সুন্নি সংস্কারযানী আন্দোলন কীভাবে শিয়া-সুন্নি ধর্মের দ্ধন্দ্ব বিচারও নিরসন করেছে তাও আলোচনা করছেন।

    ৩) মহাকোরআনের বঙ্গানুবাদ

    মুনশি নইমুদ্দিন হলেন প্রথম বাংলাভাষী আলিম যিনি প্রমিত বাংলায় প্রথম কোরআন অনুবাদ করেন সেই আঠেরোশো সাতাশি সালে। একই সময়ে অবশ্য ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন কৃত সংস্কৃত ঘেঁষা ভাষার সঙ্গে খ্রিষ্টীয় গস্পেল অনুবাদের তৎসম ধাঁচাকে মিশিয়ে কোরআনের অনুবাদ পাওয়া যায়। প্রথম সংস্করণে অবশ্য সাবধানতা অবলম্বনের জন্য তাঁর নামের বদলে ‘অনুবাদকস্য’ লেখা হয়। কোরআনের ত্রিশ পারা, ওই পারাগুলোর অন্তর্গত একশো চোদ্দ সুরা আবার প্রতি সুরা মূল একক কাব্যে- আয়াহতে বিভক্ত। মুনশিসাহেব দশটা পারা অনুবাদ করে যান। প্রথম খণ্ড সুরাহ ফাতিহার প্রচ্ছদে তিনি যা বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন তা হলো – ‘আল্লা ব্যতীত কেহই উপাস্য (মাবুদ) নহে। মুহম্মদ তাঁহার প্রেরিত (রসূল)’ - এই রকম। ইতিমধ্যে কোরআন অনুবাদের ঢল নেমে গেল, আলাদা পারাগুলো কম দামের বই হয়ে মুসলমানের পাঠ্য হচ্ছে বা সোনার জলে ছাপাই হয়ে অনূদিত মূল কোরআন ভক্তি নিদর্শন হিসেবে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছে। অনুবাদে আল্লার বাণীর যাতে মহিমা ক্ষুণ্ণ না হয় তাই মধ্যযুগ থেকে প্রাক আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ায় কোরআনের অনুবাদ হয়নি বললেই চলে কিন্তু বাংলায় এই অনুবাদ–পুনরনুবাদ হয়ে দিকবদলই ঘটছে। এই দিক বদলের অনুসন্ধান করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। এই অনুবাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যেও ধর্মীয় মাত্রা ছাপানো মুসলিম আধুনিক সত্তা নির্মাণের নানা দিক তার ঐতিহাসিক ত্রিমাত্রিক অবস্থানের নিরিখে বিচার করেছেন লেখক। কোরআন অনুবাদের বহুমাত্রিকতার সঙ্গে যে বাঙালি মুসলমান সমাজের আঞ্চলিক –বঙ্গীয়, জাতীয় –ভারতীয় বা অতিদেশীয় (trans territorial) অবস্থান সম্পৃক্ত, এ বুঝলে মুসলিম প্রেক্ষিতে নেশন নির্মাণের ভিন্ন সংজ্ঞাও বোঝা যায়।

    ৪) বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যে পরকালের ভাবনা

    ইসলামের ইতিহাসের আদি পর্ব থেকে ইহজাগতিক আর পারলৌকিক ধার্মিকতার মধ্যে খটামটি ছিল। প্রথম যুগে নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠাকল্পে ইহজাগতিকতার দিকে ঝুঁকে ছিল ইসলাম। পরে বিশাল রাজত্ব হাসিল হলে, অন্য ভূমিতে খৃস্টান আর অন্য ধর্মের অতীন্দ্রিয়তার সংস্পর্শে এসে আর খালিফাদের ক্ষমতার গুমোরে অতিষ্ট হয়ে মুসলমান সুফি পথের দিকে ঝুঁকলো যা হলো পারলৌকিকতার পথ। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব এই দুয়ের টানাপোড়েনের ফলাফল। আগেই বলা হয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের মধ্যে সকলই আল্লার অংশ যাকে উজুদি পথ–ওয়াহদাত-আল উজুদ বলা হয় আর সকলই তাঁর থেকে উৎপন্ন যাকে শুহুদি পথ-ওয়াহদাত-আল শুহুদ বলে, এ দু মতের টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যায়। প্রথমটা যদি পারলৌকিকতার সমার্থক হয় তবে দ্বিতীয়টা ইহজাগতিকতার দিকে ঝোঁকা পন্থা। প্রথমটার প্রতিনিধি যদি চিশতি, কাদিরি ইত্যাদি সুফি সিলসিলার লোক করে থাকে তবে দ্বিতীয়টার প্রতিনিধি হলো নক্সবন্দিরা। সামাজিকতার স্বার্থে অবশ্য এই দু মতের পার্থক্য মুছে গেছে প্রায়ই। অনুগত ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান - মুমিনকে - ব্যক্তিগত ফরজ পালনের ওপর তার পর জগতের ভবিতব্য নির্ভরশীল - এ ফতোয়া দেওয়ার জন্য ফ্রান্সসিস রবিনসন সংস্কারযানী ইসলামকে ইহজাগতিক বলেছেন। বলা হয় হারাম কাজে গুনাহ আর হালাল কাজে সওয়াব মিলবে ত্রাণকর্তা মুহম্মদের কাছ থেকে। বাংলার রিচুয়্যালিস্টিক ইসলামের পৃষ্ঠভূমিতে শরিয়তি বিধানকে আবশ্যক করার টেনশনও কম ছিল না আর তাই দোভাষী বাংলা আর প্রমিত বাংলায় ইমানের উপঢৌকন হিসেবে মুসলমান পুরুষকে পরকালে যৌবন ফিরে পাওয়া আর অনন্তযৌবনা হাজার হুরীর সঙ্গ পাওয়ার লোভ দেখানোও হতে থাকে। অধ্যাপক হালদার এই অধ্যায়ে সেসব বিস্তারে আলোচনা করেছেন। তিনি আরো দেখাচ্ছেন দোভাষী বইগুলোতে, শাহাদাতের ফলে পরকালে পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রসঙ্গে জেহাদি শাহাদাতের ধারণা একেবারেই ঠাঁই পাচ্ছে না। তার একটা কারণ হিসেবে লেখক সমসময়ে ওয়াহাবি ট্রায়ালে জেহাদিদের কোনঠাসা অবস্থার কথা বলছেন আর অন্য কারণটা হলো কারামত আলি জৌনপুরীরর ব্রিটিশ ভারতকে দার অস -সালাম -শান্তির রাজ্য ফতোয়া দেওয়া।

    ৫) হৃত গরিমার পুনরুদ্ধার ও বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তার মুহূর্ত

    আঠেরোশো আশি থেকে মুহম্মদের উম্মাহ হিসেবে বাঙালি মুসলমানের গোষ্ঠী চেতনা, জনপরিসরে কাঠামো আর অভিব্যক্তিতে বদল ঘটে। মুসলমান জাতি হিসেবে নিজেদের চিহ্নিত করতে থাকে প্রমিত বাংলায়। উদাহরণ স্বরূপ শেখ আব্দুল জব্বারের ইসলাম চিত্র ও সমাজচিত্র বইটা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন লেখক
    জাতীয় গৌরব, জাতীয় উন্নতি এবং জাতীয় জাতীয় জীবন গঠন করিবার একটি প্রধান উপাদান একতা। কিন্তু, উহা সমাজের সহিত দৃঢ়রূপে সংলিপ্ত ; অতএব সমাজ ত্যাগ করিলে জাতীয় উন্নতির আশা সুদূর পরাহত।
    ১৯০৭ হিন্দু জাতীয়তাবাদী সন্দর্ভ–সাহিত্য পরিসরের প্রতি-প্রস্তাবনা হিসেবেই শুধু নয় খ্রিস্টান পাদ্রিদের ইসলাম বিরোধিতার জবাবও দিচ্ছিল মুসলিম জাতীয় সাহিত্য। হিন্দু জাতীয়তার ধারণার কেন্দ্রে আছে আর্যজাতির দুর্জয় পৌরুষ ও পরাক্রম যা ভারতের পরিসরেই (territorial) অতীতলগ্ন বিপরীতে বাংলার মুসলমানের অতীতের গৌরবগাথা তার বাসস্থানের অঞ্চলে নেই, তা অতিদেশীয়( transterritorial) তাই কারবালার যুদ্ধ আর হুসেনের আদর্শের গুরুত্ব মুসলমান জাতীয় সাহিত্যে আধুনিকতার উৎসমুখ হিসেবে বিকশিত হয়। জাতীয় সাহিত্যে এই ইসলামের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।

    ৬) অতীতের পুনরুদ্ধার – ইতিহাস ও জীবনী

    বাঙালি মুসলমান তার আর্থিক দৈন্যদশার কারণে হজে যেতে পারত না। কিছু লেখক ইসলামের ইতিহাস জীবনী লিখে সে খিদে মেটাচ্ছেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস জীবনীর আবেগের ধাঁচাকে অবলম্বন করে মুসলমানের জাতীয় সাহিত্য এগোচ্ছে আর তার সঙ্গে যোগ থাকছে ব্রাহ্ম সমাজের ধর্মীয় সন্দর্ভ আর সাহিত্যিক আধুনিকতার। হজরত মুহম্মদ, চার সাহাব (চার ধর্মনেতা) থেকে হাসান হোসেনের জীবনী রচনা শুরু হচ্ছে যা তৈরি করছে জাতীয় সাহিত্যের আধুনিকতা। এপ্রসঙ্গে ব্রাহ্ম আরবি-ফার্সি পণ্ডিত, শরিয়ত বোদ্ধা ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের অবদানের কথা বিশেষ ভাবে আলোচিত হয়েছে এ অধ্যায়ে, শুধু কোরআনের অনুবাদ নয় গিরিশ চন্দ্র লিখলেন মুহম্মদের জীবনী, হাসান হোসেনের জীবনী ইত্যাদি। এইসব জীবনীর মধ্যে অতিপ্রাকৃত উপদানগুলোকে সরিয়ে বাস্তবতার উপস্থিতিও দেখা গেল।

    এই ভাবে বাংলার মুসলিম জনপরিসর নির্মাণের ভাষিক উদ্যোগ বিষয়ে সম্যক আলোচনা করে অধ্যাপক ঈপ্সিতা হালদার বাংলায় তত্ত্বচর্চার এক অন্য দিক খুলে দিলেন। এই পরিসরে তার কিছু ছকবদ্ধ আভাস দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। অত্যন্ত চলিষ্ণু এক সমাজ -ভাষা -রাজনীতি সমন্বিত প্রকল্পকে জানতে বুঝতে কিছু প্রাথমিক ছক হয়ত প্রয়োজন হলেও হতে পারে এই বিধায় এমনটা করা।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১২ আগস্ট ২০২৬ | ৩৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন