

ছবি: রমিত
শক্তি আমার সাড়ে ছয় দশকের নিভৃত দূরত্বের একান্ত প্রাণের সুজন, সেই কলেজ জীবন থেকেই। প্রথম দিন থেকেই ওর কথাবার্তায় প্রখর আভিজাত্য ও কাব্যিক ব্যক্তিত্বের প্রভায় আমার মতো মধ্যমেধার সহপাঠী, কেবল মৃদু হাসি বিনিময়ের অনুচ্চারিত সৌজন্যে ওর সঙ্গে সম্ভ্রমের দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। অথচ শক্তি আমার দাদার ছাত্রী, আমার দিদিদের সঙ্গে ছিল ওর খুব নিবিড় সম্পর্ক। মেজদির সঙ্গে একই স্কুলে কাজও করেছে।
ভাবলে অবাক লাগে যে একই শহরে বড় হলেও, আমাদের মধ্যে বাক্য বিনিময়ের সুযোগ হয়নি সুদীর্ঘ ছয় দশকেও। কলেজ পেরিয়ে যে যার পথে চলে গেছি, শেষ পর্যন্ত সম্ভবত ২০১৬ সাল নাগাদ শক্তির সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ হলো ফেসবুকে, সে তখন সুদূর আমেরিকায় ছেলে সায়নের কাছে।
আমি তখন "স্মৃতি অমলিন" নামে আমার আত্মকথা সম্পর্কিত একটা কিছু লিখেছি ফেসবুকে। শক্তি বইটি পড়তে চাইলো। সে দেশে ফেরার পর প্রকাশক তাঁর কাছে বইটা পাঠিয়ে দিলেন। আমি তখন সিডনিতে। গ্রন্থটিতে আমার স্খলন পতনের অকপট আত্মস্বীকৃতি, শক্তিকে মুগ্ধ করেছে এবং তক্ষুনি আমার সাহসকে সে উদার প্রশংসা করেছে।
এরপরে ফেসবুকেই আমি যখন "জীবনের বাঁকে বাঁকে" নামে বিস্তৃত পরিসরে আমার দ্বিতীয় বইটি লিখি, তখন প্রতিটি অধ্যায় পড়ে শক্তি তাঁর সুস্পষ্ট দৃঢ় মতামত জানিয়েছে। প্রকাশ্যে ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে আমার বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছে, এবং আমি আক্রমণে রুচিশীলতা হারালেও, শক্তি কখনো ক্রোধান্ধ হয়ে প্রত্যাক্রমণ করেনি। শুধু তাই নয়, এরই মধ্যে শক্তির কথায় আমি দু-একটি বিশেষ অধ্যায় আমার বইয়ে যোগও করেছি। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, না করলে বইটিতে সত্যিই ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে যেত।
এতসব বাক বিতন্ডা সত্ত্বেও, শক্তি তাঁর ছেলে শঙ্খকে দিয়ে কলকাতা বইমেলা থেকে আমার সদ্য প্রকাশিত বই "বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের ত্রিপুরা" সংগ্রহ করে অসুস্থ শরীরেও প্রথম রাতেই ৬৪ পাতা পড়ে নেয়। কতটুকু আন্তরিকতা থাকলে আমার মতো দুর্বিনীত অকৃতীর সৃষ্টিকে এই সম্মান দেওয়া যায়, তা ভেবে অবাক হই।
এর পরের দিন যা হলো তা আরও অবাক করার মতো। সেদিন রাতে পুত্র শঙ্খ আমায় ফোন করে ফোনটি মায়ের হাতে তুলে দেয়। পরিচয়ের ৬১ বছর পর সেই প্রথম দুই বন্ধুতে সরাসরি বাক্যালাপ।
এইতো সেদিন বলেছিল মায়ের সাথে আরেক দিন কথা বলিয়ে দেবে। আফসোস রয়ে গেল আমি শেষ ক্ষমাটা তাঁর কাছে চাইতে পারলাম না।
অবশ্য এও জানি কবির হৃদয়ের ব্যাপ্তি অনেক বেশি, তাঁর দৃষ্টি জাগতিক তুচ্ছতার সীমানা ডিঙিয়ে নীল দিগন্ত ছাড়িয়ে দূর গগন পানে ধায়, তারায় তারায় খোঁজে অসীম অনন্তের শেষ নিশ্চিত বরাভয়। তাইতো শক্তি বলতে পেরেছে ---
"শঙ্খ, একদিন মুখাগ্নির কাঠি
মার মুখে ছোঁয়াবি যখন,
তখনো কবিতা থাকবে বিষন্ন আগুনে
শঙ্খ তোর বাবাকে বলিস
মা কখনো কবিতা ভোলেনি।"