এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  স্মৃতিচারণ

  • আমার বন্ধু শক্তি

    বিকচ চৌধুরী
    স্মৃতিচারণ | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৪০০ বার পঠিত
  • শ্রীমতী শক্তি দত্ত রায়-এর স্নেহচ্ছায়া গুরুচণ্ডা৯-র সঙ্গে যুক্ত অনেকেই পেয়েছেন। গুরুচণ্ডা৯-র পাঠকরা অনেকেই ছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ। উত্তরপূর্ব ভারত, বিশেষ করে ত্রিপুরার লেখালিখি প্রকাশ করবার যে প্রয়াস গুরুচণ্ডা৯ নিয়েছে, সেই প্রয়াসে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লেখকদের অনেকেই এই প্রবীণা সাহিত্যিকের উপদেশ ও উৎসাহ পেয়েছে, তাঁর কাছে বিভিন্নভাবে ঋণী। তাঁর জীবনাবসান গুরুচণ্ডা৯ পরিবারের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। গুরুচণ্ডা৯ থেকে প্রকাশিত তাঁর দুটি বই- ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড এবং পিরোবতী ও মুড়ির টিন।

    ছবি: রমিত



    শক্তি আমার সাড়ে ছয় দশকের নিভৃত দূরত্বের একান্ত প্রাণের সুজন, সেই কলেজ জীবন থেকেই। প্রথম দিন থেকেই ওর কথাবার্তায় প্রখর আভিজাত্য ও কাব্যিক ব্যক্তিত্বের প্রভায় আমার মতো মধ্যমেধার সহপাঠী, কেবল মৃদু হাসি বিনিময়ের অনুচ্চারিত সৌজন্যে ওর সঙ্গে সম্ভ্রমের দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। অথচ শক্তি আমার দাদার ছাত্রী, আমার দিদিদের সঙ্গে ছিল ওর খুব নিবিড় সম্পর্ক। মেজদির সঙ্গে একই স্কুলে কাজও করেছে।

    ভাবলে অবাক লাগে যে একই শহরে বড় হলেও, আমাদের মধ্যে বাক্য বিনিময়ের সুযোগ হয়নি সুদীর্ঘ ছয় দশকেও। কলেজ পেরিয়ে যে যার পথে চলে গেছি, শেষ পর্যন্ত সম্ভবত ২০১৬ সাল নাগাদ শক্তির সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ হলো ফেসবুকে, সে তখন সুদূর আমেরিকায় ছেলে সায়নের কাছে।

    আমি তখন "স্মৃতি অমলিন" নামে আমার আত্মকথা সম্পর্কিত একটা কিছু লিখেছি ফেসবুকে। শক্তি বইটি পড়তে চাইলো। সে দেশে ফেরার পর প্রকাশক তাঁর কাছে বইটা পাঠিয়ে দিলেন। আমি তখন সিডনিতে। গ্রন্থটিতে আমার স্খলন পতনের অকপট আত্মস্বীকৃতি, শক্তিকে মুগ্ধ করেছে এবং তক্ষুনি আমার সাহসকে সে উদার প্রশংসা করেছে।

    এরপরে ফেসবুকেই আমি যখন "জীবনের বাঁকে বাঁকে" নামে বিস্তৃত পরিসরে আমার দ্বিতীয় বইটি লিখি, তখন প্রতিটি অধ্যায় পড়ে শক্তি তাঁর সুস্পষ্ট দৃঢ় মতামত জানিয়েছে। প্রকাশ্যে ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে আমার বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছে, এবং আমি আক্রমণে রুচিশীলতা হারালেও, শক্তি কখনো ক্রোধান্ধ হয়ে প্রত্যাক্রমণ করেনি। শুধু তাই নয়, এরই মধ্যে শক্তির কথায় আমি দু-একটি বিশেষ অধ্যায় আমার বইয়ে যোগও করেছি। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, না করলে বইটিতে সত্যিই ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে যেত।

    এতসব বাক বিতন্ডা সত্ত্বেও, শক্তি তাঁর ছেলে শঙ্খকে দিয়ে কলকাতা বইমেলা থেকে আমার সদ্য প্রকাশিত বই "বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের ত্রিপুরা" সংগ্রহ করে অসুস্থ শরীরেও প্রথম রাতেই ৬৪ পাতা পড়ে নেয়। কতটুকু আন্তরিকতা থাকলে আমার মতো দুর্বিনীত অকৃতীর সৃষ্টিকে এই সম্মান দেওয়া যায়, তা ভেবে অবাক হই।

    এর পরের দিন যা হলো তা আরও অবাক করার মতো। সেদিন রাতে পুত্র শঙ্খ আমায় ফোন করে ফোনটি মায়ের হাতে তুলে দেয়। পরিচয়ের ৬১ বছর পর সেই প্রথম দুই বন্ধুতে সরাসরি বাক্যালাপ।

    এইতো সেদিন বলেছিল মায়ের সাথে আরেক দিন কথা বলিয়ে দেবে। আফসোস রয়ে গেল আমি শেষ ক্ষমাটা তাঁর কাছে চাইতে পারলাম না।

    অবশ্য এও জানি কবির হৃদয়ের ব্যাপ্তি অনেক বেশি, তাঁর দৃষ্টি জাগতিক তুচ্ছতার সীমানা ডিঙিয়ে নীল দিগন্ত ছাড়িয়ে দূর গগন পানে ধায়, তারায় তারায় খোঁজে অসীম অনন্তের শেষ নিশ্চিত বরাভয়। তাইতো শক্তি বলতে পেরেছে ---

    "শঙ্খ, একদিন মুখাগ্নির কাঠি
    মার মুখে ছোঁয়াবি যখন,
    তখনো কবিতা থাকবে বিষন্ন আগুনে
    শঙ্খ তোর বাবাকে বলিস
    মা কখনো কবিতা ভোলেনি।"


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • স্মৃতিচারণ | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৪০০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন।