

ছবি: রমিত
আমার মতো অভাজনও কীভাবে কীভাবে জানি তাঁর স্নেহের ভাগ পেয়েছিল। কী অবিশ্বাস্য কাণ্ড একটা! ভারতীয় হয়ে বাংলাদেশের প্রতি উনার মতো এমন অদ্ভুত টান আমি এর আগে-পরে আর দেখিনি। শুধুমাত্র বাপের ভিটা ছিল এক সময়, এই কারণে যে এমন করে আরেকটা দেশকে এত ভালোবাসা যায়, তা না দেখলে আমিই হয়তো বিশ্বাস করতাম না। এই মানুষগুলোকে আর পাওয়া যাবে না। এমন অদৃশ্য টানে এখনকার কেউ স্মরণ করবে বাংলাদেশকে? শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে আসছে দেখে, তার সাথে দেখা করতে অধীর হয়ে অপেক্ষা করবে এমন করে? আজকে তিনি মহাপ্রস্থান করলেন। সায়নদা, শঙ্খদাদাদের মা, কবি, লেখক শক্তি কর ভৌমিক চলে গেলেন!
আমার সাথে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। আমি বাংলাদেশের ছোট জেলা শেরপুরের একটা ছেলে। তিনি থাকেন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। আমি তো কোনো দিন যাইওনি কলকাতায়। কিন্তু সবই হলো, আমার কলকাতা যাওয়াও হলো আর তাঁর সাথে দেখাও হলো। আর এই সব হলো গুরুচণ্ডালীর মাধ্যমে।
গুরুতে লেখার সূত্রে নামে চিনত দু-একজন। তাই আমি যখন কলকাতায় ঘুরতে যাওয়ার চিন্তা করলাম, তখন ইপ্সিতাদিকে জানালাম যে আমার ভিসা হয়েছে, আমি কলকাতা যাব। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যাওয়ার পরে যেন তাঁকে জানাই। জানালাম। তিনিই সায়নদার নম্বর দিলেন। যোগাযোগ করলাম। এমন করেই একদিন আমি সায়নদাদের বাড়িতে। তখন পর্যন্ত আমার জানা নেই, সেখানে আমার জন্য আরও কেউ অপেক্ষা করছে।
আমি বাংলাদেশ থেকে আসছি জেনে সায়নদার মা আমার সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করে বসে ছিলেন। নিজেই রান্না করেছেন। অসুস্থ শরীরে এই যে উনার ব্যাকুলতা, এই রহস্যের সমাধান হলো পরে, তাঁর বাবার বাড়ি ছিল বাংলাদেশে! কিশোরগঞ্জের লোক তাঁরা! আমাদের এই আড্ডায় ইমানুল হক ভাইও ছিলেন। সব মিলিয়ে আমি যেন জাদুবস্তবতার কোনো জগতে ঢুকে গিয়েছিলাম।
মাসিমা কিশোরগঞ্জের নানান গল্প শোনালেন। তাঁর বাবার বাড়ির গল্প, ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পরে তিনি যে ফেসবুকে এখন কিশোরগঞ্জের নানান লোকের সাথে পরিচিত হয়েছেন, সেখানের গল্প, ছবি দেখছেন—এগুলোও উঠে এল গল্পে গল্পে। আমি হাওরে ঘুরতে যাওয়ার গল্প বললাম, বললাম আমার দেখা কিশোরগঞ্জের গল্প। তিনি সেগুলো সব শুনলেন।
কাঁটাতারের সীমানা এই টান কী দিয়ে বাঁধবে? আছে এমন কোনো শক্তি? আমি সেদিন যেন নতুন করে জানলাম অনেক কিছু। দেশভাগ নামক ফাইজলামির ভিন্ন রূপ। এই টান, এই প্রেম বাংলাদেশে দেখা যায় না। দেশভাগের ক্ষত তো একতরফা না। কিন্তু কেন জানি সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে একা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, যারা বা যাদের পরিবার পূর্ববঙ্গ থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে গেছিল ওই পাশে।
আমার খুব কাছের বন্ধুর পরিবার আসছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। ওদেরকে দেখেছি কোনো আগ্রহই নেই এইসবে কথা বলার। কয়েক পুরুষ না, ওর বাবাই এসেছে ওই পাশ থেকে। অথচ ওরা কেউ জানে না কোনো জেলা, কোনো থানা ইত্যাদি। ওদের ফুফু, ফুফাতো ভাই-বোনেরা এখনো পশ্চিমবঙ্গেই থাকে। হয়তো ইদে-চান্দেও কথা হয়। কিন্তু তাঁদের আর কোনো খোঁজ জানে না। আমি রীতিমতো খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে বের করার চেষ্টা করেছি, কোনো জায়গায় বলেন? এর পরে আমি যাব, বলেন কোথায়? ওর বাবা যতটুকু মনে আছে বলে, ওইটা আবার গুগলে খুঁজে পাই না। পরে বলল, কাজিনদের সাথে কথা বলে জানাবে কই থাকে তাঁরা!
এই ঘটনা বললাম উদাহরণ দেওয়ার জন্য। এমনই সব। আজীবন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা লোকজন তাঁদের ভিটা হারানোর কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে, আড়াল করেছে, পারলে অস্বীকার করেছে। আমি এমন পরিবেশ দেখেই বড় হয়েছি। সেইখানে মাসিমার পূর্বপুরুষ বাংলাদেশি ছিল, শুধুমাত্র এই কারণে আমার মতো একজনের জন্য অমন করে অপেক্ষা করা, অমন করে গল্প বলা—এগুলো আমার জন্য নতুন ছিল, অবিশ্বাস্য ছিল।
আরেকটা জিনিস আমার জানা ছিল না। তা হলো ত্রিপুরার ভাষা যে অনেকটাই আমাদের বাংলাদেশের মতো, এইটাও আমার জানা ছিল না। ভাষার ধাক্কাটা বেশ চমকপ্রদ ছিল। আমি তাঁদের বাড়িতে ঢোকার আগেই রাস্তাতেই সায়নদার সাথে দেখা হয়। সেখান থেকেই এই ধাক্কা শুরু। আমি অবাক হচ্ছি, আরে, এরা আমাদের মতো কথা বলে কেন? কাহিনি কী? পরে এই রহস্যও উদ্ঘাটন হলো। জানলাম ত্রিপুরার ভাষা আমাদের মতোই। আর উনারা হচ্ছেন ত্রিপুরার লোক! তাঁদেরও ট্যাক্সি-বাসে লোকজন বাঙাল বলে মনে করে!
তো অদ্ভুত টানে মাসিমা টুকটুক করে আমার সাথে যে গল্প করছিলেন, তা আমার এখনো কানে বাজছে। তিনি চলে গেলেন। এমন রহস্যময় টান অনুভব করা মানুষ ধীরে ধীরেই কমে আসছে। পরের প্রজন্ম, তাদের পরের প্রজন্ম কোনো দিন এমন টান অনুভব করবে না।
উনি লেখক, তাঁর বই আছে—এগুলো আমি তখন জানতাম না। সায়নদাদের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দাদা আমার হাতে একটা বই ধরাই দিয়েছিল। আমি ব্যাগে নিয়ে চলে আসছি। পরে দেখি মাসিমার লেখা গুরুচণ্ডালী প্রকাশনীর বই—৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড। বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বুঝলাম এইটা উনার স্মৃতিকথামূলক লেখা। এর পরে আমার নানা বইয়ের ভিড়ে, বইয়ের পড়ার তালিকায় কই জানি পড়ে ছিল বইটা। হুট করে হাতে এল আবার। পড়া শুরু করে দিলাম।
আমি মাসিমার পাশে বসে, উনার কথা বলতে সমস্যা হচ্ছিল, তার মধ্যেও উনি যে টুকটুক করে কথা বলছিলেন, তা শুনছিলাম। বই পড়ে বারবার মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন তিনি সেই একই রকম মিষ্টি করে গল্প বলে যাচ্ছেন আমাকে। গল্পগুলো এত চমৎকার করে বর্ণনা করা হয়েছে যে আমি যেন কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। লেখায় সায়নদা, শঙ্খদার কথা এসেছে, আমার আরও বেশি করে আনন্দ হচ্ছিল তখন। আমি এঁদেরকে চিনি, এই লেখকের সাথে আমার কথা হয়েছে, আমি শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি বলে উনি পরম মমতায় আমার সাথে গল্প করেছেন। তিনি ঠিক এমন করেই গল্প বলেন—এইটা আমার কাছে অনন্য এক অভিজ্ঞতা।
বইয়ে মাসিমার জীবনের গল্পের সাথে সাথে চলে আসছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প, দেশভাগের গল্প। এসেছে উনার বাবার বাড়ি কিশোরগঞ্জের গল্প, অষ্টগ্রামের গল্প। আহ, দেশভাগ! আসামের বাঙাল খেদা আন্দোলনের গল্পও ছুঁয়ে গেছেন রোমহর্ষক এক গল্পে। আমার কাছে অতি আশ্চর্য লাগছে ত্রিপুরায় কেরপূজার গল্প পড়ে।
আমি তত দিনে মাসিমার ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়ে গেছি। উনার বইটার ছোট্ট রিভিউ লিখেছিলাম, ওইটা তিনি শেয়ার দিয়েছিলেন। পূজায়, ইদে, নববর্ষে মেসেঞ্জারে শুভেচ্ছা বিনিময় হতো। এর মধ্যে গুরুচণ্ডালী থেকে আমার বই বের হলো। আমাকে লিখলেন, বইটা পড়েছি, একটা রিভিউ লিখি? আমি বললাম, আরে অবশ্যই লিখেন, এইটা আবার জিজ্ঞেস করছেন? আমি আমার ওয়ালে তাঁর লেখা রিভিউ শেয়ার দিলাম। গত বছর যখন কলকাতা গিয়েছিলাম, তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ করতে পারিনি। পরে মেসেজ দিয়েছিলাম যে গেলাম কিন্তু আপনার সাথে দেখা করতে পারলাম না। তিনি লিখলেন—"আমার অসুখটা বেড়েই চলেছে, সারবে তো না।। কষ্ট পাচ্ছি। তুমি ভালো থেকো। কোলকাতা এলে এসো।" এই শেষ, এর পরে আমার আর মেসেজের উত্তর আসে নাই। আমি বুঝছিলাম উনি হয়তো খুবই অসুস্থ। আর এখন তো চলেই গেলেন!
এখন যখন তিনি নেই আমাদের মাঝে, তখন বারবার মনে হচ্ছে এই সব কথাই। খুব অল্প সময়ের জন্য তাঁকে পেয়ে আমি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে বোঝাই যাচ্ছে তাঁর কাছের লোকজনের কী অবস্থা এখন। তাদেরকে শোক সইবার শক্তি চাওয়ার প্রার্থনা করা ছাড়া এখন আর কিছু করার নাই। মাসিমা যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক—এইটাই চাওয়া।