

ছবি: রমিত
মাসীমার সঙ্গে আমার একটা অসমবয়েসী বন্ধুত্ব ছিল। যখন দেশে যেতাম, মন চাইত একবার মাসীমার কাছ থেকে ঘুরে আসি। শেষের দিকে শরীর মোটেই ভালো থাকত না। কিন্তু তাঁর মধ্যে এক আশ্চর্য আলোকময় জীবনীশক্তি ছিল। সেই আলোটুকু পাশে যে বসত, তার মধ্যেও যেন সঞ্চারিত হত। খুব আনন্দ নিয়ে ফিরতাম।
আমরা গেলে খুব খুশি হতেন মাসীমা। সেবার শরীরে আরেকটু সক্ষমতা ছিল। গিয়ে দেখলাম, মাসীমা তাঁর বসার ঘরটাতে - যেখান থেকে অঢেল সবুজ দেখা যেত - শাড়ি পরে পরিপাটি হয়ে বসে আছেন। বললেন, “তোমরা আসবে বলে আজ শাড়ি পরেছি।” পরে আর শাড়ি পরতে পারতেন না। কিন্তু পরিপাটি থাকতেন।
আমি একটু ফুল নিয়ে যেতাম। বৈদ্যবাটি থেকে গেলে বাড়ির গাছের চাঁপাফুল, কলকাতা থেকে গেলে কেনা ফুল। একবার মাসীমা বললেন, এই ফুল শিশিতে ভরে রেখে দেবেন - অনেক দিন গন্ধ থাকবে। এমন কত রকম আইডিয়া আসত ওঁর মাথায়।
শঙ্খদার সঙ্গে প্রতিবার দেখা হত না। কিন্তু লালিদি চলে আসত। লালিদির ওপর ছিল আমাদের খাওয়ানোর ভার। মাসীমা সামনে বসে তদারক করতেন। এ বছর জানুয়ারি মাসে যখন গেলাম, মাসীমা নিজের রেসিপিতে রান্নার মেয়েটিকে দিয়ে পালংশাকের লুচি বানিয়ে রেখেছিলেন। আমরা সবুজ রঙের ফুলকো লুচি খাচ্ছি দেখে মাসীমার কী আনন্দ!
অত্যন্ত ভালো স্মৃতিশক্তি ছিল। রহস্যে মোড়া ছবিমুড়া পাহাড়ের কথা মাসীমার লেখাতেই প্রথম জেনেছিলাম। সাক্ষাতেও সেসব জায়গার গল্প বলতেন। ভালোবাসতেন আমাদের বেড়ানোর গল্প শুনতে। আমাদের মেরুজ্যোতি দেখার অভিজ্ঞতা ওঁকে বিশেষ করে স্পর্শ করেছিল। অনেকবার তুলেছেন সে প্রসঙ্গ। এক সময় চৈতন্যের মৃত্যুরহস্য নিয়ে উপর্যুপরি লেখা বেরোচ্ছিল। মাসীমার কাছে বিরক্ত হয়ে বললাম, মৃত্যু নয়, জীবনটা জানতে চাই। উনি বললেন, শিশির কুমার ঘোষের অমিয় নিমাইচরিত পড়তে। বই কেনা হয়েছে। পড়া হয়নি এখনও।
মাসীমার অল্প বয়সের ছবিতে দেখেছি, ভারী সুন্দর সাজতেন। সে কথা বললে খুশিও হতেন। আমায় একবার লাহুল-স্পিতি থেকে আনা একছড়া মধু-রঙের স্ফটিকের মালা ও দুল উপহার দিলেন। বললেন - তুলায় মুড়ে রেখো, তাহলে পাথরগুলি উজ্জ্বল থাকবে। বহুদিন ফেলে রাখার পরে এবছর সরস্বতীপুজোর দিন ওই মালা আর দুল পরে ছবি পাঠালাম। ভাগ্যিস আরও দেরি করিনি।
মাসীমার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মন ছিল। তিনি ছিলেন খুব মনোযোগী পাঠক। এমন অনেক কিছু দেখতে পেতেন, যা অসতর্ক পাঠক সহজেই উপেক্ষা করে যায়। গুরুচণ্ডালীতে আমি মাতৃত্ব বিষয়ক একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। মাসীমা বলেছিলেন, আমার লেখার মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম যুক্তি হল নিজের সন্তানের নিরাপদ ও সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনের জন্য তাকে অধিকাংশের থেকে বিচ্ছিন্ন করে বড় করার অনীহা। বাস্তবিক, এটাই আমার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব ছিল। প্রতিটি শিশুর সমানাধিকারে বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের শিশুটির বিশেষ অধিকারকে - যা শুধু মাতৃস্নেহে সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিপালনের তারতম্যেও বিস্তৃত - আমি সহাবস্থানে রাখতে পারিনি। মাসীমা আমার সঙ্গে সহমত হতে পেরেছিলেন কি না জানি না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই; কিন্তু আমার দ্বন্দ্বটিকে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
৪৬ হরিগঙ্গা বসাক লেন আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি বই। তার মধ্যে বিশেষ প্রিয় “আমার বাবার বাড়ি” অধ্যায়টি। লেখাটি শুধুমাত্র তাঁর বাবার ছোটবেলায় ফেলে আসা অষ্টগ্রামের স্মৃতিচারণায় সিক্ত নয়; দেশ ও মানুষ সম্পর্কে এক আশ্চর্য বোধের জন্ম দেয়। প্রতিটি মানুষের এই লেখাটি পড়া উচিত বলে মনে করি। গুরুচণ্ডালীর গল্পপাঠের আসরে আমি এটি পাঠ করেছিলাম। কিন্তু সে সময় আমার ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যারটা এক্সপায়ার করে গিয়েছিল। যে দীর্ঘ যতিগুলো বাদ দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো গুরুর গল্পপাঠের টিমেরও নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। এবারে কিছুটা মেরামত করে নিজেই ইউটিউবে তুললাম। আমি বাচিকশিল্পী নই। স্বরক্ষেপণে, বিশেষ করে অন্তঃস্বরে, ত্রুটি আছে। দীর্ঘ পাঠের অভ্যাস না থাকার কারণে জিভ জড়িয়ে গেছে কিছু জায়গায়। বলা যায়, নিজেই বারবার শোনার জন্য রেকর্ড করে রাখা। শেষের দিকে মাসীমা খুবই অসুস্থ ছিলেন। শুনেছিলেন কি না জানি না।
বাড়ি গিয়ে যাঁদের সঙ্গে দেখা করতাম, সেই তালিকায় একটা নাম কমে গেল। পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পর মানুষের নিজস্ব পথ আর কিছু থাকে বলে প্রমাণ পাইনি। মানুষ বেঁচে থাকে স্মৃতিতে। তর্পণে।
শারীরিক কষ্ট ছিল, মেসোমশাই চলে যাওয়ার পর ছিল মানসিক শূন্যতাও। তবু মাসীমা ছিলেন এক আনন্দময় মানুষ। দুঃখ-সুখের ওপারে জগতের চিরন্তন মাধুর্যে তাঁর আস্থা ছিল। তাঁর লেখায়, তাঁর সান্নিধ্যে সেই মাধুর্যের ছোঁয়া পাওয়া যেত। বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই অমর স্তোত্র দিয়ে শেষ করি -
“ওঁ মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ। মাধ্বীর্নঃ সন্তোষধীঃ।
মধু নক্তম্ উতোষসো মধুমৎ পার্থিবং রজঃ মধু দ্যৌরস্তু নঃ পিতা।
মধুমান্নো বনস্পতির্মধুমাং অস্তু সূর্যঃ। মাধ্বীর্গাবো ভবন্তু নঃ।”
“বায়ু মধুবহন করিতেছে। সমুদ্রসকল মধুক্ষরণ করিতেছে।
ওষধিরা আমাদের পক্ষে মাধ্বী হউক, রাত্রি এবং উষা আমাদের পক্ষে মধু হউক, পৃথিবীর ধূলি আমাদের পক্ষে মধুমান হউক, এই-যে আকাশ পিতার ন্যায় সমস্ত জগৎকে ধারণ করিয়া আছে ইহা আমাদের পক্ষে মধু হউক, বনস্পতি আমাদের পক্ষে মধুমান হউক, সূর্য মধুমান হউক এবং গাভীরা আমাদের জন্য মাধ্বী হউক।”
—অনুবাদ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর