

ছবি: রমিত
শক্তি মাসিমাকে আমি কিভাবে চিনি? ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছে, কিন্তু সে চেনা চোখের চেনা। মনের চেনা হয়েছিল তাঁর লেখার মাধ্যমে। প্রথম পড়েছিলাম বোধহয়, পাত্থর - গুরুর পাতায়। তিনি লিখেছিলেন,
"নদীর কিনারে বন্যার জলে কোন মন্দিরের পাঠের সিঁড়িটা ভেসে এসে ইকরা গাছের ঝোপে আটকে গেছিল। ওটাই কাপড় কাচার পাট। এখানে বাগানের ধোপাও কাপড় কাচে। ওর মধ্যেই খোদাই করা কোন ঠাকুর - হাতে একটা চাকা, একটা পদ্মফুলের কলি - কোন ঠাকুর কে জানে, তবে দয়ামায়া আছে। এই যে কলাকুচি বস্তির সব কাপড় আছড়ে আছড়ে কাচে সবাই - দেবতা কিন্তু পাপ দেয় না। কোথায় কাচত না হলে এরা? দুপাড়ে শুধু কাদা মাটি, বড় বড় ঘাস, কাঁটাগাছ। তা মানে না তা নয়। কাচার আগে কপালে হাত ঠেকায়, কাচা হয়ে গেলে স্নান করে। দুটি লালপাতিয়ার লাল সাদা পাপড়ি ছিঁড়ে ঠাকুরের নূপুর পরা পাথরের পায়ে দেয়। নমন করে।"
ভাল লেগে গিয়েছিল। এই যে একটা সহজ গ্রামীণ দেব মানবের মিথোজীবিতার জীবন, এই ছবি কলমে তোলা কিন্তু খুব সহজ নয়। মনে হয়েছিল, এই মানুষটির জীবনের অভিজ্ঞতা হয়ত অন্য রকমের।
পরে ওঁর বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে জেনেছিলাম, সেটাই সত্যি। মাসিমা একদিকে যেমন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ‘বেলসিরি, ভরলি, গাব্রু নদির পাড় ধরে নাগকেশর, সূর্য্যমুখির সারি পেরিয়ে ধূপ গাছের আঠালো ধূপ’ সংগ্রহ করে এনেছেন, পরিচিত হয়েছেন চা বাগানের জীবনের সঙ্গে, অন্যদিকে মাতামহের সূত্রে আগরতলার অগ্রণী সমাজের কোলে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর পরিণত জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন ত্রিপুরার সারস্বত জীবনের অংশ। পাশাপাশি শিক্ষকতার জীবন ওঁকে ঋজুতা দিয়েছে। আর সর্ব অভিজ্ঞতার থেকে বিন্দু বিন্দু অমৃত আহরণ করে উনি হয়ে উঠেছেন অনন্যা শক্তি। এক উদার সংস্কৃতিমনস্ক বাঙ্গালিয়ানার উত্তরাধিকারী।
যখন মুখোমুখি আলাপ হয়েছে তাঁর সঙ্গে, ততদিনে তাঁর জীবনে অপরাহ্ণের আলো নেমেছে। তবু সতেজ ও দৃঢ় মনটিকে স্পষ্ট চিনে নেওয়া যেত। জীবন ওঁর অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে অনেক রং বেরং এর নুড়িপাথর জোগাড় করে দিয়েছিল। আর সেই সঙ্গে দিয়েছিল একজোড়া অনাবিল চোখ। তাই পাথরের গায়ে প্রভাতী সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে যে ঝিলিক বেরোয়, সেই ঝিলিক তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন কলমের আঁচড়ে। ওঁর শেষতম গল্প সংকলন “পিরোবতী ও মুড়ির টিন” বইয়ের দশটি গল্প এই কারণেই মন কাড়ে। পাত্থর গল্পটিও এই বইতে রয়েছে।
মাসিমা লিখেছিলেন-
“ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কাজ সাঙ্গ হবে
ভুলে যাবো প্রিয় কবিতার পংক্তি
মনে থাকবে না প্রিয় মানুষের নাম
ভুলে যাবো কবিতা লিখতাম।
এই শাস্তির আগে ছুটি দিয়ে দাও।
তোমাকে ঈশ্বর ভেবেছি আমরা
শ্রেণি কক্ষে শুনেছি অনেক উপদেশ
সব ঠিকঠাক ছিল কিনা এখনো সংশয়।
কিন্তু তোমার সৃষ্টির মহিমা মেনেছি নিশ্চয়
ভালোবেসে ষড়ঋতু গেয়েছি প্রচুর গান।
কিছু পুণ্য হয়নি সঞ্চয়?
কবিতা ভোলার আগে "শ্যামসমান" দেখা দিও--
"বহুত মিনতি করি তোয়"।--মাধব অনেক প্রার্থনা।”
(মাসিমার ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত )
ঈশ্বরবিশ্বাসী হলে ভাবতে পারতাম, মাধব তাঁর মিনতি শুনলেন! কিন্তু তা তো নই। বরং তাঁর লেখা বইগুলোর পাতা ওল্টাই, টুকরো টুকরো শক্তি দত্তরায় লুকিয়ে আছেন ওইখানেই।