এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মোগলাই কিতাব

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ আগস্ট ২০২৬ | ৯ বার পঠিত
  • মুঘল আমলে প্রায় সব বইপত্র-ই মূলত হাতে লেখা হতো এবং লেখার মাধ্যম ছিল প্রধানত কাগজ। তবে কাগজই একমাত্র মাধ্যম ছিল না।

    কী কী জিনিসে লেখা হতো?

    ১. কাগজ — সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
    মুঘল যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে কাগজের ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
    তুলো, পুরনো কাপড়ের তন্তু ইত্যাদি থেকে তৈরি উন্নতমানের হাতে-তৈরি কাগজ ব্যবহৃত হতো।
    রাজদরবারের পাণ্ডুলিপিতে কখনও অত্যন্ত মসৃণ ও দামি কাগজ ব্যবহার করা হতো।
    ফারসি, আরবি, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষার গ্রন্থ কাগজে লেখা হয়েছে।

    ২. তালপাতা। কাগজের পাশাপাশি বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে তালপাতায় পুঁথি লেখার ঐতিহ্য ছিল। তবে মুঘল দরবারের ফারসি গ্রন্থে কাগজই বেশি প্রচলিত।

    ৩. কাপড় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ধর্মীয়/আচার সংক্রান্ত লেখায় কাপড়ও ব্যবহার করা হতো, যদিও বই লেখার প্রধান মাধ্যম ছিল না।

    ৪. পাথর ও ধাতু শিলালিপি, স্মারক বা স্থায়ী ঘোষণার ক্ষেত্রে পাথর ও ধাতুতে লেখা হতো। এগুলো অবশ্য সাধারণ বইয়ের বিকল্প ছিল না।

    ৫. আর কলম?
    তখনকার লেখকরা সাধারণত খাগের কলম (reed pen) ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে ফারসি ক্যালিগ্রাফিতে কলমের নিব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাটা হতো।

    কালি তৈরি করা হতো বিভিন্ন উপাদান দিয়ে—যেমন কালো কালি, গাছের নির্যাস, গলনশীল পদার্থ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান। রাজকীয় পাণ্ডুলিপিতে সোনা-রুপোর রঙও ব্যবহার করা হতো।
    একটা মজার ব্যাপার হলো—মুঘল আমলে ছাপাখানায় বই ছাপা সাধারণ ব্যাপার ছিল না। একটি বইয়ের একাধিক কপি তৈরি করতে হলে লেখক বা পেশাদার নকলনবিশকে বসে হাতে কপি করতে হতো। ফলে একটি সুন্দর রাজকীয় পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে অনেক সময় ও দক্ষতা লাগত।

    মুঘল আমলের একটি রাজকীয় পাণ্ডুলিপি কীভাবে তৈরি হতো? ধাপে ধাপে নিম্নে উল্লেখ রইল....

    ১. কাগজ তৈরি :-
    পুরনো কাপড় বা তুলোর তন্তু ভিজিয়ে নরম করে পাল্প বানানো হতো। সেই পাল্প ছাঁচে ছড়িয়ে পাতলা স্তর তৈরি করে শুকানো হতো। পরে পাথর বা মসৃণ যন্ত্র দিয়ে ঘষে কাগজকে মসৃণ ও চকচকে করা হতো।

    ২. লেখার জন্য পাতা প্রস্তুত :-
    পাতায় সরাসরি লেখা শুরু করা হতো না। পাতার চারদিকে মার্জিন রেখে লেখার ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা হতো। কখনও সূক্ষ্ম রেখা টেনে দেওয়া হতো, যাতে লেখা একেবারে সোজা থাকে।

    ৩. ক্যালিগ্রাফার লিখতেন :-
    বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নস্তালিক বা অন্যান্য ফারসি লিপির ক্যালিগ্রাফার খাগের কলম দিয়ে লেখা লিখতেন।
    রাজদরবারে একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফারের কাজের মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।

    ৪. ছবি ও অলংকরণ :-
    রাজকীয় গ্রন্থ হলে আলাদা শিল্পীরা ছবির কাজ করতেন।
    যেমন—
    • সম্রাটের দরবার
    • যুদ্ধ
    • শিকার
    • রাজপরিবার
    • ঐতিহাসিক ঘটনা

    ছবিতে খনিজ ও উদ্ভিদজাত রং এবং কখনও সোনা-রুপোর গুঁড়ো ব্যবহার করা হতো।

    ৫. পৃষ্ঠাগুলো সাজানো :-
    লেখা ও ছবি সম্পূর্ণ হলে পাতাগুলো নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো হতো। চারপাশের অলংকৃত বর্ডারও করা হতো।

    ৬. বাঁধাই :-
    সবশেষে পৃষ্ঠাগুলো একত্র করে চামড়া বা কাপড়ে মোড়া শক্ত মলাটে বাঁধাই করা হতো। দামি রাজকীয় পাণ্ডুলিপির মলাটও অত্যন্ত শিল্পসম্মত হতে পারত।
    অর্থাৎ একটি মুঘল রাজকীয় বই আসলে একজন লেখকের তৈরি জিনিস ছিল না—কাগজ প্রস্তুতকারী, ক্যালিগ্রাফার, চিত্রশিল্পী, অলংকরণ শিল্পী এবং বাঁধাইকার—অনেক মানুষের সম্মিলিত কাজ ছিল।
    আর একটা বিষয় খুব আকর্ষণীয়: আকবরের আমলে রাজদরবারে বিশাল একটি পাণ্ডুলিপি-কারখানা বা কিতাবখানা ছিল, যেখানে এ ধরনের বই তৈরি হতো।

    আকবরের সময়কার রাজদরবারের “কিতাবখানা” আসলে শুধু বই রাখার লাইব্রেরি ছিল না—এটি ছিল এক ধরনের রাজকীয় প্রকাশনা ও শিল্পকেন্দ্র।

    কিতাবখানায় কারা কাজ করতেন?
    একটি বড় গ্রন্থ তৈরিতে একাধিক বিশেষজ্ঞ যুক্ত থাকতেন—

    ১. পাণ্ডুলিপি-লেখক (কাতিব) :-
    মূল লেখাটি সুন্দর হস্তাক্ষরে কাগজে লিখতেন। একটি বড় গ্রন্থের শত শত পৃষ্ঠা হলে একাধিক কাতিব একসঙ্গে কাজ করতেন।

    ২. চিত্রশিল্পী :-
    লেখা শেষ হওয়ার পরে নির্দিষ্ট জায়গায় ক্ষুদ্রাকৃতির ছবি বা মিনিয়েচার আঁকতেন।

    ৩. রং প্রস্তুতকারী :-
    প্রাকৃতিক উপাদান থেকে রং তৈরি করতেন। নীল, লাল, হলুদ, সবুজের পাশাপাশি সোনা-রুপোর রংও ব্যবহৃত হতো।

    ৪. মুজাহহিব বা অলংকরণ শিল্পী :-
    পাতার চারপাশের বর্ডার, ফুল-লতা, সোনালি নকশা ইত্যাদি তৈরি করতেন।

    ৫. মুজাল্লিদ বা বাঁধাইকারী :-
    সব পাতা একত্র করে বই বাঁধতেন এবং অলংকৃত মলাট তৈরি করতেন।

    ৬. পণ্ডিত ও অনুবাদক :-
    আকবরের সময় সংস্কৃত, হিন্দি ইত্যাদি ভাষার বহু গ্রন্থ ফারসিতে অনুবাদ করা হয়েছিল। মহাভারত-এর ফারসি অনুবাদ রজমনামা তার বিখ্যাত উদাহরণ।

    একটি বই বানাতে কত সময় লাগত?
    এটার নির্দিষ্ট একটা সময় ছিল না। ছোট পাণ্ডুলিপি তুলনামূলক দ্রুত তৈরি হতে পারত, কিন্তু বহু পৃষ্ঠা, অসংখ্য মিনিয়েচার এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম অলংকরণযুক্ত রাজকীয় গ্রন্থ তৈরি হতে কয়েক বছরও লাগত।
    এর একটি অসাধারণ উদাহরণ আকবরনামা। এর মতো বিশাল গ্রন্থে শুধু লেখা নয়, বিপুল সংখ্যক চিত্রও তৈরি করা হয়েছিল।

    আর সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হল,
    একটি বইয়ের একই পাতায় লেখা এবং ছবি একই সময়ে তৈরি হতো না। প্রথমে ক্যালিগ্রাফার লেখা তৈরি করতেন, তারপর শিল্পীরা নির্দিষ্ট অংশে ছবি আঁকতেন এবং শেষে অলংকরণ ও বাঁধাই হতো।
    অর্থাৎ আজকের ভাষায় বললে, আকবরের কিতাবখানা ছিল অনেকটা—
    Writer + Editor/Translator + Calligrapher + Illustrator + Graphic Designer + Bookbinder = এক বিশাল রাজকীয় প্রকাশনা সংস্থা।
    আর আকবরের আমলের রজমনামা (ফারসি মহাভারত) কীভাবে তৈরি হয়েছিল, এবং তার পাতায় কৃষ্ণ, অর্জুন, ভীষ্মদের কীভাবে মুঘল শিল্পীরা এঁকেছিলেন, সেটা আরও চমৎকার ইতিহাস।

    ___________
    ©রজত দাস
     
    তথ্যসূত্র -
    মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস — যদুনাথ সরকার।
    আকবর — বিনয় ঘোষ।
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন