এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • অণুগল্প -- দূরত্ব 

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত
  • অণুগল্প – দূরত্ব


    সকাল সাড়ে সাতটা

    বাড়ির সামনের বাঁধানো চাতালটায় শুয়ে আছে সুরমা। তাঁকে ঘিরে রেখেছে প্রতিবেশিনী জনা কয়েক মহিলা। তাঁদের কেউ কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা সুরমার মাথার কাছে বসে আছে। সকলেই শোকার্ত।তাঁদের মুখে আজ একটু অন্যরকম গল্প। রোজকারের পি এন পি সি র খ‌ই ফুটছে না। অন্যদিন হলে সুরমাও তাতে ভাগ নিয়ে গলা মেলাতো। আজ এখন অবশ্য সে নির্বাক। সমবেত ভিড়ের মধ্য থেকে চৌধুরী গিন্নি বলে উঠলো –

    – ভালো দিনেই বিদায় নিলো সুরমা। আজ অনন্ত চতুর্দশী।
    – ওমা! তাই? তাহলে তো পুণ্যবতী বলতে হবে।
    – সুরমা এসবের ধার ধারতো নাকি কোনোদিন ?
    – এখন তো আমাদেরকেই এসব নিয়ে ভাবতে হবে। তাইনা..
    – বড়ো আর মেজো ছেলে কি এসেছে?
    – না এখনও এসে পৌঁছয় নি। এলে একটু হৈচৈ হতো। উত্তেজনা
    – তা সাতসকালেই সুরমা মাসিমাকে বাইরে এনে রাখলো কে?
    – আর বলোনা। ছোটো ব‌উটা অমন ফটর ফটর করলে কি
    হবে? ভীষণ শুচিবাই গ্রস্ত। ওই তো বাইরে শোয়ানোর বুদ্ধি
    দিয়েছে। ঘরে থাকলে নাকি অকল্যাণ হবে। যতো সব কাণ্ড।
    – এখন সুরমা দির কাছে ঘর বার দুইই সমান। এ নিয়ে তক্কো
    করে কি লাভ?

    সুরমার ছোটোছেলে ছোটন বাইরে আসে কানে ফোন ঠেকিয়ে কথা বলতে বলতে।
    – হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, আমি ছোটন বলছিলাম। মা তো আজ
    সকালে মারা গেছে। আপনাকে একবার আসতে হবে মাকে
    দেখে ওই ডেথ সার্টিফিকেটটা দিতে হবে তো। ….

    মার ছবি ভিডিও কল করে আপনাকে দেখাবো? ওখান থেকে
    দেখলে হবে? আচ্ছা! আপনি লাইনে থাকুন, আমি কল
    করছি।

    ছোটন মায়ের পাশে বসে। ফোনের ক্যামেরা মায়ের মুখের ওপর ধরে। চোখের বুজে যাওয়া পাতা টেনে ধরে ডাক্তারবাবুকে দেখায়। না! কোথাও প্রাণের সাড়া মেলেনা। ওপার থেকে ডাক্তারবাবু নিশ্চিত হন। ছোটনকে বলেন –
    – মায়ের নাম, তোমার বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা, মায়ের
    বয়স সব ঠিকঠাক করে লিখে নিয়ে এসো। ওগুলো লাগবে,
    আর শোনো সার্টিফিকেটের জন্য আমাকে দু হাজার টাকা
    দিতে হবে।
    টাকার কথা শুনে ছোটোন কিছু বলতে যায়। পাশে থাকা তপন ওকে চুপ থাকতে বলে।

    সকাল সাড়ে দশটা

    সুরমাকে ঘিরে থাকা ভিড়টা এখন খানিকটা পাতলা হয়ে গেছে। সকালে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই ঘরের কাজ সেরে আসতে গেছেন। নতুন কিছু মানুষ এসেছেন বটে তবে তারা ছোটনকে সান্ত্বনা দিয়ে পড়ে আসবেন বলে চলে গেছেন। দুই দাদারা কেউই এখনও এসে পৌঁছায়নি। ফোন করে র‌ওনা দেবার কথা জানিয়েছে মাত্র। ছোটনকে একটু বিমনা লাগে। শত হলেও মা। ছোটোদের ওপর মায়েদের একটু বাড়তি টান থাকে, মায়ের অনেক প্রশ্রয় থাকে। সেই সব কথা একটু একটু করে মনের ভেতর পাক দিতে থাকে। দাদাদের অনুপস্থিতিতে সবটাই তাকে সামলাতে হচ্ছে। মনে মনে একটু রাগ হলেও মুখে কিছু বলেনা।

    – হ্যাঁরে ছোটন? মা কোনো দোষ পায়নি তো? দেখে নিস্।
    – কাকিমার বয়স কত হয়েছিল রে? আশির ওপরে বটেই।
    – এই বয়সেও দিদি খাটতে পারতো খুব। বসে থাকতে চাইতো
    না। খালি ভাগের মা হয়ে এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে ঘুরে থাকাটা
    একদম পছন্দ করতো না।
    – কি আর করা যাবে? এ সময়ের এটাই নিয়ম। তবে কাকিমা
    এখানে থাকতেই পছন্দ করতো। শত হলেও স্বামীর ভিটে।
    এর ওপর অন্য রকম মায়া!
    – কোন্ শ্মশানে নিয়ে যাবি? নিমতলা? না কাশী মিত্তির ঘাট।
    – নিমতলাই ভালো। অনেক চুল্লি বাড়িয়েছে। আমি গত মাসে
    দেখে এসেছি।

    ছোটন চুপচাপ বসে বসে এসব কথা শুনছিল তবে কোনো কথাই যেন কানে ঢুকছিলো না। তপন আর শানু ছোটনের ছেলেবেলার বন্ধু। ওরাই সব ব্যবস্থা করছে। লোকাল কাউন্সিলরকে বলে মিউনিসিপ্যালিটির কাঁচে ঘেরা শববাহী গাড়ির ব্যবস্থা করেছে তপন। দাদারা কেউই এখনও এসে পৌঁছায়নি। কতটুকুই বা দূরত্ব! আসলে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের দূরত্বটা অনেক বেড়ে গেছে। এটা বুঝতে পেরে ছোটন আরও চুপ হয়ে যায়।


    বেলা দেড়টা

    সরমা এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কাঁচে ঘেরা গাড়ির ভেতরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ভিড় এখন গাড়িকে ঘিরে। এতোদিনের সংসার ছেড়ে সুরমা আজ শেষ পাড়ানির খেয়াঘাটের যাত্রিনী। বড়ো আর মেজো ছেলেরা এতদূর ঠেঙিয়ে আসেনি। সব‌ই তো শেষ হয়ে গেছে। আর কি দেখতে আসবে তাঁরা ? ছোটনের কাছে ইউ পি আই করে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। বলেছে কেওড়াতলায় মাকে নিয়ে যেতে। ওদের গড়িয়ার ফ্ল্যাট থেকে ওটাই সবথেকে কাছে হবে। ওঁরা ওখানেই অপেক্ষা করবে। বড়দা লোকাল নেতাকে ধরে ভি আই পি চুল্লির ব্যবস্থা করেছে যাতে করে সুরমার শেষ কাজটা তাড়াতাড়ি মিটে যায়।

    – ছোটন, এবার তাহলে র‌ওনা দিতে হবে।
    – হ্যাঁ, দূরত্বটা আরও অনেকটাই বেড়ে গেল।

    ছোটোন মুখে কোনো কথা বলেনা। কেবল ঘাড় নাড়ে।

    সরমাকে নিয়ে সাদা রঙের গাড়িটা গলির বাঁকে হারিয়ে গেল।













     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ritabrata Gupta | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:১৬742857
  • মনটা খারাপ হয়ে গেল . এটাই রূঢ় বাস্তব . আমাদের সবাইকেই এর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে . জানি সবকিছুই . তাও মনটা আনমনা হয়ে যায় ! দারুন লিখেছেন . ভবিষ্যতটা সবারই জেনে রাখা প্রয়োজন !
  • কিঙ্কর দাস | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৩৩742862
  • গল্পকার পাঠকদের এক কঠিন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। উত্তর নেই আমার কাছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন।