দেখছি আমি চেয়ে ( পর্ব ১ )
গৃহনির্মাণ।
বছর দুয়েক আগে, বিকেল বেলায় বাড়ির পেছনের বাগানের আম গাছের ঘন পাতার ফাঁক ফোঁকরে ছয় ছোট্ট চেহারার কিছু পাখিকে কিচিরমিচির শব্দের ফোয়ারা ছুটিয়ে উড়ে বেড়াতে দেখেছিলাম। একে ছোট চেহারা, তার ওপর বিকেলের পড়ন্ত আলোআঁধারিতে এই অতিথিদের ঠিক মতো চিনে নেওয়া বেশ কঠিনই ছিল। আমাদের মধ্যে একটা সবজান্তা প্রবণতা আছে - ছোটো পাখি মানেই হলো টুনটুনি। কিন্তু কেবলমাত্র আকৃতি দেখে পাখিকে চিনতে গেলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। আমি তক্কে তক্কে রইলাম তাদের পুনরাগমনের প্রতীক্ষায়। দিন কয়েক ধরে আর তেনাদের দেখা নেই। বুঝলাম, নজরদারি করছি বলে ওরা হয়তো গতিবিধি বিলকুল পাল্টে ফেলেছে। অপেক্ষায় থাকতে হলো।
যেমন হঠাৎ করে তারা এসেছিল, তেমন হঠাৎ করেই তারা ফিরে এলো একদিন। বাড়ির সামনে ইলেকট্রিকের তারের ওপর সাদা কালোর মিশেলে গড়া শরীরের বেশ কয়েকটা পাখিকে বসে থাকতে দেখেই মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। আরে!এরা তো সেনারাই। আমার হারানিধিরা। কালচে রঙের ভারি ঠোঁট দেখেই বুঝলাম এরা সবাই মুনিয়া গোত্রীয়। তবে তখনো তাদের নাম গোত্র পরিচয় ঠিকঠাক জানা হয়ে ওঠেনি। অথচ আরও কিছু জানতে মনটা ভারি উশখুশ করছিল।
কী করি,কী করি ভাবতে ভাবতে, একটু রাত হতেই ফোন করলাম পরিচিত অনুজপ্রতিম এক পাখি প্রেমিককে। তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিস্তর প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। পাখির রঙ - মাথার, বুকের, পেটের। ঠোঁটের গড়ন নিয়েও চললো একরাশ প্রশ্ন ; বাকি রইলোনা লেজ প্রসঙ্গ, পায়ের রঙ বিষয়ক প্রশ্নও। কতক্ষন আগে বা কতদিন আগে তার দেখা পেয়েছি সেই খবরও প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। ঠান্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম যে নিজের শরীর রীতিমতো ঘামে ভিজে উঠেছে। বুঝলাম - ইহাকেই কহে জিজ্ঞাসাবাদ। সব উত্তর শুনে ওপার থেকে বন্ধুবর গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন - “সোমনাথ দা, সব বিবরণ শুনে মনে হচ্ছে ওগুলো শাঁখারী মুনিয়া। বাংলাদেশের মানুষজনের কাছে তাদের পরিচয় ধলাকোমর মুনিয়া, পেটের দিকটা ধলা বা সাদা বলেই এমন আজব নামকরণ।” অতিথিদের নাম ধাম জানার পর মনটা খুশিতে ভরে উঠতেই ফোনের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো ছবি - শাঁখারী থুরি ধলাকোমর মুনিয়ার ছবি। নীচে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা রয়েছে দেখলাম - WHITE RUMPD MUNIA ( Lonchura striata )। সেই শুরু। এখন তারা আমার নিত্যদিনের সঙ্গী।
রোজকার মতন,আজ সকালেই আবার তাদের সঙ্গে দেখা। ভীষণ ব্যস্ত। ওদের ডাক নকল করে বার কয়েক শিস্ দিলাম বটে, তবে সে সুর কানে ঢুকেছে বলে মনে হলোনা। খানিকটা অভিমান করে তাকিয়ে থাকতেই নজরে এলো – লম্বা লম্বা ফিনফিনে ঘাসের গোছা ঠোঁটে করে নিয়ে কর্তা গিন্নি উড়ে উড়ে বাড়ির সামনে থাকা উইপিং অশোক গাছের ঘন ঝোপালো অংশের মধ্যে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। বুঝলাম নতুন করে সরকারি অনুদান পেয়েছে তো, তাই বাসা বাঁধার তোড়জোড় শুরু করেছে। ভারি ভালো লাগলো। খানিকটা সময় পরে দেখি দুজনের একজনই কেবল ওড়াউড়ি করছে। বুঝলাম একজন শুকনো লম্বা ঘাসের টুকরোগুলোকে পরিপাটি করে গুছিয়ে গোলগাল চেহারার বাসা তৈরির কাজ করছে, আর অন্যজন হয়েছে জোগানদার। এক আশ্চর্য তালমিল, পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক। সকাল সকাল এমন দৃশ্য মনটাকে খুশিতে ভরিয়ে দিল।
পুজো আসছে। কয়েকদিন ধরেই গিন্নি লাগাতার তাড়া দিয়ে যাচ্ছেন ঘরদোর একটু সাফসুতরো করার কাজে হাত লাগানোর জন্য। নানান অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেছি সেই আবদার ( পড়ুন হুকুম)।
আজ সকালে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালায় চুমুক চড়াতে চড়াতে বললুম – চলো,আজ ঘরগুলো একটু ঝাড়পোছ করি। গিন্নি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চা পর্ব মিটিয়ে আমি উঠে পড়ি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।