এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ  স্মৃতিকথা

  • ব্যক্তিগত শোকপ্রস্তাব

    সায়ন কর ভৌমিক লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | স্মৃতিকথা | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২৪০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • এইসব একেবারেই ব্যক্তিগত কথা, নিজের জন্যই লেখা, মূলত চিন্তাভাবনাকে সংযত ও কিছুটা সংহত করার জন্য। এমনিতে, তাতে কী হবা, ঐ প্রশ্নটা আছে, কিন্তু ভাবতে গিয়ে দেখা গেল ঐ প্রশ্নটাই সবচে’ বড়, কী হবা। আবার এটা নিজের ব্যক্তিগত ডাইরিতে রাখলেই তো হয়, ছাপিয়েই বা কী হবা। একদিকে সেটা আজকালকার ইন্টারনেটে তাৎক্ষনিক ঢক্কানিনাদের বাতিকের আপদ, আবার নিতান্তই যদি জল ঘোলার ত'শিলদার খুঁজতে যাই, তবে মনে হয়, হতেও তো পারে অন্য কেউ বা অনেকে এরকম ভাবছে, দেখাই যাক না।

    তো, শোক কেন হয়, এইটা একটা কথা। মৃত্যুবিষয়ে পাঠ্য ভাবতে গেলেই আমার মনে পড়ে তারাপদ রায়ের চারাবাড়ি পোড়াবাড়ির মান্ধাই জ্যাঠার বেতের ধামা বাজিয়ে সে বড় একা যাচ্ছে। মৃত কি একা যায়? শ্মশান অনলদগ্ধোহসি পরিত্যক্তহসি বান্ধবৈঃ... - এই পদ্য শুনলে বুক মুচড়ে আসে,  ইদং নীরং, ইদং ক্ষীরং স্নাত্বা পীত্বা সুখী ভব- এই কামনা যে আকাশস্থ নিরালম্ববায়ুভূত নিরাশ্রয়, তার জন্য প্রিয়জনের যথাযথ। তবে কিনা পরকাল বা জীবনের পরের যাত্রা বলে তো কিছু নেই, তবে আবার ভাগ্যিস আগেকার দিনের লোক তা জানতেন না, না হলে এসব চমৎকার কাব্য রচনা হতো না। বেদেদের সঙ্গে মান্ধাই পাহাড়ে চলে যাওয়া চারাবাড়ির উন্মার্গগামী ছোকরা থেকে প্রাচীন যুগের গুরুগম্ভীর ঋষি- সকলে এইসব ভেবেছেন। সুদীপ্ত পালের অন্ত্যেষ্টি শিল্প বইটা এই বিষয়ে মনে করি, মৃতের প্রতি যত্ন নিতে যুগে যুগে মানুষ কত কী না করেছে। কিন্তু সে তো হল পরকাল। একা যাওয়ার ব্যাপারটা তাও হন্টিং- শেষ নিঃশ্বাস ফেলার মূহুর্তে, চেতনা নিভে যাওয়ার আগে চলে যাওয়া মানুষ কী ভাবছিল- হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়ার পর, মস্তিষ্কে স্নায়ুগুলি ফাইনালি বার্তা পাঠানো পর্যন্ত কী হয়েছিল- সত্যিই কি কোন ফ্ল্যাশব্যাক হয়, যদি হয়ে থাকে তবে তাতে কী দেখা গেছিল, তখন কি সুখস্মৃতিগুলি এসেছিল নাকি দুঃখের, ভয়ের… আর তার আড়ালে, তাতে কি আমি ছিলাম, ফাইনাল অ্যাপ্রাইজালে বেল কার্ভ টার্ভ কী রেটিং পেলাম - এই প্রশ্নটাও জাগে বইকি। তো সে যাই হোক, ঐ জায়গাটা একা। এক্কেবারে একা। আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো- আমার মনে হয় এর মধ্যে একটা ভয়ানক সাবটেক্সট আছে। তো এই হল একটা ক্রাইসিস। পরকাল না থাকলে পড়ে রইলাম আমি। তো শোক মূলত আত্মকেন্দ্রিকই হল। যে চলে গেছে সে তো চলেই গেল, কে হে বট যাচ্ছো চলে ভোঁ গাড়িতে উড়িয়ে ধুলো তোমার ঘটি বাটি রইল চড়ে জুড়ি গাড়ি কে হাঁকাবে। এর মধ্যে অবশ্য একটা ফ্যালাসি আছে- জুড়ি গাড়ি পড়ে রইঅল কিন্তু ভোঁ গাড়িটা যাচ্ছে- অবশ্য ভোঁ গাড়িটাকে একটা বড়সড় রূপক ধরা যেতে পারে। যাগ্গে, সংহত করতে গিয়ে কেবল পথভ্রষ্ট, তো প্রিয়জনেরা নিজের দুঃখেই কাতর আর কি।

    এবার সেসবও কোন কথা না, বড় স্কেলে মানুষের চলে যাওয়ার ইম্প্যাক্ট কী? আমার মনে হয় অনেকগুলি গল্প, কাহিনি, আখ্যান হারিয়ে যাওয়া। মা'র বাতিক ছিল হঠাৎ করে মধ্যরাতে জাগিয়ে তুলে আজাইরা কথা শুরু করা। কখনও হয়তো শংখ বা আমি, বাড়িতে কেউ নেই, মার ফ্ল্যাটেই খেয়ে দেয়ে বাড়তি ঘরটায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম, রাত দুটোয় জাগিয়ে তুলে হ্যাঁরে হ্যাঁরে তুই নাকি কাল সাদাকে বলছিলি লাল। তারপর নানা বিষয়ে গপ্পো শোনা যেত। পুরনো ও ডালপালা ওলা পরিবারগুলির নানান ভালো মন্দ গপ্পো থাকে, সেসব, আবার কখনও যুদ্ধের সময় কী হয়েছিল, বাষট্টি সালে আসামে কী হয়েছিল, সাব্রুম বা কৈলাশহরের গল্প। সেসব শুনে মনে হত এগুলি লিখে রাখলে তো হয়, তো সেসব চলে গেল, যদিও মা'কে দিয়ে তার অনেক কিছু লিখিয়ে রাখা গেছে। বাবার এইসব গল্পগুলি পুরোই চলে গেছে, গোগালিছড়া চা বাগান, কলকাতায় হল্লাগাড়ির পেছনে ঝুলে ঝুলে যাওয়া, কসবার বনভূমিতে কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি কুড়িয়ে পাওয়া, ত্রিপুরার জঙ্গলে হাতির গল্প। শংখ অবশ্য অনেক কিছু লিখেছে এদিক ওদিক। 

    এইবার এই লেখাটার উদ্দেশ্য বিধেয়ও গুলিয়ে গেছে। শোকপ্রস্তাব, নাকি আত্মবীক্ষণ, নাকি স্মৃতিচারণ, নাকি জীবিতের আচরণবিধি।

    স্মৃতিচারণের খুব কিছু নেই এই পাতায়, ৪৬, বাড়ি বৃত্তান্ত, ছবিমুড়া, চড়াই ঠাকুমা- এইগুলি ফিরে পড়ি মাঝে মধ্যে, বাকি যা তা তো ব্যক্তিগত। শিক্ষকতা জীবনের গল্প জানি কিছু। ছাত্রপ্রিয় শিক্ষিকা ছিল, বেশিরভাগ সময় গ্রামে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাকরি করেছে- প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া সব- তাদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা ছিল বলে দেখেছি। এক ছাত্র নেতা একবার মাকে বলেছিল দিদিমনি আপনার সঙ্গে আমরা অভিযোজনের সূত্র খুঁজে পাই, তাতে মা খুব কনফিউজড হয়ে বাড়ি এসে আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল এটা কী বললো রে? শংখ তখন উঁচু ক্লাসে, ব্যাখ্যা করলো। আর শক্তি দিদিমনি গোবরে পদ্মফুল- এইটা তো বোধহয় মা লিখেছিল। উদয়পুরে ছনবনের বাড়িতে গাবলু বাহাদুর ছাড়াও ছিল নানা রকম গাছ- মা'র সাজানো বাগানের ঝোঁক ছিল না, যেদিকে যা মনে হয় পুঁতে দিত- বীরুৎ গুল্ম বৃক্ষে কোন বাছবিচার ছিল না, আর মঙ্গলবার জঙ্গল পরিস্কার করার দিন হলেই এক অশান্তি হত- কোন কম্পোস্টের গর্তের ধারে সিট্রোনেলার ঝাড় বা রান্নাঘরের পেছনে জারবেরা বা সদর দরজা ঢেকে কড়ই গাছ বাড়ছে- সে আর কে বুঝবে। এই দোষ কিছুটা আমাতে বর্তেছে, তার থেকেই বোধহয় জামবাগানের আকুলতা। 
    তো এইসব মোহ ভালো না। ইউটিউব হাতে পাওয়ার পর মা'র ঝোঁক হল ভিলেজ ঠাকুমার আর মাংকি বেবির রিল দেখা। ভিলেজ ঠাকুমা তো আচ্ছা ঠিক আছে, মাংকি বেবি হল এক দল চীনে না জাপানী (ক্ষমো হে রেসিয়াল প্রোফাইলিং) লোক বাঁদর পোষে আর তাদের নিয়ে আদিখ্যেতা করে। দেখে আমার সন্দেহ হল বাঁদরগুলি ছোট থাকতে পোষে, বড় হলে কী করে? তো মাকে বললাম এই যে তুমি সারাদিন বাঁদরের রিল দেখছো, মনে আছে তো কোন এক ঋষি সারাদিন হরিণ নিয়ে আদিখ্যেতা করে পরের জন্মে কী সব গোলমাল হল? 

    আরেকবার হলো কি, লুরুতে সব্জিওলা এসেছে, এদিকে মা তেঁতুলের যাবতীয় অন্য প্রতিশব্দ হয় জানে না নয় ভুলে গেছে, তারপর মনে হয়েছে দক্ষিণ ভারতের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি, এরা আর কিছু না হোক সংস্কৃত তো বুঝবে। কিন্তু মুখ্যু সব্জিওলা তিন্তিড়ি শুনেও কিছু বুঝলো না।

    যাগ্গে সেসব কথা। শোকে ফিরি। শোক জিনিসটা একে তো গোলমেলে, বিগতর জন্য না নিজের জন্য- তা হল এক মুশকিল। দ্বিতীয়ত শোকের অভিঘাত বিচিত্র। কখনও মনে হয় উই হ্যাভ মেড পিস উইথ ইট, কখ্নও মনে হয় এ কী, আমার দুঃখ হচ্ছে না কেন, আবার কখনও নিতান্ত অসময়ে তেড়ে আসে। তবে একটা গুরুতর চিন্তা হয় প্রিয়জনেদের- আমরা ভুলে যাচ্ছি না তো? তো এই ভুলে না যাওয়া, বেদনা পাওয়া জাগিয়ে রাখা একটা গুরুতর বিষয়। তাই হয়তো এত ছবি টবি টাঙিয়ে স্মৃতিচারণের চল। একটা মানুষ চলে গেল, তাকে দু'দিন পর ভুলে গেলাম- এ কী মামদোবাজি পায়া হ্যায়? এইসব স্মৃতিগুলি সুখস্মৃতি হওয়াই ভালো, ভালো ভালো কথাগুলি মনে রাখা। আর হয় বিগত'র ইচ্ছাপূরণ। দিদা'র কথা লিখতে গিয়ে মা একবার লিখেছিল- 'আমি আমার মায়ের মত হতে চাইনি, মায়ের মনের মত হতে চেয়েছি' - খুব মনে ধরেছিল কথাটা। তবে জীবনের অধিকাংশ সময় নিতান্ত ব্যাদ্ড়া বালক হিসেবে কাটিয়েছি বলে, ঐ ফাইনাল অ্যাপ্রাইজাল রেটিংটা জানার কোন উপায় নেই। আমাদের বাড়িতে খুব আবেগ জরজর কথাবার্তা বলার চল ছিল না, তাই কৌতূহল থাকলেও জিজ্ঞেস করার উপায় ছিল না, সে আর রইলও না। তবে যাগ্গে সেসবে আর কী হবা।

    তো ঐসবই ভাবছিলাম। দৈনন্দিন ব্যাপার স্যাপারে মা ছিল নিতান্ত পরনির্ভরশীল। সুইচ ঘুরিয়ে রেডিও চালানোর বেশি প্রযুক্তির জ্ঞান আহরনে উৎসাহ হয়নি। এমনকি টিভির রিমোট কন্ট্রোলটা কীভাবে চলে তা নিয়েও নাহ'ক হয়রানি ছিল। কিন্তু আবার প্রথম ল্যাপটপ কিনে দুদ্দাড় করে লিখে ফেললও অনেক কিছু, ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোডের লেখাগুলি ঐ পর্যায়ের। তারপর একবার কয়েক মাসের রোগভোগ অস্ত্রোপচার হাসপাতাল বাসের পর ফিরে এসে দেখা গেল ল্যাপটপ চালনা সংক্রান্ত জিনিসপত্র বেমালুম ভুলে গেছে। ট্যাবের প্রেডিক্টিভ টেকস্ট জিনিসটা নিয়ে বিরক্তির একশেষ। আবার বাড়ির বাইরে কঠিন কঠিন কাজকর্ম অনায়াসেই চলতো। সরকারি কাজের তো হাজার ঝামেলা। ড্রয়িং ডিসবার্সিং অফিসার বলে একটা ব্যাপার আছে, নিশ্চিত নই ঠিকঠাক লিখলাম কিনা, তবে এদের হাত দিয়ে দপ্তরের সবার মাইনে, যাবতীয় বরাদ্দ আসে। সেসময় ত্রিপুরাতে মাইনে হত ক্যাশে, স্টেট ব্যাংকে ঐ ডিডিওদের লাইন, টাকার বস্তা নিয়ে ঠেঙিয়ে অফিস ফিরে সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া, অডিটে পাঁচ নয়া পয়সার এদিক ওদিক হলে ভিজিল্যান্সে ধরবে। তারপর শহরতলীর স্কুলে গিয়ে পেরেন্ট টিচার মিটিং চালু করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চক্ষুশূল, রাত বিরেতে হুমকি ফোন - সেসবও মাথা ঠান্ডা করে সামলাতে দেখেছি। রোগশয্যায় একবার বললো, খুব বৃষ্টি হয়েছে, বাইরে কাদা জমেছে, কত কাদা ঠেঙিয়ে গ্রাম গঞ্জ মফস্বলের পথে আসা যাওয়া করতে হয়েছে, আর তো কোনদিন কাদায় হাঁটতে পারবো না। আমার মনে হল তাই তো, কাদায় হাঁটতে না পারাটাও যে যাতনার হতে পারে তা তো কখনও মনে হয়নি। তো ঐ নানাবিধ না পারা নিয়ে বেচে থাকতে অনীহা বাড়ছিল। আজীবন লোকজনের সান্নিধ্যে থেকে গৃহবন্দীত্ব ভালো লাগতো না। মানুষজন পছন্দ ছিল, কমবয়সীদের সঙ্গে মতের আদান প্রদান পছন্দের জিনিস ছিল। বছরে এক দু'বার মিঠুন শুচিস্মিতার সঙ্গে দেখা হওয়াটা আগ্রহের উপলক্ষ ছিল। ইন্টারনেটের অ্যাকসেস ও গত বছর দশেকে গুরুচণ্ডা৯র কয়েকটা বৈঠক মুক্ত হাওয়ার জোগান দিয়েছে। পাখিয়ালের প্রকাশ মা'র হাতে, আর ছেচল্লিশের প্রকাশে আমার উপস্থিতি - এই দু'টি আমার কাছে মূল্যবান, ভাবতে গিয়ে মনে হল। গত মার্চ না এপ্রিল নাগাদ একবার জিজ্ঞেস করলো তোর বইটা লোকে কিনছে? আমি ব্যাজার মুখে বললাম, মোটেই কিনছে না। আর আমার বইটা? হ্যাঁ তোমারটা তো কিনছে। তো এইসব কথাবার্তা হত আরকি।


    লেখাপত্রের গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে মোটে যত্ন ছিল না। বাবার আবার নিজের সাহিত্য বিষয়ে বিশেষ না থাকলেও, আর্কাইভিঙে প্রবল উৎসাহ ছিল। সেই করেই থেকে গেছে কিছু। এই প্রসঙ্গে মনে হল, মানুষ কি নিজের শেষটা একটু বুঝতে পারে? বাবা অল্প বয়সে দুচারটে কবিতা লিখেছিল, একেবারেই ইয়ে আরকি। তো সেসব খাতা রাখা ছিল। ঐ ডেটা প্রাইভেসি নিয়ে আমরা যে রিটেন ডেস্ট্রয় এইসব বাৎসরিক কড়াকিয়া করি, সেসবে বাবা খুব স্পেসিফিক ছিল, চাকরিজীবনে আপিসের ফাইলপত্র বিষয়ে যা করতে হত; তো বাড়িতেও ব্যক্তিগত কাগজপত্র নিয়ে ঐসব চলতো। মৃত্যুর আগে স্বল্পকালীন রোগশয্যায় পড়ার ঠিক আগে বাবা যত্ন করে সেসব কাব্যপুঁথি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল, পরে যেন সেসব নিয়ে কেউ আদিখ্যেতা করতে না পারে। মোটামুটি পঞ্চাশ বছর যেসব তোরঙ্গের তলায় পড়ে ছিল সেসব অনলে দগ্ধোহসি করার কথা তখনই মনে পড়লো কিনা সেই প্রশ্নটা থেকে গেল। বাবা যে এর আগেও ভোগেনি তা তো না, কয়েক বালতি কাঁচা রক্ত বমি করে মাস খানেক হাসপাতালে কাটিয়ে দু'দিন পর আবার দেখা গেল ঠোঁটের বাঁ দিকে সিগারেট ঝুলিয়ে নিজের ফর্মে। সেবার কী হল কে জানে। আরো কয়েকবার হিমালয়, আরেকবার আমেরিকা, সেইসব প্ল্যান ছিল কিন্তু। পারে হয়তো। বুদ্ধিমান প্রাণীর তো একেবারে না পারার কথা না। হাতি বা বেড়াল নাকি পারে। আসলে মানুষের জীবন তো নানান বাইরের জিনিসে জড়িয়ে গেছে, তাই হয়তো ক্ষমতা থাকলেও তার প্রয়োগ নেই।

    কল্যানী ভট্টচার্য যখন মানবী শুরু করলেন, আমার কাজ ছিল লেখা টেখা পোঁছে দিয়ে আসা। উৎসাহ নিয়েই করতাম, সুকন্যাও ঐ পাড়ায় থাকতো কিনা। তো ঐ করে করে আমিও একটু জড়ালাম মা'র বৃত্তের সঙ্গে, তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অবস্থান ও দর্শন নিয়ে রীতিমত বেয়াদবের মত তীর্যক মন্তব্য ও তক্কো করতাম। ওঁরা সব মোটের ওপর ধ্রুপদী বাম মনোভাবাপন্ন ছিলেন (যাঁদের কেউ কেউ পরে রাম হয়েছেন) পরবর্তীকালে মা একবার বলেছিল, তখন তোর কথা শুনে মনে হত তুই বুঝি কংরেস সমর্থক হয়েছিস। আমি বলেছিলাম আ ছি ছি। যাদের নিন্দে করতাম তাদের পরিনতি দেখলে তো? 
    তুলসীবতী স্কুলের শতবার্ষিকীতে মা একটা নাটক লিখেছিল। এমনিতে নাটকটা আমার যে বিশাল ভালো লেগেছিল তা না, কিন্তু নাটক দেখতে গিয়ে দেখলাম প্রেক্ষাগৃহ একেবারে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছে, নাটকের শেষ দৃশ্যে সব প্রবীণা প্রাক্তন ছাত্রীরা বিহ্বল। গর্ব হয়েছিল বৈকি। সার্থক নাটক হয়েছিল মেনে নিয়েছিলাম।

    তা সেসব তো হল।

    জীর্ণ বসন যথা বিহায়, ঐরকম অনিচ্ছার ও যাতনার জীবন অবসানে মুক্তির কথা ভেবে স্বস্তি পাওয়া বনাম আত্মকেন্দ্রিক শোক- এর মধ্যে টানাপোড়েন বিষম। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান জীবনকে দীর্ঘ করার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রনার উপশমে আরেকটু দক্ষ হবে- এই আশা হয়। গত মাস খানেকে মা'র সব থেকে বড় বেদনা হয়েছিল লিখতে ও পড়তে না পারা। লিখতে গেলে আঙুল বশে থাকছিল না, বইয়ের পাতা ওল্টাতে পারছিল না। অন্য কেউ বইয়ের পাতা উল্টে দেবে- ঐ বন্দোবস্ত পছন্দ ছিল না, কারন এক সঙ্গে একাধিক বই পড়া আর যখন তখন পাতা মুড়ে রেখে দেওয়া মুশকিল। এর থেকে নিরাময়ের আশাও ছিল কিনা বলা খুব মুশকিল। 

    তো পরকালে বিশ্বাস করলে ভাবা যেত পরলোকের ঠিকেদার নিশ্চয় ঢোকার পথেই বেশ কাদা করে রেখে দেবেন, যাতে প্রথমেই একটা আছাড় খেতে হয়। কিন্তু তা তো আর হলো না।  
    তাই হয়তো টুকটাক স্মৃতিচারনই করবো।

    সত্যি বলতে কী বাবাকে নিয়েও কখনও কিছু লিখিনি, তার একটা কারন অন্তত নিজেকে বলতাম, ঐ জায়গাটা হয়তো মা'কে ছেড়ে দেওয়া ভালো। এই করে তেরো বছর কেটে গেল, আর যা হয়, অভ্যাস হয়ে যায়। 

    তো ঐ আরকি, নিতান্তই ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, এসব লিখে ছাপানোর কোন মানে তো হয়ই না। কিন্তু মা যখন এই পাতায়, আড্ডা না দিলেও (ভাগ্যিস), বেশ কিছুদিন লিখেছে, তাই হয়তো একেবারে ব্যানালও হবে না। অক্টোবর বা আশ্বিন মাস মা'র জন্য বেদনা বয়ে এনেছে বারবার। মা'র প্রিয়তম জনেরা এই সময় বিদায় নিয়েছে, বেশ আশ্চর্য সমাপতনই বলতে হবে। মা সেই বেদনার উত্তরাধিকার দিয়ে গেল আরকি।
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • স্মৃতিচারণ | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২৪০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:২৬742934
  • হুতো,এই লেখা পড়লাম, ও চুপ করে রইলাম।
  • :|: | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪৯742936
  • ছবিটা বাঙ্ময়।
    শুধু গুল্পটাকে গুল্ম করে দিন প্লিজ।
  • স ক ভ | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৮742937
  • ওহ তাই তো, থ্যাঙ্কিউ।
  • tatin | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৭742945
  • ভালোবাসা
  • Ranjan | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০০:২৪742951
  • সঙ্গে আছি l বুঝতে পারছি l
  • Guruchandali | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৫২742954
  • heart
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন।