দেখছি আমি চেয়ে ( পর্ব – ৫ )
কুয়োতলার জমায়েত রহস্য এবং…।
সেবার ঘুরতে গিয়েছি হিমাচল প্রদেশের এক গ্রামে। উদ্দেশ্য খুব কাছ থেকে পাহাড়তলির গ্রামের মানুষজনের জীবনধারা সম্পর্কে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা। আমাদের অতিথি নিবাসের হেঁসেল সামলানোর দায়িত্ব যার কাঁধে ছিল সেই রওশনলাল জী আমাদের ইচ্ছের কথা জানতে পেরে বললেন – “হমরো গাঁওমে চলিয়ে। খুব সুরৎ। আপকো অচ্ছা লাগেগা।” লোভনীয় প্রস্তাব। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম।
তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবো হবো। পাকদণ্ডী বেয়ে বেশ খানিকটা নিচে নামতেই মিলে গেল রওশনলাল জীর সেই গ্রাম। ছোটো গ্রাম, খান বিশেক পরিবারের বাস। আমরা যখন গ্রামের ভেতর ঢুকছি তখন দেখি গ্রামের মহিলারা সব জল আনতে চলেছেন “চশমায় “। সেখানেও হাজির হয়ে যাই। গিয়ে দেখি চশমার বাঁধানো পাড়ে গোল হয়ে বসে চলছে বৈকালিক গুলতানি, হাসি ঠাট্টা,সুখদুঃখের কথা কওয়া। মাঝেমাঝে আপন খুশিতে গেয়ে উঠছেন গান। সে এক মজলিসি ব্যাপার।
আমাদের গ্রামীণ বাংলাতেও পুকুর কিংবা কুয়ো পাড়কে ঘিরেই একসময় গ্রাম জীবনের নানান কর্মকাণ্ড আবর্তিত হতো। পুকুরগুলো ছিল মুকুরের মতো, মানুষের হাসি কান্না দোলদুলানির লীলাক্ষেত্র। এই দিক থেকে দেখলে হিমাচলের চশমা পাড়, রাজস্থানের ইঁদারা আর বাঙলার কুয়ো পাড় বা পুকুর পাড় এক সারিতে দাঁড়িয়ে আছে।
গল্পগুজবের জন্য কুয়ো পাড়ের যে মহিমা তা যে শুধু মনুষ্য সমাজেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়। বিহগকুলেও এই রীতি বেশ জনপ্রিয়, অন্ততঃ আমার অভিজ্ঞতা তেমনই বলে। সে কথায় আসবো, তবে তার আগে কার্তিক দার গল্প একটু বলে নিই।

নতুন এলাকায় উঠে আসার পর বাড়িটাকে নতুনভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন আছে মনে হতেই ডাক পড়লো কার্তিক দার। কার্তিক দা ননী জ্যেঠুর পরিচিত। তাঁর সুপারিশেই কার্তিক দাকে সবকিছু ঠিকঠাক করে গড়েপিটে নেবার দায়িত্ব দিলেন বাবা। কাজের জন্য লরি বোঝাই ইট এলো,বালি এলো, বস্তাভর্তি সিমেন্ট এলো, কার্তিক দার সহযোগী হয়ে এলো আরও কয়েকজন, এলো লক্ষ্মী মাসি – কার্তিক দার বিশ্বস্ত সঙ্গী। কার্তিক দার পরামর্শে জলের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বাড়িতে খোঁড়া হলো এক কুয়ো, উদ্দেশ্য সেখান থেকে জল তুলে মশলা মাখার কাজ করা হবে। বিশ শতকের একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে কুয়োর জলের চক্করে পড়বো কেন? তাই কিছুদিনের মধ্যেই বিকল্প জলের ব্যবস্থা করা হলো। কার্তিক দার আদরের কুয়োরাণী অচিরেই দুয়োরাণীতে পরিণত হলো। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে একসময় তা অনাদরের বস্তু হয়ে উঠলো। সেভাবেই চলছিল। বাগানের খেচর অতিথিদের কল্যাণে সেই কুয়োই আবার সকলের গোচরে এলো।
সেদিন চোখ থেকে ঘুম টুটেছে খানিকটা আগেই। ঘরের ঠিক পাশে থাকা বাগিচার জলসাঘর তখনও সেভাবে সরগরম হয়ে ওঠেনি। আমি কান পেতে থাকি ভোরের আবাহনী ভোরাই শোনার জন্য। খুব বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। রোজকার মতো শিস্ দিতে দিতে হাজির হয় ভোরের দোয়েল পাখি। মশারির ভেতর থেকে আমিও শিস্ দিয়ে উঠি। পাছে ওরা উড়ে যায় সেজন্য পা টিপে টিপে বাইরে এসে জানালার পর্দা সামান্য একটু ফাঁক করে কুয়োর দিকে তাকাই। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি একজোড়া ছিপছিপে চেহারার দোয়েল পাখি কুয়োর চাতালের ওপর বসে আছে আর জুলুজুলু চোখে কুয়োর ভেতরে উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখছে। কী দেখছে ওরা অমন করে ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে না পেতেই সেখানে এসে হাজির হলো একজোড়া বুলবুলি পাখি। এমনিতেই এরা রীতিমতো ছটফটে লড়াকু স্বভাবের। নিজের এলাকায় ওরা অন্যের উপস্থিতি মেনে নেবে কেন? অবশ্য ওদের দেখেই শান্ত স্বভাবের দুই গায়ক ময়দান থেকে সটকে পড়লো। লড়াই ঝগড়ায় ওদের অনীহা। শত হলেও গাইয়ে তো!
বুলবুলিদের একদম বিপরীত স্বভাবের। বুলবুলিদের একজন সটান ঢুকে গেল কুয়োর ভেতরে। কিছু একটা মুখে নিয়ে উড়ে গেল নিজের বাসার উদ্দেশ্যে। অন্যজনও একই ভাবে কুয়োর ভেতরে ঢুকে গিয়ে মুখে করে কিছু তুলে নিয়ে উড়ে গেল তার ঠিকানায়। কী নিয়ে গেল তা বুঝতে পারলাম না।
পর্দে কি পিছে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমিতো তখন রীতিমতো উত্তেজিত। বৃষ্টি ভেজা ঠাণ্ডা সকালেও আমি ঘেমে নেয়ে উঠেছি। অপেক্ষা করছি নতুন কোনো অতিথির আগমনের। কুয়োর পাড়ে তখন ডানাওয়ালা অতিথিদের উপস্থিতিতে চাঁদের হাট। এবার এলেন ছাতারের দল। সকালের নিস্তব্ধতার দফারফা করে তারা তখন শুকনো পাতা উল্টিয়ে পোকা খুঁজতে ব্যস্ত। কি খেয়ালে তাদের ভেতর থেকে একজন সটান ঢুকে গেল কুয়োর ভেতরে। মনে মনে ভাবলাম ওরা কি সব সাতসকালেই তৃষ্ণা মেটাতে এতো ব্যস্ত হয়ে পড়লো? নাকি পুণ্যের লোভে পবিত্র কুয়োয় স্নান সেরে নিচ্ছে? পর্দার ফাঁকটাকে আরও বড়ো করতে সাহস হয়না,পাছে গোটা দৃশ্যটাই চোখ ছাড়া হয়ে যায়! ছানাবড়ার মতো গোল গোল চোখ করে আমি তাকিয়েই আছি। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে। মুখে করে কী নিয়ে যাচ্ছে ওরা? প্রশ্নটা সমানে মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।
ছাতারেদের ছায়া কুয়োর পাড় থেকে সরে যেতেই সেখানে এসে হাজির হলেন বড়োসড়ো চেহারার কুবো পাখি। কালো আর বাদামি রঙের মিশেলে গড়া শরীর বেশ আকর্ষনীয়। মাটিতে পা ফেলে কদম কদম চলতে ফিরতে খুব ভালোবাসে। খানিকটা ডাকাতে স্বভাবের বলে অন্যান্য পাখিরা কুবোকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। এহেন কুবো পাখি আজ সরাসরি কুয়োর মুখে এসে বসে। ওখান থেকেই ডেকে ওঠে কুব কুব করে। তা শুনে আমিও লোভ সামলাতে না পেরে ডেকে উঠি কুব কুব কুব….। ইনিও প্রত্যুত্তর দেন। তারপর ঝপ্ করে নেমে পড়েন কুয়োর ভেতরে। লম্বা লেজ আর বেশ ভারী শরীর নিয়ে উঠে আসতে দেরি দেখে আমি তখন বেশ চিন্তায় পড়েছি। খানিক সময় বাদেই অবশ্য উঠে আসে মুখে ব্রেকফাস্টের হাই প্রোটিন ডায়েট নিয়ে। এই কুবোর কল্যাণে বিহগকুলের কুয়োতে ঝাঁপ দেবার রহস্য অনেকটাই পরিস্কার হয়ে আসে আমার কাছে। তবুও ভেরিফিকেশনের জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করি।

অপেক্ষা করতে মন সায় দিচ্ছে না? ভাবছেন তো পাখিদের এমন কাজের পেছনে কোন কারণ রয়েছে? তাহলে খোলাসা করেই বলি যে ওই হেজে মজে যাওয়া কুয়োর ভেতরেই মজুদ রয়েছে প্রোটিনের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। আরশোলারা পছন্দ করে ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার পরিবেশে থাকতে। বর্ষার সময় জলের জোগান বেড়ে যায় বলে মজে যাওয়া কুয়োর জলতল সীমা অনেকটা ওপরে উঠে আসে। ফলে কুয়োর স্থায়ী আবাসিক আরশোলার দল কুয়োর দেয়াল বরাবর হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসে পাখিদের সহজ নাগালের মধ্যে। পাখিরাও সব তক্কে তক্কে থাকে। কুয়োর ভেতরে থাকা আরশোলারা অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে টের পেয়েই একবারে হামলে পড়ে আরশোলাদের পাশাপাশি অন্যান্য পোকামাকড় ধরবার জন্য। বিশেষত ছুটির দিন সকাল বেলা উত্তর ও মধ্য কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দোকানে ভাজা গরমাগরম হিংয়ের কচুরি আর জিলিপির জন্য আমরা সবাই যেভাবে লাইন দিই ঠিক সেভাবেই আশপাশের পাখিরা এসে ভিড় জমায় আমার কুয়োতলার দ্যা গ্রেট প্রোটিন শপের সামনে। এও এক বিস্ময়কর মিথোজীবিক সম্পর্ক যার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে বসে থাকি দিনভর। এই খোলা মন নিয়ে চেয়ে থাকাতেই যে অপার আনন্দ। সাধে কি আর গাইয়ে গুপী গেয়ে উঠেছিল – দেখোরে! নয়ন মেলে জগতের বাহার…। নয়ন আর মন দুইই যে মেলে রাখতে হয়!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।