অনেকে বলে বাঙালিরা ব্যবসা করতে জানে না। অনেকে বলে বাঙালিদের ব্যবসা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। 'কথা হলো ব্যবসা করা কী এমন গৌরবের কাজ? যা না হলে একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।' এটাই হলো এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। প্রথমে দেখা যাক ব্যবসা করার মধ্যে কোন গৌরব জড়িয়ে আছে? এটা বুঝতে গেলে সবার আগে বুঝতে হবে, ব্যবসা কী?
সোজা ভাষায় বলতে গেলে ব্যবসা হলো পণ্যের বণ্টন ব্যবস্থা। এবং যেকোনো ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হলো এই পণ্য। পণ্য ছাড়া ব্যবসা কল্পনাও করা যায় না। তাহলে পণ্য কী? একজন ব্যক্তিকে বেঁচে থাকতে হলে যে যে দ্রব্য ও সেবার প্রয়োজন হয় সেগুলোই পণ্য। এই পণ্যের অনেক ভাগ আছে। তার মধ্যে একটি ভাগ হলো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। অর্থাৎ যে পণ্য ছাড়া ব্যক্তির বেঁচে থাকা বা সুস্থভাবে বেঁচে থাকা দূরূহ। যেমন খাদ্য। এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটি প্রাথমিকভাবে কোনো বাণিজ্যিক পণ্য ছিল না। খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ পরে হয়েছে। কিন্তু বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত এই খাদ্য। এরপর আসে বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা। এগুলো প্রতিটি অত্যাবশ্যক পণ্য কিন্তু খাদ্যের মতো অত বেশি অত্যাবশ্যকীয় নয়। খাদ্য সব থেকে বেশি আবশ্যিক পণ্য। পরবর্তী পণ্যগুলো তুলনামূলক কম আবশ্যিক হওয়ার সাথে সাথে প্রকৃতিগতভাবে বেশি বাণিজ্যিক। অর্থাৎ খাদ্য সব থেকে অত্যাবশ্যক পণ্য। খাদ্য সব থেকে কম বাণিজ্যিক পণ্য। বস্ত্র ও বাসস্থান তুলনামূলক কম অত্যাবশ্যক পণ্য। বস্ত্র, বাসস্থান তুলনামূলক অধিক বাণিজ্যিক পণ্য।
সুতরাং দেখতে পাচ্ছি পণ্য যত কম অত্যাবশ্যকীয় হতে থাকে, তার বাণিজ্যিক প্রবণতা তত বাড়াতে থাকে। এর একটা কারণ হতে পারে প্রকৃতি। অর্থাৎ মানুষ প্রকৃতি থেকে সরে গিয়ে যে অগ্রগতিগুলো ঘটিয়েছে সেই অগ্রগতি কেবল মানব সমাজের মধ্যেই হয়েছে, প্রকৃতির মধ্যে হয়নি। যেহেতু মানুষ প্রকৃতিসৃষ্ট, তাই যে কর্মকাণ্ড প্রকৃতির অগ্রগতি ঘটায় না, সেই কর্মকাণ্ড হয়তো মানুষেরও প্রকৃত অগ্রগতি ঘটায় না। যেমন আধুনিক কৃষির মাধ্যমে অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করা গেছে, কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান উত্তরোত্তর খারাপ হয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক কৃষির ফলে প্রকৃতির ওপরও খারাপ প্রভাব পড়ছে। ক্ষতিকর কীটনাশক ও সারের ফলে প্রকৃতি, মানব সমাজ তথা স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। সুতরাং আধুনিক কৃষিরও প্রকৃতির ওপর এক প্রবল ক্ষতিকর প্রভাব আছে। যদি কোনো দিন কৃষি বিজ্ঞান ততটা উন্নত হয়, যখন আধুনিক কৃষির ফলে মনুষ্য সমাজ ও স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়বে না বা কম প্রভাব পড়বে—তখন সেই একই বিজ্ঞানের ফলে প্রকৃতির ওপরও কম কুপ্রভাব পড়বে এবং একই সাথে সেই দ্রব্যকে পণ্যে রূপান্তরিত করতে অসুবিধা হবে। একটু সহজভাবে বোঝা যাক। খাদ্যকে যত বেশি প্যাকেজিং করা সম্ভব হয়েছে, তত বেশি খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ করতে সুবিধা হয়েছে। কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান কমেছে এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের ফলে স্বাস্থ্যের অবনতিও হয়েছে। একইভাবে যদি চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথা ধরি, তাহলে হাসপাতাল যখন সরকারি ছিল তখন অধিক ব্যক্তিবর্গ চিকিৎসার সুবিধা নিতে পারত এবং ডাক্তাররাও তাদের ইচ্ছামতো বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারত। কিন্তু হাসপাতালের বেসরকারীকরণের সাথে সাথে চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ তো হয়েছে, কিন্তু অনেক মানুষ চিকিৎসার সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং ডাক্তারদেরও সাবজেক্ট কমেছে।
আধুনিকতা বনাম পণ্য: দ্বিতীয়ত যদি বস্ত্র, বাসস্থান ও বিদ্যুৎ বা শক্তির কথা বলি—তাহলে বিদ্যুৎ, বস্ত্র ও বাসস্থানের থেকে বেশি আধুনিক পণ্য এবং এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যিক পণ্য। অর্থাৎ আধুনিক হলেই যে সেটি কম আবশ্যিক হবে, তেমনটা নয়। কিন্তু চিকিৎসার মতো এই বিদ্যুৎ পরিষেবাও প্রাথমিক ও প্রকৃতিগতভাবে কোনো বাণিজ্যিক পরিষেবা নয়। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ পরিষেবারও বেসরকারীকরণ শুরু হয়েছে। একই সাথে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বেড়েছে এবং বাণিজ্যিক অগ্রগতির সাথে সাথে এই বিদ্যুৎ শিল্পের ফলে ঘটতে থাকা পরিবেশ দূষণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞান, পণ্য ও ধর্ম: পণ্য হলো মানব শরীরের ভোগ সংক্রান্ত বিষয়। অর্থাৎ খাওয়া-দাওয়া, এসির ঠান্ডা হাওয়া, দেহের সুরসুরি (কম কথায় বিষয়টি বোঝানোর মতো এর থেকে ভালো অভিব্যক্তি আর পাওয়া গেল না)। অন্যদিকে বিজ্ঞানের কাজ মানব শরীরকে পরিষেবা দেওয়া নয়। বিজ্ঞানের মূল কাজ হলো রহস্যময়ী প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করা, প্রকৃতিকে জানা এবং প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। অন্যদিকে ধর্মেরও কাজ হলো প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করা এবং প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। কিন্তু ধর্ম ও বিজ্ঞানের মেথডোলজি (methodology) আলাদা। বিজ্ঞান যুক্তি, গবেষণা ও কার্যকারণ সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ; ধর্ম কুসংস্কার, ম্যাজিক ও ভণ্ডামির মধ্যে আবদ্ধ। এবং এখান থেকেই ধর্ম ও বিজ্ঞানের বৈরিতা শুরু হয়।
বর্তমান দিনে ব্যবসার গুরুত্ব: বিশ্বে পুঁজিবাদকে টিকে থাকতে গেলে যে পরিমাণ উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন, সেই পরিমাণ সম্পদ পৃথিবীতে নেই এবং পুঁজিবাদের ভার দীর্ঘদিন ধরে সহ্য করার ক্ষমতা পৃথিবীর বা প্রকৃতির নেই। সেজন্য বিজ্ঞান থাকবে, কিন্তু পুঁজিবাদ থাকবে না। কারণ একটা ছোট ল্যাবে কিছু পদার্থ নিয়ে গবেষণা করার মতো সম্পদ পৃথিবীতে থাকবে এবং এর ভার প্রকৃতি সহ্য করতে পারবে, কিন্তু বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করার মতো অবস্থা থাকবে না—যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। পুঁজিবাদ বা কনজিউমারিজম (consumerism) ধ্বংস হলেও বিজ্ঞান ধ্বংস হবে না। বিজ্ঞানের অগ্রগতি হতে থাকবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সময় ধর্মীয় শক্তি/সামন্ততন্ত্র/ফ্যাসিবাদ ও বৈজ্ঞানিক শক্তির এক প্রবল সংঘর্ষ হবে। কারণ বিজ্ঞান পণ্য উৎপাদন না করলে, একটা অংশের মানুষের কাছে বিজ্ঞান অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। সুতরাং তারা ধর্মের দ্বারা আকৃষ্ট হবে। পণ্যের ব্যবহার কমার ফলে সেই স্থান পূরণ করবে বিজ্ঞান, গবেষণা, ধর্ম, রাজনীতি, সামন্ততন্ত্র, সমাজতন্ত্র। কিন্তু সব শেষে বিজ্ঞানের জয় হবে, কারণ এগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান উন্নততর এবং শক্তিশালী।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি বাঙালির ব্যবসা করা উচিত নয়?
অনেক চাকরি বা কাজকর্মও তো সমাজে আলাদা ভ্যালু যোগ করে না, তাহলে সেগুলোও কি করা উচিত নয়? ব্যক্তি পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন কার্যকলাপ করে থাকে, তার মধ্যে প্রতিটিই যে সমাজে আলাদা ভ্যালু যোগ করে, এমনটিও নয়। সুতরাং সেই অর্থে বাঙালি ব্যবসা করতেই পারে। কিন্তু বাঙালি ব্যবসা করুক বা না করুক, তার সাথে জাতির উত্থান-পতন বা গৌরবের কিছু নেই। বা কোনো ব্যক্তি প্রচুর পুঁজির মালিক হলেন, এর মধ্যেও গর্বের কিছু নেই। সরকার ব্যবসাকে প্রমোট করে নিজের কাঁধ থেকে কর্মসংস্থানের দায়িত্বকে ঝেড়ে ফেলার জন্য। এছাড়া ব্যবসা হলে কর্মসংস্থান বাড়ে—এটা মিথ ছাড়া অন্য কিছু নয়। সুতরাং জাত্যাভিমানের দিক থেকে বলতে গেলে, বিজ্ঞানমনস্কতা, চিন্তাশীলতা, যুক্তিবোধ, সমাজ ও রাজনীতি সচেতনতাই একটি জাতির উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড। অন্যদিকে ধর্ম, কুসংস্কার, ম্যাজিক হলো একটি জাতির অধোগতির প্রকৃত মানদণ্ড। অতএব বিষয়টি হলো বিজ্ঞান বনাম ধর্মের। এক্ষেত্রে ব্যবসা ও বাণিজ্যের কোনো ভূমিকা নেই। অর্থনীতির দিক থেকে বলতে গেলে, কোনো স্থানে বিশাল সংখ্যক জনগণ (এক্ষেত্রে বাঙালি) থাকলে সেখানে অর্থের সার্কুলেশন হবেই এবং অর্থের সার্কুলেশন হলে ব্যবসা হবে। কারণ ব্যক্তিমাত্রই ভোক্তা এবং ব্যবসার মূল লক্ষ্য হলো বিক্রি বা সেল ও মুনাফা, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। সেই স্থানে ভোক্তা না থাকলে বিক্রি করবে কার কাছে? একটু অন্যভাবে বোঝা যাক। সরকার একটি বেসরকারি সংস্থাকে ঠিকা দিল একটা ব্রিজ তৈরি করার জন্য। ব্রিজটা করার জন্য সেই সংস্থা টাকা পাবে সরকারের কাছ থেকে, যা থেকে তারা মুনাফা করবে। যদি ঐ ব্রিজটি ব্যবহার করার মতো বিপুল জনগণ না থাকত, যারা সরকারকে ভোট দেবে—তাহলে সরকার কি ব্রিজটা তৈরি করত? আর সরকার ব্রিজটা না বানালে ঐ বেসরকারি সংস্থা কি মুনাফা করতে পারত? এটি হলো পরোক্ষভাবে সেল বা বিক্রি। সুতরাং জনগণ থাকলে অর্থের সার্কুলেশন হবেই এবং অর্থের সার্কুলেশন হলে ব্যবসা হবে। এবার সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে করে খাওয়ার ক্ষমতা আছে কি না, না তার নিজের করে খাওয়ার সুযোগটা অন্যকে ছেড়ে দেবে—সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমন কিছু আছে যা বাণিজ্যের পক্ষে সহায়ক। যেমন বাঙালির ভোগবাদ—হুইস্কি আর বিফ, পোর্ক, ইলিশ ইত্যাদি। অন্যদিকে নিরামিষভোজী মাড়োয়ারি, গুজরাটিরা নিজেরা ভোগবাদে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু অন্যকে ভোগ করিয়ে নিজেরা মুনাফা করতে চায়। এটা কনজিউমারিজম ও বিজনেস ইকোসিস্টেমের সঙ্গে ঠিক মেশে না।