এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • কাজার ডায়েরি - ৭

    দ লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত
  • ০ | ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ | ৭
    ২১/০৯ - ২২/০৯

    সোমবারটা সাধারণভাবে ক্যাফেতে একটু নিরিবিলি থাকে বলে শুনেছিলাম। এই সোমবার তার ব্যতিক্রম ছিল। সকাল থেকেই হুড়মুড় করে লোক এসেই যাচ্ছে। তার মধ্যে আবার মন্যিয়া ক্যাফেতে যাচ্ছে বিকেল ৪টের দিকে। আমি আড়াইটে অবধি অপেক্ষা করে চলে এসেছিলাম দুপুরের খাবার খেতে। আবার বিকেলে বেরিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে একটা মিষ্টির দোকান পেয়ে দেখি জিলিপি ভাজছে। গরম জিলিপি কিনে ক্যাফেতে যাবার খানিক পরেই মন্যিয়া 'আমি তাহলে যাচ্ছি' বলে হাওয়া।

    সেখানে তখন তিনজন মহিলা বসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। তাঁরা এসেছেন ব্যাঙ্গালোর থেকে। প্রত্যেকে জৈন ধর্মাবলম্বী এবং এখন বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে ভাল করে জানতে চান। তাঁদের ব্যানানা চকোলেট স্মুদিতে আমুলের দুধ যেন একফোঁটাও না পড়ে। হোয় মিল্ক দিয়ে বানাতে হবে। হিকিম কমিক লাংজার বৌদ্ধরা কতটা বুদ্ধের প্রকৃত অনুসারী এই প্রশ্নটা আমায় বার চারেক করলেন। কি আপদ রে বাবা! ওই জায়গাগুলোয় না গেলে কী হবে সেটাও ওঁদের জিজ্ঞাস্য।

    এর উত্তর অবশ্য সোজা। লাংজার অমন মস্ত বুদ্ধমুর্তি না দেখা কোন কাজের কথা নয়। এদ্দুর যখন এসেইছেন ওটাও দেখে যান। তাবো আর ধানকড় গোম্পা নিয়েও ওঁদের প্রচুর প্রশ্ন। যতটুকু যা জানি বললাম। আর মনের আনন্দে হেমিস আলচি লামায়ুরু নিয়ে একগাদা জ্ঞান দিয়ে দিলাম। মানে গরুর রচনা, বুঝতেই পারছেন, যা জানি সেই ফিল্ডেই টেনে দেওয়া। তিব্বতী খাবার দাবার নিয়েও এঁরা অনুসন্ধিৎসু। সে অবশ্য সহজ জানাশোনা ব্যপার।

    সবে ভাবছি যে এঁরা গেলে একটু হাঁফ ছেড়ে বসবো, ওব্বাবা ৯ জনের এক মস্ত দল হইহই করে ঢুকে এলেন। তাঁদের পেছনে আরো জনা পাঁচেক। ৯ জনের দলটা মুম্বাই থেকে এসেছেন। তেনারা কষ্ট করে এই ঠান্ডায় এসে ধন্য করে দিয়েছেন এমন হাবভাব। তাঁদের দলের যে মেয়েটি অর্ডার দিচ্ছে সে এমন ক্যানক্যান করে কথা বলে যে শুনলেই কিরকম একটা রাগ হয়। কিন্তু রাগ তো করা চলবে না। অতএব নিজেকে বলি বড় বড় শ্বাস নাও, আরো নাও। এদিকে তার ক্যানক্যানানি চলছেই।

    একটা পিজ্জাকে ছয় টুকরো করে দিতে হবে। বাই ডিফল্ট আট টুকরো আসে দেখলাম। না তাতে হবে না ছয়ই চাই। তিনকাপ হট চকোলেট বানিয়ে ৯টা গ্লাসে ভাগ করে দিতে হবে। এদিকে সাড়ে আটটার পরে আর পিজ্জার অর্ডার নেওয়া সম্ভব হয় না। তাঁদের দলের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির আটটা চল্লিশে মনে হয়েছে একটা মেক্সিকান পিজ্জা খেয়ে দেখা যাক। না শুনতে রাজী নন। বলছেন 'তুমি কিচেনে গিয়ে বলো না, ওরা ঠিক বানিয়ে দেবে।'

    প্রায় সব খদ্দেরই নাম আর কোথা থেকে এসেছি জিজ্ঞাসা করে। ওয়েস্ট বেঙ্গল শুনেই এই পিজ্জা আবদেরে ধরে বসলেন পশ্চিমবঙ্গের এতদিনে কেমন ভাল গম্মেন্ট হয়েছে, কোণায় কোণায় কেমন বাংলাদেশী ছেয়ে গেছিল সেই নিয়ে আলোচনা করতে। তারপর হল আলোচনা। তাতে আলো কম চোনা বেশী। ইনি নাকি আম্রিকা থাকেন, এনয়ারয়াই। বিল পেমেন্টের সময় চেক দিতে বলেন কাজেই উনি পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আমার চেয়ে ভাল জানেন। আমি যে চটে গিয়ে বকে দিই নি এজন্যই নিজেকে একটা সিবাকথর্ন কুকি ট্রীট দিলাম।

    আর এই চোদ্দজনের নানা আবদার, অর্ডার বদলানো, একটা স্যানউইচকে চার ভাগে ৪টে প্লেটে দেওয়া ইত্যাদির চক্করে তাশিজি(সিনিয়ার), তাশি আর আমি পুরো চরকীপাক। মন্যিয়াকে বার পাঁচেক ফোন করলাম, তুললইনা। বুঝলাম ইচ্ছাকৃতই তুলছে না। আমাকে নাজেহাল দেখে তাশিজি দায়িত্ব নিয়ে মন্যিয়ার নামে যথেচ্ছ এস্ক্যালেট করল। এদিকে এই মুম্বাই পার্টি আবার হাবড়ে অর্ডার করা অর্ধেক জিনিষ প্যাক করে দিতে বলল। বোসো এবারে প্যাকিং নিয়ে। ]

    তাশিজি (সিনিয়ার) হলেন নরবুজির স্ত্রী আর নরবুজি ক্যাফের অন্যতম মালিক। কাজেই ওঁর এস্ক্যালেশান মন্যিয়াকে পরেরদিন বেশ বেকায়দায় ফেলল। মেয়েটা বিক্রিবাটার হিসেবটাও ঠিক করে রাখে নি। মঙ্গলবারেও সকাল থেকেই ভীড়ে ভীড়াক্কার। দুজন বাঙালি মহিলা এসে বলে গেলেন পরেরদিন আসবেন। দুবছর আগে ওঁদের একজনের ছেলে এসে এখানে খেয়ে গিয়েছিল তাই মা আর মাসিকে বলে দিয়েছে একবার অবশ্যই যেতে।

    পরের দিন অবশ্য তাঁরা আর এলেন না। হয়ত গ্রুপের সাথে এসেছেন সময় ম্যানেজ করতে পারেন নি। এরকমই আরেক গ্রুপের সাথে আসা এক বাঙালি মহিলা অনেকক্ষণ গল্প করলেন। বয়স আমার কাছাকাছিই হবে, স্বামী মারা যাবার পরে মেয়ে টিকিট কেটে একটা গ্রুপের সাথে পাঠিয়েছে বেড়াতে। আগে কখনো পাহাড় দেখেন নি, মুগ্ধতার রেশ ওঁর চোখেমুখে, হাতেপায়ে কিশোরীর চঞ্চলতা। টিশার্টগুলো দেখলেন নেড়েচেড়ে। বললেন পরার সাহস নেই, তবে দেখতে ভাল লাগে।

    মঙ্গলবারের সন্ধ্যাও জমজমাট। এর মধ্যে ক্যাফের নীচের স্থায়ী ভৌ দুজন গাবলু আর গুবলু গটগট করে উপরে এসে দিব্বি ক্যাফের ঠিক মাঝখানটিতে বসে ল্যাজ নাড়তে লাগলেন। খদ্দেররাও মহা খুশী হয়ে কেউ গাবলুর মাথা চুলকে দেন তো গুবলু গিয়ে তাকে নাক দিয়ে ঠেলে দেয়। গুবলুর গলা চুলকে দিলে দুজনেই আহ্লাদের ডিব্বা হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে পেট উলটে শুয়ে পড়ে। কফি খাবে কি লোকে ওদের সাথে খেলা করতে করতেই কফি ঠান্ডা হয়ে যায়। এবং অবধারিত 'ম্যাডাম থোড়া গর্ম কর দিজিয়ে না প্লীইজ।'

    ৮ জন আমেরিকানের এক দল এসে ঢুকল যার মধ্যে ৪ খানা বাচ্চা। একখানা তো বাচ্চা নয় রীতিমত চৌবাচ্চা। এই বুদ্ধিস্ট পতাকা ধরে ঝুলছে এই দিদির চুল টানছে এই বাপের টাকে তবলা বাজাচ্ছে পরক্ষণেই চিনি আর স্যস উলটে ফেলছে। তাঁদের প্রথম প্রশ্ন এই ক্যাফেতে কোনরকম মাংস সার্ভ করা হয় কি? হয় না শুনে নিশ্চিন্তে জাঁকিয়ে বসলেন। দলের কর্তা ভদ্রলোক বেশ বুঝদার টাইপ। একটু দেরী হলেও তেমন কিছু মাইন্ড করেন না। এই ভদ্রলোক আবার ২৩ তারিখেও সকাল বিকেল দুবেলাই এসে নানা কিছু প্যাক করিয়ে নিয়ে গেছেন। আমাকে স্পেশ্যালি ধন্যবাদ দিয়ে গেছেন ওঁদের নানা আবদার মেনে জিনিষপত্র দেবার জন্য।

    আমার মত মাথা গরম পাবলিক যে এঁদের বায়নাক্কা সামলেছে ঝামেলা না করে তাতে নিজেই বেশ অবাক হলাম। অভিজ্ঞতা ভালই হচ্ছে বলতে হবে। দেখা যাক আগামী কদিনে আর কী কী অভিজ্ঞতা হয়।
     
    *imagebbতে ছবি তোলা যাচ্ছে না কাজেই ছবি বাদ।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ০ | ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ | ৭
  • ভ্রমণ | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন।