

অলংকরণ: রমিত
৫
সকালে শীতের আমেজটা না কাটতেই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বেশ হাড়-কাপানো কনকনে উত্তুরে হাওয়া। শালটা জড়িয়ে নজরুল বেরিয়ে এলেন। সৌম্যদর্শন এক যুবক, হয়ত তাঁরই সমবয়সী হবে, কিছু জিগ্যেস করার আগেই বলে উঠলেন, ‘কাজীদা, আমার নাম তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। হেমন্তদা আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য আমাকে পাঠালেন’ -- বলেই নজরুলকে প্রণাম করতে এগিয়ে এলেন। তৎক্ষণাৎ তাকে ধরে ফেললেন নজরুল – সেকি হে! বামুনের ছেলে হয়ে আমাকে প্রণাম করছ, তোমার জাত যাবে না? উত্তর তিনি নাটকীয় কায়দায় বললেন --- আপনি তো আমাদের বামুন। সুতরাং জাত যাবার কোনও চান্স নেই!
‘তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলো হে তারকদাস’ --- হো হো করে হেসে উঠলেন নজরুল। ‘আর কাজীদা বলার পরে আপনি আজ্ঞে করার কোনও দরকার নাই। চলো কোথায় যেতে হবে।‘
লাগোয়া বারান্দা মিলে বৈঠকখানায় বেশ অনেকটা জায়গা। আট-দশজন অল্প বয়সী যুবক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। শীতের সকালেও বেশ মানুষজনের ভিড়। গ্রাম থেকে আসা কিছু মানুষজন ঘিরে কথা বলছে হেমন্তদার সাথে। কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করা নেতা, তাঁর কাছে গ্রামের সাধারণ মানুষ ভিড় করে থাকবে --- সেটাই তো স্বাভাবিক। ভালো লাগলো নজরুলের।
- দাদা এই সাত সকালেই বেশ জমাটি আসর দেখছি !
নজরুল না ঢুকতে ছেলে ছোকরাদের মধ্যে একটা শোরগোল উঠলো ‘কাজীদা এসেছে !’
- বিদ্রোহী কবি শহরের এসেছে, সুতরাং আসর তো জমবেই ! তাতে হিম পড়ুক আর বরফ পড়ুক।
হেমন্ত সরকার কথা শেষ করার আগেই ছেলেদের একজন নজরুলের জন্য তাঁর পাশে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
- দেখো, তোমার ব্যাটেলিয়ান দল তৈরি। এই হচ্ছে তারক …..
- হ্যাঁ তারকদাস বন্দোপাধ্যায়।
- এরমধ্যে পরিচয় হয়ে গিয়েছে? বিস্ময়ের সুরে বললেন হেমন্ত সরকার।
- শুধু পরিচয় নয়, বেশ চমক দিয়ে কথা বলতে পারে তারও পরিচয় পাওয়া গেছে! সাতসকালে সেই তো আমাকে ডাকতে গিয়েছিল। এই বলে নজরুল তারকদাসের প্রণামের বিবরণ দিলেন। বলার ভঙ্গিতে বৈঠকখানায় একটা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।
হেমন্ত সরকার বললেন --- বুঝলে কাজী, লোকে বলে কেশনগরে কথার চাষ হয়। এখানকার মানুষ সোজা কথাটাও বাঁকিয়ে বলে। যাইহোক, এখানে তারকই হচ্ছে তোমার লোকাল গার্জেন। তোমার যাবতীয় প্রয়োজন আর দরকারি কাজকর্মের কথা ওকেই বলবে, বুঝলে তো? বাকিগুলোর ভরসা নাই, সব টোটো কোম্পানি।
হেমন্তদার বলার ভঙ্গিতে নজরুল যা বোঝার বুঝে ফেললেন। কৃষ্ণনগর এমনিতেই স্বদেশীদের ঘাঁটি। এর মধ্যে অনন্তহরি মিত্র গ্রেপ্তার হবার ফলে শহরজুড়ে একটা চাপা উত্তেজনা চলছে। তার উপর নজরুলের উপস্থিতি মানেই আশেপাশে নির্ঘাৎ পুলিশের টিকটিকি ঘোরাঘুরি করবে।
- আর এই যে দুই মূর্তি, মঘা, মানে প্রমোদ আর গোবিন্দ -- এরা তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। বডিগার্ডও বলতে পারো। তবে একটু সাবধানে থেকো, কখন যে কোথায় ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে তার ঠিক নাই। প্রমোদ আর গোবিন্দ সঙ্গে সঙ্গে হইচই করে উঠল। 'হেমন্তদা, মিছে বদনাম দিচ্ছেন। আর তো কোনও ঝুটঝামেলা করিনি।
- করোনি বটে, তবে করতে কতক্ষণ! এই সেদিন নবদ্বীপের শ্মশানে যা কান্ড করে এসেছিস তোরা। আমি তো ভয়ে ভয়ে থাকি। বুঝলে কাজী, সৎকার সমিতি তৈরি হবার পর থেকে শহরের সব মড়া পোড়ানোর দায় যেন এই ছেলেগুলোর উপর এসে পড়েছে। আর এরাও তেমন --- যেখানে যাবে সেখানেই কিছু না কিছু কাণ্ড বাধাবে।
নজরুল উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, 'ভালো ছেলে দিয়ে আর কাজ হবে না দাদা। শ্মশানে গিয়ে তান্ডব করবে --- দেশে এখন এইরকম দুষ্টু ছেলেরই বেশি দরকার। নজরুলের সমর্থন পেয়ে ছেলেরা উচ্ছ্বাসে হইহই করে উঠল। হেমন্ত সরকার দক্ষ পরিচালকের ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'শোনো, নতুন দল গঠন করেছি। খদ্দের চরকা আর অসহযোগ যাই বলিস, সবই ঘুরে ফিরে সেই জমিদার জোতদার আর শহরের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু দেখেনা। সাধারণ কৃষক খেতমজুরদের কথা কেউ ভাবে না। এদের ভিতর থেকেই আমাদের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। আগামীতে কৃষ্ণনগরে বড় করে সম্মেলনের ভাবনা আছে। কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনও এবার এখানে হবার কথা। কাজী এসেছে, তাকে এসবের অনেক কিছুই সামলাতে হবে। তার জন্য তোদের ফুল সাপোর্ট দিতে হবে। তারকের উপর পুরো বিষয়টা দেখাশোনার ভার থাকবে। কিরে, ঠিক আছে তো?
নজরুল পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তারক দাসের পিঠে একটা থাবড়া মেরে বললেন, 'দাদা তারকদাসের উপর তো গুরুভার চাপিয়ে দিলেন! অবশ্য আমার আর সেই ওজন নেই, অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। ছেলেদের ভিতর একজন বলে উঠল, 'তারকদা আমাদের গুরুদেব কাজীদা। ও ঠিক সামলে নেবে।'
নজরুল দেখলেন গোবিন্দ। দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক। দেখে মনে হলো না এরকম একটা সৌম্য যুবক শ্মশানে গিয়ে মারামারি করতে পারে।
'এবারে রাধা, তোদের সাথেও কথাবার্তা গুলো হয়ে যাক'।
গ্রাম থেকে আসা মাঝবয়সী ৬-৭ জন মানুষ এতক্ষণ নীরব দর্শক হয়েই বসেছিলেন। অবশ্য চোখ মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে চলতে থাকা আলাপচারিতা ও রঙ্গ-তামাশা তারা আগ্রহ সহকারেই উপভোগ করছিলেন। তাদের দিকে ইঙ্গিত করে হেমন্ত সরকার বললেন, 'বুঝলে কাজী, রাধাকান্ত আমাদের বাগআঁচড়া-শান্তিপুর এলাকার মানুষ। আমাদের আসল কাজ তো শহরে নয়, গ্রামের ভিতরে। এর মধ্যেই ওরা কাজ শুরু করে দিয়েছে। তুমি আসার সংবাদে ওরা ভোর না হতেই রওনা দিয়ে চলে এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। সবচেয়ে কম বয়সী, কুচকুচে কালো বলিষ্ঠ চেহারার মানুষটি তুষের চাদরখানা আরেকবার জড়িয়ে কিছু বলতে যাবার আগেই নজরুল বলে উঠলেন, 'রাধাকান্ত? আমি তো ভাবছিলাম কৃষ্ণকান্ত!'
আরেক দফা হাসির রোল উঠল। রাধাকান্ত নিজেও বিগলিত হাসি হেসে উঠে দাঁড়ালেন। চাদর সামলে একেবারে যাত্রাপালার ঢঙ্গে জোড়হাতে অর্ধনত হয়ে বললেন,'হাবিলদার কবি সাহেবকে আমাদের প্রণাম। দাদা তো সবই বলেছেন। আমরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে নতুন সংগঠনের কথা প্রচার করছি। মুখে বেশি কথা বলার দরকার হয় না, লাঙলের কপি আর সাম্যবাদীর একটা কবিতা শুনিয়ে দিলেই যথেষ্ট। আমার তো চার-পাঁচখানা কবিতা বলতে বলতেই মুখস্ত হয়ে গিয়েছে।
বিস্মিত নজরুল বললেন, 'বলো কী হে?'
রাধাকান্ত একই ভঙ্গিতে বললেন হেমন্তদার কাছে আমাদের নিবেদন --- কাজী সাহেবকে নিয়ে একবার বাগআঁচড়ায় আসুন। আমরা তাঁকে নিয়ে গ্রামে ঘুরব। গ্রামের মানুষের সামনে কবি সাহেব তাঁর সাম্যবাদীর যে কোনো একটা কবিতা বললেই যথেষ্ট --- আমাদের নতুন করে প্রচার করার দরকার হবে না। আরেকটি কথা উল্লেখ করি, কাজী সাহেব উল্লেখ করেছেন তাঁর ওজন অর্ধেক হয়ে গিয়েছে --- এই কথাটা আমরা মানতে পারলাম না। আপনার ওজন কৃষ্ণনগরে এসে দ্বিগুণ বেড়ে যাবে এ আমরা নিশ্চিত, আমাদের গ্রামে এলে তার প্রমাণ আপনি পেয়ে যাবেন।'
--- দাদা ওজনের প্রমাণ কী হবে তা জানি না কিন্তু কথার চাষ এখানে যে ভালোই হয় --- সে প্রমাণ আমি হাতে হাতে পেয়ে গেলাম।
নজরুলের কথা থামিয়ে দিয়ে হেমন্ত সরকার বললেন --- 'সবে তো একটা দিন এসেছ। কেশনগরে আরো কত কিছু দেখতে পাবে। যাইহোক, আজ এই পর্যন্তই থাক। তোমাকে ডাক্তার দে'র কাছে আগে নিয়ে যাওয়া একটা বড় কাজ। গ্রামেগঞ্জে ঘোরাঘুরি অনেক কাজ বাকি আছে, কিন্তু শরীরটা তো সর্বাগ্রে ঠিক করতে হবে। তারক, ডাক্তার দে'র চেম্বারে তুই বলে যাস, আমি দুপুরের পরে কাজীকে নিয়ে যাব। আর শিবেন কোথায়?
লিকলিকে চেহারার একটি ছেলে পিছন থেকে উঁকি দিল --- এই তো দাদা আছি!
হেমন্ত সরকার বললেন, 'শিবেন, বাকিদের তো বাইরে বাইরে কাজ, তোর ডিউটি কিন্তু কাজীর অন্দরমহলে। রোজ সকালে একবার করে মাসিমার কাছে গিয়ে খোঁজ নিবি বাজারহাট ইত্যাদি কী কী দরকার। ও দায়িত্বটা তোর।
- ঠিক আছে দাদা। ঘাড় নেড়ে শিবেন সায় দিল।
- তাহলে এখনই কাজ শুরু করে দে। গিয়ে মাসিমার সাথে একবার দেখা করে আয়, নতুন জায়গা --- নিশ্চয়ই অনেক কিছু দরকার হবে।
- ও আর একা একা যাবে কেন? আমিও আসছি দাদা, পরে আবার কথা হবে। রাধাকান্ত, দেখা হবে পরে।
নজরুল উঠে দাঁড়ালেন। হেমন্ত সরকার বললেন, 'বিকেলে ডাক্তারবাবুর কাছে যাব, রেডি থেকো'।
শিবেনকে নিয়ে নজরুল বেরিয়ে পড়লেন।
৬
কৃষ্ণনগরে শীতের দুপুর বলে বোধহয় কিছু হয় না। এমনিতে খ'ড়ে নদীর কুয়াশা সারা সকাল গোয়াড়ি বাজারকে চাদরের মতো ঢেকে থাকে। একটু বেলা হলে সূর্যদেব মুচকি হেসে রাজবাড়ির উপর খানিক আলো বিছিয়ে টুক করে চার্চের দিকে হেলে পড়েন। স্নান-খাওয়া সেরে আয়েশ করে রোদ পোহানোর জন্য ছাদে উঠতে না উঠতেই দুপুরটা বিকেল হয়ে যায়।
নজরুলের নতুন বাসায় অবশ্য ছাদে ওঠার সুযোগ নেই। ঘর বারান্দা উঠোন নিয়ে জায়গা অনেকটা, কিন্তু উপরের অংশে গৃহকর্তা হেমন্ত সরকারের দাদা জ্ঞান সরকারের সংসার। ভিতর বারান্দা দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি আছে, কিন্তু খুব দরকার ছাড়া ব্যবহার হয় না। রাস্তার দিকে জ্ঞান সরকারের হোমিওপ্যাথি চেম্বার আর তার পাশ দিয়ে সরাসরি দোতলায় ওঠার সিঁড়ি আছে। অবশ্য কাল থেকে ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে জ্ঞান সরকারের স্ত্রী তিন-চার বার ওঠানামা করেছেন। দাঁড়িয়ে থেকে কাজের মেয়েকে দিয়ে কলতলা, উঠোন, রান্নাঘর সব পরিষ্কার করে দিয়েছেন। শিবেনকে দিয়ে গোয়াড়ি বাজার থেকে তেল-নুন, তরি-তরকারির পাশাপাশি একটা উনুন আর কয়লাও আনিয়ে দিয়েছেন। হাই স্ট্রিটে তারক দাসের নিজের কয়লার দোকান আছে, খবর দিলেই কয়লা পৌঁছে দিয়ে যাবে।
নজরুল বিস্ময়ের চোখে গিরিবালা দেবীকে দেখছিলেন। কী আশ্চর্য দক্ষতায় একদিনের মধ্যে উপরের বৌদি, তাঁর কাজের মেয়ে, আর শিবেনকে নিয়ে সংসারটিকে গুছিয়ে ফেলেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আশপাশের মানুষজনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারা, তাদের দিয়ে সংসারের দরকারি টুকটাক কাজ করিয়ে নেবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে মাসিমার। বিয়ের পর থেকে সংসারের যাবতীয় হাল তিনিই ধরে রেখেছেন। অভাব অনটন আর সংসারের পারিপার্শ্বিক ঝামেলার প্রায় পুরোটাই তিনি একা হাতে সামলেছেন - দোলনের গায়ে আঁচ লাগতে দেননি।
বিয়ের পরেই বা কেন? তার আগে থেকেই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনিই নিয়েছেন। বহরমপুর জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ঘন ঘন কান্দিরপাড় যাওয়া, শহর জুড়ে তির্যক কানাকানি, গুঞ্জন - তার সঙ্গে দোলনের প্রায় হিতাহিত জ্ঞান-শূন্য প্রেম, মুগ্ধতা - এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে সরাসরি নজরুলকে জিগ্যেস করেছিলেন - "নুরু, তুমি কি সত্যিই অন্তর থেকে দুলিকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত আছ"?
এরকম একটা সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে কোনও ক্ষোভ প্রকাশ নয়, হা-হুতাশ নয়, লজ্জায় মুষড়ে পড়া নয় - স্পষ্ট করে নজরুলের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, ইচ্ছেটা জানলেন। বলা ভালো স্বীকারোক্তির সাথে একপ্রকার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলেন। তারপর আর দ্বিতীয় বার না ভেবে ঘোষণা করে দিলেন সিদ্ধান্ত - "ঠিক আছে, তুমি ব্যবস্থা কর, আমি বিয়ে দেব। দুলির কথা ভেবে আমরা দু'জনেই সাগরে ঝাঁপ দিচ্ছি - এই কথাটা শুধু তুমি মনে রেখো"।
দৃঢ় এবং স্পষ্ট উচ্চারণ। যেমন জেদ, তেমনি সাহস। কুমিল্লা জুড়ে সেনগুপ্ত পরিবারকে কে না চেনে! ভাসুরের পরিবারে আশ্রিতা বিধবা ভ্রাতৃবধূ - সেই পরিবারেরই আভিজাত্য আর মান-সম্মানের উপর কলঙ্ক লেপন করার অপরাধ মাথায় নিয়েও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে মেয়েকে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন - একাই - চালচুলোহীন বাউন্ডুলে এক কবির ভরসায়। শ্রদ্ধার সাথে একরকম অপরাধবোধে গিরিবালা দেবীর সামনে মাথাটা নত হয়ে আসে নজরুলের। ঘরে সদ্য সন্তানহারা কন্যা, তার সঙ্গে ম্যালেরিয়া প্রকোপে মরণাপন্ন অভাবী জামাতা - এরকম অবস্থায় অচেনা এক শহরে কোথা থেকে ধার-দেনা করে কিভাবে যে তিনি সংসার চালাতেন - ভেবে অবাক হওয়া ছাড়া কিছু মাথায় আসত না। প্রাণতোষ মইনুদ্দীনেরা বাধ্য ছেলের মত মাসিমার এটা-সেটা সব ফাই-ফরমাস শুনে যেত। এখানে যাওয়া, ওখানে যাওয়া, ওষুধ নিয়ে আসা, বরফ জোগাড় করা - বিনা বাক্যে তারা মাসিমার সব নির্দেশ পালন করে যেত। কৃষ্ণনগরে ওদেরকে আর কাছাকাছি পাওয়া যাবে না - কথাটা মনে হতে একটা শূন্যতা ভেসে উঠল।
কিন্তু সেই শূন্যতাকে ছাপিয়ে উঠোন জুড়ে নতুন সংসারের কলরব ভেসে এলো। উপরের কাজের মেয়েটিকে দিয়ে মাসিমা অনেক কাজই করিয়ে নিচ্ছেন। কথা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে এপাশ ওপাশ ঝাড়ু দেওয়া, ইঁদারা থেকে জল তুলে দেওয়া - মেয়েটি করেও দিচ্ছে বেশ। হয়ত উপর থেকে বলাও হয়েছে সেরকম। নতুন জায়গায় সংসার পাতা - প্রথম প্রথম কত কী দরকার হবে। মাঝবয়সী, ভারি চেহারা, কাজকর্মে হাতও চলে ভালো। তবে হাতের চেয়ে তার মুখ চলে দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে। উঠোন থেকে বারান্দা পেরিয়ে তার উচ্চকণ্ঠ আত্মবিবরণী নির্দ্বিধায় ঘরের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে - স্বামী কলকাতার খিদিরপুরে কাজ করতে গিয়ে দ্বিতীয় সংসার পেতেছে, ঘরের খবর নেয় না, দুটো বাচ্চা আর সোমত্ত বউ রেখে বড়ো ছেলে মরে গিয়েছে, তিওরখালিতে মেয়ের বিয়ে হয়েছে, শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচার, প্রায়ই এসে মায়ের কাছে থাকে, ছোটো ছেলে জোগাড়ের কাজ করে কিন্তু বাউণ্ডুলে, পুরো সংসার তাকেই সামলাতে হয়, তাই বলে কারো কাছে ফেৎরা চাইতে যায় না, কাজের বাড়ি থেকে না বলে কোনোদিন একমুঠো চাল নিয়ে গিয়েছে - পচার মাকে এই বদনাম কেউ দিতে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
পচার মায়ের উচ্চকণ্ঠ পাঁচালি শুনতে শুনতে গিরিবালা দেবী কাপড় শুকানোর দড়ি টাঙানোর ব্যবস্থা, কলতলায় কয়েকটা ইঁট পেতে দেওয়া ইত্যাদি খুচরো অথচ দরকারি কাজ করিয়ে নিচ্ছিলেন। দোলনের কিন্তু সেসব নিয়ে তেমন ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। আলনায় জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, তক্তপোশে তোষক, চাদর টান করে ঠিকঠাক বিছানো ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত। কাল রাতে যেমন তেমন করে ঘুমিয়ে পড়েছিল, অতটা সময় পায়নি। বড় ঘরটি দোলনের বেশ পছন্দ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। জামাকাপড় বিছানাপত্র তো অল্পই - তাই দিয়েই তার ঘর সাজানোর প্রচেষ্টা দেখে নজরুলের ভালো লাগল। কান্দিরপাড়ে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যের ভিতরেই বড়ো হয়েছে, অভাব কাকে বলে চোখে দেখেনি। বিয়ের পর থেকে নজরুল তাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া তো দূরের কথা, এখনো ভালো করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাটাও করে উঠতে পারেননি। তবু এতো অনটনের ভিতরেও দোলন মুখফুটে কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেনি, কষ্টের কথা বলেনি। আজ অনেকদিন পরে প্রাণপ্রিয় প্রমীলার মুখচোখে খুশির খানিক আভাস দেখে হেমন্তদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নজরুলের মনটা আর্দ্র হয়ে উঠল।
হেমন্তদার কথা ভাবতে না ভাবতেই বাইরে থেকে তারক দাসের গলা ভেসে এলো - "কাজিদা, ডাক্তারের চেম্বারে যেতে হবে। হেমন্তদা অপেক্ষা করছেন"!
নজরুল মনে মনে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন৷ শীতের টুপিটা মাথায় দিয়ে বেরোনোর উদ্যোগ নেবার আগেই প্রমীলা দেবী সামনে এসে দাঁড়ালেন।
শালটা টেনে ঠিক করে দিতে দিতে বললেন - "ডাক্তারকে সব কথা ঠিক করে বলবে, কোনো কথা লুকাবে না। পেটে ব্যথার কথাটাও বলবে। আমি কি যাব তোমার সঙ্গে"?
নজরুল প্রমীলাকে কাছে টেনে নিলেন। একমুহূর্ত চোখে চোখ রেখে হেসে বললেন, "চিন্তা কোরো না, সব ঠিকঠাক বলব। হেমন্তদা তো সঙ্গে আছেন। তোমাকে যেতে হবে না"।
নজরুল বারান্দার দরজা খুলে পথে বেরিয়ে এলেন। তারকদাস দাঁড়িয়েই ছিলেন। দুজনে এগিয়ে গেলে প্রমীলা নিঃশব্দে দু'হাত জড়ো করে কপালে ঠেকালেন - অদৃশ্য অদৃষ্টের উদ্দেশ্যে।