এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  পরিবেশ  শনিবারবেলা

  • কুলেম মোলেম:পরিবেশগত বিতর্ক প্রতিরোধ ও আইনি লড়াই

    দময়ন্তী
    আলোচনা | পরিবেশ | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • ছবি: রমিত 

    ছবিসূত্রঃ- https://www.techforwildlife.com/mollem-storymap



    কুলেম মোলেম অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচিতি

    মনে আছে চেন্নাই এক্সপ্রেস সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে ট্রেন একটা রেলব্রিজের উপরে আচমকা থেমে যায়, শাহরুখ আর দীপিকা নেমে আসে, পিছনে সুবিশাল চার স্তরের এক জলপ্রপাত, যার জলের ধারা দেখে মনে হচ্ছে দুধের নহর গড়িয়ে আসছে। দুধসাগর ফলস। গোয়া আর কর্ণাটকের সীমানায় অবস্থিত এই মস্তবড় জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছাতে গেলে যে এলাকার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সেটাই হল মোলেম জাতীয় উদ্যান ও ভগবান মহাবীর অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্যের ভেতরেই একটি ছোট গ্রাম ও তৎসংলগ্ন রেল স্টেশান হল কুলেম। গোয়ার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, কর্ণাটক সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত মোলেম জাতীয় উদ্যান (Mollem National Park) ও ভগবান মহাবীর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Bhagwan Mahaveer Wildlife Sanctuary) পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্তর্গত ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল (Biodiversity Hotspot)। গোয়ার রাজধানী পানাজি থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বনাঞ্চল ঘন চিরহরিৎ ও অর্ধ চিরহরিৎ বনভূমি নিয়ে গঠিত, যেখানে বাঘ, চিতাবাঘ, গাউর (ভারতীয় বাইসন)সহ ২০০র বেশি প্রজাতির পাখি ও অসংখ্য উভচর ও সরীসৃপ প্রজাতির বাস। এই অঞ্চলটি মহারাষ্ট্র গোয়া ও কর্ণাটকের মধ্যে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঘ যাতায়াতপথের অংশ। কুলেম রেলস্টেশনটি এই সংরক্ষিত এলাকার প্রান্তে অবস্থিত এবং কাস্‌লরক (কর্ণাটক) কুলেম মাডগাঁও রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কুলেম মূলত একটি ছোট শহর ও রেলওয়ে স্টেশন, যা বিখ্যাত দুধসাগর জলপ্রপাতে যাওয়ার প্রধান জিপ সাফারি বা ট্রেকিঙের যাত্রা শুরুর স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে মোলেম হলো জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার। [১] 

    প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ


    কুলেম ও মোলেম অঞ্চল প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ। এখানকার প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে:

    ভগবান মহাবীর অভয়ারণ্য (Bhagwan Mahaveer Sanctuary): 
    এটি গোয়ার বৃহত্তম অভয়ারণ্য যা প্রায় ২৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ঘন পর্ণমোচী ও চিরহরিৎ বনে ঘেরা এই অভয়ারণ্যটি চিতা, হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং দুর্লভ উদ্ভিদের আবাসস্থল।

    মোলেম জাতীয় উদ্যান (Mollem National Park): 
    ভগবান মহাবীর অভয়ারণ্যের কেন্দ্রস্থলে ১০৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে এই জাতীয় উদ্যানটি গঠিত। পরিবেশপ্রেমী এবং গবেষকদের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি স্থান।

    দুধসাগর জলপ্রপাত (Dudhsagar Waterfalls):
    ভারতের অন্যতম উচ্চ এবং সুন্দর জলপ্রপাত দুধসাগর। চার ধাপে নেমে আসা এই জলপ্রপাতের শুভ্র জলধারা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পাহাড়ের কোল বেয়ে দুধ গড়িয়ে পড়ছে। কুলেম থেকে জিপ সাফারি বা ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে এখানে পৌঁছানো যায়। [২] 

    তাম্বদি সুরলা মন্দির (Tambdi Surla Temple):
    দ্বাদশ শতাব্দীতে কদম্ব রাজবংশের আমলে নির্মিত এই শিব মন্দিরটি গোয়ার প্রাচীনতম সংরক্ষিত মন্দির। সম্পূর্ণ কালো ব্যাসাল্ট পাথরে খোদাই করা এই মন্দিরটি গভীর বনের মধ্যে অবস্থিত এবং এটি প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।

    পরিবেশ সংক্রান্ত বিরোধ ও 'Save Mollem' আন্দোলন

    ২০২০ সাল নাগাদ সরকারের মনে হল পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় এই জায়গায় এবারে একটু ‘উন্নয়ন’ করা যাক। করোনাকালীন লকডাউনের সময় ভারত সরকারের ন্যাশনাল বোর্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ (NBWL) অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে কুলেম ও মোলেম সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে তিনটি অবকাঠামোগত প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। এই প্রকল্প তিনটি হলো:

    ১) সিঙ্গল ব্রডগেজ রেলকে ডাবল লাইন করা: 
    কর্ণাটকের কাস্‌লরক থেকে গোয়ার কুলেম পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইন বর্তমানে সিঙ্গল লাইন। এই অংশে সমান্তরালে দ্বিতীয় লাইন বসিয়ে রেলপথের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হল। পুরো হুবলি – লোন্দা – ভাস্কো দা গামা রুটের ৩৬৩ কিমি লাইনকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের অংশ এটি। এর মধ্যে ২৮৮ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তিনাইঘাট – কাস্‌লরক - কুলেম – সানভোরদেম অংশটি এখনো একক লাইন হিসাবে রয়ে গেছে। আসলে এই অংশটি ভগবান মহাবীর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও মোলেম জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যায়। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ দেখে উৎসাহিত মানুষজন অনেকেই কাস্লরক স্টেশানে নেমে রেললাইন বরাবর হেঁটে দুধসাগর দেখতে চলে যান। একক লাইন হওয়ায় এবং মাঝে একটি অন্ধকার টানেল থাকায় দুর্ঘটনা যথেষ্ট বেড়ে যায়। রেললাইনে হাঁটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরেও দুর্ঘটনার সংখ্যা শুন্যে নামানো যায় নি। এখানে ডাবল লাইন হলে এটার খানিক সুরাহা হবে বলেই মনে হয়। 

    কিন্তু সংরক্ষিত বনভূমির মধ্য দিয়ে ডাবল লাইন করাটা পরিবেশবিদেরা একেবারেই অনুমোদন করছেন না। এর জন্য বনভূমি প্রয়োজন প্রায় ১৩৮.৩৭ হেক্টর। গাছ কাটা পড়বে: প্রায় ২২৮৮২টি, এর মধ্যে ২০৭৫৮টি সংরক্ষিত এলাকা থেকে। আনুমানিক ব্যয়: প্রায় ৫০৪ কোটি টাকা। খাতায় কলমে উদ্দেশ্য হল মোরমুগাঁও বন্দর (MPT) থেকে কয়লা পরিবহণ ক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে একটি লাইনে সীমাবদ্ধ ক্ষমতা (প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন/বছর) JSW ও আদানির কয়লা টার্মিনালের প্রয়োজনীয় ক্ষমতার (প্রায় ১৯ মিলিয়ন টন/বছর) তুলনায় অপ্রতুল বলে প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়। আদানি গ্রুপ অবশ্য নভেম্বর ২০২০-এ টুইট করে এই প্রকল্পে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের দাবি অস্বীকার করে। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই প্রকল্পের বন্যপ্রাণী ছাড়পত্র বাতিল করে। তিনটির মধ্যে এটিই একমাত্র প্রকল্প যা সরাসরি আদালতের আদেশে থমকে যায়, এবং এখনও সেই অবস্থাতেই আছে। [৩] 

    ২) জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ: 
    জাতীয় সড়ক NH-4A চার লেনে উন্নীত করা। কর্ণাটক সীমান্তের আনমোদ থেকে মোলেম হয়ে অভয়ারণ্যের ১৩ কিলোমিটার অংশ চার লেন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর জন্য বনভূমি প্রয়োজন: প্রায় ৬৩.৬১৫ হেক্টর। গাছ কাটা পড়বে: প্রায় ২০৩৪০টি, এর মধ্যে ১২০৯৭টি সংরক্ষিত এলাকা থেকে। এর জন্য আনুমানিক ব্যয় প্রায় ১,৭৯৪ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য গোয়া-কর্ণাটক সংযোগকারী জাতীয় সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি। সংরক্ষিত বনভূমি অংশে সম্পূর্ণ উড়ালপথ (viaduct) নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়ে ছিল। CEC-র সুপারিশ অনুযায়ী EC ও প্রাণী চলাচলের ব্যবস্থা করার শর্তে ছাড়পত্র বহাল রাখা হয়েছে, বাতিল হয়নি। [৪] 

    ৩) গোয়া-তামনার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন: নতুন ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন:
    কর্ণাটকের ধারওয়াড় নরেন্দ্র থেকে গোয়ার জেলদেম সাবস্টেশন পর্যন্ত অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩.১৫ কিমি অংশে ৪৬ মিটার প্রশস্ত করিডোর বানাতে বনভূমি প্রয়োজন প্রায় ৪৮.৩ হেক্টর যার মধ্যে অভয়ারণ্য থেকে প্রায় ১১.৫৪ হেক্টর নিতে হবে। হিসেব করে দেখা গেছে এতে গাছ কাটা পড়বে ১৫৭৭২টি, যার মধ্যে ৪,১৩৯টি সংরক্ষিত এলাকা থেকে। আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৬.৮ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে গোয়া তামনার ট্রান্সমিশন প্রজেক্ট লিমিটেড (স্টারলাইট পাওয়ার)। CEC-র সুপারিশে বিদ্যমান পুরনো লাইন বরাবর রুট পরিবর্তন করার শর্তে অনুমোদিত। তিনটি প্রকল্পের মধ্যে এটির নির্মাণ কাজ সবচেয়ে আগে শুরু হয়েছিল।

    পরিবেশকর্মীদের মতে, এই তিনটি প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫৯০০০এরও বেশি প্রাচীন গাছ কাটা পড়ত। গোয়ার কয়লা পরিবহনের করিডোর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনাগুলো তৈরি করা হয়। এর প্রতিবাদে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের নেতৃত্বে "Save Mollem" (Amchem Mollem) এবং "Goyant Kollso Naka" আন্দোলন গড়ে ওঠে। মোট ছয়টি পৃথক বন ছাড়পত্র আবেদন (রেলের জন্য ৩টি, সড়কের জন্য ২টি, সঞ্চালন লাইনের জন্য ১টি) মিলিয়ে প্রায় ২৫০.৩ হেক্টর বনভূমি এবং ৫৯০২৪টি গাছের ক্ষতির হিসাব প্রথমে দেওয়া হয়েছিল। কোনো কোনো সূত্রে এই সংখ্যা কর্ণাটক অংশ মিলিয়ে প্রায় এক লাখ পর্যন্ত ধরা হয়েছে। লকডাউনের মধ্যে ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল স্ট্যান্ডিং কমিটি অফ ন্যাশনাল বোর্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ (SC-NBWL)-এর ৫৭তম বৈঠকে এই ছাড়পত্রগুলির বেশিরভাগ আলোচিত ও অনুমোদিত হয়, যা পরবর্তীতে সমালোচনার মূল কারণ হয়ে ওঠে। [৫] 

    সমালোচকদের মূল অভিযোগ ছিল:


    ১) লকডাউনের সুযোগে, জনপরিসরে বিতর্কের সুযোগ না দিয়ে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
    ২) বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও সড়ক প্রকল্পদুটি কোনো পূর্ণাঙ্গ বন্যপ্রাণী মূল্যায়ন (wildlife assessment) ছাড়াই অনুমোদিত হয়।
    ৩) পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) রিপোর্টগুলি অসম্পূর্ণ। রাজ্য প্রাণী (State animal) গাউরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি এবং বিরল স্থানীয় প্রজাতি যেমন Goan Shadow Dancer ড্রাগনফ্লাই পর্যালোচনা থেকে বাদ পড়ে।
    ৪) ২০২০ সালের মে মাসে একজন বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানীর ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম ব্যাপক জনপরিসরে আসে।

    আন্দোলনের সূচনা ও বিস্তার

    Amche Mollem (আমাদের মোলেম) বা My Mollem নামে পরিচিত নাগরিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যাতে যুক্ত হন পরিবেশবিজ্ঞানী, শিল্পী, আইনজীবী, ছাত্র, চিকিৎসক, স্থপতি, কৃষক ও সাধারণ নাগরিক। উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রম সাজালে দেখতে পাই 

    ১) ৫ জুন ২০২০ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সারা দেশ থেকে ১৫০ জন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সংরক্ষণবিদ কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে চিঠি লিখে প্রকল্পগুলি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

    ২) অনলাইন প্রচারাভিযান শুরু হয়। Change.org-এ ৭০,০০০-এর বেশি স্বাক্ষর, Let India Breatheএর মাধ্যমে ৭,০০০-এর বেশি ইমেইল প্রতিনিধিত্ব, ওয়েবিনার, শিল্পকর্ম ও সামাজিক মাধ্যম জুড়ে প্রচার শুরু হয়।

    ৩) ১৫ আগস্ট ২০২০ স্বাধীনতা দিবসের দিন গোয়া জুড়ে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসুচী অনুষ্ঠিত হয়। 

    ৪) ১ নভেম্বর ২০২০ চান্দোরের যুদ্ধ (Battle of Chandor) শুরু হয়। মধ্যরাতে হাজার হাজার মানুষ চান্দোরে রেললাইনে বসে পড়ে প্রতিবাদ জানান, যা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে। প্রায় ৫,০০০ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন বলে জানা যায়। প্রতিবাদীদের অভিযোগ ছিল গোয়াকে "কয়লা হাব"-এ পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে। মোরমুগাঁও বন্দর থেকে কর্ণাটকের ইস্পাত কারখানায় কয়লা পরিবহণের সুবিধার জন্যই এই প্রকল্পগুলি আনা হয়েছে। এর প্রতিবাদে "Goyant Kollso Naka" ‘গোয়ায় কয়লা চাই না” স্লোগান জনপ্রিয় হয়।

    ৫) এই আন্দোলনে ধর্মীয় নেতৃত্বও যুক্ত হয়। চিকালিম গ্রামের যাজক ফাদার বোলম্যাক্স গির্জার মাধ্যমে প্রচারে অংশ নেন এবং Goencho Ekvott (গোয়ার ঐক্য) নামে একাধিক পরিবেশ ও নাগরিক সংগঠনের জোট গঠিত হয়।

    ৬) রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া হয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং গোয়া কংগ্রেস ২০২২ বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে প্রকল্প বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসেনি। 

    এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
    ড. ক্লদ আলভারেস (Dr. Claude Alvares): পরিবেশবাদী সংগঠন Goa Foundation-এর প্রধান, যিনি সুপ্রিম কোর্ট ও আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। [৬] 
    অভিজিৎ প্রভুদেসাই: পরিবেশবাদী দল Rainbow Warriors-এর অন্যতম প্রতিনিধি।
    ক্যাপ্টেন বিরিয়াতো ফার্নান্দেস (Capt. Viriato Fernandes): আন্দোলনকারী সংগঠন Goencho Ekvott-এর অন্যতম সংগঠক।
    যুব ও নাগরিক সমাজ: তরুণ শিক্ষার্থী, শিল্পী, গবেষক, পরিবেশবিদ (যেমন- ইভানথিকা পেরেরা, ফ্রা. বলম্যাক্স পেরেরা) এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা একযোগে ডিজিটাল শিল্পকলা ও সরাসরি সমাবেশের মাধ্যমে এতে নেতৃত্ব দেন।

    বিরোধিতা দমনে প্রশাসনের পদক্ষেপ

    সরকার ও প্রশাসন আন্দোলন দমনে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল

    শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের আটক: ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে গোয়া মুক্তি দিবসে পানজিম চার্চের সামনে থেকে শান্তিপূর্ভাবে ব্যানার ও ফুল নিয়ে প্রতিবাদরত শিশু ও তরুণদের আটক করে পুলিশ। তাদের বাসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।
    এফআইআর (FIR) ও আইনি মামলা: আন্দোলনকারী সংগঠন 'Goyant Kolso Naka' ও 'Goencho Ekvott'-এর প্রধানদের বিরুদ্ধে বেআইনি সমাবেশ, দাঙ্গা সৃষ্টি ও চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
    বহিরাগত ফান্ডের অভিযোগ: রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে এই আন্দোলন বাইরের দেশের উসকানিতে এবং রাজনৈতিক স্বার্থে চালানো হচ্ছে। 

    পরিবেশবিদদের প্রস্তাবিত বিকল্প পথ
    পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বন ধ্বংস না করে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন। তার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নীচে দেওয়া হল। 
    ● ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের জন্য নতুন লাইন বাতিল: পরিবেশবিদেরা প্রস্তাব করেন নতুন করে জঙ্গল না কেটে বিদ্যমান পুরনো বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের (Old Alignment) পথ ব্যবহার করে সেটা সংস্কার করেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পরিবাহিত করা।
    ● রেললাইনে ডাবল ট্র্যাক লাইন বাতিল: পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মতো সংবেদনশীল এলাকায় ডাবল লাইন না বসিয়ে বর্তমান রেকওয়ে ট্র্যাকের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। কয়লা পরিবহনের বিকল্প হিসেবে ক্লিন এনার্জি বা নৌপথ ব্যবহার করা।
    ● হাইওয়ে সম্প্রসারণ: পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সঠিকভাবে সম্পন্ন করে কেবল প্রয়োজনীয় অংশে বিদ্যমান রাস্তার কাঠামোর আধুনিকায়ন করা। 

    আদালতের হস্তক্ষেপ, স্থগিতাদেশ ও রায়

    আইনি লড়াই ও জনদাবীর মুখে গোয়া ফাউন্ডেশনের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিতি গঠন করে ও বিষয়টি এই অধিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি (Central Empowered Committee, CEC)কে খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়। ২৩ এপ্রিল ২০২১-এ জমা দেওয়া রিপোর্টে CEC জানায়:- 

    ● রেল ডাবল লাইন করার প্রকল্পের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি পশ্চিমঘাটের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করবে। জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের ছাড়পত্র প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। [৬] 
    ● বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের রুট পরিবর্তন করে বিদ্যমান পুরনো লাইন (১১০/২২০ কেভি) বরাবর নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। 
    ● সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র (EC) নেওয়া এবং প্রাণী চলাচলের জন্য রাস্তার উচ্চতা বাড়ানোর শর্ত আরোপ করা হয়। 

    অর্থাৎ, তিনটির মধ্যে কেবলমাত্র রেললাইন ডাবল করার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাতিলের সুপারিশ করা হলেও, বাকি দুটিকে পরিবর্তিত শর্তে চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়। এটি সম্পূর্ণ প্রকল্প-বিরোধী রায় ছিল না। 

    মার্চ ২০২১ এ এই CEC রিপোর্টের আগেই কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় (MoEF) রেল প্রকল্পের জন্য ১৪০ হেক্টর বনভূমি পরিস্কার করার অনুমোদন দিয়ে দেয়। অর্থাৎ প্রশাসনিক অনুমোদন ও বিচারবিভাগীয় সমালোচনা প্রায় সমান্তরালে চলছিল। পরবর্তীকালে জুলাই ২০২৪এ সুপ্রিম কোর্ট বোম্বে হাইকোর্টের একটি রায় বহাল রাখে, যাতে বলা হয় রেলপথে ডাবল লাইন বসানোর জন্য গোয়া উপকূল অঞ্চল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (GCZMA)র পূর্বানুমতি আবশ্যক নয়, প্রকল্পের পক্ষে যাওয়া এই রায় পরিবেশ সম্পর্কিত অনুমোদন নেবার ব্যপারটাকে হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। ২০২৫সালে সুপ্রিম কোর্টে রেল কর্তৃপক্ষ (RVNL/দক্ষিণ পশ্চিম রেল) (Wildlife Institute of India-র করা নতুন পরিবেশগত সমীক্ষা দাখিল করে দাবি করে প্রকল্পের সুফল ক্ষতির তুলনায় প্রায় ৪৩৬ গুণ। তারা পুনরায় ছাড়পত্রের আবেদন জানায়। 

    সুপ্রিম কোর্ট গোয়ার পাঁচটি অভয়ারণ্যের ৭৪৫ বর্গ কিমি এলাকা নিয়ে একটি পৃথক মামলায় বাঘ সংরক্ষণাগার ঘোষণার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে নতুন CEC নিয়োগ করে, যার রিপোর্ট ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে জমা পড়ার কথা ছিল। এই মামলা রেল প্রকল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, কারণ এলাকাটি একটি "trijunction tiger corridor" হিসেবে চিহ্নিত। ২০২৬এ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আঞ্চলিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি (Regional Empowered Committee, REC) বন ছাড়পত্রের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সরকারি প্রস্তাব স্থগিত রাখে। বোম্বে হাইকোর্ট (গোয়া বেঞ্চ) কালায় গ্রামে রেল সংক্রান্ত জমি অধিগ্রহণ চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একটি পিটিশন গ্রহণ করে শুনানির নির্দেশ দিয়েছে। 

    সারকথা হল আদালতের হস্তক্ষেপ প্রকল্পগুলিকে সম্পূর্ণ বাতিল করেনি, বরং রেল প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদী আইনি অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখেছে, আর বাকি দুটিকে শর্তসাপেক্ষ পথে পরিচালিত করেছে।

    আন্দোলন দমনে প্রশাসনিক পদক্ষেপ

    সাধারণভাবে আমরা দেখেছি আন্দোলন যত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, রাজ্য প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াও তত কঠোর হয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 

    প্রথম FIR দাখিল হয় নভেম্বর ২০২০তে। চান্দোর রেললাইন প্রতিবাদের পরপরই "Goyant Kolso Naka" ও "Goencho Ekvott" এই দুই সংগঠনের ছয়জন আহ্বায়কের বিরুদ্ধে বেআইনি সমাবেশ, চলাচলে বাধা এবং দাঙ্গা সংক্রান্ত ধারায় FIR দায়ের হয়। দক্ষিণ গোয়ার পুলিশ সুপার জানান বিষয়টি "বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হবে।‘
    ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ গোয়া মুক্তি দিবসের দিন প্রশাসনের তরফে সবচেয়ে কঠোর দমনপীড়ন চলে। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ গোয়া সফররত ছিলেন, সেইসময়ই Amche Mollem ও চিকালিম যুব সংগঠনের সদস্যরা পানজি চার্চ স্কোয়্যারে সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের বাসটি পথিমধ্যে আটকে দিয়ে পোন্ডার একটি থানায় সরিয়ে নেওয়া হয়। চার্চ স্কোয়্যারে শিশুসহ অন্য প্রতিবাদীদের পুলিশ ঘিরে ফেলে এবং একাধিক জনকে আটক করে। আটক তরুণদের এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের কোন ধারায় আটক করা হয়েছে তা জানানো হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদীরা এটিকে "বেআইনি আটক" বা কার্যত অপহরণের শামিল বলে অভিহিত করেন।
    তাঁরা আরও মন্তব্য করেন যে, নির্বাচনী সাফল্যের পর ক্ষমতাসীন দল বিরোধিতাকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও নিরুৎসাহিত হয়। 

    প্রশাসনিক পর্যায়ে অস্বীকৃতির কৌশলও লক্ষ করা যায়। ২০২০ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর গোয়া সফরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেন যে তিনি এই তিন প্রকল্পের বিরোধিতা সম্পর্কে অবগত নন এবং কোনো লিখিত আপত্তি পাননি। যদিও পরিবেশকর্মীরা মাসের পর মাস ধরে ডিজিটাল ও ডাকযোগে লিখিত আপত্তিপত পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্থানীয় বিধায়ক এই অস্বীকৃতিকে "গোয়াবাসীর জন্য বিরক্তিকর" বলে চিহ্নিত করে প্রতিবাদ জানান।
    মহামারীকালীন বিধিনিষেধ যথা জমায়েতে বিধিনিষেধ, লকডাউন আন্দোলনকারীদের জন্য বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যদিও একই সময়ে প্রকল্প অনুমোদনের বৈঠকগুলি ভার্চুয়ালি অব্যাহত থাকে। এই বৈসাদৃশ্যও সমালোচনার একটি প্রধান বিষয়। 

    সর্বশেষ পরিস্থিতি

    রেলপথে ডাবল লাইন করা: এটি এখনও আইনগতভাবে বিতর্কিত ও বর্তমানে স্থগিত আছে। রেল কর্তৃপক্ষ নতুন EIA (২০২৫, WII) দিয়ে পুনরায় ছাড়পত্র পাওয়ার চেষ্টা করছে। REC সেই EIA-তে গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক চিহ্নিত করেছে। এছাড়া বোম্বে হাইকোর্টে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে। 

    সড়ক সম্প্রসারণ (NH-4A): EC ও বন্যপ্রাণীবান্ধব নকশা সহ শর্তসাপেক্ষে কাজ এগিয়ে চলেছে।

    ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন: পরিবর্তিত রুটে বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

    প্রকল্প বিরোধী আন্দোলন: ২০২০-২১ সালের রাস্তায় নেমে ব্যপক প্রতিবাদের রূপ থেকে সরে এসে এখন মূলত আইনি মামলা, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা (peer-reviewed প্রকাশনা) এবং প্রাতিষ্ঠানিক (REC/CEC) স্তরে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে সক্রিয়। যদিও মাঝেমধ্যে স্থানীয় প্রতিবাদ এখনও দেখা যায়, যেমন কারাপুর গ্রামে কিছুদিন আগেই ঘটে গেল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি একটি সমান্তরাল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলা হল গোয়ার পাঁচটি অভয়ারণ্যকে বাঘ সংরক্ষণাগার ঘোষণার দাবীতে। জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ (NTCA) মহারাষ্ট্র-গোয়া-কর্ণাটক সংযোগকারী এলাকাটিকে "trijunction tiger corridor" হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২১ সালের CEC রিপোর্টও এই করিডোর যুক্তিতেই জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের ছাড়পত্র বাতিলের সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ বাঘ সংরক্ষণ ও কয়লা করিডোরের মধ্যে বিতর্কটি এখনও আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে আছে। এই মামলাটি রেল প্রকল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছে এবং আগামী দিনে এই সংঘাতের অভিমুখ অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে। 

    এখানে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা সম্পর্কে দু’চারকথা বলে রাখি। আন্দোলনের শুরুতেই গবেষক Madhura Niphadkar ও তাঁর সহলেখকরা Journal of Threatened Taxaতে একটি peer reviewed পর্যালোচনা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনটি প্রকল্পের মূল EIA রিপোর্টগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতে দেখানো হয় যে গাউর (Gaur), বিরল স্থানীয় ড্রাগনফ্লাই প্রজাতি Goan Shadow Dancer এবং একাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের মত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সরকারি মূল্যায়ন থেকে বাদ পড়েছিল। এরপরে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রেল কর্তৃপক্ষ WII-কে দিয়ে একটি নতুন Cumulative Impact Assessment করায়, যাতে ২০১৭ সালের IISc সমীক্ষার তুলনায় উন্নতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে একই জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন সমালোচনামূলক প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে এই নতুন EIAও অসম্পূর্ণ। এতে মিষ্টিজলের মাছ, পোকামাকড়, arachnida মাকড়সা এবং ছত্রাক (fungi)এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী, উদ্ভিদ বাদ পড়েছে, এবং প্রকল্পের নিজস্ব লক্ষ্য যথা গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর বাসস্থান চিহ্নিতকরণ, পূরণ হয়নি। সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়নও উপেক্ষিত হয়েছে, অথচ গোয়ায় বহু মানুষ এর প্রবল বিরোধিতা করছেন।

    আরেকটা কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হল WII-র নিজস্ব উপাত্তই বিরোধীদের বক্তব্য সমর্থন করছে। WII-র মাঠপর্যায়ের সমীক্ষায় রেললাইন বরাবর ১৩৫ প্রজাতির পাখি, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ ও ২৭ প্রজাতির উভচর প্রাণীর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৯২% উভচর ও ৬২% সরীসৃপ প্রজাতি পশ্চিমঘাটের স্থানীয় (endemic)। এই তথ্য বিরোধী পক্ষের (Amche Mollem আন্দোলন) দাবিকেই শক্তিশালী করছে। এছাড়া পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন REC নিজেই WIIর নতুন EIAতে গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক চিহ্নিত করেছে, বলেছে যে এতে প্রভাবের যথাযথ ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ নেই। অর্থাৎ সরকারি কাঠামোর ভেতর থেকেই সমালোচনা এসেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে এখন নজরদারি মূলত তিনটি স্তরে চলছে। স্বাধীন peer-reviewed বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা, সরকারি কমিটির (REC) ভেতর থেকে প্রশ্ন তোলা, এবং বাঘ সংরক্ষণাগার সংক্রান্ত একটি সমান্তরাল আইনি মামলা যা মূল বিতর্ককে নতুন প্রাসঙ্গিকতা দিচ্ছে।
    প্রশাসন শেষ পর্যন্ত গোয়ার মানুষের দাবীকে মান্যতা দিয়ে রেল প্রকল্প থেকে সরে আসে কিনা, সেটি বোঝার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। 

    তথ্যসূত্র: 
    [১] https://www.bbc.com/news/world-asia-india-55082645
    [২] https://www.escape2explore.com/blog/trekking/into-the-mist-experiencing-the-magic-of-dudhsagar-falls/429
    [৩] i) https://www.thegoan.net/goa-news/railways-will-continue-track-work-on-kulemvasco-route/84082.html
    ii)https://www.thegoan.net/goa-news/%EF%BB%BFtrains-to-from-goa-affected-due-to-double-tracking-work/92419.html
    [৪] https://www.deccanherald.com/amp/story/india/savemolem-why-are-goans-protesting-913348.html
    [৫]https://businessgoa.in/environmentalists-stand-vindicated/
    [৬]https://goafoundation.org/pil/
     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন