এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কিছু বলা আমার সাজে না, আর বলার মুশকিলও আছে। বক্তব্য পছন্দ না হলেই সেখানকার লোকেরা চোখ মটকে বলে আগে ভর্তি হয়ে দেখাও, সে যে পক্ষই হোক। ছোটবেলায় মন দিয়ে পড়াশুনো করিনি, সে নিয়ে যেচে খোঁটা শুনে কী হবে খামোখা।
তো কথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে না, কথা হল ধরে নিলাম সেকু মাকু লিবেড়ালরা কোথাও একটা খুব গোলমাল করছে আর গাঁজা খাচ্ছে (গাঁজা খেয়ে অবশ্য শান্তভাবে এক কোণে বসে থাকা বিধেয়, গোলমাল করলে মনোযোগ ব্যহত হয়, সে যাগ্গে, এসব নিয়ে বেশি বললে আবার লোকনিন্দে হবে), তো সেসব দমন করার জন্য থানা পুলিশ মিলিটারি গোয়েন্দা জেমস বন্ড ইত্যাদি নানান জিনিস আছে। আধুনিক পৃথিবীতে সাধু সন্ন্যাসীরা এইসব করেন বলে শুনিনি। প্রাচীন কালে করতেন অবশ্য, ধর্মযুদ্ধ টুদ্ধ, তারপর দা ভিঞ্চি কোডের ঐ ভিলেনটা, আমাদের এদিকেও প্রাচীনকালের একটি ভাড়াটে সেনাবাহিনী পরবর্তীকালে ফুলটাইম সাধু হয়েছেন, তবে দিনকাল খারাপ, নাম বললে যদি আবার লোকে গাল দেয়, তাই থাক। ওদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে সন্তান দল। তো সে না হয় বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিনপন্থী দলগুলির একটা অতীত (প্রায়শ কাল্পনিক) গৌরবের দিকে ঝোঁক আছে, কেউ খাঁটি আর্যরক্তের রবরবা চায়, কেউ আবার পুনরায় গর্বিত হতে চায়। তবে এই পেছনদিকে যাওয়ার ব্যাপারটায় যে একটা বিষম গোলমাল আছে, মানে সভ্যতার ধারাই তো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, সেটা যাঁরা না বোঝেন বা না বোঝার ভান করতে চান তাঁদের সঙ্গে তো আর তক্ক চলে না। অনেকে বলছেন সাধু সন্ন্যাসীরা একান্তে সাধনা করবেন, ওসব বলে লাভ নেই, ওঁরা কী করবেন তা ওঁরাই জানেন, আর যে গোষ্ঠীকে নিয়ে কথা হচ্ছে তাঁদের ইতিহাসটাও, একটু ইয়ে, এ নতুন কিছু না। সাধুদের হ্যান্ডবুকের এসোপিতে কী লেখা আছে সে তো আর আমি জানি না, সেসব ওঁদেরই ব্যাপার।
আজকাল মিটিং মিছিলের জন্য অনুমতি পাওয়া নিয়ে অনেক কঠিন নিয়মকানুন হয়েছে শুনতে পাই, তবে এই মিছিলে তো মিছিলকারীদের সঙ্গে কোটাল পেয়াদা রাজানুগ্রহ সবই ছিল, আর আমরা সবাই জানি সমানাধিকারের দুনিয়ায় কিছু মানুষ অন্যদের থেকে বেশি সমান। তাই সেসবও খাটবে না। এমনিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী ও শিক্ষাকর্মীদের জায়গা, সেখানে সাধু সন্ন্যাসীদের কী কাজ সে একটা প্রশ্ন, তবে তা বললে আবার লোকে বলবে এই যে রাজনীতি হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। ছাত্ররাজনীতি দেশে দেশে যুগে যুগে একটা বড় ব্যাপার, সেসব তর্ক করলে আবার অনেকদূর জল গড়াবে ও নিস্ফল পাঁক মাখা হবে, তাই ঐসব বলেও লাভ নেই। মোটের ওপর কোন যুক্তি তর্কই কোথাও গিয়ে পোঁছবে না, অনর্থক কাদা মাখা ছাড়া, আর এ তো প্রবাদেই বলে যে যাদের কাছে কাদা হোম গ্রাউন্ড তাদের সঙ্গে কাদায় কুস্তি করে জেতা যাবে না। এই জিনিসটা আমার খুব বেশি বেশি করে মনে হয় যখন মুক্তচিন্তা ইত্যাদির পক্ষাবলম্বীদের মনুস্মৃতি টাইপ জিনিসপত্র উদ্ধার করতে দেখি। মানে হোয়াট দ্য ফ? যারা মনুস্মৃতির প্রচার করছে তারা কী জানে না ওতে কী আছে? আর যারা তাদের প্রবাহের গড্ডল তাদের ওসব যুক্তি শোনার অবকাশ আছে? মানে তোমাদিগের নিজেদের বক্তব্য, ইস্যু, এজেন্ডা কিছু নাই? কাদাটা যে কাদা তা প্রমান করে কী চতুর্বর্গ হবে? তবে সে ভেবে লাভ নেই, আমি ভাবছি মানেই তা অনর্থক- তা তো না। এসবেরই নিশ্চয় মূল্য আছে।
তো যাঁরা এসবের বিরুদ্ধে, তাঁদের একমাত্র পথ হল যথাসাধ্য প্রতিরোধ করা। কীভাবে প্রতিরোধ তাও এক প্রশ্ন। একটা বড় প্রশ্ন হল তাঁদের সঙ্গে যথেষ্ট সমমনস্ক লোকজন আছে কিনা। ধরা যাক একটা কলেজে একটা বিভাগের শিক্ষার্থীরা একটা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলো। এবার সে যদি পঞ্চাশজনের মধ্যে দু'জন হয় তাহলে তাঁদের কেরিয়ার ভবিষ্যত সব ভোগে যাবে। পঁয়তাল্লিশজন হলে তার একটা ইম্প্যক্ট হবে। তার মধ্যে ধরা যাক তিরিশজন আদর্শবাদী, দশজন ফোমো, চারজনের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড সাম্যবাদী ও একজন খোঁচড়। তা-ই সই। কিন্তু আজকের যুগে ওরকমও হবে কিনা কে জানে, তার একটা বড় কারন আজকে মানুষের কাছে হারানোর অনেক কিছু আছে। বিশ্বাস বা অনুসরনযোগ্য নেতা টেতা তেমন নেই। ইন্টেলেকচুয়ালদের ক্রেডিবিলিটি শেষ হয়ে গেছে, বা শেষ করে দেওয়া হয়েছে বলা ভালো। এই বিষয়ে বাংলায় লোকে তৃণমূলকে দোষ দেয়, তবে আমার মনে হয় বামেদের দায় সব থেকে বেশি। এই কৌশিক সেন টেন, এঁদের এত গাল দেওয়ার কোন মানে ছিল না। গাড়ি কারখানা নিয়ে এখনও বামেরা অপর্না সেন মেধা পাটেকরকে গুছিয়ে গাল দেয়। জয় গোস্বামী- আর বাপু পূর্বাপর বিবেচনা করে একটা লোককে দোষ দেবে তো, নাকি। এইরকম একটা ক্ষীণজীবি ও প্রতিভাবান লোককে যাদবপুর সেন্ট্রাল পার্কে তাঁর নিজের বাড়ির সামনে হেনস্তা হতে হয়েছে, ওদিকে বুদ্ধদেব গুহ নন্দীগ্রামের সমর্থনে আজকালে গরম গরম লিখছেন, পরে শোনা গেল তিনি নাকি বিজেপি ঘনিষ্ঠ। সুবোধ সরকার শুভাপ্রসন্ন (উনি আজকাল কোথায়?) এঁরা জালি লোক। কিন্তু তা বলে গোটা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বৃত্তটাকেই দূর করে দেওয়ার কোন মানে ছিল না। তারপর এই নো ভোট টু বিজেপি - মানছি এতে তৃণমূলের সুতো ছিল, কিন্তু দেখা গেল বামেরা এই স্লোগানের বিরোধিতা করতে জান লড়িয়ে দিল। আরে ভাই নো ভোট টু বিজেপি মানে তো নো ভোট টু বামফ্রন্ট না- নো ভোট টু বিজেপির পাশেই ভোট ফর বামফ্রন্টও বলা যেত। সে যাগ্গে, যাঁরা করেছেন তাঁদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমার থেকে বেশি এতে সন্দেহ নেই, ভেবেচিন্তেই করেছেন নিশ্চয়। তৃণমূল চোর ডাকাত ভন্ড জালি তোলাবাজ ঘুষখোর, সবই সত্যি। তবে হাজার হাজার আরেসেস স্কুল, প্রধানমন্ত্রীকে আশীর্বাদ করে প্রদীপ জ্বালানো, শহরে নাগাল্যান্ড - এসবের থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়টা কী? যে বামফ্রন্ট তৃণমূলের মত একটা আদর্শহীন ছ্যারাব্যারা দলকে প্রতিহত করতে পারলো না, সে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বে? মানে, আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি এই ছিল মোর ঘটে।
ওদিকে, যাঁরা বলছেন হুঁহুঁ যাদবপুর অন্য জিনিস, ওখেনে এসব চলবে না- আমি ঠিক তাঁদের মত অত আশাবাদীও হতে পারছি না। যুগের হাওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রচার- অনেক কিছু আছে। স্বাধীন ভারতের বেশি সময়টা ভ্রাতৃত্ব একতা এইসব নিয়ে বিপুল প্রচার চলতো। সব হাংকি ডোরি ছিল না, কিন্তু সরকারি ভাবে একটা ঘোষিত অবস্থান ছিল, তাতে একরকম মানসিকতা গড়ে উঠছিল। যে যতই স্বাধীনচেতা সাম্যবাদী হোক, বড়দার বানী শোনার আকাঙ্খা বেশির ভাগ মানুষের সহজাত। এই গুরুর পাতায় এত সব বুদ্ধিমান লোক, তাও গোল বাঁধলেই অ্যাডমিনের খোঁজ পড়ে। এখানে আবার অ্যাডমিন কে এই বলে আমি এক আধবার মৃদু গঞ্জনাও শুনেছি। তো রাষ্ট্র যদি বলে দেয় আমরা অমুক- তাহলে তার একটা বিরাট প্রভাব তো পড়েই। বিশেষ করে তাতে যদি সংখ্যাগুরু মানুষের রুজি রুটিতে কোন অসুবিধে না হয়, এবং তাতে যদি সেই অংশের মনে কিছু কাল্পনিক উচমন্যতার অনুভূতি আসে- তাহলে তো আরোই।
ক'দিন আগে বোধয় সৈকতদার লেখায় বিই কলেজের কেন্দ্রীয়করন নিয়ে পড়ছিলাম, এর বাইরেও শুনেছি। নয়ের দশক ও তার আগে কেউ তো এসব ভাবতে পারেনি। তো কোথায় যে কী বিপুল সংস্কৃতিগত বদল হয়ে যাবে ওসব বলা শক্ত।
তো তাতে কী দাঁড়ালো? অঞ্জন দত্ত'র ববি রায় গানে আছ 'পিছনে আমার কানাগলি আর সামনে শুধুই গাঢ় অন্ধকার'। ঐ দাঁড়ালো।
অন্ধকার চিরকাল থাকে না সে সত্যি কথা। মুশকিল হল অন্ধকারে থাকতে থাকতে অন্ধকার সয়ে যায়, চোখে আলো পড়লে মনে হয় কী আপদ। এইটাও একটা সত্যি কথা।