আজ তিনদিন হল হাজারীবাগে আসা।
অবিনাশের দাদা-বৌদি থাকেন সপরিবারে এখানে কর্মসূত্রে। কোলিয়ারির বড় কোয়ার্টার্সে থাকেন তাঁরা। অবিনাশের পেটের রোগটা কিছুতেই সারছে না দু’মাস ধরে। ডাক্তারবাবু বলেছেন চেঞ্জে যেতে। তাই অবিনাশের আসা এখানে। ওঁকে পেয়ে দাদা, বৌদি ও ভাইপো খুব খুশি।
বাড়ির একটু দূরে একটা বড় জঙ্গল শাল, সেগুনের গাছে ভরা। মাঝে মাঝে অন্ধকার বাঁশঝাড়। অবিনাশ সকালের অনেকটা সময় কাটান সেখানে। ওখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে কলকাতার বাড়ির কথা। হাঁটতে হাঁটতে ভাবেন –‘প্রতিমা এখন হয়ত ব্যস্ত রান্নাঘরে’।
‘পোনা মাছের টুকরো ক’টা হল, মানিকের মা?’
‘চোদ্দটা টুকরো, মাসিমা’, আঁশবঁটিটা নামিয়ে বলে মানিকের মা।
‘অজয় এখুনি ভাত চাইবে। মাছগুলো তাড়াতাড়ি ধুয়ে দাও‘
‘বৌদি, পেঁয়াজ বাটা দিয়ে ঝাল ঝাল কালিয়া কোরো‘ বলেন ঠাকুরঝি।
অবিনাশের কল্পনায় ভেসে ওঠে কলকাতার বাড়ির এই নিত্যদিনের ছবি। অবিনাশের মনে হয় প্রতিমার কথা। পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে প্রতিমা কখনও বেড়াতে যেতে পারেননি অবিনাশের সঙ্গে কোথাও। দশজনের সংসারে হাজারটা কাজ একা হাতে করেন প্রতিমা। প্রথমদিকে বিয়ের পরে অবিনাশের ইচ্ছে হত প্রতিমাকে নিয়ে একটা- আধটা সিনেমা দেখতে যাবার অথবা ময়দানে হাওয়া খেতে খেতে চিনে বাদাম খাওয়ার। কিন্ত শ্বশুর-শাশুড়ির অনুমতি ছিল না। সেসব ইচ্ছেপূরণ আর হয়ে ওঠেনি। প্রতিমাও তাঁর সাধ আহ্লাদ নিয়ে কখনও কোন ইচ্ছে প্রকাশ করেননি।
আসার সময় প্রতিমা বলেছিল- ‘পৌঁছে চিঠি দিও। কখনো একা যাওনি বাড়ির বাইরে। কোন অসুবিধেয় পড়বে কে জানে‘!
দূরে সীতাগড় পাহাড়ের ওপর মেঘ জমে উঠেছে দেখা যাচ্ছে ঘরে বসে। মেঘ জমে এমন ঝাপসা হয়ে উঠেছে যে গোটা পাহাড়টায় মনে হয় কুয়াশা ঢাকা। ঝিরঝির করে মিষ্টি বাতাস বইছে। অকারণেই অবিনাশের মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে।
কলকাতার বাড়ির কথা ভেবে তাঁর মনে হয় কত বৈপরীত্য। সেখানে উঠোনের কুয়োতলার চারদিক ঘিরে তিন শরিকের বাস। ঘরের দেওয়ালগুলো যেন সর্বদা স্যাঁতস্যাঁতে। রান্নাঘরের নর্দমা দিয়ে রাত্রে মেঠো ইঁদুর ঢুকে ঘুরে বেড়ায় চালের টিনের ওপর দিয়ে বা কখনও জলের ড্রামের পাশ দিয়ে, চিকচিক আওয়াজ তুলে। শ্রাবণ মাসে রান্নাঘরের টালির ফাঁক দিয়ে জল পড়ে ঘরের মেঝেতে। ফি–বছর জনমজুর দিয়ে টালি মেরামত করতে হয়। সিঁড়ির নিচের কয়লাঘরে আরশোলা, ইঁদুরের পাকাপাকি বাস। অবিনাশের মনে হয়–বড় আবিলতা জড়ানো যেন কলকাতার জীবনে।
এখানে চারদিক ভারী নির্জন। মনে যেন পরম শান্তি। অফিস যাওয়ার তাড়া নেই। কলকাতার জীবনের গতানুগতিকতার থেকে মুক্তি পেয়ে মনে ভারী আনন্দ হয় অবিনাশের। মনে পড়ল প্রতিমার মুখখানি। বেচারিকে সংসারের নাগপাশের বাইরে কোনোদিন আনা গেল না - অজস্র অসুবিধে, খরচ আরও বেশি।
রাত্রে বিছানায় শুয়ে অবিনাশের মনে পড়ল, ঘুমোতে যাবার আগে প্রতিমাকে পড়ে শোনানো ‘দেশ’ প্রত্রিকার গল্পগুলোর কথা। সারাদিনের অনেক পরিশ্রমের পরে ক্লান্ত প্রতিমা ঘুমে ঢুলে পড়ছেন মাঝে মাঝে। আবার জেগে উঠে শুনছেন ‘দেশে’র গল্প অবিনাশের মুখে। ওই সময়টা তাঁদের বড় আকাঙ্ক্ষিত একান্তযাপন দিনান্তে। অবিনাশ ভাবেন, ‘প্রতিমাও কি এখন মনে ভাবছে এই কথা? প্রতিমাও কি অপেক্ষায় আছে তাঁদের এই যৌথযাপনের পথ চেয়ে?‘
পরের দিন সকালে অবিনাশ ছোট টেবিলটি টেনে এনে কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন চিঠি লিখতে। লিখতে বসে মনে পড়ল এটি তাঁর প্রথম চিঠি প্রতিমাকে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি কলকাতাতেই–চিঠি লেখার বিশেষ প্রয়োজন হয়নি। প্রতিমাও বেশীদিনের জন্য বাড়িছাড়া হননি।
গোল বাধল শুরুতেই। কি বলে সম্বোধন করবেন তিনি। একবার ভাবলেন, -‘প্রিয়তমাসু‘ লিখবেন। কিন্তু লজ্জাবোধ হতে থাকল। তাঁদের পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রতিমাকে এই সম্বোধনে তাঁর অস্বস্তি হতে থাকল। এ যেন বড় বেশি আধুনিক নভেলের মত শোনাচ্ছে। তার চেয়ে বরং ‘কল্যাণীয়া’ লেখা ভাল। প্রতিমা তো তাঁর সংসারে কল্যাণময়ীরূপেই বিরাজমান সদাই!
অবিনাশ লিখলেন –
শ্রীশ্রীহরি
পরম কল্যাণীয়া প্রতিমা
আমি নিরাপদে এসে পৌঁছেছি। ট্রেনে কোন অসুবিধে হয়নি। রাত্রে তোমার দেওয়া লুচি, তরকারি ও মিষ্টি খেয়ে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু ঘুম এল না। বারবার তোমার ও ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম সবাই মিলে আসতে পারলে কত আনন্দ হত। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছার অন্যথা হবার তো উপায় নেই।
এই জায়গাটি বেশ ভালই। চারদিকে পাহাড় ও জঙ্গল। খুব নির্জন ও শান্ত। দাদা, বৌদি আমার খুব যত্ন করছেন। আমার শরীর বর্তমানে অনেক ভাল। আমার জন্য চিন্তা কোরো না।
তোমরা সকলে কেমন আছো? কুশল সংবাদ জানিও। তোমরা সবাই সাবধানে থাকবে। অজয় আশা করি সময়মত অফিসে যাচ্ছে। সুজয় ও বাবলি মন দিয়ে পড়াশোনা করছে, আশা করি। কমলেশ, ছোট বৌমা ও ছেলেমেয়েরা সব কেমন আছে জানাবে। তুমি শরীরের যত্ন নিও। বেশি অনিয়ম কোর না।
এই পর্যন্ত লিখে অবিনাশ ভাবতে থাকেন প্রতিমার কথা আর কি কিছু লেখার ছিল। তাঁর মনে হতে থাকল তাঁদের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে দুজনে পাশাপাশি থাকতে থাকতে বিশেষ ভাবে প্রতিমার কথা তাঁর কখনো মনে পড়েনি। আজ প্রবাসে এসে তাঁর মনে হচ্ছে বড় বেশি করে প্রতিমার কথা। তাঁর মনে হচ্ছে হঠাৎ, ‘তিনি প্রতিমাকে ভালবাসেন ও তাঁকে এই কথাটা জানানো দরকার।‘ কিন্তু তিনি কি করে লিখবেন –‘তুমি আমার গভীর ভালবাসা জেনো‘। এ কথা লিখবার ইচ্ছে হলেও তাঁর মন লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এতদিনের দীর্ঘ সংসার করার পর, নতুন প্রেমের মত–‘তোমাকে ভালবাসি’ একথা লেখা যায় না আর। কালির অক্ষরে লেখা না গেলেও অবিনাশের মনের গভীরে এই সুর বাজতে থাকল বারংবার। মনের মধ্যে এই ভালবাসার আলোড়ন তাঁকে অস্থির করে তুলল।
তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রতিমার বকাবকি ছেলে-মেয়েদেরকে, বাজারের ফর্দ লেখা, প্রবল গরমের মধ্যে রান্নাঘরে বসে রান্না করা, আঁচলে লেগে থাকা হলুদের দাগ, ও ঘর্মাক্ত মুখখানি।
অবিনাশ ভাবলেন, এই প্রতিমার কাছে ভালবাসা নিবেদন অর্থহীন। ভালবাসা ব্যক্ত করে চিঠি লিখলেও সে হয়তো ভাববে, ‘এটা চিঠি লেখার একটা বাঁধাধরা সুর‘। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে যে কথা বলা হয়নি কখনো অবিনাশের, সে কথা অর্থহীন মনে হয় আজ। নতুন করে প্রেম নিবেদন করা আর সম্ভব নয়, মনে হয় অবিনাশের। তবু একটা আজানা অনুভুতি হতে থাকল তাঁর।
অবিনাশ আবার চিঠিটা একবার পড়ে নিয়ে শেষে লিখলেন –
‘তোমরা সকলে আমার আশীর্বাদ নিও। ঠাকুর তোমাদের মঙ্গল করুন।‘
ইতি
তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী
অবিনাশ
সূর্য এখন মধ্যগগনে।
পাহাড়ের চূড়া আলোয় উজ্জ্বল। মেঘের আবরণ অন্তর্হিত।
অবিনাশ অব্যক্ত প্রেমের নব উপলব্ধির আলোয় উদ্ভাসিত ও উদ্বেলিত। তাঁর হৃদয়ে যে এত ভালবাসা সঞ্চিত ছিল স্ত্রীর জন্য, তিনি নিজেও জানতেন না কখনো। বর্ষার পাহাড়ি নদী যেমন নুড়ি-পাথরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তাঁর মনের মধ্যেও একটা আনন্দের ঘূর্ণি সমস্ত সত্তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল। মনের মধ্যে যেন সুরের ঝঙ্কার বেজে উঠল। আপনমনে বলতে থাকেন অবিনাশ –‘তোমাকে ভালবাসি প্রতিমা। পরজন্মে তোমাকে সাতমহলা বাড়ি বানিয়ে দেব। এই জন্মের মত আর অনটনের সংসারে তোমাকে থাকতে দেব না। দেখো, তোমার সব অভাব পূর্ণ করে দেব, প্রতিমা। তুমি যে আমার মানস প্রতিমা! তোমাকে যদি আরেকটু সুখ দিতে পারতাম! এ শুধুই আমার ব্যর্থতা! দারিদ্র ভালবাসাকে দূরে ঠেলে দেয়। সুখের ঘরেই ভালবাসা বাসা বাঁধে, হয়তো। কিংবা, ভালবাসা শুধুই কবির কল্পনা, যা শুধুই অধরা!‘
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।