১ ‘বোর্ডিং টু কাতার এয়ারওয়েজ ফ্লাইট নাম্বার QR739 টু লস অ্যাঞ্জেলস উইল স্টার্ট ইন ফিফটিন মিনিটস’। রমা বসে আছেন দোহা এয়ারপোর্টে। যাবেন লস অ্যাঞ্জেলসে ছেলে শমীকের কাছে। কলকাতা থেকে দোহা এসে পৌঁছেছেন চার ঘণ্টা আগে। সঙ্গে যাচ্ছে শমীকের বন্ধু সুবীর ও তার পরিবার। রমার এটি প্রথম বিদেশযাত্রা। খুব ঘাবড়ে আছেন। সঙ্গে সুবীর আছে বলে একটু ভরসা। রমা থাকেন দমদমের মতিঝিলে একটি ফ্ল্যাটে, একা। রমার স্বামী অসীম তিন বছর হল মারা গেছেন, এই ফ্ল্যাটে আসার দু বছরের মাথায়। রমার স্বামী বর্ধমান ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। রমার এক মেয়েও আছে ... ...
ট্রেন চলেছে দিল্লি, রাজধানী এক্সপ্রেস। বিকেল পাঁচটায় ছেড়েছে হাওড়া থেকে। অম্লান বসে আছেন লোয়ার বার্থে, নিজের সিটে। সামনের লোয়ার আর আপার বার্থে আছেন দুজন যুবক, বয়স পঁচিশের আশেপাশে। অম্লানকে একবার দেখলে কেউ আর ভুলবে না, তাঁর বাঁ গালে আছে একটা বড় কালো আঁচিল। যুবক দুজন অম্লানের সঙ্গে খুব আলাপ জমিয়ে নিয়েছেন। মাঝে মাঝেই ঝালমুড়ি, কমলালেবু, বাদামভাজা, কফি ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন ওঁরা তিনজন। সবাই বাংলাতেই কথা বলছেন। গল্প বেশ জমে উঠেছে। সন্ধ্যা আটটায় ট্রেনটা ধানবাদ এলে অম্লান কৌটো খুলে লুচি, আলুর দম আর মিষ্টি খেতে শুরু করলেন। অম্লান যাচ্ছেন দিল্লি, অফিসের কাজে। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানির অ্যাকাউন্টস অফিসার। কাল দিল্লি পৌঁছবে ... ...
সঞ্জীব মাথুর থাকেন মুম্বাই, জুহু বীচে। ফিল্ম প্রোডিউসার তিনি। বিশাল তিনতলা বাংলো তাঁর, যার মুল্য প্রায় ২০০ কোটি। ব্যালকনি থেকে সমুদ্র দেখা যায় স্পষ্ট। বাড়িতে ৫টা দামী গাড়ি – রোলস রয়েস, ল্যাম্বরঘিনি, মার্সিডিজ, বেন্টলে - এরকম সব। পরিবারে আছেন স্ত্রী সুনীতা, আর দুই ছেলে আর এক মেয়ে – আরিয়ান, আরভ ও কিয়ারা। সঞ্জীবের বয়স এখন ৫৫। বাড়িতে কাজের লোক ১৫ জন। তাঁদের নানা দায়িত্ব। কেউ রান্নাঘর সামলান, কেউ লন্ড্রি, কেউ ঝাড়া-মোছা, কেউ বাগানের দেখভাল, কেউ কুকুরের দেখাশোনা আর কেউবা গাড়ির ড্রাইভার। বাড়িতেই সুইমিং পুল আছে ছাদের একপাশে। বাড়ির সদস্যরা সেখানে সাঁতার কাটেন অবসর সময়ে। এছাড়া সঞ্জীবের প্রাইভেট জেট আছে যাতে ... ...
প্রোফেসর ভাজ্জি সকালে দেখা হতেই বললেন,“চাও, চাও। হাউ আর ইউ ইন্দ্রাণী? হাউ ইজ ইয়োর ওয়ার্ক গোয়িং?” জানালাম কাজ ভাল চলছে, “প্রেটি গুড”। এসেছি ইতালির পাভিয়া ইউনিভার্সিটিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে চারমাসের জন্য। পাভিয়া বহু পুরনো ইউনিভার্সিটি। ১৩৬১ সালে এখানে পড়ানো শুরু হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্তত একটি নাম সম্ভবত সকলের জানা– বিজ্ঞানী আলেসানড্রো ভোল্টা, যাঁর নাম থেকে ‘ভোল্ট’ কথাটি এসেছে। তিনি এখানে চল্লিশ বছর অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন। খুব মন দিয়ে কাজ করি সারাদিন। পড়াশোনা আর পেপারের কাজ নিয়ে সারাদিন কেটে যায়। বাইরে গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত আটটা বাজার ঘণ্টা পড়ল।কাগজপত্র গুছিয়ে উঠে পড়লাম বাসায় ফেরার জন্য। এখন জানুয়ারী মাস। ... ...
বিমল সরকার চাকরি করেন কর্পোরেশনে, ক্লার্ক। একটা ছোট দু’কামরার বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে্ন বেলেঘাটায়। সংসারে আছেন বৌ প্রতিমা আর ছেলে অর্কপ্রভ, ডাকনাম অর্ক। প্রতিমা সংসারের হাজার কাজে ব্যস্ত থাকেন সারাদিন। সকাল ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে উনুন ধরাতে হয় প্রতিমাকে, না হলে অফিস আর স্কুলের ভাত হবে না সময়মত। অর্ক পড়ে ক্লাস টেনে কাছের একটা স্কুলে। নিম্নবিত্ততা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে সংসারে। ‘আমার টিফিনটা হল?’ বিমল হাঁকেন, সকাল ন’টা তখন। ‘নাও তোমার রুটি আলুভাজা’, ব্যস্ত হয়ে বলেন প্রতিমা।সকাল দশটার মধ্যে বিমল আর অর্ক বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। প্রতিমা তখন হয়ত কাপড় কাচতে বসেন কলতলায় না হয় কয়লার গুঁড়ো মেখে গুল দিতে বসেন উঠোনে। সেই সময় ... ...
সুদীপ চ্যাটার্জী বড় সরকারী অফিসার। ওঁর স্ত্রী মধুরার স্বভাবটা তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়েই চলে যেন। বয়সে সুদীপের থেকে দু’বছরের ছোট। তিনি একটা স্কুলের শিক্ষকা। ওঁদের ছেলে অর্ণব আর মেয়ে অমৃতা। সুদীপের বয়স এখন প্রায় পঞ্চাশ। সকাল সাড়ে ন’টায় তিনি বাড়ি থেকে বেরোন সরকারি গাড়িতে অফিসের উদ্দেশে। মধুরাও স্কুলে বেরোন সকাল আটটায়। অর্ণব পড়ে বি টেক আইআইটি বম্বেতে আর অমৃতা পড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে পলিটিক্যাল সায়েন্স। সুদীপের বড় দোতলা বাড়ি সল্টলেকে প্রায় ছ’কাঠা জমির ওপর। বাড়ির চারদিক ঘিরে বড় বাগান। সামনে ফুলের আর পেছনে সব্জির। ছুটির দিনে অনেকটা সময় কাটে সুদীপের বাগান পরিচর্যায়। বাগান করাটা সুদীপের প্যাশন। বাগানের প্রত্যেকটা গাছকে সুদীপ ভালবাসে ... ...
মৃন্ময়ী একুশ বছরে বিয়ে হয়ে চৌধুরীবাড়ির মেজছেলের বৌ হিসেবে এল সংসারে। চৌধুরীবাড়ির গিন্নি সুধাময়ীর তিন ছেলে আর চার মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার। মৃন্ময়ী যখন এ বাড়িতে এল ততদিনে বাড়ির বড় ছেলে অমলের বিয়ে হয়ে গেছে আর অমলের তিন বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। মেজ ছেলে কমলের পরে আছে ছোট মেয়ে সীমু আর ছোট ছেলে বিমল যারা তখন কলেজ আর স্কুলে পড়ে। চৌধুরী বাড়ির কর্তা দেবশঙ্করের প্রেসের ব্যবসা আছে। বিরাট তিনতলা বাড়ি করেছেন তিনি। বড় ছেলে অমল সেই ব্যবসাই দেখে। মেজছেলে কমল একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। অমলের পরে তিন বোন– রুমু, ঝুমু আর কুমুর ভাল বিয়ে দিয়েছেন বড়কর্তা। জামাইরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। অমলের ... ...
- "সিভিয়ার ডিপ্রেশন”, ডাক্তার মাথা নাড়লেন। - “অনেক ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। ব্রেনের মধ্যে সেরোটোনিন বলে একটা কেমিক্যাল থাকে তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। মনে হয় খুব সাংঘাতিক কোনও শক পেয়েছে পেশেন্ট। আমি কয়েকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি ওগুলো খেতে হবে দু’বেলা”। ডাক্তার বললেন অদিতিকে দেখে ও তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে। অদিতির বাবা মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন খুব চিন্তিত মুখে। অদিতি ও অরিন্দমের বিয়ে হয় তিন বছর প্রেম পর্বের পরে। বিয়ের পরে দুজনেই খুব সুখী ছিল। দিন কাটছিল যেন স্বপ্নের মতো। অদিতি একটা কলেজে পড়ায়, অরিন্দম আছে কর্পোরেটে। ছুটি পেলেই দুজনে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ত - পাহাড়ে, জঙ্গলে, বা সমুদ্রের ধারে। তিনটে বছর কোথা ... ...
রোজ সকাল থেকে গায়ত্রী গজ গজ করে। পরিতোষকে বলে বাথরুমের ঘুলঘুলিতে বাসা করেছে যে পায়রারা, তা ভেঙ্গে দিতে। বলে, বাথরুমটা খালি নোংরা হচ্ছে কাঠকুটো পড়ে।পরিতোষ গা করে না। বলে-“থাক না ওরা ওখানে। ওদেরও তো যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। আর কতদিনই বা থাকবে ওরা? খুব বেশী হলে পায়রা বাঁচে ছ বছর। তারপর তো আর ওরা আসবে না।“ পরিতোষের খুব মায়া পাখিদের ওপর। অনেক পড়াশোনা করে পাখি নিয়ে। পরিতোষ বলে পাখিরা মারা যাওয়ার সময় আকাশের অনেক ওপরে উড়ে চলে যায় ও মৃত্যুবরণ করে। আর তাদের শরীরটা পঞ্চভূতে ... ...
অরণ্য সারাদিন মেতে থাকে কাফকা, কাম্যু, নীটসে, দেরিদা, ফুকোর জগতে। স্বভাবে বাউণ্ডুলে, একমাথা এলোমেলো চুল, একমুখ দাড়ি। ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের ইকনমিক্সের ছাত্র। পোশাকের ব্যাপারে উদাসীন, মাঝে মাঝে ছেঁড়া শার্ট পরেও ক্লাসে আসে। কথাবার্তায় খুব ধারালো ও খুব আকর্ষণীয়। পড়াশোনায় তুখোড়। ক্লাসের অনেক মেয়েই আকর্ষণে পড়ে কাছে আসে। কিন্তু সম্পর্ক গভীর হয় না। ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ মেয়ে বৃষ্টির সঙ্গে কথা হয় বন্ধুদের ভিড়ে। খুব গভীর কথা বলে মেয়েটা। আর তেমনি দুর্দান্ত গানের গলা। ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক অনুষ্ঠানে বৃষ্টি দুটো গান করল, অরণ্য আবৃত্তি, আর একটা নাটক হল অনেকে মিলে। এরপর থেকে যেন কোন এক আকর্ষণে বাঁধা পড়ে গেল অরণ্য বৃষ্টির টানে। আস্তে ... ...