রোজ সকাল থেকে গায়ত্রী গজ গজ করে। পরিতোষকে বলে বাথরুমের ঘুলঘুলিতে বাসা করেছে যে পায়রারা, তা ভেঙ্গে দিতে। বলে, বাথরুমটা খালি নোংরা হচ্ছে কাঠকুটো পড়ে।
পরিতোষ গা করে না। বলে-“থাক না ওরা ওখানে। ওদেরও তো যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। আর কতদিনই বা থাকবে ওরা? খুব বেশী হলে পায়রা বাঁচে ছ বছর। তারপর তো আর ওরা আসবে না।“
পরিতোষের খুব মায়া পাখিদের ওপর। অনেক পড়াশোনা করে পাখি নিয়ে। পরিতোষ বলে পাখিরা মারা যাওয়ার সময় আকাশের অনেক ওপরে উড়ে চলে যায় ও মৃত্যুবরণ করে। আর তাদের শরীরটা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। পরিতোষ বলে গায়ত্রীকে, “এত যে পাখি দেখতে পাও চারদিকে, তার মধ্যে কটা মৃত পাখি দেখতে পাও রাস্তাঘাটে?” গায়ত্রী ভাবে, পরিতোষের কথাটা খুব সত্যি।
পরিতোষ বলে, “কে জানে গত জন্মে আমিও পাখি ছিলাম কিনা? হয়তো স্বল্প আয়ু নিয়ে জন্মেছিলাম। এভাবে এর আগেও কত হাজার বার জন্মেছি আর মরেছি, কে জানে! এই মানুষ জন্ম বড় গৌরবের। অনেক পুণ্য করলে মানুষ জন্ম পাওয়া যায়, শাস্ত্রে বলে। এই জীবনটাকে যেমন তেমন করে উপভোগ না করে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। যাতে একটা পরিপূর্ণ জীবন উপলব্ধি করা যায়।“
-“পরিপূর্ণ জীবন ব্যাপারটা কি?“
-“জীবনটা যেন একটা বৃত্তে সম্পূর্ণ হয়। যা যা চেয়েছি জীবনে তা পরিপূর্ণ ভাবে পেয়ে আমি তৃপ্ত –এই আর কি।“গায়ত্রী মনে মনে ভাবে তার জীবনটা কি পরিপূর্ণ জীবন? ছোটবেলা থেকে সব ঘটনা ছবির মত চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মফস্বল শহরে একটা মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্টের জন্য কলকাতার একটা বিখ্যাত কলেজে সে সুযোগ পায় পড়ার। কলেজ, ইউনিভার্সিটি ভালভাবে শেষ করে একটা অধ্যাপনার চাকরি পায় কলেজে। কিন্তু গায়ত্রী ভাবে এটা কি তাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে? গায়ত্রীর ইচ্ছা ছিল আমেরিকায় যাবে, পিএইচডি করবে। এমন সময় পরিতোষের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধটা এসে গিয়ে সব ওলটপালট হয়ে গেল। গায়ত্রীর রক্ষণশীল পরিবার চাইলো আগে বিয়ে হয়ে একটা অভিভাবক আসুক মাথার ওপর। গায়ত্রীর স্বপ্ন আর পূরণ হল না। শেষে কলকাতাতেই একটা পিএইচডি করে ঘর সংসারে মন দিল।
পরিতোষ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। অনেক রকম জীবন দর্শনের কথা বলে গায়ত্রীকে সে। পরিতোষের আছে বিদেশী পিইচডি। কত সুনাম তার চারদিকে শিক্ষাজগতে। গায়ত্রীর গর্ব হয় পরিতোষকে নিয়ে। তবু একটা দুঃখ মাঝে মাঝে জেগে ওঠে। ভাবে তার জীবনটা তো অন্যরকম হতে পারত। শুধু নারী বলে তার স্বাধীনতা নেই অন্যরকম হওয়ার। বাবা, মা, দাদারা বা স্বামী তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে তার জীবনে। তার ইচ্ছে–অনিচ্ছে গুলো সব চাপা পড়ে গেছে পুরোপুরি। গায়ত্রীর মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। তার খুব ইচ্ছে ছিল সরোদ শিখবে। কিন্তু বাবা আর দাদারা রাজী হল না। ওরা ভাবত সরোদ শেখা খুব কঠিন ব্যাপার আর অনেক নিষ্ঠা দরকার তার জন্য। আর মধ্যবিত্ত বাড়িতে সরোদ শিখে কী হবে? তার চেয়ে গান শেখা ভাল। সব জায়গায়, সব পরিস্থিতিতে গাইতে পারবে। তাই গান শিখতে শুরু করল গায়ত্রী ওদের ইচ্ছেয়। কিন্তু মনের ভেতর থেকে যেন মেনে নিতে পারল না গায়ত্রী। গানটা শেখা হল কিছুদিন, কিন্তু সেই সব সুর যেন মনে অনুরণন তুলল না। ফলে গানের সঙ্গে খুব দৃঢ় গাঁটছড়া বাঁধা হল না। কিছুদিন পরে গান শেখার উৎসাহও হারিয়ে ফেলল গায়ত্রী। তাই সেটা বন্ধ হয়ে গেল চিরতরে। গায়ত্রী যে গান ভালবাসে না, তা নয়। কিন্তু ওই নিয়মমাফিক শিক্ষা ব্যাপারটা তার পছন্দ ছিল না। সে চাইত গান আসবে মনের মাঝে আপন আনন্দে। জীবনের সব কাজে এই আনন্দের খোঁজ করাটা খুব জরুরি, গায়ত্রী ভাবে। যে কাজে আনন্দ নেই, তা হল দায়সারা কাজ মাত্র। তাতে ফাঁকি বিস্তর, সুখ নেই কণামাত্র সেখানে। গায়ত্রী ভাবে, যে কাজ করবে সে, তাতে ষোলোআনা মন ঢেলে করবে। কোনও ফাঁকি রাখবে না সেখানে। এইজন্য কতকিছুই সে জীবনে সম্পূর্ণ করে উঠতে পারে নি। জীবনটা যেন আঁকাবাঁকা পথে চলে লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে তার। এজন্য তার মাঝে মাঝে আক্ষেপ হলেও গভীর দুঃখ বোধ নেই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয় তার –“তার কি পরিপূর্ণ জীবন পাওয়া হয়েছে? জীবন থেকে আরও একটু বেশি কি পাওয়ার ছিল না? “
গায়ত্রীর গর্ব তার মেয়ে সুদেষ্ণাকে নিয়ে। নিজের অপ্রাপ্তিগুলো যেন মেয়েকে স্পর্শ করতে পারে না সেই চেষ্টা করে গায়ত্রী সবসময়। সুদেষ্ণা যা চেয়েছে ছোট থেকে সব দিয়েছে তার মা তাকে। কোনও সাধ অপূর্ণ রাখেনি। সুদেষ্ণার ইচ্ছে ছিল গীটার শেখার। ওকে তাই শিখিয়েছিল গায়ত্রী। সুদেষ্ণা ছোটবেলা থেকে খুব ভাল ছবি আঁকত। তাই ওকে ছবি আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল গায়ত্রী। সুদেষ্ণার মনটা যাতে মুক্তি পায় নানা দিকে সেদিকে নজর ছিল গায়ত্রীর সবসময়। গায়ত্রীর পছন্দ ছিল না বিড়াল, কুকুর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা। কিন্তু সুদেষ্ণার আবার তাতে খুব আগ্রহ। নিজের ইচ্ছেটা কোনও দিন চাপিয়ে দেয়নি গায়ত্রী তার মেয়ের ওপর। তাই সুদেষ্ণা সব স্বাধীনতা পেয়েছে বাড়িতে। গায়ত্রী বিশ্বাস করত স্বাধীনতা মনকে আরও প্রসারিত করে, মনকে মুক্ত করে সংসারের আবিলতা থেকে। একবার সুদেষ্ণার ইচ্ছে হল সারারাত ছাদে শুয়ে আকাশের তারা দেখবে। সেই রাতে সুদেষ্ণা তার বাবা আর মার সঙ্গে মাদুরে শুয়ে রাতের আকাশ দেখল। পরিতোষ সব তারাদের চেনাতে থাকল সুদেষ্ণাকে। কোনটা সপ্তর্ষি, কোনটা কালপুরুষ, আর ভোরের আকাশে কোথায় ধ্রুবতারা, সব চেনাল পরিতোষ মেয়েকে। সুদেষ্ণা তো মুগ্ধ রাতের আকাশের সৌন্দর্য দেখে। একবার ওরা গেল সাঁতরাগাছি ঝিলে শীতকালের ভোরবেলা। কত যে যাযাবর পাখি সেখানে! পরিতোষ চেনাতে থাকল সব পাখিদের তার মেয়েকে। কত যে তাদের নাম, আর কত রকমের ডাক আর কত রঙের বাহার! সুদেষ্ণা অবাক হয়ে শোনে পরিতোষের কথাগুলো আর ভাবতে থাকে কোন সুদূর দেশ থেকে উড়ে এসেছে এই সব পাখিরা, কত হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে। মনে মনে ভাবে পাখি হলে বেশ হত, উড়ে যেতাম কত কত দেশে! একবার সুদেষ্ণাকে নিয়ে তার বাবা, মা গেল বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে। গায়ত্রী চেনাতে লাগল সব গাছ মেয়েকে- মেহগনি, তেঁতুল, বট, অশ্বত্থ, কিউবান পাম, আম, জাম, মন্দার, চন্দন, সেগুন, শিশু, বাবলা, অমলতাস, নিম, শিমুল, দেবদারু, শাল,অশোক, পলাশ, অর্জুন, জারুল, ছাতিম, রডডেনড্রণ, নানারকম অর্কিড –আরও কত গাছ। গায়ত্রী বলে, অনেক গাছ খুব বিরল প্রজাতির আর আনা হয়েছে সুদূর নেপাল, ব্রাজিল, জাভা, সুমাত্রা, পেনাং, পেরু, চিলি, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, মেক্সিকো, কস্টারিকা এরকম কত দেশ থেকে তার হিসেব নেই। দেখতে দেখতে সুদেষ্ণা ভাবে গাছেদের রাজ্যপাট কত বিচিত্র আর কত মনমুগ্ধকর। মনটা ভরে ওঠে সুদেষ্ণার। মনে মনে বলে,”পরের জন্মে গাছ হলে বেশ হয়! গাছের প্রকৃতি কেমন শান্ত, আর কেমন সহনশীল। মানুষ যে কেন এমন হয় না!”
গায়ত্রীর অনেক স্বপ্ন ছিল মেয়েকে নিয়ে। তার সব সাধ পূর্ণ করেছে তার মেয়ে। সুদেষ্ণা ভালো পড়াশোনা করে বিদেশে বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। গায়ত্রীর অনেক গর্ব মেয়েকে নিয়ে। মাঝে মাঝে ভাবে, হয়ত সুদেষ্ণা একটা পরিপূর্ণ জীবন পেয়েছে। মেয়েকে এই কথা বললে সে হেসে উড়িয়ে দেয়। বলে –“ পরিপূর্ণ জীবন বলে কিছু হয় না মা, আমরা যেন মাটির পুতুল। কোন অদৃশ্য শিল্পী আমাদের যেমন গড়ছে আর ভাঙছে, তাই নিয়েই আমাদের জীবন। এই শিল্পী মাঝে মাঝে অনেক অপ্রত্যাশিত উপহারও দেয় আমাদের। এই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়েই জীবন চলেছে পূর্ণতার দিকে। এই শিল্পীকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করলে আর কোনও দুঃখবোধ থাকে না। তবু অনন্তের কাছে থাকুক প্রার্থনা-এ জীবন পূর্ণ কর।“
এসব কথা শুনতে শুনতে গায়ত্রীর মনটা ভরে ওঠে। ভাবে পরের জন্মে যদি এ জন্মের অপ্রাপ্তিগুলো পাওয়া হয়ে যায় ! ভাবে তার জন্য কিছু সুকর্ম করা দরকার হয়ত। তাই পায়রাগুলোকে আর তাড়াতে বলে না গায়ত্রী আজকাল পরিতোষকে। মাঝে মাঝে পায়রাগুলোকে খেতেও দেয় গায়ত্রী। পায়রাগুলো বাথরুমে খড় কুটো ফেললেও আর রাগ করে না গায়ত্রী। পায়রাগুলো মনের আনন্দে বংশবিস্তার করে ওদের বাড়িতে। ডিম ফুটে পায়রার ছানা হয় যখন, গায়ত্রীর মনটা নরম হয়ে ওঠে ওদের জন্য। একটু বড় হলেই সেইসব ছানারা উড়ে চলে যায় কোথায় যেন! আবার তাদের বাসাটা শূন্য হয়ে যায়।
গায়ত্রী ভাবে, যদি জানা যেত পূর্বজন্মের কথা সব সবিস্তারে। আমি কেমন ছিলাম, কী কী সুকর্ম বা দুষ্কর্ম করেছি- এইসব। শাস্ত্রে বলে জীব তার কর্মফল ভোগ করে সারাজীবন ধরে। কর্মফল এড়াবার কোনও উপায় নেই। বিগত সব জন্মের হিসেবনিকেশ হবে এজন্মে। হয়ত অনেক দুষ্কর্ম করা হয়েছিল আগেকার সব জন্মে, যার ফলে এই জন্মে এত অপ্রাপ্তি, এত দুঃখ। গায়ত্রী ভাবে।
গায়ত্রীর মনে পড়ে যায় গীতার বাণী - আত্মা অবিনশ্বর। এই দেহের বিনাশ হবে, কিন্তু আত্মা বিদ্যমান থাকবে। গায়ত্রী কল্পনা করে তার মৃত্যুর পরে তার আত্মা একটা বিরাট আলবাট্রস পাখির মত ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যাবে আর বিলীন হয়ে যাবে ঐ অদৃশ্য শিল্পীর সত্তায়। আবার জন্ম হবে, জীবনপ্রবাহ চলবে, মৃত্যু হবে। এই খেলা চলবে কত যুগ যুগ ধরে কে জানে! গায়ত্রী ভাবে হয়ত কোন জন্মে তার পরিপূর্ণ জীবন প্রাপ্তি হবে। ততদিন কালচক্রে যাওয়া আসা থাকবে অবিরাম।
গায়ত্রী ভাবে তার মেয়ে সুদেষ্ণার কথাই ঠিক-“ঐ অদৃশ্য শিল্পী যেমন গড়বে তেমনি হবে জীবন। হয়ত কোন একদিন থেমে যাবে কালচক্র যেদিন আর পুনর্জন্ম হবে না – যেদিন ওই শিল্পীকে হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করা যাবে”। ওই শিল্পীই শুধু পূর্ণ, গায়ত্রী অনুভব করে মনের ভেতর। বাকি সবই শুধু শূন্য, অনিত্য, নশ্বর। পরিপূর্ণতা শুধু ওই শিল্পীর মধ্যেই আছে। আমরা এগিয়ে চলেছি ওই পূর্ণের দিকে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে –নদী যেমন সাগরের পথে ধায়। এ জীবন পূর্ণ হবে ঠিকই একদিন এই অনন্ত কালপ্রবাহে। ততদিন শুধুই পথ চলা লক্ষ্য স্থির রেখে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।