সুনন্দা অধ্যাপনা করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, উত্তরবঙ্গে। বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়ানো ক্যাম্পাস। খুব শান্ত আর নিরিবিলি পরিবেশ। সুনন্দার ভাল লাগে খুব। ক্যাম্পাসের মধ্যে একটা কোয়ার্টার্সে থাকে সুনন্দা। বাড়িটি একটু ফাঁকা জায়গাতে, কাছাকাছি আর কোনও বাড়ি নেই। অন্য কোয়ার্টার্সগুলি অনেকটা দূরে। সুনন্দা একাই থাকে এখানে, মেয়ে রুপুকে নিয়ে। তার স্বামী প্রবীর অনেক দূরে থাকেন। মাঝে মাঝে আসেন ছুটিতে।
ছিমছাম কোয়ার্টার্সের বাইরে বিরাট বাগান। শুধু কি ফুলের গাছ? আছে বড় বড় আম-জামেরও গাছ। বড় বড় কাঁচের জানলা চারপাশে। সন্ধে থেকে সব নিঝুম হয়ে যায়। এক একদিন রাত্রে রুপু ঘুমিয়ে পড়লে কেমন যেন গা ছমছম করে সুনন্দার এই বাড়িতে।
দিন কয়েক আগেই রাত দশটা নাগাদ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সুনন্দা টেবিলল্যাম্প জ্বেলে পড়ছে তার ক্লাসের জন্য। রুপু ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ মনে হল কে যেন শুকনো পাতা মাড়িয়ে জানলার বাইরে লনে হেঁটে চলেছে। সুনন্দা লনের আলো জ্বেলে দেখতে গেল, কে আবার এল এত রাত্রে! কিন্তু কেউ কোথাও নেই। আলো জ্বালতেই সব চুপচাপ। আবার পড়ায় মন দিল সুনন্দা। আরও পনের মিনিট পর আবার শুকনো পাতা মাড়ানোর আওয়াজ। পরিস্কার কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। সুনন্দার খুব ভয় করতে লাগল। ভাবল, চোর এলো নাকি? লনের আলোটা সারারাত জ্বেলে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল সুনন্দা।
পরদিন বন্ধুদের বলল আগের রাত্রের ঘটনা। সবাই হেসে উড়িয়ে দিল। বলল, একা একা থাকতে তোর ভয় করছিল বলে ওরকম শুনেছিস। সুনন্দাও ভাবল হয়ত তার মনের ভুল।
বেশ কয়েকদিন নিশ্চিন্তে কাটল এরপর। আবার দিন পনের পর একই রকম আওয়াজ পেল সুনন্দা রাত্রে। সারারাত ভাল করে ঘুম হল না। পরের দিন আবার বলল বন্ধুদের। রান্নার মাসি, বাগানের মালী, দুধওয়ালা সবাইকে বলে বেড়াতে লাগল সুনন্দা তার রাত্রের অভিজ্ঞতা। দুধওয়ালা নন্দ শুনল। কী যেন বলতে গিয়েও বলে না। হঠাৎ বলে ওঠে, ‘দিদি, এই বাড়িতে ভূত আছে’। সুনন্দা বিরক্ত হয় এই কথা শুনে। ‘যত বাজে কথা!’ নন্দ বলে, ‘তুমি তোমার মালী মংলুকে জিজ্ঞেস করো। ও সব জানে।’ পরদিন মংলুকে চেপে ধরে সুনন্দা। মংলু প্রথমে কিছু বলতে চায় না। অনেক চাপাচাপির পরে বলে,
‘আমার বাবা ঝড়ু এই বাগানের মালী ছিল আগে। খুব ভালবাসত এই বাগানটাকে। মনপ্রান ঢেলে কাজ করত বাগানে। হঠাৎ যক্ষ্মা ধরা পড়ল তার। শরীরে জোর পেত না আর কাজ করার। সারাদিন বাড়িতে শুয়ে শুয়ে কাশত খালি আর মুখ দিয়ে রক্ত উঠত। এভাবে এক বছর চলার পরে হঠাৎ ঝড়ুকে একদিন পাওয়া গেল না বাড়িতে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও চলে গেল। তারপর সকালে এই বাগানের আমগাছে ওর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গেল।’
‘বাবার খুব মায়া ছিল এই বাগানটার ওপর। বলত “আমি এখান ছেড়ে কোথাও যাব না”।
সুনন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে মংলু বুঝতে পারে না দিদি তার কথা বিশ্বাস করছে কি না। বলে চলে, ‘আপনার আগে এখানে যে বাবুরা থাকতেন তেনারাও রাতে এরকম আওয়াজ পেয়েছেন; সবাই বলে এখানে ঝড়ু ঘুরে বেড়ায় রাতবিরেতে’।
এসব শুনে সুনন্দার একটু ভয় লাগতে শুরু করল। ইউনিভার্সিটিতে বলল, সে কোয়ার্টার্স বদল করতে চায় এখনই। পরে অনেকের মুখে শুনল এই বাড়িটায় কেউ থাকতে চায় না। যারা ওখানে থেকেছে তাদের সকলেরই এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে আগে। দু’মাস পর সুনন্দা নতুন কোয়ার্টার্স পেল। এটাও বড়, বাগানওয়ালা আর অনেকটা জায়গা নিয়ে। সুনন্দা খুশিই হল এটাতে এসে।
এদিকে রুপু দেখতে দেখতে দু’বছরের হয়ে গেছে এর মধ্যে। নতুন বাড়িতে ও বাগানে খেলে বেড়ায়। আরও অনেক বন্ধু হয়েছে তার। তবে বেশিরভাগই রুপুর থেকে বড়। দিন বেশ কাটতে লাগল সুনন্দার এখানে। এই বাড়িতে রান্নাঘরের বাইরে একটা বড় খোলা বারান্দা আছে। সেখানে শীতকালে বেশ রোদ পোহানো যায়। ওই বারান্দায় বাইরের গেট খুলে সোজা আসা যায়।
একদিন রাত্রে সুনন্দা আর রুপু ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ মধ্যরাত্রে বারান্দার দিকে রান্নাঘরের দরজায় মনে হল কেউ যেন জোরে জোরে ঘা দিচ্ছে মোটা লাঠি দিয়ে। সুনন্দার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ‘কে ওখানে?’ চেঁচিয়ে উঠল সুনন্দা। কোনও সাড়া নেই। আবার একটু পরে একই কাণ্ড। মনে হচ্ছে কেউ যেন দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকতে চাইছে। সুনন্দা সব আলো জ্বেলে রাখল আর দুর্গানাম জপ করতে লাগল মনে মনে। এরকম দরজা ঠেলাঠেলি আরও কিছুক্ষণ চলল। তারপর থামল। কিন্তু সুনন্দার আর সারারাত ঘুম হল না।
পরদিন আবার বন্ধুদের বলল ওর রাত্রের অভিজ্ঞতা। বন্ধুরা ঠাট্টা করতে লাগল। কেউ বলল, ‘তোর বাড়িতে বারে বারেই ভূত আসছে। এবার তোর ঘাড় মটকাবে’। কেউ বলল, ‘রাতের পাহারাদার হয়ত কিছু পান করে পথ ভুলে ওখানে চলে গিয়েছিল’। সবাই হালকা করে দিতে চাইল ব্যাপারটা। এই ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হয় নি।
এরপর ঘটলো অন্য ঘটনা। একদিন রুপু খেলছে বাগানে দুপুরবেলা একা একা। সেদিন সুনন্দার ক্লাস ছিল না। জানলার ধারে বসে সুনন্দা একটা বই পড়ছিল। হঠাৎ খুব শালিকের চিৎকার শুনে বাইরে তাকিয়ে দেখে একটা বিরাট গোখরো সাপ বাগানের মধ্যে দিয়ে পার হয়ে অন্য পাশের জঙ্গলে যাচ্ছে। তার বিশাল লম্বা শরীরটা এঁকে বেঁকে চলেছে। রুপু কাছেই খেলছিল। সুনন্দার হৃৎস্পন্দন যেন থেমে গেল হঠাৎ। দৌড়ে বাগানে নেমে রুপুকে কোলে করে ঘরে এল সুনন্দা। মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জানায় ঠাকুরকে। আর একটু হলেই সাপটা রুপুকে কামড়াত। ভাবতে পারে না সুনন্দা কী হত তারপর! একটা ভয় গ্রাস করে সুনন্দাকে।
একদিন সুনন্দা সকালে উঠে শোনে, কাল রাত্রে একটা চিতা ঢুকেছিল ক্যাম্পাসে। সেটি জঙ্গল পেরিয়ে পাশের রাস্তায় একটি বাড়ির বারান্দায় সারারাত চুপ করে শুয়ে ছিল। সকালে দরজা খুলে সেই দৃশ্য দেখে তো গৃহকর্ত্রীর আক্কেল গুড়ুম। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বাড়ির লোকেদের ডেকে তোলেন তিনি। বাড়ির লোকেরা বন দপ্তরে ফোন করে জানান ঘটনাটা। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল চিতাটি তখনও নড়ছে না সেখান থেকে। পরে বনদপ্তরের লোকজন এসে ঘুমপাড়ানি গুলি মেরে ঘুম পাড়িয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
এই ঘটনাটা জেনে সুনন্দার ভয় আরও বেড়ে ওঠে। ও ভাবতে থাকে যদি ওর বাড়ির দরজায় চিতাটা বসে থাকত আর সকালে রুপু বাইরে বেরিয়ে যেত! আর ভাবতে পারে না সুনন্দা। একটা আতঙ্কের ঘন মেঘ গ্রাস করতে থাকে সুনন্দাকে। সুনন্দা ভাবে সব ছেড়ে কলকাতা শহরের নিশ্চিন্ততায় চলে যাবে। এত টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি হবে ভেবে এখানে সে ছুটে এসেছিল একদিন। আজ ভাবে শহরের ভিড়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকাই ছিল ভাল। একটা ফ্ল্যাট বাড়ির নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে কেটে যাবে জীবনের বাকি দিনগুলো। সেখানে হয়তো মনের মুক্তি আটকে যাবে অপরিসর বারান্দার গ্রিলে, কিন্তু আছে এক নিরাপত্তার শান্তি। সুনন্দা মনে মনে ভাবে, শ্রীমদভাগবতে উল্লেখ আছে মানুষের জীবনের তাপত্রয় এর কথা –আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক। বর্তমানে তার সব ভয়ের কারণ যেন আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক! এই তাপত্রয় এড়িয়ে থাকা সম্ভব নয় কোনও মানুষের, গীতায় বলেছে। তবু মনে হয় আধিভৌতিক ও আধিদৈবিকের প্রভাব কমবে কিছুটা শহরে গেলে, যদিও আধ্যাত্মিক তাপ থাকবে অব্যাহত। আবার চাকরি খুঁজতে হবে তাকে, ভাবে সুনন্দা। ভেসে চলা জীবন। এই গতিময় পথেই খুঁজে পাবে জীবনের ছন্দ। ছুট, ছুট, ছুট.........সুনন্দা ছুটে চলেছে জীবনের এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। অকুল দরিয়ায় কূল মিলবে কবে কে জানে! ‘আমায় ভাসাইলি রে আমায় ডুবাইলি রে/ অকুল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে’।
জীবনের সুদীর্ঘ পথ চলতে চলতে সুনন্দা ভাবে, স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়া দরকার আসলে। এই তাপত্রয় যাতে বিচলিত করতে না পারে তার জন্য অন্তরের গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার। আর থাকা দরকার শাস্ত্রে বর্ণিত ঋষির মত জীবন দর্শন -
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।
জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এসে সুনন্দার মনে হয় অভিজ্ঞতা মানুষকে সমৃদ্ধ করে, স্থিতপ্রজ্ঞ হতে সাহায্য করে। জীবনের শুরুতে যে সব ঘটনা মনকে নাড়া দিত, শেষ ভাগে এসে তা মনকে নিঃস্পৃহ করে তোলে। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের দর্শনের মত মন বলে শুধু –‘এহ বাহ্য, আগে কহো আর’।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।