এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বাংলা জানা অবাঙালি তারকারা

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৮১ বার পঠিত
  • ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস আসলে বহু ভাষার মানুষের মিলনকাহিনি। হিন্দি সিনেমার কোনও অভিনেতা হয়তো কলকাতায় বড় হয়েছেন, দক্ষিণ ভারতের কোনও তারকা বাংলায় অভিনয় করেছেন, কেউ আবার বাঙালি পরিবারে জন্মেছেন। কেউ বাংলা শিখেছেন কলকাতায় বসবাসের কারণে, কেউ বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে, আবার কারও ক্ষেত্রে বাংলা ছিল তাঁর শৈশবের ভাষা।
    তাই “বাংলা জানা তারকা” বলতে শুধু বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রীকে বোঝালে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং দেখা দরকার—কোন তারকার সঙ্গে বাংলার সম্পর্কটা কোথা থেকে তৈরি হয়েছে।
    এই তালিকায় সেই দিক থেকে বেশ কয়েকটি চমকপ্রদ নাম রয়েছে।

    কে. এল. সায়গল — কলকাতার নিউ থিয়েটার্সের শিল্পী।
    ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের কিংবদন্তি অভিনেতা কুন্দনলাল সায়গল-এর সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। কলকাতার নিউ থিয়েটার্স তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি তিনি বাংলা গানও গেয়েছেন।
    অর্থাৎ সায়গলের ক্ষেত্রে বাংলা কোনও বাইরের ভাষা ছিল না। কলকাতার চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ফলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তাঁর শিল্পীজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। নিউ থিয়েটার্সের বাংলা-হিন্দি দুই ধারার চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতিই তার প্রমাণ।

    রাজ কাপুর — কলকাতার স্কুলজীবন।
    তাঁর জন্ম হয়েছিল পেশোয়ারে। তবে তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছিল কলকাতায়। তিনি কলকাতার St. Xavier’s Collegiate School-এ পড়াশোনা করেছিলেন।
    আর এখানেই তাঁর বাংলা জানার সম্ভাব্য ও স্বাভাবিক সূত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় কলকাতায় থাকা, স্কুলে পড়া এবং বাঙালি পরিবেশের সঙ্গে মেলামেশা—এসবের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল।
    অর্থাৎ রাজ কাপুরের বাংলা জানার গল্পটি কোনও পরিণত বয়সে চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে ভাষা শেখার গল্প নয়; কলকাতার শৈশব ও স্কুলজীবনের সঙ্গে তার সূত্র জড়িয়ে আছে।
    গুরু দত্ত — কলকাতার শিল্প-পরিবেশ
    গুরু দত্তের জীবনেও কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। কলকাতায় তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা এবং এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তাকে প্রভাবিত করেছিল।
    তাঁর চলচ্চিত্রের কবিত্বময়তা, সাহিত্যবোধ এবং সংবেদনশীলতার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দেখা যায়, তার সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও সেই কলকাতা-অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

    গুলজার — ভাষার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী।
    গুলজার-এর বাংলা-সম্পর্ক আবার অন্য ধরনের। তিনি মূলত উর্দু ও হিন্দি ভাষার কবি, গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার হলেও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ বহুদিনের। তাই তাঁর ক্ষেত্রে “বাংলা জানা”কে শুধু কথ্য ভাষার দক্ষতা দিয়ে বিচার না করে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সৃষ্টিশীল যোগাযোগ হিসেবেও দেখা যায়।

    কমল হাসান — বাংলায় অভিনয়ের সাহস
    দক্ষিণ ভারতের কিংবদন্তি অভিনেতা কমল হাসান বহুভাষিক অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত। বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
    ১৯৭৭ সালের বাংলা ছবি ‘কবিতা’-য় তিনি অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি ছিল বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র এবং সেখানে মালা সিনহা, রঞ্জিত মল্লিক ও কমল হাসান অভিনয় করেছিলেন।
    এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—কমল হাসান এমন একজন অভিনেতা যিনি ভাষাকে অভিনয়ের পথে বাধা হতে দেননি। বাংলা ছবিতে অভিনয় করার জন্য বাংলা সংলাপের সঙ্গে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। তাই তাঁকে ভারতীয় সিনেমার বহুভাষিক অভিনেতাদের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ বলা যায়।

    ড্যানি ডেংজংপা — বাংলা ছবিতেও অভিনয়
    ড্যানি ডেংজংপা মূলত হিন্দি ছবির জনপ্রিয় অভিনেতা হলেও বাংলা চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। ১৯৯২ সালের বাংলা ছবি ‘বাহাদুর’ তাঁর বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য কাজগুলির একটি। তাঁর ক্ষেত্রে বাংলা জানার সূত্রটি মূলত বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পাহাড়ি শিকড় এবং পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পরিবেশও এই যোগাযোগকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। লালকুঠি, প্রহরী, বন্ধু ছবিগুলো ওঁর অভিনয়ের অমর স্বাক্ষর। বাহাদুর ছবিতে উনি একটি বাংলা গানও গেয়েছিলেন।
    অমল পালেকর — বাংলা ছবিতে অভিনয়
    স্বাভাবিক অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত অমল পালেকর-ও বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। মাদার, কলঙ্কিনী, চেনা অচেনা, অবশেষে প্রভৃতি বাংলা ছবিতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনিও নিজের সংলাপ নিজেই ডাব করতেন। ফলে বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও কেবল দূর থেকে নয়—বাংলা ছবিতে সরাসরি অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি।

    শত্রুঘ্ন সিনহা — বাংলা ছবির সঙ্গেও যোগাযোগ।
    শত্রুঘ্ন সিনহা হিন্দি চলচ্চিত্রের বড় তারকা হলেও তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে বাংলা ছবির সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে। শত্রুঘ্ন সিনহা বিহারে জন্মেছেন। সেখানে ওঁর স্কুল ও পাড়ায় প্রচুর বন্ধু বাঙালি ছিলেন। পরবর্তীতে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে গিয়ে সহপাঠী হিসেবে পান গৌতম ঘোষ ও কল্যাণ চ্যাটার্জীর মত বাঙালিদের। নিজের সংলাপ নিজে ডাব করে তিনি অন্তর্জলি যাত্রা, জবান, মস্তান ছবিগুলোতে অভিনয় করেন।

    রাজেশ শর্মা — কলকাতার থিয়েটার থেকে বাংলা সিনেমা।
    রাজেশ শর্মা এই তালিকার অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ। পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্ম হলেও তিনি কলকাতায় কাজ করেছেন এবং রঙ্গকর্মী-র সঙ্গে থিয়েটারে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন।
    অপরাধী, পুলিশ, সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁকে বাংলা ছবিতে এমন স্বাভাবিকভাবে দেখা গেছে যে অনেক দর্শক তাঁর বাংলা পরিচয় আলাদা করে ভাবেনই না।
    তাঁর বাংলা শেখার সূত্র তাই পরিষ্কার—কলকাতায় বসবাস, বাংলা থিয়েটার এবং দীর্ঘদিন বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়।

    অমিতাভ বচ্চন — কলকাতার সাত বছর।
    অমিতাভ বচ্চনের বাংলা জানার গল্পটিও অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
    ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯—প্রায় সাত বছর তিনি কলকাতায় বসবাস করেছিলেন। চাকরির সূত্রে কলকাতায় থাকা সেই সময়টি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরে মুম্বইয়ে চলচ্চিত্রজগতে যাওয়ার পরও বাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়নি।
    এমনকি পিকু-র শুটিংয়ের সময় পরিচালক সুজিত সরকারের সঙ্গে তিনি বাংলায় কথাবার্তা বলতেন। 'কহানি' ছবির জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘একলা চলো রে’-ও বাংলায় আবৃত্তি/গানরূপে পরিবেশন করেছিলেন।
    তাই অমিতাভ বচ্চনের বাংলা জানার মূল সূত্র—কলকাতায় দীর্ঘ সাত বছরের বসবাস এবং বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ। তিনিও বাংলা ছবিতে অভিনয়ের জন্য নিজের সংলাপ নিজেই ডাব করেছেন। তাঁর বাংলা ছবিগুলি হল, জবান, অনুসন্ধান ও ওরা কারা।

    অঞ্জন শ্রীবাস্তব — বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয়।
    অঞ্জন শ্রীবাস্তব হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। কলকাতা ও বাংলা থিয়েটারের সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কারণে বাংলা ভাষা ও নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও উল্লেখযোগ্য।
    তাঁর ক্ষেত্রে বাংলা জানার বিষয়টি মূলত থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সূত্রে দেখা উচিত।

    বিদ্যা বালান — বাংলা তাঁর আপন ভাষার পরিসর
    বিদ্যা বালান-এর ক্ষেত্রে গল্পটা আরও ব্যক্তিগত। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে বাংলায় তাঁর স্বচ্ছন্দতা কেবল কোনও একটি ছবির জন্য শেখা ভাষার ফল নয়।
    পরিণীতা, ভালো থেকো এবং পরবর্তী সময়ে বাংলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি দেখিয়েছে, বাংলা তাঁর কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিসর।

    আশীষ বিদ্যার্থী — বহু ভাষার অভিনেতা।
    আশীষ বিদ্যার্থী ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বহুভাষিক অভিনেতা। হিন্দির পাশাপাশি তিনি বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, ওড়িয়া, মারাঠি-সহ বহু ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর বাংলা ছবির তালিকাও দীর্ঘ—বোম্বাইয়ের বোম্বেটে, গ্রেফতার, নীল রাজার দেশে, গোয়েন্দা ইত্যাদি।
    অর্থাৎ তাঁর বাংলা জানার সূত্র খুব স্পষ্ট—দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয়।

    তনুজা — বাংলা ছবির দীর্ঘ অধ্যায়। তাঁর বিয়ে হয়েছে প্রবাসী বাঙালি পরিবারে।
    তনুজা হিন্দি ছবির অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী হলেও বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান কম নয়। দেয়া নেয়া, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, তিন ভুবনের পারে, প্রথম কদম ফুল, চৈতালি, অপরাজিতা থেকে শুরু করে বহু বাংলা ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন।
    আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাংলা ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি বাংলা সংলাপ নিজে বলার মতো করে ভাষাটি শিখেছিলেন।
    তাই তনুজার বাংলা জানার সূত্র একেবারে পরিষ্কার—বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অভিনয়জীবন এবং নিজে বাংলা সংলাপ বলার অভ্যাস।

    মালা সিনহা — কলকাতার মেয়ে, বাংলা ছবির নায়িকা
    মালা সিনহা এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলির একটি। নেপালি বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম হলেও তিনি কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠেন। স্কুলজীবনও কলকাতায়।
    আর তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরুই হয়েছিল বাংলা ছবি দিয়ে। শিশুশিল্পী হিসেবে বাংলা ছবিতে অভিনয় করার পর ১৯৫২ সালের ‘রোশনারা’-য় নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন।
    পরবর্তী সময়ে তিনি হিন্দি সিনেমার বড় তারকা হয়ে ওঠেন, কিন্তু বাংলা তাঁর শিল্পীজীবনের গোড়াতেই ছিল। তাঁর অভিনীত বাংলা ছবির সংখ্যা ২০-রও বেশি।
    অতএব মালা সিনহার ক্ষেত্রে বাংলা জানা কোনও আশ্চর্যের বিষয় নয়—কলকাতার শৈশব, স্কুলজীবন এবং বাংলা ছবিতে অভিনয়—তিনটিই তাঁর বাংলা ভাষাজ্ঞান তৈরির ভিত্তি।

    শরদ কাপুর — কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা
    শরদ কাপুর-এর বাংলা জানার সূত্রও বেশ পরিষ্কার। তিনি কলকাতায় জন্মেছেন এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। পাঞ্জাবি পরিবারের সন্তান হলেও কলকাতার পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে বাংলা ভাষা তাঁর কাছে অপরিচিত ছিল না। তিনি পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন।
    তাই তাঁর ক্ষেত্রে বাংলা শেখার মূল সূত্র—কলকাতায় জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ।

    আদিল হুসেন — অসমের শিল্পী, বাংলার চলচ্চিত্রেও স্বচ্ছন্দ।
    আদিল হুসেন-এর শিকড় অসমে। অভিনয়জীবনের শুরু থেকেই তিনি অসমীয়া নাটক ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বাংলা চলচ্চিত্রেও কাজ করেন।
    আহারে মন, অব্যক্ত, মিল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য বাংলা ছবিগুলি রয়েছে।
    তাঁর ক্ষেত্রে বাংলা জানার সূত্রটি মূলত পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বাংলা চলচ্চিত্রে ধারাবাহিক অভিনয়।

    তিনু আনন্দ — বাংলা ছবিতেও অভিনয়
    তিনু আনন্দ মূলত হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তিনিও বাংলা ছবিতে কাজ করেছেন। গোরস্থানে সাবধান এবং গোঁসাইবাগানের ভূত-এর মতো বাংলা ছবিতে তাঁর অভিনয় রয়েছে। তিনু আনন্দ বাংলা শিখেছিলেন, সত্যজিৎ রায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করতে এসে। বাঙালি বৃত্তে রায়বাবুর টিমে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে বাংলা ভাষা রপ্ত করে নিয়েছিলেন। তাই তাঁর বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও বাংলা চলচ্চিত্র।

    রবীন্দ্র জৈন - প্রথম জীবনে কলকাতা

    আলিগড়ের এক অন্ধ তরুণ যখন কলকাতায় পা রাখলেন, তখনও হয়তো তিনি জানতেন না—এই শহর একদিন তাঁর সংগীতজীবনের পাশাপাশি তাঁর ভাষাজীবনও বদলে দেবে। তিনি রবীন্দ্র জৈন।
    শাস্ত্রীয় সংগীতে ছোটবেলা থেকেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ছিল। কিন্তু আরও বড় কিছু করার তাগিদে তরুণ বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এই শহরেই শুরু হয় তাঁর কঠিন সংগ্রামের দিন। তিনি একটি বাঙালি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। সেই পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, কথাবার্তা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিশতে মিশতেই ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা তাঁর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
    কিন্তু রবীন্দ্র জৈনের বাংলা শেখা শুধু কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা গান ও সাহিত্যের প্রতিও তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি পরে স্মরণ করেছিলেন, কলকাতাতেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল।

    জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি স্কুলে সংগীত শেখাতেন, বাড়িতে ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাতেন। পাশাপাশি তাঁর যোগাযোগ হয় আকাশবাণী কলকাতার সঙ্গে। সেখানেই বাংলা গান লেখা ও সুর করার সুযোগ পান। তাঁর নিজের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তাঁর লেখা ও সুর করা একটি বাংলা গান রেকর্ডও হয়েছিল।

    এইভাবেই কলকাতা তাঁকে শুধু একজন দক্ষ সুরকার হিসেবে তৈরি করেনি, বাংলা ভাষাকেও করে তুলেছিল তাঁর আপন। পরে মুম্বইয়ে গিয়ে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি গীতিকার-সুরকার হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর সংগীতজীবনের সেই শিকড়ের একটি অংশ রয়ে গেল কলকাতায়।
    তাই রবীন্দ্র জৈনের বাংলা জানার গল্প আসলে একজন অবাঙালি শিল্পীর অন্য একটি ভাষা শেখার গল্প নয়; এটি একটি শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে একজন শিল্পীর গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার গল্প।
    একই বাংলা, কিন্তু সূত্র আলাদা
    এই তালিকাটির সবচেয়ে মজার দিক এখানেই।

    রাজ কাপুর—কলকাতার শৈশব ও স্কুলজীবন।
    অমিতাভ বচ্চন—কলকাতায় সাত বছরের কর্মজীবন।
    মালা সিনহা—কলকাতায় জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বাংলা ছবিতে শৈশব থেকেই অভিনয়।
    শরদ কাপুর—কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা।
    রাজেশ শর্মা—কলকাতায় বেড়ে ওঠা। কলকাতার থিয়েটার ও বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়।
    বিদ্যা বালান—বাংলা সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পরিসর। বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়ের জন্য রীতিমত শিক্ষক রেখে বাংলা ভাষা শিখেছিলেন।
    তনুজা— বাঙালি পরিবারে বিবাহ সূত্রে বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অভিনয় এবং নিজের কণ্ঠে বাংলা সংলাপ বলা।
    আশীষ বিদ্যার্থী ও তিনু আনন্দ—বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা।
    কমল হাসান—বাংলা ছবিতে সরাসরি অভিনয়।
    আর সায়গল-এর ক্ষেত্রে কলকাতার নিউ থিয়েটার্সই হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পীজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।
    অর্থাৎ এঁদের বাংলা জানার কারণ এক নয়। কেউ কলকাতার মানুষ হয়ে, কেউ কলকাতায় থেকে, কেউ বাংলা থিয়েটারে কাজ করে, কেউ বাংলা ছবিতে অভিনয় করে, আবার কেউ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ থেকে বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
    এটাই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্য—ভাষা এখানে শুধু সংলাপ নয়, সংস্কৃতির সেতু।

    হিন্দি সিনেমার তারকা বাংলায় কথা বলছেন, দক্ষিণের অভিনেতা বাংলায় অভিনয় করছেন, পাঞ্জাবের অভিনেতা কলকাতায় এসে বাংলা থিয়েটারে কাজ করছেন, নেপালি বংশোদ্ভূত এক অভিনেত্রী কলকাতায় বেড়ে উঠে বাংলা ছবির নায়িকা হয়ে হিন্দি সিনেমায় সর্বভারতীয় তারকা হয়ে উঠছেন—এই ঘটনাগুলিই দেখায়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রকৃত শক্তি তার বহুভাষিক চরিত্রে।
    আর সেই কারণেই “বাংলা জানা তারকারা” নিছক কয়েকজন তারকার নামের তালিকা নয়; এটি আসলে বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক আকর্ষণ এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের আন্তঃভাষিক বন্ধনের একটি ছোট্ট ইতিহাস।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কৌতূহলী | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৫১742573
  • নাসিরুদ্দিন শাহ?
  • :|: | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৫৮742574
  • তনুজার "অপরাজিতা"?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন