এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিরজু কেওট

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৭১ বার পঠিত
  • পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর শেষ অভিযোগ শুনেছিলাম ভিখারি পাসোয়ানের কেসে। গত তেত্রিশ বছর, অর্থাৎ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই পাপ থেকে মুক্ত ছিল বাংলা। ভিখারি, রাজনীতির কেউ ছিলেন না। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কারো পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু তো গোটা বামফ্রন্ট জমানাতেই হয়নি। মোটামুটি বিগত পঞ্চাশ বছর। অনেক কিছুর মধ্যেও এইটুকু এগোনোর রেকর্ড ছিল বাংলার। রেকর্ড ভেঙে দিল শুভেন্দু অধিকারী জমানা, ক্ষমতায় আসার স্রেফ কয়েক মাসের মধ্যেই। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হল কাঁচরাপাড়া পুরসভার পদত্যাগী তৃণমূল কাউন্সিলরের স্বামীর। নাম বিরজু কেওট। বিরজুকে গ্রেফতার করেছিল হালিশহর থানার পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে আদালতেও হাজির করানো হয়েছিল। বিচারক তাঁর পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। সেই হেফাজত থেকে তিনি আর ফেরেননি। স্ত্রী বলেছেন, রাত দশটাতেও তিনি দেখা করেছিলেন স্বামীর সঙ্গে। কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিলনা। তারপর গভীর রাতে 'হঠাৎ করে'ই তিনি মারা যান। অন্তত পঞ্চাশ বছর পর, পশ্চিমবঙ্গের লকআপে একজন রাজনীতিবিদ পট করে মরে গেলেন। লকআপে মারধর করার অভিযোগ এসেছে, বলাবাহুল্য।

    ওই একই দিনে, আরেকটা ঘটনা ঘটেছে। টলিপাড়া-খ্যাত স্বরূপ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কয়েকদিন আগে। অভিযোগ কী কী বলা কঠিন। তবে টিভিতে দেখানো হয়েছিল, তাঁর ক্লাবের দোতলার মোজেইক করা বাথরুম। সঙ্গে নারীসঙ্গের ভয়ানক গল্প। যেরকম 'পিঠে বানানো'র গল্প এর আগেও আমরা শুনেছি। এক মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে নারীনিগ্রহের অভিযোগ এনেছেন, তাই স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেপ্তার, প্রচুর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শোনা গিয়েছিল। তো, সেই মহিলা কাল সমাজমাধ্যমে এসে লাইভ করে জানিয়েছেন, স্বরূপ কস্মিনকালেও তাঁর শ্লীলতাহানি করেননি। এমনকি সামনাসামনি দেখাও কখনও হয়নি। তিনি কারো প্ররোচনায় এবং 'ভয় আউট ভরসা ইন' এর চক্করে পড়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু সেই অভিযোগ স্বরূপের বিরুদ্ধে নয়, শ্লীলতাহানির তো নয়ই।

    এই দুটো ঘটনা থেকেই পশ্চিমবঙ্গে কী ধরণের মগের মুলুক চলছে, সেটা টের পাওয়া যায়। অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার, লক-আপে মৃত্যু, ইত্যাদি প্রভৃতি। খেয়াল করে দেখবেন, এগুলোর বৈধতা তৈরি করা হয়েছিল ডিম্মিডিয়ার স্টুডিওয়। কিছু বিল্ডিং দেখানো হয়েছে, সেখানে নিয়ম করে পাওয়া যাচ্ছিল কন্ডোম, যেন খুব নিষিদ্ধ কোনো বস্তু। ডিম ছোঁড়ার নাম হয়েছিল জনরোষ। খালি পায়ে হাফপ্যান্ট পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর নাম উচিত শিক্ষা। বিরাট বিশেষজ্ঞরা, বাঘা সঞ্চালকরা খুব চেঁচিয়েছেন টিভিতে, খবরের কাগজে রিপোর্টিংএর বন্যা, কারো একবারও সাহস হয়নি, বেআইনী কাজকে বেআইনী বলার। অথচ এর একটা কান্ড, ধরুন ছমাস আগে যদি ঘটত, এঁদের বিক্রম দেখার মতো হত। এঁরা চেঁচাতেন, আদালতে কোনো ভগবান আরও জোরে বলতেন, ঢাকি সমেত বিসর্জন দিয়ে দেব। সেসব গলা আর শোনা যায়না। এক বাঘা সঞ্চালক সরু গলায় বছরের পর বছর চেঁচিয়ে গেছেন, বাংলায় এত হিংসা কেন। দেখে মনে হত রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি নাটক দেখছি। এখন তাঁর গলা বুজে গেছে। পুলিশকে কাজে লাগিয়ে, সরাসরি যে হিংসা হচ্ছে, সে নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। ডিম্মিডিয়া মানেই পোষ্য সারমেয়, এ তো এমনি বলা হয়না। ঢাকি এবং ঢাক সব সমেত এদেরকে বিসর্জন দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। ঢাক বলতে সেই সমস্ত বৌদ্ধিক লোকজন, যাঁরা সরাসরি অথবা প্রকারান্তরে এদের নৈতিক সমর্থন জুগিয়ে গেছেন, তাঁদের কথাই বলা হচ্ছে।

    অন্য কিছু লোকজনও এই স্বরূপ বিশ্বাসের ঘটনায় খুব নেচেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এখানে এসেও বলবেন, "আপনি কি তবে স্বরূপ বিশ্বাসের সমর্থক?" লিখে কারো আইকিউ বাড়ানো যায় কিনা জানিনা, তবু বলে রাখি। স্বরূপ বিশ্বাস ফেডারেশনে অপকম্মো করতেন কিনা আমি জানিনা। করতেই পারেন। এমনকি ভবিষ্যতে ভালো তৃণমূল হয়ে আবার ওই ফেডারেশনের মাথায়ই বসবেন কিনা তাও জানিনা। কাঁচরাপাড়ার বিরজু কেউট তোলা তুলতেন কিনা জানিনা। হয়তো তুলতেন। কিন্তু একটা কথা জানি, যা হচ্ছে, এগুলো কোনো বিচার নয়, এমনকি বিচারের চেষ্টাও নয়। কেবল এবং কেবলমাত্র প্রতিশোধমূলক আচরণ করা হচ্ছে, পুলিশ এবং সরকারি ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে, গত ৫০ বছরে পশ্চিমবঙ্গ এই মাত্রার অপকম্মো দেখা যায়নি। "ভালো" হয়ে যাও, নইলেই বিপদ, এই বার্তা খুব স্পষ্ট। এবং এটা স্রেফ তৃণমূলে থেমে থাকবে তা নয়। ধরুন বাম বিধায়ক ভালো, তিনি ঠিকই আছেন। কিন্তু লাহেক আলি খারাপ, অতএব তিনি জেলে। এই তো সোজা হিসেব। এর কোনো তৃণমূল-সিপিএম-এসইউসি নেই।

    অমুককে সিবিআই গ্রেপ্তার করলে সঠিক, তমুককে নিয়ে ডিম্মিডিয়া বললে একদম খাঁটি কথা বলেছে, এইসব গোবধে আনন্দিত হয়ে অবোধপনার দিন গেছে। অভিজিৎ দীপকে কিংবা ধ্রুব রাঠি সমস্ত বিরোধীদের সম্মান দিলে সেটা 'সহি' কাজ, আর সৈকত বাঁড়ুজ্যে বললেই চটিচাটা, এইসব প্রকারান্তরে ডিম্মিডিয়াকে সমর্থন করার দিনও গেছে। এই করে, বিজেপি-বিরোধিতাকে গোল্লায় দেওয়া হয়েছে। এখনও করে চললে কিছু বলার নেই, গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু গাম্বাটপনাকে গাম্বাটপনা বলাও গণতান্ত্রিক অধিকার। একজন মনে করিয়ে দিলেন, এর মধ্যে 'এনকাউন্টার'ও হয়ে গেছে। এটাও রেকর্ড। নকশাল আমলের পর এ জিনিস হয়নি পশ্চিমবঙ্গে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • গোবধ বন্ধ হোক | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১৪:১০742162
  • তরুণ তেজপাল না স্বরূপ বিশ্বাস কে বেশি মহান?
  • নামে কি আসে? | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ২০:৩৮742168
  • লকআপ দেখেছে লেখক? আমি দেখেছি? আপনার আপন নির্মমতার আমলেই। আপনি দেখবেন?
  • ar | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪৭742169
  • "লকআপ দেখেছে লেখক? আমি দেখেছি? আপনার আপন নির্মমতার আমলেই। আপনি দেখবেন? "

    "আপনি দেখবেন"?
    তো, বাংলার চাড্ডিরা এখন গুরুর পাতায় থ্রেট বিতরণ করতে চায়!!! তা বেশ। তবে "ক্যামেরাকে সামনে" হলে এমনটি হয়।
  • albert banerjee | ১০ আগস্ট ২০২৬ ১৫:১৬742180
  • আমি দেখতে চাই। থ্রেট করতে আসবেন না দয়া করে। আরো অনেক লেখকই দেখতে চায়। এ বড়ো কঠিন ঠাঁই বন্ধু। কোনো দিন নিজে থেকেও যেতে পারি জেল ভরতে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন