কবীরের বিখ্যাত দোহা আছে— “মো কো কাহা ঢুড়ো বন্দে মৈ তো তেরে পাস মে, না মৈ দেবল, না মৈ মসজিদ, না কাবে কৈলাস মে” —অর্থাৎ ঈশ্বরকে মন্দির-মসজিদে না খুঁজে নিজের ভেতরে খোঁজা, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বসবাস। একই রকম দর্শন আমাদের পরিচিত দর্শনে কি নাই? আছে। লালনও এমন কথা নানাভাবে বলে গেছেন নানা জায়গায়। লালন আর কবীরের মধ্যে সময়ের ব্যবধান সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু দর্শন তো সময়ের ফাঁদে পড়ে না, তাই কবীরের দর্শন সেই সময় অতিক্রম করে পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়েছে, সময়ের সীমাবদ্ধতাও অতিক্রম করেছে। সেই পনেরোশ শতকের দিকে ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেওয়া কবীর তাঁর সময়ের সীমার ঊর্ধ্বে উঠে, পরে আমাদের তৈরি কৃত্রিম সীমানা ভেঙে যখন আমাদের সম্মুখে এসে দাঁড়াচ্ছে, তখন তাঁকে বিতর্কে ফেলে কে যে কী হাসিল করতে চাচ্ছে তা বোঝা মুশকিল।
বাউল গান, ফকিরদের জীবনধারা এগুলো যুগের পর যুগ মানুষের মুখে মুখে, শিষ্য থেকে শিষ্য, একটা পরম্পরা ধরে চলেছে। তাই লালন আর কবীরকে আলাদা করাটা বর্তমান যুগের নানা তাত্ত্বিকের জন্য সহজ কিন্তু আসলে তা অসম্ভব! আর তাই সাড়ে তিনশ বছর পরে লালন বলে—
“ভক্ত কবির জাতে জোলা
প্রেম ভক্তিতে মাতোয়ালা
ধরেছে সে ব্রজের কালা
দিয়ে সর্বস্ব ধন তাই”
আপনি কবীরকে চেনেন না, এইটা আপনার ব্যর্থতা। কিন্তু আপনার ব্যর্থতাকে জাতির ঘাড়ে তুলে দিয়েন না। যখন চিন-পরিচয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে তখন মানসিক ক্ষুদ্রতার কারণে উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে একে নষ্ট করা উচিত হবে না।
এগুলো কেন লিখলাম তাই বলা হয় নাই আসলে। লিখলাম এই কারণে যে, লালনসংঘ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মিলে কবীর-লালন উৎসব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ২৫ সেপ্টেম্বর শেরপুর শিল্পকলা একাডেমিতে ময়মনসিংহ বিভাগের আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গা থেকে। নানান রঙের যে ভণ্ড আছে দেশে, তারা প্রশ্ন তুলছে কেন লালন উৎসব কবীরকে সাথে নিয়ে করতে হবে? এর মধ্যে তারা ভারতীয় আধিপত্য দেখছে, আগ্রাসন দেখছে, দেশ নিয়ে গেল ইন্ডিয়া দেখছে! কিছু কুযুক্তি তোলা হয়েছে। দেশের এত এত বাউল সাধক রয়েছেন, তাহলে কেন তাঁদেরকে বাদ দিয়ে ভারতের কবীরকে নিয়ে উৎসব করতে হবে? এগুলো হচ্ছে কুযুক্তি। মনে হবে, তাই তো, এ আবার কোন কথা? কিন্তু প্রশ্নটাই যে ভুল, তা আর কেউ বলবে না। প্রশ্নটা কেন এইটা হচ্ছে, তা না হয়ে হওয়া উচিত ওগুলো কেন হচ্ছে না! সেগুলো কেন হচ্ছে না তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলেন, তোলা উচিত। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে, এইটা গোলমেলে আলাপ। আমি যতদূর জানি, এইটা হওয়ার জন্য দেশের লালনভক্তরা বেশ লম্বা সময় ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিল। লালন বিশ্বসংঘের সাথে খুব ভালোভাবে জড়িত অনেকেই আমার কাছের বন্ধু হওয়ায় এইটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। এতদিন পরে তাদের চেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল।
কবীরের নাম বাংলাদেশের মানুষ চিনে না। অনেক, মানে অনেক মানুষ কবীর সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা রাখে না। দেশে যে কবীর নামটা এত এত দেখা যায়, এর পেছনেও যে সেই একই কবীর—কারণে এইটাও অনেকের জানা নাই। আমারও খুব জানাশোনা নাই। নানান সময় নানান বইপত্র পড়ার একটা সুবিধা হচ্ছে, মাথায় নানা জিনিস নিজের অজান্তেই জমা হয়ে থাকে। এতদিন পরে কবীরকে নিয়ে দেশে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে দেখে এগুলো মনে পড়ল। আর তারপরেই দেখলাম নানান রঙের বুদ্ধিজীবীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে এর বিরোধিতা করতে। তার মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রদূত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে একেবারে সর্বনাশ করেছে! দেশে জলে ভেসেই গেল বুঝি—এমন আহাজারি শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। যারা বিরোধিতা করছে, তারা কিন্তু কবীরকে ভালো করেই চেনে। আপনার আমার চেয়েও ভালো করেই জানেন। কিন্তু এরা হচ্ছে ভণ্ড শিরোমণি। তাই ভারতের সিনেমা হলে গিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখতে দেখতে কবীরের বিরোধিতা করতে আসছে। দেশের সংস্কৃতি উদ্ধারে নেমেছে, সেই সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনীতিসহ আরও আল্লাহই জানে কী কী উদ্ধার করতে চাচ্ছে তারা!
বাংলায় বা বাংলা সংস্কৃতিতে কবীর এক সময় খুব পরিচিত নামই ছিল। প্রচুর কবীর নাম দেখে তা সহজেই অনুমেয়। লালন যেমন কবীরকে শ্রদ্ধা করতেন, নিজের নানা গানে কবীরের নাম নিয়েছেন; তেমনই বাংলা সাহিত্যের গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কবীরকে পছন্দ করতেন। কবীরের একশ গান নিয়ে তা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, নাম দেন—“Songs of Kabir”। ১৯১৫ সালে এই বই প্রকাশিত হয়। পুরো দুনিয়ার কাছে কবীরকে মূলত এই বইটাই পরিচিত করে তোলে। রবীন্দ্রনাথকে এই অনুবাদে সাহায্য করেন ইংরেজ লেখক ইভলিন আন্ডারহিল।
যাই হোক, এই ধর্ম নিয়ে হানাহানি, জাতপাত নিয়ে এই আধুনিক সমাজেও নানা বিতর্ক, ধর্মীয় উগ্রবাদের এই রমরমা সময়ে কবীর-লালনের মত-পথ ও মতবাদের খুব জরুরি দরকার। একটা সহজ হিসাব হচ্ছে কবীরকে বহিরাগত আমদানি হিসেবে দেখাটা ইতিহাসকে সরলীকরণ করে, কবীরকে ক্ষুদ্র করে। কবীর এমনিতেই লালনের নিজের গানে, বাউল-ফকিরদের মুখে মুখে, শত বছর ধরে বাংলার আধ্যাত্মিক ভাষার অংশ ছিলেন—তাঁকে "নতুন করে আমদানি" করার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তিনি কখনো সম্পূর্ণ বাইরের ছিলেন না। যারা এগুলো জেনে বিরোধিতা করছে, তাদের থেকে সাবধান। এরা অন্যকিছুর ধান্দায় আছে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।