তৌফিক ইমরোজ খালেদী মারা গেছেন গত শুক্রবার, ২ অক্টোবর। লন্ডনে ব্যক্তিগত সফরের সময় ব্রেন হেমারেজের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এই ছোট্ট একটা সংবাদ যে কত ভয়ংকর একটা সংবাদ, তা আসলে বলে বোঝানো সম্ভব না। তিনি সাংবাদিক ছিলেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নামে যে নিউজ পোর্টাল আছে বাংলাদেশে, তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্বই পালন করেছেন। এগুলা সব জানা কথা, মানুষ যারা তাঁকে চেনে-জানে, তাদের জন্য নতুন খবর না। কিন্তু আমি দাবি করছি, তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমি বলছি, এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। কেন এমন বলছি?
সাংবাদিক তো কতই আছে, সম্পাদকও অনেক আছে। নামের ভারে নু্যয়ে পড়ছে এমন অনেক। গত দুই বছরে আমরা বাংলাদেশিরা এমন কত কত সাংবাদিক দেখলাম না? যারা একসময়ের পত্রিকার প্রথম পাতায় লাল রঙের শিরোনাম করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নানা কুকীর্তির ফিরিস্তি ছাপিয়েছে, তারাই এখন বড় বড় ফন্টে লিখছে জাতির এখন দরকার সেই নেতাকেই, যে মুচলেকা দিয়ে লন্ডন চলে গেছিল। যার দুর্নীতির কিচ্ছা এই পত্রিকাওয়ালাই প্রকাশ করেছিল। এরাই জানা সত্ত্বেও মৌলবাদকে প্রশ্রেয় দিয়েছে। এরাই আবার মৌলবাদের আক্রমণের শিকার হয়েছে। এই সব ভণ্ডামির ঊর্ধ্বে ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালেদী। এই জন্যই তাঁর মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি।
তিনি দেশের প্রথম ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম চালু করেন। ২০০৬ সালে ইন্টারনেট সহজলভ্য ছিল না। তখন তিনি ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল চালু করেন। আমার কাছে আশ্চর্য লাগত। এমনে করে মানুষ সংবাদ পড়বে? পত্রিকা না ধরে, না ছুঁয়ে কীভাবে পড়বে? কিন্তু খুব বেশি দিন লাগেনি আমার চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন হতে। আমার জন্য যখন নিজস্ব কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা হলো, তখন আমি যে কয়টা সাইটকে বুকমার্ক করে, ট্যাব খুলে রাখতাম, তার মধ্যে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম একটা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের একটা স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়, যা সবসময়ই তাঁদের কাজের ভেতরে বোঝা যেত।
এই সব ছাপিয়ে আমি আসলে তাঁর এবং বিডিনিউজের ভক্ত হলাম এই দুর্দিনে। চব্বিশ সাল থেকে যে অন্ধকার সময় আসছে এবং এখনো যা চলছে, এই অন্ধকার সময়ে তৌফিক ইমরোজ খালেদী আমার চোখে ভিন্নভাবে ধরা দেন। দোসর ট্যাগ খাচ্ছে, কারও পত্রিকা দিনে-দুপুরে দখল হয়ে যাচ্ছে, কেউ টুপ করে টুপিটা খুলে নতুন টুপি পরে নতুন সুরে গান গাওয়া শুরু করেছে। তখন দেখি এই লোক নির্ভীক হয়ে কাজ করছেন। তাঁর ওপরে কি চাপ আসেনি? একশ ভাগ এসেছে। কিন্তু তিনি নীতির সঙ্গে আপস করেননি। যে আস্থাটা আমরা প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারের কাছ থেকে আশা করি, তা আমি পেয়েছি বিডিনিউজে। চ্যানেল আইয়ের মতো এত পুরোনো চ্যানেল তেলের শিশি হাতে ঘুরছে সকাল-বিকাল, প্রধানমন্ত্রীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত তৈলাক্ত করে পরে থামার নিয়ত।
বেশ কিছু প্রতিবেদন চমকে দিয়েছে আমাকে। এখন এই সময়ে এগুলা কথা বলছে কে? তখনই মূলত তৌফিক ইমরোজ খালেদীকে চিনেছি। এর আগে নাম না জানা কেউ একজন আছে, এমন করেই চিনতাম তাঁকে। এরপরেই জানলাম তাঁর সংগ্রামের কথা। ‘লীগ’র আমলেও তাঁকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এরপরেও হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সব কাটিয়ে নিজের মতোই চলেছেন।
সবচেয়ে দুর্দান্ত লেগেছে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভরসা দেখে। চব্বিশ সালের পরে যখন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অপমান স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি নিয়মিত এই সব অন্যায়ের সংবাদ প্রকাশ করেছেন। যখন সবাই হাত ছেড়ে দিচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, তখন তিনি প্রকাশ করেন তিন খণ্ডের বিশাল এক বই, নাম—‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। তিন খণ্ড মিলিয়ে এর আয়তন হলো ১ হাজার ৪৯৬ পৃষ্ঠা! মুক্তিযুদ্ধের ওপরে দারুণ একটা কাজ। প্রথম খণ্ডে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির সংগ্রাম, গৌরব, বেদনা এবং শিকড়ের ইতিহাস। দ্বিতীয় খণ্ডে করা হয়েছে ‘শেষ রণক্ষেত্র’ স্মরণে রেখে বাঙালির বহুমাত্রিক জনযুদ্ধের ইতিহাস। তিন নম্বর খণ্ডে আছে ছবি। দুর্লভ সব ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই খণ্ড। এমন একটা বই এই সময়ে প্রকাশ করা যে কত বড় সাহসের কাজ এইটা যারা এই বাংলাদেশে থাকছে তারাই সম্ভবত একটু আধটু বলতে পারবে, বুঝতে পারবে।
অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করছে, ‘এখন কেন?’ তিনি জবাবে বলেছেন, ‘কাউকে তো করতে হবে!’ তাঁর মৃত্যুর পরে একজনের একটা লেখা পড়লাম, সেখানে তিনি বলছেন, তিনি নাকি বলতেন, “আমরা নিরপেক্ষ নই। আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে, একাত্তরের প্রতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।” তৌফিক ইমরোজ খালেদীর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিও সবসময় একাত্তর নিয়ে সংবেদনশীল। আমার জন্য আর এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না।
ভাইরালের যুগে তাঁর প্রতিষ্ঠান ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করেনি—এইটাই তাঁদের বড় শক্তি। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া সহজ। তিনি গা ভাসিয়ে দেননি। তাই তিনি অনন্য। তাই তাঁর এই প্রস্থান, অসময়ে, মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তাঁর এই চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে এই সময়ে, যখন তাঁকে জরুরি দরকার। যখন সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ম্যুরাল ভেঙে একটা ফোয়ারা বানানো যাক, যখন মেহেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এখন পর্যন্ত ভাঙাই রয়েছে, যখন ফুলার রোডের একটা ভাঙা ভাস্কর্যও ঠিক করা হয়নি, যখন এই দেশে ৩২ নম্বরকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যখন পাকিস্তানের প্রেতাত্মা ঘাড়ের ওপরে নিশ্বাস ফেলছে দৈনিক, তখন তাঁর মতো একজন যোদ্ধার চলে যাওয়ার ক্ষতি আসলে অকল্পনীয়।
বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তৌফিক ইমরোজ খালেদীর প্রতি। জাতি আপনাকে মনে রাখবে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।