অন্ধজনে দেহ আলো
প্রথম ভাগ
আমরা বিশ্বাস করেছিলাম
১ সুপ্রতীকের কথা
বোধহয় ভোর হয়েছে। কখন হয় আগে টের পেতাম না। এই বাড়িটায় পাখির ডাক শোনা যায় না। এমনকি কাক বা চড়ুইদের খুনসুটিও না। কেন? এই ঘরটা বোধহয় বাড়ির একটু ভেতর দিকে। বাইরের আওয়াজ খুব কম আসে।
ঘর? বাড়ি? হুঁঃ!
প্রথম প্রথম জানতাম এটা একটা হাসপাতাল। চোখ এবং আরও অনেক কিছুর অ্যাডভান্সড্ রিসার্চ সেন্টার। মানে সেই রকমই বলা হয়েছিল আর আমরা বিশ্বাস করেছিলাম। আমরা—আমি আর চন্দনা। তাই ভর্তি হয়েছিলাম।
আর এখন?
ঠিক বুঝতে পারি না। কখনও মনে হয় এটা সত্যি সত্যি একটা হাসপাতাল। টের পাই দুয়েকজন রোগীকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাকেও বোধহয় এভাবেই আনা হয়েছিল।
কিন্তু আমি তো তখন অচেতন—অ্যানাস্থেশিয়ায়। তাহলে কী করে জানতাম যে ঠিক কী ভাবে আমাকে আনা হয়েছিল? আমাকে বলা হয়েছিল যে!
--আচ্ছা, তুমি বিশ্বাস করেছিলে! যা বলা হয় সব বিশ্বাস কর? তাহলে তো তুমিও সেই ভক্তদের দলে? না, বাজার চলতি অন্ধভক্ত কথাটা বলছি না।
তুমি তো যুক্তিবাদী, অথবা সংশয়বাদী। সবকিছু তলিয়ে দেখে নিতে চাও। সবকিছুকেই প্রশ্ন কর।
দেকার্ত বলেছিলেন—সবকিছুকেই প্রশ্ন করা উচিত। এমনকি খোদ ঈশ্বরকেও।
বলেছিলেনঃ আপেলের ঝুড়ি উলটে দিতে হয়। তারপর একটা একটা করে আপেল হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বাসি পচা খুঁতধরা সব ফেলে দিতে হয়।
আর ভালোগুলোকে ফের ঝুড়িতে রেখে দিতে হয়।
--তুমি এতসব জানলে কী করে? পড় তো যত রাজ্যের অখাদ্য ক্রাইম থ্রিলার আর ন্যাকা প্রেমের গল্প। হঠাৎ ফিলজফি মারাচ্ছো?
--কোত্থেকে আর? তুমিই তো দেকার্তকে নিয়ে একটা বই লিখেছিলে। তাতেই এই সব বড় বড় গালগল্প রয়েছে।
--গালগল্প? কী ফালতু কথা! সত্যিই দেকার্ত এসব লিখে গেছেন। আমি ওনার লেখা বই খুলে দেখাতে পারি।
--থাক, থাক; আর বই খুলে দেখাতে হবে না। নিজের গোঁয়ার্তুমি আর ভক্তির চোটে চোখের মাথা খেয়ে বসে আছ, ফের তক্কো!
আরে যে কথা বইতে লিখেও তুমি মেনে চল নি, সেটাকে গালগল্প ছাড়া কী বলা যায়!
লিখেছ সবকিছুকে প্রশ্ন করতে হবে। তা চোখের ডাক্তারকে প্রশ্ন করেছিলে? ওনার প্রেসক্রিপশন বা ভুজুংভাজুংকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলে?
কোন সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিয়েছিলে? এসব কিছুই কর নি, আবার নিজেকে দেকার্তের একলব্য শিষ্য বল!
মনে আছে, বহুদিন আগে আমাদের এক রাষ্ট্রনায়ক বলেছিলেন—হিপোক্রেসি কা ভী সীমা হোতী হ্যায়! ভণ্ডামিরও একটা লিমিট আছে!
--এবার কেটে পড়। একটু গরম লাগছে, মানে সূর্য উঠেছে। আমাকে রোজের কাজ সেরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
ব্যাটা পালিয়েছে। অন্ধকারের জীব। সুর্য ডোবার পরে আসে, প্রায়ই। একটাই কাজ, আমার আমিকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়া। কে পাঠায় ওকে?
কে আমার পেছনে হাত ধুয়ে পড়েছে?
হাতড়ে হাতড়ে বিছানা থেকে নামি। নাঃ ‘নামি’ বলাটা ভুল। বলা উচিত ‘বিছানা ছেড়ে উঠি’। কারণ, বিছানা কোন খাটে পাতা নেই, বরং মাটিতে মোটা তোষকের উপর পাতা।
এসব আমার ভালোর জন্যেই—নিঃসন্দেহে। আগে একটা লোহার খাটে শুতাম, হাসপাতালের খাট যেমন হয়।
কিন্তু একবার মাঝরাতে বাথরুম যাবার সময় বিছানা থেকে পড়ে গেলাম। পাশের খাটে শুয়ে থাকা চন্দনা টের পেয়ে চিলচিৎকার শুরু করল।
দৌড়ে এল কিছু লোক, সম্ভবতঃ ওয়ার্ড বয়। হাঁটু আর কাঁধে ওষুধ দেবার পর স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো হল।
পরের দিন থেকে মাটিতে বিছানা।
এখন কোন অসুবিধে নেই। বাথরুম শোবার ঘরের গায়ে লাগা। দেয়াল হাতড়ে ঠিক পৌঁছে যাই। মাঝরাতে একবার উঠতেই হয়।
প্রস্টেটের সমস্যা, যেমন অনেক বুড়োর থাকে। সত্তর পেরিয়ে আমি এখন বাহাত্তুরে।
ভুল বলেছি। একটাই অসুবিধে।
এই কামরায় এখন চন্দনা নেই। ও চলে গেছে প্রায় একবছর হল, বা তারও বেশি। ওরা যাই বলুক, একটা খটকা লেগেই রয়েছে। আমাকে না বলে ও কোথাও যেত না।
ওকে ছাড়া আমি যে কত অসহায় সেটা ও ভাল করেই জানত। তাহলে!
আর এরা দু’রকম কথা বলে কেন?
একবার বলল, শরীর খুব খারাপ হয়ে গেছল, মাথা ঘুরে যাওয়ায় ওকে অন্য ওয়ার্ডে নিয়ে গেছে। কিন্তু এসব তো দুয়েক দিনেই সেরে যাওয়ার কথা।
তাহলে ওকে ফিরিয়ে আনল না কেন? পরে বলতে শুরু করল ওর শরীরে নতুন কোন উপসর্গ দেখা দেয়ায় আরেকটা ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
কী সেই উপসর্গ?
বলে -আপনি জেনে কী করবেন! আরে, আমি না হলে কে জানতে চাইবে? পাড়ার লোকে?
তবে ওর একটা পুরনো উপসর্গ আমার চেনা। বড় বেশি প্রশ্ন করত। সেটাই কি ওর কাল হল?
তারপর দু’মাস কেটে যেতেই আমি প্রশ্ন করতে লাগলাম।
এদের রোজ জিজ্ঞেস করতামঃ
চন্দনা কবে ফিরে আসবে?
--সেরে গেলেই।
আমি কবে এখান থেকে ছাড়া পাব?
--সেরে গেলেই।
আমি কবে ভাল হব?
--সেরে গেলেই ভাল হবেন।
কবে সেরে উঠব? কবে এখান থেকে ছাড়া পাব?
--এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে আপনি একটু কো-অপারেট করলে তাড়াতাড়ি ছাড়া পাবেন।
আমার ছেলের কোন খবর এসেছে?
--টাকা পাঠিয়েছে, আপনাকে সুস্থ হয়ে ওঠার শুভকামনা জানিয়েছে।
আমার মোবাইল কবে ফেরত দেবে?
--সেরে উঠলেই।
এখন নয় কেন? আমি একটু ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
--সেটা ঠিক হবে না। আপনার চোখের চিকিৎসা চলছে। ডাক্তারের মতে এটায় আপনি উত্তেজিত হবেন। চোখের নার্ভে ইনফ্লেমেশন হবে।
চোখে ইমপ্ল্যান্ট করা কৃত্রিম কর্নিয়া ক্যাভিটি থেকে নড়ে গেলে আর কোনদিন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন না।
এসব কথা কে বলেছে? কোন ডাক্তার?
--অপথাল্মোলজিস্ট এবং নিউরো সার্জন দুজনেই।
আমি ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। পেশেন্ট হিসেবে এটুকু আমার অধিকার আছে কি নেই?
--কেন থাকবে না? আমিই নিউরো সার্জন ডক্টর পুরকায়স্থ।
তুমি—আপনি ওয়ার্ড বয় না? আমার যে গলাটা শুনে—
--আপনার ভুল হচ্ছে। কোন কোন গলার স্বর অনেক সময় একরকম লাগে।
আর সেই ডাক্তার চৌবে? যে আমার প্রথম অপারেশন করেছিল? সে কই?
--অন্য হাসপাতালে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। সরকারি হাসপাতালে প্রতি তিন বছরে বদলি হয়।
ডাক্তার, আপনার পায়ে পড়ি। ওদের বলুন আমার মোবাইল ফিরিয়ে দিতে। ওটা হাতে পেলে আমি আদ্দেক সেরে যাব।
বড় দুনিয়াকে দেখতে পাব। মনে মনে। কথা বলব ছেলের সঙ্গে, চন্দনার সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে। আমার লেখার প্রকাশকের সঙ্গে।
আমার মাথায় একটা নতুন উপন্যাসের আইডিয়া এসেছে। একজনকে ঠিক করে দিন যে আমার কথা শুনে শুনে টাইপ করে প্রকাশককে ই-মেইল করে দেবে।
এর খরচা আমার ছেলে পাঠিয়ে দেবে। আজ অব্দি যত খরচা আপনারা বলেছেন সব নিয়মিত পাঠিয়েছে কিনা—আপনিই বলুন!
আর এই স্টেনোটাইপের কাজের যা ফী সেটা ওর জন্যে এমন কিছু না।
জানেন তো, ও এখন সিঙ্গাপুরে আছে। সেখানে একটা নামকরা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি পড়ায়। ওর বেশ কয়েকটা রিসার্চ পেপার আছে।
এই তো সেদিন দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীতে একটা সেমিনারে গিয়েছিল।
সেদিন মানে কতদিন?
ঠিক আমার চোখের সমস্যা শুরু হওয়ার আগে। স্যোল থেকে ফিরে এল আর আমার চোখের অপারেশন হল।
ও নিজেই আমাকে ভর্তি করে দিয়ে গেল। বলল, চিন্তা না করতে। এসব অপারেশন আজকাল জলভাত।
কিন্তু –সেটাই আমার সঙ্গে শেষ দেখা।
আর একটা ব্যাপার ছিল। ও নিজে আমার শেষ উপন্যাসটার বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছিল। পাবলিশার খুঁজছিল। আন্তর্জাতিক স্তরের।
ওর বিশ্বাস ছিল এটার ইংরেজি অনুবাদ হলে একটা ঘটনা হবে। এতে রূপকের আড়ালে এমন ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে—
বইটার নাম? ‘জোম্বিদ্বীপে অগ্নিকাণ্ড’।
হ্যাঁ, আমাদের দেশটার নাম জম্বুদ্বীপ, জোম্বিদ্বীপ নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ভয়ের কিছু নেই।
কিন্তু আপনি জোম্বি কাকে বলে জানেন? জোম্বিদের নিয়ে সিনেমা দেখেছেন?
ধরুন, ‘লাস্ট ট্রেন ফ্রম বুসান’? দেখেননি? শুনুন।
জোম্বি হল বাঁচিয়ে তোলা মড়া, মানে ঠিক বাঁচিয়ে তোলা নয়, বরং ‘জাগিয়ে তোলা’ শব। মন্ত্রবলে। সেই দেহের চারপাশের পরিবেশ বা সমাজ নিয়ে কোন চেতনা থাকে না।
এদের শরীরে থাকে ভাইরাস বা কোন সংক্রামক রোগ, যা ছড়িয়ে গেলে একের পর এক এই অর্ধমৃত জীব তৈরি হয়।
এরা নরখাদক হয় এবং এদের কামড়ে একজন সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ জোম্বি হয়ে যেতে পারে।
কী বলছেন? মেটেরিয়া মেডিকাতে এমন কোন অসুখ বা সংক্রমণের কথা লেখা নেই। তাতে কী হয়েছে ডাক্তারবাবু?
চারদিকে তাকিয়ে দেখুন, আমি, আপনি সবাই কি একরকম জোম্বি হয়ে যাইনি? অর্ধমৃত? সুযোগ পেলে একে অন্যের টুঁটি কামড়ে দিতে উদ্যত?
আরে, আজ আপনার মেডিক্যাল শাস্ত্রে লেখা নেই তো কী হয়েছে, কাল লেখা হবে। আগামী দিনে অনেক কিছু নতুন করে লেখা হবে।
ইতিহাস, ভুগোল, বিজ্ঞানের বই—সবকিছু। এখন মাত্র শুরু হয়েছে।
আমার ছোটবেলায় কোন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে পটাসিয়াম কমে গেছে, সোডিয়াম কমে গেছে—এসব লেখা হত না। হত কি? বুকে হাত দিয়ে বলুন।
তেমনই আগামী দিনে জোম্বির কামড়ের চিকিৎসা নিয়ে মেডিক্যাল ডিপ্লোমা হবে, প্যারামেডিকসদের ট্রেনিং দেয়া হবে।
আমার সন্দেহ হয় ডাক্তারবাবু, আমরা কি সত্যিই বেঁচে আছি?
আপনি বাঙালী তো, ডি এল রায়ের ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা ‘ শুনেছেন?
কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত নাটক পড়েছেন? ‘কাত্যায়ন, তুমি নাড়ি দেখতে জানো? দেখ তো, আমি বেঁচে আছি কিনা’?
ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশন দেবে ডাক্তার? দাও। দিয়ে দাও।
আর ডোজটা একটু বাড়িয়ে দিতে পার না? যাতে একবারে চিরঘুমের দেশে চলে যাই?
আবোলতাবোলের দেশে
এসব তো অনেক আগের কথা। এখন আমি সব মেনে নিয়েছি।
চন্দনা আর এই ঘরে আসবে না, মেনে নিয়েছি বাকি জীবন আমাকে একাই কাটাতে হবে। মেনে নিয়েছি আমি আর ভাল হব না।
কেউ একজন চায় না যে আমি সেরে উঠে আগের জীবনে ফিরে যাই। কে সে? জানিনা, জানতে পারি নি।
ছেলে টাকা পাঠাবে কিন্তু দেখতে আসবে না।
কেন? না আর প্রশ্ন করি না।
জানি, আমার সেই উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ আর দিনের আলো দেখবে না, ঠিক আমারই মত।
ডোরিস ডে’র সেই পুরনো গানের কলি গুনগুন করিঃ
কে সেরা সেরা!
হোয়াটএভার উইল বী, উইল বী,
দ্য ফিউচার’স ইজ নট আওরাস্ টু সী।
যা হবার তা হবেই হবে,
কেবা জানে কাল কীইবা হবে--।
এখন আমার জীবন একটা ছন্দে বাঁধা হয়ে গেছে। কে বেঁধেছে? খানিকটা আমি, আর বাকিটা এখানকার ওয়ার্ডার আর নিয়ম কানুন।
এই দেখ, বলতে চাইছিলুম ওয়ার্ড বয়, হয়ে গেল ওয়ার্ডার। কেন হল? ওয়ার্ডার তো জেলে থাকে, ওয়ার্ড বয় হাসপাতালে।
সেই সহজ পাঠ কি ভুলে গেলাম?
‘বনে থাকে বাঘ।
গাছে থাকে পাখি।
জলে থাকে মাছ’।
তাহলে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় কী করে জেলের ওয়ার্ডার হয়ে গেল?
এখন অনেক কিছু টের পাই। অনেক গন্ধ, অনেক শব্দ—যা আগে আমার শ্রবণ এবং ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে ধরা পড়ত না।
কেউ পা টিপে টিপে করিডরে হাঁটছে, কেউ জুতো ছাড়া খালি পায়ে—কানের রাডারে ঠিক ধরা পড়ে যায়।
কেউ আমার খাবার নিয়ে এল। কিন্তু ঠিক টের পাই লোকটা স্নান করেছে নাকি করেনি। ও কি শ্যাম্পু করেছে?
কারও কারও গায়ে একধরনের উৎকট গন্ধ থাকে যেন চিড়িয়াখানার বাঘ; শত পাউডারের ডিবে খালি করলেও যা ঢাকা যায় না।
কাল যে এসে খাবার জল দিয়ে গেল, বিছানার চাদর বদলে দিল তার মাড়িতে বোধহয় জিঞ্জিভাইটিস হয়েছে। আমার নাক ঠিক টের পেয়েছে।
আগে এসব বোধ আমার ছিলনা। কারণ সঙ্গে চন্দনা ছিল। ওর নাক-কান খুব সক্রিয়। ঠাট্টা করে বলতাম—তুমি বোধহয় আগের জন্মে সরমা ছিলে, কুকুরের দেবী।
--আর তুমি ছিলে শেতলামায়ের বাহন।
কিন্তু ও বড্ড খুঁতখুঁতে। ঠিক ছুঁচিবাই নয়, তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বেশ কড়া। বিয়ের পর মুখ না ধুয়ে বেড-টি’র অভ্যেস ছাড়তে হল।
অথচ কলেজ জীবনে এবং ব্যাচেলর লাইফে আগে চা, তারপর বিছানা ছেড়ে ওঠা।
ভাবতাম, বিয়ের পর বৌ এসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে বেশ ‘জাগো, মোহন প্রীতম জাগো’ গেয়ে ঘুম ভাঙাবে।
আঁধি সিনেমায় সুচিত্রা সেন যেমন সঞ্জীবকুমারের ঘুম ভাঙাতেন। তারপর সঞ্জীবের খুনসুটি, আমার কল্পনাকে উসকে দিয়েছিল।
কোথায় কী? শুনতে হল কড়া কথা—এত আন-হাইজেনিক কেন তুমি? ছি ছি! আ-ছোঁচা মুখে একপেট অ্যাঁ নিয়ে চা খাবে।
যাও, আগে বাথরুম সেরে এস। নইলে –।
একবছরের বেশি সময় হল চন্দনা এখানে নেই। আমিও ধীরে ধীরে আমার পুরনো অভ্যেসে ফিরে গিয়েছি। কার জন্যে কড়াকড়ি?
মেনে নিয়েছি আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সব এই বিল্ডিং, এই চৌহদ্দীর ভেতর। এখান থেকেই একদিন আমার ‘জানাজা’ বেরোবে।
না কোন, মিছিল নয়, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় পরিজনের কাঁধে চড়ে নয়। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে কাছাকাছি যে সরকারি শ্মশান, সেখানে দাহ করা হয়ে যাবে।
এরা কি ছেলেকে খবর দেবে? মনে হয় না। মৃত্যু সংবাদ জানালে ওর থেকে মাসে মাসে মোটা টাকা আসা বন্ধ হয়ে যাবে যে!
সত্যিই কি এরকম হবে? আমার বিশ্বাস ওরা এত নীচে নামতে পারে না।
সেসব তো অনেক পরের কথা। এখন চাই গরম ধোঁয়াওঠা কড়িমিঠি চা, পাঞ্জাবি ঘরানার। তারপরে নিত্যকর্ম শুরু হবে।
হ্যাঁ, আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয় গন্ধ পাচ্ছে ফুটন্ত চায়ের, তাতে আদা আছে, থেঁতো করে দেয়া।
আর শুনতে পাচ্ছি বাসনপত্রের এবং চা ছাঁকার টুং টাং, খট খট, খসখস।
কিন্তু চা খাওয়ার এগে আমার একটি নিত্যকর্ম রয়েছে, সেটা না করলে চা পাওয়া যাবে না।
না, দাঁত মাজা নয়—সেটা চা খাওয়ার পরে করি, আগেই বলেছি। সেই পবিত্র কর্মটি হল তেড়ে খিস্তি দেয়া।
হ্যাঁ, কাঁচা খিস্তি, একেবারে রাস্তাঘাটে গলির ভেতরে ঝগড়াঝাঁটির সময় যেমনটি শোনা যায়।
যতদিন চন্দনা ছিল শরীর এবং মুখের শুচিতা নিয়ে কড়াকড়ি ছিল। ‘শালা’ বললেও বিরক্ত হত। বিয়ের পর ওকে বলতাম ‘বেম্মজ্ঞানী’।
আমার কাছে খিস্তি হল জিভের আরাম, ওর চিত্রময়তা যেন আরেকটি সমান্তরাল ভাষার নির্মাণ!
কিন্তু এসব সন্তর্পণে বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের মধ্যে সীমিত ছিল। এখন রোজ সকালে খিস্তির বন্যা বইয়ে দি’।
আমার যত ব্যর্থতা, যত হতাশা সব ফোঁড়া পেকে পুঁজ বেরোনোর মত খিস্তির মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে।
এই আধা হাসপাতাল আধা বন্দীশালার বদ্ধ হাওয়া কেঁপে ওঠে, হয়ত শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়।
শুরু হয়েছিল এক সকালে চায়ে চিনি না থাকায়। খেঁকিয়ে উঠে বলেছিলাম—কোন শালা চা বানিয়েছে? মনে হচ্ছে মা জন্মের সময় জিভে মধু না দিয়ে নিমপাতার রস দিয়েছিল।
জবাবে শুনলাম—অ্যাই বুড়ো, বাপ মা তুলে কথা বলবি না।
বুড়ো! হ্যাঁ, আমি শুধু বুড়ো নই, বাহাত্তুরে! তবে অপ্রিয় সত্যিটা সবসময় গায়ে লাগে।
বলব, কী ছিঁড়বি রে বাঞ্চোৎ?
--আরেকবার বলে দ্যাখ!
শালার ব্যাটা শালা! নিজের চাড্ডির মধ্যে থাক, বেশি বাড়িস না।
এবার লাথিটা ক্যাঁৎ করে আমার পাঁজরায়। কেউ আমার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাচ্ছে। মুখে একটা পেল্লায় ঘুঁসি। ছিটকে পড়লাম।
তারপর কী হল মনে নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে দু’পক্ষেরই ব্যাপারটা সয়ে গেল।
ওরা এটার নাম দিল বুড়ো দাদু’র রামায়ণ গান।
আমি খিস্তি দিই, হিন্দি বাংলা মিশিয়ে। ওরা খ্যা খ্যা করে হাসে।
মাঝে মাঝে বলে –ও দাদু, এটা অনেকবার হয়ে গেছে। নতুন কিছু ছাড়ো।
কত নতুন নতুন ভাবব? একেক সময় বড় ক্লান্ত লাগে। তখনই চন্দনার কথা মনে হয়।
ও থাকলে এসব লফড়ার লুপে আটকে যাওয়ার প্রশ্ন ছিল না।
--দাদু, চা রেডি। নাও, তোমার রামায়ণ গান শুরু কর। তবে এনে দেব।
ওরে মা-মেগো, বোন-মেগোর দল! চা কখন দিবি রে? ওরে বাপ-ভাতারি ভাই-ভাতারির বাচ্চারা! নিয়ে আয় তোদের ঘোড়ার পেচ্ছাপ চা!
ওরে আঁটকুড়ির ব্যাটা! ওরে বুরবক চো--!
আঃ, সকালবেলায় কাঁচের গেলাসে ধোঁয়াওঠা গরম চা! গেলাসটা তুলে ধরে চোখে কাছে আলতো করে ঠেকাই, ভাপ নিই। যদি উত্তাপে চোখের কুয়াশা একটু কাটে।
একটুখানি। বলা তো যায় না!
মরার আগে দেখতে চাই চন্দনার মুখ, চড়াইপাখি, ভোর হওয়া, সুর্যের অস্ত যাওয়ার সময় আকাশে লাল আবির ছড়িয়ে দেয়া।
কিন্তু কিছুই হল না। আমার যে চির আঁধার।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।