৫
চন্দনা
কাল থেকে সুপ্রতীক কলেজে আসছে, ওর ক্লাসে গেছে। সাসপেনশন উঠে গেছে গত শনিবারে। ইউনিয়ন রুমে বেশ ভীড়। কিন্তু সেদিনের কথাটা শেষ হয় নি যে! আর ওর বেশির ভাগ ক্লাস দুপুরে। ওর যখন শুরু হয় আমার তখন শেষ।
আজ আমার টিউশন আছে, কামাই করতে পারব না।
কিন্তু হিন্দিতে একটা কথা আছে না? ‘জহাঁ চাহ, ওহাঁ রাহ’—ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়! তাই ঘটল।
আজকে ফোনেটিক্স এর স্যার আসেন নি। বন্ধুরা অন্য অপশনাল পেপার নিয়েছে। তাই এটা আমার ফ্রি পিরিয়ড,--শুধু আমার।
আমি দোতলার লাইব্রেরিতে না গিয়ে একতলার রীডিং রুমে ‘ দ্য ইডিয়ট” নিয়ে বসে পড়লাম। প্রিন্স মিশকিন আমায় টানছে—এক অমোঘ আকর্ষণে।
বড় হলঘরটা প্রায় ফাঁকা। জানলার ধারের টেবিলের পাশের চেয়ারে বসে কাহিনীতে ডুবে গেলাম।
কেন জানি গপ্পোবাজ গোগল ও তুর্গেনেভের থেকে আমার বেশি পছন্দ দস্তয়েভস্কি। তলস্তয় বড্ড জ্ঞান দিতে থাকেন।
চেখভ মিহি গলায় রাগ-রাগিণীর আলাপ। গোর্কি অনেক ডাউন টু আর্থ, তবে কিছু লেখায় শিল্পের চেয়ে ফর্মূলা চেপে বসেছে মনে হয়।
--একটু বসতে পারি?
চমকে বই থেকে মুখ তুলে দেখি সেই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স—হে ভগবান! এদের কি ক্লাস-টাস নেই, নাকি খালি আড্ডা?
শুকনো হেসে বলি—বৈঠিয়ে।
এই রীডিংরুম আসলে ফ্রি পিরিয়ডে আড্ডা মারার জায়গা। তবে সবাই একটু নীচু গলায় কথা বলে। কোন স্টাফ এখানে নাক গলায় না।
সত্যিকারের পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ও প্রফেসররা যান উপরের লাইব্রেরিতে।
সাদিক আমার বইটা টেনে নাম দেখে বলে—বাব্বা! আপনি তো খুব সিরিয়াস! সেকেন্ড ইয়ারে ভালবেসে দস্তয়েভস্কি কে পড়ে!
আমি কথা ঘোরাই।
--সেদিন আপনাদের কথা শুনে সত্যি মনে হোল যে আপনারা ফিলজফির স্যারের সংগে ইয়ার্কি মারতে গেছিলেন। কিন্তু এই যে প্রশ্ন করার ইচ্ছে বা চেষ্টা এটা কি মানব সভ্যতার গোড়াতে ছিল? কোন ধর্ম ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেছিল? আমাদের হিন্দুধর্মে?
শ্যামসুন্দর ত্রিবেদী ওরফে ‘বিদ্রোহী’ চটপট বলে – বিখ্যাত নাসদীয় সূক্ত ঋগবেদ ১০ম মন্ডল /১২৯।
ওরে বাবা! ভুলে গেছলাম যে ও দর্শনে মাস্টার্স করছে, তায় উত্তর প্রদেশের বামুন। কিন্তু আমি এত সহজে ছেড়ে দেবার বান্দী নই।
--কী যে বলেন! ও তো সৃষ্টিতত্ত্ব। তার কাব্যময় রচনা। আমার বাবার খুব প্রিয়। মাঝে মাঝে আবৃত্তি করেন--
সৃষ্টির পূর্বে না ছিল 'সৎ', না 'অসৎ'। তখন কোনো আকাশ, মৃত্যু, অমৃত, দিন কিংবা রাতের অস্তিত্ব ছিল না।
চারিদিকে কেবল অন্ধকার এবং আলোহীন গভীর জলরাশি বা এক অব্যক্ত অবস্থা বিরাজ করছিল।
--তা হলে কী ছিল?
--ছিল এক পরম তত্ত্ব।
--কিন্তু কোন কিছু নেই, না আলো না অন্ধকার। তাহলে তিনি কোত্থেকে এলেন? কী অবস্থায়?
-- তিনি কোন বাতাস ছাড়াই নিজের শক্তিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন। তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম, তিনি অব্যক্ত।
--তা বেশ; কিন্তু অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত, মানে স্থুল জগৎ কী ভাবে এলো? যখন আকাশ, বাতাস, জল কিছুই ছিল না?
-- সেই পরম তত্ত্বের মধ্যে এক ‘কাম’ বা সৃষ্টির আদি ইচ্ছার বীজ জাগ্রত হল।
অসৎ থেকে সৎ বা অব্যক্তের থেকে ব্যক্ত জগতের সৃষ্টির কারক তত্ত্ব হল পরব্রহ্মের ইচ্ছা বা কামনা।
--বাঃ, আপনার বাবাকে নমস্কার। উনি আপনাকে ছোটবেলা থেকে ভাল করে পড়িয়েছেন। কিন্তু পরব্রহ্মের কামনা থেকে ব্যক্ত বা স্থুল জগত কী ভাবে সৃষ্টি হল।
‘কাম’ এখানে কারক বা ক্যাটালিস্ট, কিন্তু জড় উপাদান বা প্রকৃতির তিনটে গুণ কোত্থেকে এল?
আমি থতমত খেয়ে ভাবতে থাকি। ইতস্তত করে বলি—আমি জানি না।
সুপ্রতীক বলে—সাবাশ! অনেস্টলি স্বীকার করায় কোন দোষ নেই। তাতে আপনি ছোট হন না। বরং আপনার সততা প্রকাশ পায়।
দেখুন, মুনিঋষিরাও তাই বলেছেন।
--কিন্তু প্রশ্ন কোথায়? এখানে সৃষ্টির বর্ণনার বেশ কাব্যময় বিবরণ পাচ্ছি।
--নাসদীয় সূক্তের শেষ দুটো শ্লোক দেখুন। ঋষি কী বলছেন? কেউ জানে না কী ভাবে আদি সৃষ্টি হল।
দেবতারাও জানেন না। কারণ, তাঁরাও অনেক পরে সৃষ্ট হয়েছেন।
--তাহলে কে? পরব্রহ্ম?
--দেখুন, ঋষি থেমে যান নি। কথা ঘোরান নি। প্রশ্ন করেছেনঃ এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি কোথা থেকে এলো? কেউ কি তা গড়েছেন নাকি এটি নিজে নিজেই উৎপন্ন হয়েছে?
মহাকাশের সর্বোচ্চ স্তরে বসে যিনি এই সৃষ্টির ওপর নজর রাখছেন (পরমেশ্বর), সম্ভবত তিনিই এটি জানেন; অথবা তিনিও হয়তো তা জানেন না!
আসলে সভ্যতার উষাকালে আমরা অনেক সৎ এবং অকপট ছিলাম।
আমি একটু ভেবলে গেছি। মাথার ভেতরে কোন বিপদ সংকেত বাজছে।
এদের মতলবটা কী? এরা কি আমায় টার্গেট করেছে? ইম্প্রেস করতে চাইছে?
ভেবেছিল ইংরেজির বান্দি, সংস্কৃত বা ঋগবেদ শুনে নাক সিঁটকাব আর ওরা ঝাড় দেবে?
আচ্ছা, ওরা কী করে জানল যে আমার এখন অফ পিরিয়ড, আমি রীডিং রুমে বসে আছি? সে পরে দেখে নেব।
এখন এদের ইংরেজি সাহিত্যের দৌড় কত একটু বাজিয়ে নিই!
--হিন্দু ও ইসলাম হোল। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্ম, মানে যার ফলোয়ারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে প্রশ্ন করার নজির আছে?
নাকি প্রশ্নহীন আনুগত্য?
দু’জন মুচকি হেসে সুপ্রতীকের দিকে তাকায়। ভাবটা ও তো ইতিহাসের ছাত্র, ওই বলে দিক।
--“দেখুন, ক্রিশ্চান ধর্মের আদি গ্রন্থ হল ওল্ড বাইবেল—আমাদের যেমন ঋগবেদ। তার মধ্যে সৃষ্টিতত্ত্বের অধ্যায়ের নাম ‘জেনেসিস’।
ওর প্রথম তিনটে শ্লোক, থুড়ি ভার্স খেয়াল করুন।
(আমার ওসব জানা আছে, তবু এমন ক্যাবলা ক্যাবলা ভাব করি যেন প্রথমবার শুনছি।)
১ শুরুতে ঈশ্বর স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন।
২ সেই পৃথিবী ছিল আকারহীন, শূন্যতায় পূর্ণ। এক ঘোর তমসায় সবকিছু পরিব্যাপ্ত। শুধু ঈশ্বরের আত্মা জলের উপরে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
৩ তখন ঈশ্বর বললেন –আলোক সৃষ্ট হোক, এবং চারদিক আলোয় ছেয়ে গেল”।
আমি ঢোঁক গিলি। এভাবে ভাবিনি তো!
শায়র বলে—তার সংগে স্যারকে কাঠি করা প্রশ্নগুলো ভাবুন। আমার ছেলেমানুষি ইয়ার্কি নয়, বরং সুপ্রতীক যা বলেছিল- এপিকিউরাসের প্রশ্নগুলো।
--বুঝলাম। এসব তো দু’হাজার বছর আগের কথা। অ্যাদ্দিনে নিশ্চয়ই এর একটা লাগসই উত্তর এসে গেছে।
--আমি জানি না।
তবে হিউম বলে একজন নামকরা ইংরেজ দার্শনিক প্রায় আড়াইশো বছর আগে বলে গেছেন যে এপিকিউরাসের প্রশ্নগুলোর আজ পর্য্যন্ত সমাধান হয় নি।
উনি এটাও বলেছেন যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এ কেমন বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন যেখানে মানুষ এবং পশুপাখি কেউ সুখী নয়?
আমার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় বাবার কেনা ফিলিপ্স কোম্পানির ট্রানজিস্টারে শোনা বিখ্যাত শ্যামাসঙ্গীত গায়ক হীরালাল সরখেলের একটা গানঃ
“ভগবান তুমি এখনও কেন যে নীরব রয়েছ তাই,
তোমার সৃষ্টি তোমার বিধান কিছু না মানিতে চাই।
দুখে সুখে যারা চিরদিন ধরে করে তব জয়গান,
তারা তো পেলনা করুণা তোমার, পেল যারা ধনবান”।
সুপ্রতীক বলে—ওই গান নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন? কেন ঈশ্বরের ন্যায়ের দুনিয়ায় এমন পক্ষপাত?
--বলেছিলাম, তখন বাবা শুনিয়ে ছিলেন একটা হিন্দি প্রবাদ ‘ভগবানকে রাজ মেঁ দের হ্যায়, পর অন্ধের নেহীঁ।
অর্থাৎ ঈশ্বরের দুনিয়ায় ন্যায় পেতে একটু দেরি হয় বটে, কিন্তু একেবারে চোখ বুঁজে থাকেন না। আর আমাদের সময়ের মাত্রা আর ঈশ্বরের সময়ের একক এক নয়।
আমার মা বলেছিলেন ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। যারা আজ ক্ষমতার জোরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা কাল ধুলোয় গড়াবে।
সাদিক গুন গুন করে – জব তাজ উছালে জায়েঙ্গে,
জব তখত গিরায়ে জায়েঙ্গে।
বস নাম রহেগা আল্লাহ কা,
জো গায়েব ভী হ্যায় হাজির ভী।
--এটা তো কোন পাকিস্তানি শায়েরের লেখা, নাম ভুলে গেছি।
-হ্যাঁ, বিখ্যাত গীতিকবি এবং বিদ্রোহী শায়র ফৈজ আহমদ ফৈজের লেখা। একটা কথা। পাকিস্তানি শায়র কেন বললেন?
শেক্সপীয়রের নাম নেয়ার সময় কি আলাদা করে ইংরেজ কবি বলা হয়?
-- সবাই জানে যে শেকসপিয়র ইংরেজ, তাই বলার দরকার পড়ে না। তাছাড়া উনি অনেক বড় কবি ও নাট্যকার।
--ফৈজ ও উর্দু শায়রির জগতে অনেক বড়। গালিব, ইকবাল এর পরেই ওনার নাম নেয়া হয়। তাহলে?
--ঠিক আছে। কিন্তু এটা ইসলামিক ভক্তিগীতি বা নাৎ নয়? দেখুন, শুধু আল্লার নাম নেয়া হবে বলা হচ্ছে।
ওরা তিনজন মুচকি হেসে চুপ করে।
আমি উৎসাহ পেয়ে বলি—কী, ঠিক বলেছি?
শায়র শ্যামসুন্দর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে। ‘ওসব মেটাফর, রূপক। ধর্মীয় প্রতীকের আড়ালে বিদ্রোহের বার্তা।
আপনার কোর্সে মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট ভাবুন’।
সাদিক বলে—যেদিন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিল, মানে ১৯৪৭ সালের ১৪ই অগাস্ট, সেদিন ফৈজ জেলে বন্দী ছিলেন।
আর এই কবিতাটা অত্যাচারী মিলিটারি শাসক জিয়া উল হকের প্রতিবাদে লেখা। পাবলিকের বুঝতে ভুল হয় নি।
শেষ দুটো লাইন দেখুন।
ফৈজ বলে দিচ্ছেন এই কবিতায় খুদা কে? – জো ম্যাঁয় ভী হুঁ, জো তুম ভী হো!
ওরে বাবা! আড্ডা তো সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে, রাজনীতির কথাবার্তা শুরু হবে নাকি? আমার ওসব অপছন্দ।
সব থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়! আমার মা বলত অন্য একটা হিন্দি প্রবচন –এক নাগনাথ, তো দুসরা সাঁপনাথ!
এটা মা ওই পাড়ার গসিপ এবং ঘটকালি করা সখী মিনুমাসির থেকে কলেক্ট করেছিল।
ওনার ভাসুরপোর সংগে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় কিছুদিন কথা বন্ধ ছিল—আবার যে কে সেই! মিনুমাসি যেচে বাড়ি বয়ে শুনিয়ে গেছে ভাসুরপোর খুব বড় ঘরের মেয়ের সংগে বিয়ে হয়েছে। অনেক সোনাদানা নগদ সব পেয়েছে।
আমি কথা ঘোরাতে চেষ্টা করি। পরিবেশ একটু হালকা হোক।
--আচ্ছা শায়র জনাব, সেদিন যে কথাটা উঠল –আপনি নাকি পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পরা একটি মেয়েকে বাঁচিয়েছেন?
তাও আপনার ডিপার্টমেন্টের ডীনের মেয়ে? সত্যি নাকি? কেসটা কী?
আমরা তো এখন বন্ধু। খুলে বলুন না ! আচ্ছা, মেয়েটা কীভাবে ধরা পড়ল সেটাই বলুন।
সবাই এমন হেসে ওঠে যে দূরের টেবিলে বসে থাকা কয়েকজন ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকায়।
বিদ্রোহী কবি শ্যামসুন্দর লাজুক লাজুক হেসে ইতস্ততঃ করে।
সুপ্রতীক ফোড়ন কাটে—নকল করনে কে লিয়ে ভী অকল চাহিয়ে। উপরওয়ালা মেয়েটিকে খুবসুরতি দিয়েছেন, সৌন্দর্য দিয়েছেন, কিন্তু ঘটে বুদ্ধি দেন নি।
আর মেয়েটা কবিতা টবিতা একদম পছন্দ করে না।
--তাহলে আমাদের শায়র কেন বাঁচাতে গেলেন?
সাদিক পঞ্চাশের দশকের মুম্বাইয়া ফিল্মের কাওয়ালির মুখড়া শোনায়, অবশ্য চাপা গলায়—ইয়ে ইশক ইশক হ্যায়, ইশক ইশক!
--আচ্ছা, তাহলে মেয়েটি শ্যাম ভাইয়াকে ভালবাসে, তাই?
সাদিক আর সুপ্রতীক একসঙ্গে মাথা নাড়ে। বলে—না না, একদম ভাও দেয় না আমাদের শায়রকে।
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে তিনজনের দিকে পালা করে তাকাই। কিছুই বুঝতে পারছি না।
--মুহব্বত অন্ধা হোতা হ্যায়।
এমন সময় পিরিয়ডের বেল বেজে ওঠে। আমি চটপট ব্যাগে বইটা ঢুকিয়ে উঠে পড়ি। ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে।
*********************************************************************************
আমার বাবার আমলে মানে গত শতাব্দীর শেষের দিকে জগজিৎ সিং নামে একজনের গজল খুব পপুলার ছিল।
বাপির কালেকশনে ছিল একগাদা সোনি কোম্পানির ক্যাসেট আর একটা প্যানাসোনিক প্লেয়ার। আমি যখন ছোট ছিলাম বাপি ধুলো ঝেড়ে একটা খুব বাজাতো। পরে সেগুলো কোথায় চলে গেল। কারণ এসব এখন ইউটিউবে সহজে শোনা যায়—সে মোবাইলে হোক কি টিভিতে।
আজ আমি রাত্তিরে শোয়ার আগে ঘরের আলো নিভিয়ে মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে শুনতে লাগলাম সেই আশ্চর্য গজল, যা বাপি বাজিয়ে বাজিয়ে প্রায় মুখস্থ করিয়ে ছেড়েছিল
—সরকতী জায়ে হ্যায় রুখ সে নকাব—আহিস্তা! আহিস্তা!
মুখ থেকে খসে পড়ছে মুখোশ। ধীরে ধীরে, একটু একটু করে।
কেন এটাই শুনতে লাগলাম? অস্বস্তি কাটাতে? হয় তো তাই। কোথাও কিছু একটা আছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি না, বুঝতে পারছি না।
কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ—কী করে বুঝব?
কান থেকে হেড ফোন না খুলেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।
আমি ফের মোদহাপাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে কলেজ যাচ্ছি। শুনশান সড়ক। ফের একটা মাঠের কোণায় তিনজন জটলা করে কিছু একটা করছে। সেই তাসের খেলা নয় তো?
হ্যাঁ, তাই। সেই খেলাটাই।
না, এবার কেউ আমায় ‘ও ম্যাডামজি, ইধার আইয়ে! ইনলোগ হাত কী সাফাই সে লুঠ রহে হ্যাঁয়। আপ কুছ মদদ করিয়ে –‘ বলে ডেকে নেয় নি।
আমিই কেমন করে কলেজের রাস্তা ছেড়ে মাঠের কোণার দিকে গুটি গুটি এগিয়ে গেছি।
ফের সেই তাসের কোণা দাঁত দিয়ে মুড়ে নিশানা লাগিয়ে ভেলকি দেখানো।
কোথা থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি—চিনি, এখান থেকে যা! বারবার একই ভুল করিস নি। সর্বনাশ হবে।
কিন্তু আমি সাপের চোখে চোখ রেখে হিপনোটাইজড, নড়ার ক্ষমতা নেই। আবার মনের মধ্যে একটা জেদ, একটা রাগ চাগিয়ে উঠছে।
সেদিন খুব ঠকিয়ে ছিলি। আজ তোদের সব জারিজুরি বের করছি। সব চালাকি আমার জানা আছে। আজ বদলা নেব। কাউকে ডাকব না।
আজ অব্দি যতলোককে ঠকিয়েছিস, সবার পয়সা উসুল করে ছাড়ব!
ওরা তাস শাফল করে। আমি বলি হরতনের বিবি! আমার হরতন খুব পয়া। বাচ্চা বয়সে স্কুলে একবার ‘ফ্যান্সি ড্রেস’ কম্পিটিশনে আমি হরতনের বিবি সেজেছিলাম। মা সাজিয়ে দিয়েছিল।
কী কপাল! আমি ফার্স্ট! এবারও ঠিক জিতব।
লোকটা তাস উলটে দিয়ে হাসে। বিবি বটে, কিন্তু ইস্কাপনের। আমার চোখ ছানাবড়া! কিন্তু বলি ফের তাস বাঁটো! এবার রুইতনের সাহেব!
লোকটার চোখ হাসে, উলটে দেয়। রুইতনের নওলা!
জিদ চেপে গেছে। এবার কেউ আমার পার্সের টাকায় হাত দেয় নি। নিজেই ব্যাগ থেকে বের করে দশ দশ টাকার দাঁও লাগিয়ে যাচ্ছি।
কখনও দুরি, তিরি; কখনও চিঁড়ের গোলাম। কিন্তু আজ কপাল মন্দ।
একবারও জিততে পারলাম না। লোক তিনটে হাসছে।
আমার টাকা শেষ! কিন্তু আমি নড়ি না।
আমি বলি –বাকি রেখে খেলব। কিন্তু ছাড়ব না।
সিনেমায় দেখেছি—বাকি রেখে ফের জিতে সব টাকা ফেরত পাওয়া যায়।
--কীসের ধার? আপনার কাছে কী আছে ?
‘জনি মেরা নাম’ সিনেমায় এমন একটা ডায়লগ শুনেছিলাম না? পদ্মা খান্নাকে ভিলেন প্রেমনাথ বলছে—তেরে পাস ক্যা হ্যায় লড়কি”?
কী সর্বনাশ! এরা আমার কাছে কী বন্ধক চাইছে?
ভাঙলেও মচকাই না। এদের বুঝতে দেব না যে ভয় পেয়েছি।
বলি—এই হাতঘড়ি দিচ্ছি। আদ্দেক দামে বেচলেও দু’শো টাকা পাবেন।
ওরা মাথা নাড়ে।
খেলুড়ে লোকটা বলে—খামোখা জিদ করছেন। বাড়ি যান। আজ আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না।
আপনার সেবারের হিরোকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আপনার খেলতে ইচ্ছে করছে—এবার এমনি এমনি খেলুন।
আমাদের থেকে শিখুন। পয়সা লাগবে না। আপনার ঘড়ি নিয়ে পরে বিপদে পড়ব।
আমি মানি না। বলি—ঠিক আছে। কিন্তু ফোকটে খেলব না। হারলে ধার! কাল এই সময় কলেজ যাবার পথে টাকা দিয়ে যাব।
খেলা শুরু হয়। কোত্থেকে আমার মাথায় একটা গান বেজে ওঠে—রিম/ ঝিম/ নেশা নেশা! রিম/ ঝিম/ সুরের নেশা ! উদাসী হয়ে আমি-- যাই। রঙ রঙ/ রঙেরই তাসে/ লাল লাল/ বিবি যে হাসে/ হায় হায়/ সাহেব যে কোথায় পাই? উদাসী হয়ে আমি-- যাই।*
গান বাজতে থাকে। আমি খেলতে থাকি আর হেরে চলি।
লোকটা গামছা দিয়ে টাকা ও তাসের প্যাকেট বাঁধে, ঠিক সেদিনের মত। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে—অব?
--অব ক্যা?
--পৈসা লৌটা দো!
--কৌন সা পয়সা?
--জো হারে হো!
--ওসব তো কাল কলেজে আসার পথে চুকিয়ে দেব বলেছিলাম!
--না ম্যাডামজী! ইস ধান্দে মেঁ সব নকদী কারোবার! আজ কা পয়সা আজ!
আমার ভীষণ শীত করতে থাকে। হঠাৎ যেন কুয়াশা এসে সব ঢেকে ফেলছে। আমার চোখ ফেটে জল আসে।
--আমার কাছে আর পয়সা নেই। তাহলে?
--তাহলে গায়ে খেটে শোধ দিন। কিন্তু কোন ছাড়ান নেই।
গায়ে খেটে? ফাঁদে পড়লাম! মা কত বারণ করেছিল।
--ঘাবড়াবেন না। আমরা অন্য কিছু চাইছি না। আপনি তো টিউশন করেন। সপ্তাহে একদিন আমাদের পথশিশুদের
ইস্কুলে এসে বিনে পয়সায় পড়িয়ে যাবেন। তাহলেই হবে।
চমকে উঠি। এরা কে?
ওরা তিনজন হাসতে থাকে। তারপর এক এক করে রবারের মুখোশ খুলে ফেলে। দেখি দাঁড়িয়ে আছে সেই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স।
সুপ্রতীক একটা বই বাড়িয়ে দেয়। বলে আগে বাড়ি গিয়ে এটা পড়ুন-“টোটো-চান, দ্য লিটল গার্ল অ্যাট দ্য উইন্ডো”।
তাহলে আমাদের এখানে কী ভাবে বাচ্চাদের শেখানো হয় বুঝতে পারবেন।
হঠাৎ আমার ভেতরে কিছু একটা হয়ে যায়।
বইটা ছুঁড়ে ফেলি আর সুপ্রতীকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিলঘুষি মারতে মারতে কাঁদতে থাকি।
পাশের খাট থেকে মা উঠে এসে আমাকে ঠেলা দেয়, ‘চিনি! এই চিনি! বুকের থেকে হাত নামিয়ে সোজা হয়ে শো”।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে থাকি।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।