এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • ভাণ্ডান বিনতি — দীর্ঘ স্মৃতির আখ্যান

    তাপস বিশ্বাস
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৭২ বার পঠিত
  • অলংকরণ: রমিত



    বৃহত্তর বিশ্বদৃষ্টি

    সাঁওতাল আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক জীবন বহু প্রাচীন লোকবিশ্বাস, আচার, সংগীত, নৃত্য, উপকথা এবং মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বিনতি, যাকে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর একটি পবিত্র মৌখিক সাহিত্য হিসেবে ধরা হয়। বিনতির মাধ্যমে মূলত সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস, সমাজ ও ধর্মের গল্প সুরে ও ছন্দে পরিবেশন করা হয়। তবে এই বিনতি যে কোনও সাধারণ মানুষ হুট করে গাইতে পারে না। এটি গাওয়ার জন্য সাঁওতালি সমাজে বিশেষ ‘বিনতি গুরু’ বা প্রবীণ গুণীজনেরা থাকেন। সাধারণত তিন বা তার বেশি সংখ্যক গুরু একসঙ্গে বসে কোনও বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই অথবা কখনও ‘তুদাক’ বা ‘কেন্দ্রি’ (ঐতিহ্যবাহী সাঁওতালি বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সুর ও ছন্দের মাধ্যমে বিনতি পরিবেশন করেন।

    সাঁওতালদের এই বিনতি ঐতিহ্য নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় (Rethinking Santal Identity: A study of Binti as a creation myth and its impact on Santals in contemporary tribal India) দেখা যায়, বিনিতি পরিবেশনের সময় গীতাংশ ও কথিত আখ্যান একটি নির্দিষ্ট ধারায় পর্যায়ক্রমে আসে। এটি একই সঙ্গে সৃষ্টিতত্ত্ব, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও সামাজিক নীতিশিক্ষার এক অনন্য সমম্বয়। P. O. Bodding-এর সাঁওতালি অভিধান অনুযায়ী (A Santal Dictionary: Published in 1929-1936, in multiple volumes) ‘বিনতি’ শব্দের অর্থের মধ্যে প্রার্থনা, অনুরোধ, নির্দেশ, উপদেশ এবং ঐতিহ্য আবৃত্তির ধারণা পাওয়া যায় — ‘Supplication, instruction, precept, exhortation, doctrine; [to] supplicate, instruct, exhort, proclaim, recite (traditions).” অর্থাৎ এটি শুধু গান নয়, এর মধ্যে ধর্মীয় বক্তব্য, সামাজিক নির্দেশ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং পূর্বপুরুষের জ্ঞান একত্রিত হয়ে আছে।

    সাঁওতালি বৃহত্তর ‘বিনতি’ ধারার মধ্যে কারাম বিনতি, জমসিম বিনতি, চাতিয়ার বিনতি, বাপলা বিনতি এবং ভাণ্ডান বিনতির নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ভাণ্ডান বিনতি হল সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র ঐতিহ্যবাহী আখ্যান। এটি মূলত কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের (যাকে সাঁওতালি সংস্কৃতিতে ‘ভাণ্ডান’ বলা হয়) শেষ পর্যায়ে প্রবীণ বা গুণীজনের (বিনতি গুরু/ বিনতিকার) দ্বারা গীত বা আবৃত্তি করা হয়। অনেক গবেষক বিনতিকে নির্দিষ্ট জীবনচক্রের আচার-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গীত-কথনধর্মী আখ্যান হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। কেউ কেউ আবার ভাণ্ডানের সঙ্গে বিনতির ব্যবহার গবেষণা পত্রে নথিভুক্ত করেছেন।

    অঞ্চল ভেদে ভাণ্ডান আচারের সময় ও আচার-পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও মৃত্যুর কিছুদিন বা কয়েকমাস পরে, আবার কোথাও বৃহত্তর সামাজিক সুবিধা অনুযায়ী পরে এই চূড়ান্ত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার বর্ণনা পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিবরণে ভাণ্ডানকে এমন একটি শেষকৃত্য-পর্ব হিসেবে দেখা হয়েছে, যার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি জীবিতদের জগত থেকে পূর্বপুরুষের জগতে ফিরে যান ও তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী ‘জীবন’ সম্পূর্ণ করেন। উল্লেখ্য, সাঁওতাল সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ কেবল ব্যক্তিসত্তা নয়; বৃহত্তর পরিসরে সে পরিবার, কুল, গোত্র, গ্রাম, সমাজ এবং পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতার অংশ। ভাণ্ডানের আচারে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির আত্মাকে উদ্দেশ্যে করে নিবেদন – বলি, খাদ্য ও হাঁড়িয়া নিবেদন এবং পূর্বপুরুষের স্মরণ – এসবের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিকে নতুন অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়;

    — ‘তেহেঞ দ বোন উম এয়া, নেল কাপী তে বোন সুনুম এয়া।
    তেলকূপী রেনাঃ সুনে সঁওতে, জীবী দ ফারচা এনা,
    হড়মো রেনাঃ মৈল দ নদী গাড়া রে ভেলী এনা।
    তুনুপ চালাঃ অক্তেরে গঁসাই, মারী রূপ দ ইড় এনা,
    তেহেঞ খোন দ আম দ বোঙ্গা তালা রেমিশাও এনা।’

    অনুঃ ‘আজ আমরা তাঁকে (মৃত আত্মাকে) শেষ স্নান করাবো, চুলে তেল দেবো।
    তেলকূপী ঘাটের পবিত্র জলের ছোঁয়ায়, আজ তাঁর আত্মা শুদ্ধ ও মুক্ত হলো,
    নশ্বর শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ও মলিনতা নদীর স্রোতে ভেসে গেল।
    হে ঈশ্বর, এই শেষ স্নানের সাথে সাথে তাঁর পার্থিব রূপটি মুছে গেল,
    আজ থেকে তিনি দেবতাদের (বোঙ্গা) মাঝে গিয়ে স্থান নিলেন।’

    এই আচারপর্বের সঙ্গে যুক্ত বিনতি বা দীর্ঘ আখ্যানধারায়, সৃষ্টিতত্ত্ব, মানবজাতির উৎপত্তি, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, দেশান্তর, বসতি স্থাপন, জীবন-মৃত্যু এবং সামাজিক পরিচয়ের নানা স্তর একত্রিত হয়েছে। ভাণ্ডান বিনতির আখ্যানগত কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, ব্যক্তিগত জীবনের একটি বিশেষ ঘটনাকে বৃহত্তর সাঁওতাল বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা। ফলে একজন মৃত ব্যক্তির জীবন এখানে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না থেকে পূর্বপুরুষ, বংশ এবং সমাজের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার মধ্যে স্থান পায়।

    আচার

    — নাইতেম ইদিঞ্‌রে দ বাবু তিরয়ো অরঙ্‌মে
    নাইতেম ইদিঞ্‌রে দ বাবু তির্‌য়ো বাবু অরঙ্‌মে
    তালা নাই কাঁসাই রে দ বাবু
    বহেল গিডি মে।

    অনুঃ ‘নদীতে (চান করতে) যাওয়ার সময় হে আমার খোকা
    তুমি আমার বাঁশিটি বাজাবে
    মাঝনদীতে, কাঁসাই নদীতে হে আমার খোকা
    আমাকে তুমি ভাসিয়ে দিয়ো (অস্থি বিসর্জন দিয়ো)।’

    সাঁওতাল সমাজ ব্যবস্থায় দামোদর নদ (নাই গাদা) পরম পবিত্র। তাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের আদি পূর্বপুরুষরা এই দামোদর নদের অববাহিকাতেই বিচরণ করতেন। তাই মৃত্যুর পর শরীরের প্রধান তিনটি বা পাঁচটি অস্থির টুকরো (সাধারণত মাথার খুলি বা পাঁজরের অংশ, যা দাহ করার সময় আলাদা করে রাখা হয়) সযত্নে মাটির পাত্রে তুলে রাখা হয়। অস্থি বা ‘জাঙ্‌ বাহা’ (অস্থিরূপ পুষ্প) মৃত ব্যক্তির শেষ চিহ্ন। যতদিন না সেই অস্থি দামোদর নদের জলে ভাসানো হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির আত্মাকে পূর্ণরূপে মুক্ত ধরা হয় না। অস্থি বিসর্জনের এই আচারটি (তুপ দাকা) সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল মৃত ব্যক্তির বিদেহী আত্মা একজন পূর্ণাঙ্গ ‘বোঙ্গা’ বা পবিত্র পূর্বপুরুষে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে আত্মার জাগতিক বন্ধনের মুক্তি ঘটে এবং সে পরলোকে পূর্বপুরুষের সমাজে স্থান পায়।

    বংশলতিকার পাঠ (বিনতি):
    গ্রামের বিনতি গুরু সাঁওতালদের আদি সৃষ্টিতত্ত্ব, মানুষের জন্ম, তাঁদের পরিভ্রমণের ইতিহাস এবং মৃত ব্যক্তির বংশলতিকা সুর করে বর্ণনা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হল মৃত ব্যক্তিকে স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে তাঁদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়া।

    তেলনাহান:
    মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়রা নদীতে গিয়ে ক্ষৌরকর্ম (চুল-দাড়ি কাটা) এবং স্নান সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে পরিবার ও সমাজ জাগতিক অশৌচ থেকে মুক্তি পায়।

    বোঙ্গা তালা:
    যোগ-মাঝির (সাঁওতাল সমাজপতি) উপস্থিতিতে উঠোনে মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশ্যে মোরগ বা ছাগল উৎসর্গ করা হয়। এই বলিদানের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে আহ্বান করা হয় যেন সে জীবিত আত্মীয়দের রক্ষা করে এবং সমস্ত অমঙ্গল দূর করে।

    সুরা দাকা ও হাঁড়িয়া:
    উৎসর্গ করা পশুর মাংস চালের সাথে রান্না করে ‘সুরা দাকা’ তৈরি করা হয়। প্রধান শোকপালনকারী ব্যক্তি এই সুরা দাকার কিছু অংশ মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন এবং তার পরিবারকে শুদ্ধ করার প্রার্থনা জানান। এরপর উপস্থিত আত্মীয় ও গ্রামবাসীদের মাঝে হাঁড়িয়া (চাল থেকে প্রস্তুত ঐতিহ্যবাহী মদ) ও এই খাবার বিতরণ করা হয়।

    ডানটা দন:
    ভাণ্ডানের দ্বিতীয় দিনে এক ঐতিহ্যবাহী আচার পালিত হয়, যার নাম ‘ডানটা দন’ বা ডানটা নাচ। হাতে লাঠি নিয়ে পুরুষরা মাদল ও ধামসার তালে তালে এই নাচ পরিবেশন করেন। এটি মূলত শোককে শক্তিতে রুপান্তর করার এবং সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রতীকী প্রয়াস।

    তবে এই আচারে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য জায়গাটি হল বিনতির। ভাণ্ডান বা মৃত্যুর শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানে যখন এই পুরো বিনতিটি (সৃষ্টির শুরু থেকে বর্তমান বংশলতিকা পর্যন্ত) সুর করে পাঠ করা হয়, তখন তা মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সে একা নয়। সে এই বিশাল সৃষ্টি এবং গৌরবময় ইতিহাসেরই একটি অংশ। দেহ মাটিতে মিশে গেলেও, আত্মা যেন সেই আদি পিতা-মাতা এবং ঠাকুর জিউ-এর সৃষ্ট পবিত্র উৎসে নিরাপদে ফিরে যেতে পারে- ভাণ্ডান বিনতি গানের মাধ্যমে মূলত এই আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাই দেওয়া হয়;

    — ‘হেঁদা গঁসাই, তেহেঞ দ বোন সেটের আকানা,
    ফালনা (মৃত ব্যক্তির নাম) হড় মায় বাগী আকাৎ।
    মারাং বুরু, জাহের এরা, তড়েক সুতাম তে বোন তল এয়া,
    ধূড়ী হড়মো ধূড়ী রে মিশাও এনা, জীবী দ চলও এনা।
    তেহেঞ খোন দ উনী দ মারী হাপড়াম কো সঁও এ মিলাও এনা,
    আলম রাগা আলম বোসা, তেহেঞ খোন
    আম দ মারাং বুরু ঠেন এম চালাও এনা।’

    অনুঃ ‘হে ঈশ্বর/পূজনীয় মণ্ডলী, আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি,
    আমাদের প্রিয় (মৃত ব্যক্তির নাম) এই মানব শরীর ত্যাগ করেছে।
    হে মারাং বুরু, হে জাহের এরা, আমরা তাঁকে মায়ার সুতোয় বেঁধে রেখেছিলাম,
    আজ মাটির শরীর মাটিতে মিশে গেছে, আর আত্মা চলে গেছে।
    আজ থেকে সে আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের সাথে গিয়ে মিলিত হল,
    হে আত্মা, তুমি আর কেঁদো না, দুঃখ করো না,
    আজ থেকে তুমি মারাং বুরুর চরণে আশ্রয় নিলে।’

    ধরতি সৃজনের আখ্যান


    সাঁওতাল লোকবিশ্বাসে পৃথিবীর সৃষ্টি, জল-মাটি, প্রাণী এবং মানুষের উৎপত্তি নিয়ে নানা আখ্যান প্রচলিত রয়েছে। ভাণ্ডান বিনতি-সহ বিভিন্ন বিনতি ধারায় এই সৃষ্টির কাহিনি বিশেষ মর্যাদা পায়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, সৃষ্টিতত্ত্বের একটি মাত্র নির্দিষ্ট পাঠ নেই। অঞ্চল, বিনতিকার এবং মৌখিক ধারার ভিত্তিতে আখ্যানের বিবরণে পরিবর্তন দেখা যায়।

    আগেই বলা হয়েছে, ভণ্ডান আচারে বংশলতিকার পাঠে গ্রামের বিনতিকার সাঁওতালদের আদি সৃষ্টিতত্ত্ব, মানুষের জন্ম, তাঁদের পরিভ্রমণের ইতিহাস এবং মৃত ব্যক্তির বংশলতিকা সুর করে বর্ণনা করেন। এই গীত-আখ্যানের কেন্দ্রে রয়েছেন পরম সত্তা বা ঠাকুর জিউ। বিনতির অনেক ধারায় মারাং বুরু গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে উপস্থিত। কোনও কোনও বিনতিতে মারাং বুরুকে সৃষ্টিশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়েছে। আবার একই সঙ্গে অন্য বিনতির অন্য ধারায় ঠাকুর জিউকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে প্রধান করে দেখা হয়েছে। এই পার্থক্যকে ভুল হিসেবে না দেখে সাঁওতাল মৌখিক ঐতিহ্যের এক বহুস্বরিক চরিত্র হিসেবে দেখা অনেক যুক্তিপূর্ণ হবে।

    সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্বে আদি পৃথিবীকে জলময় হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এই আখ্যানে পৃথিবীতে স্থলভূমি সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রাণীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। ঠাকুর জিউ বা সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে কাছিম জলের ওপর অবস্থান করে এবং কেঁচো জলতল থেকে মাটি তুলে আনে। কেঁচো সেই মাটি কাছিমের পিঠে জমা করতে থাকে। ক্রমে মাটি বিস্তৃত ও দৃঢ় হয়ে স্থলভূমির সৃষ্টি হয়। এরপর একজোড়া পাখি সেই স্থলে বাসা তৈরি করে এবং দুটি ডিম পাড়ে। ডিম দুটি ফুটে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম হয়। তাঁদের বেড়ে ওঠার স্থান হিসেবে হিহিড়ী-পিপিড়ীর উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এই প্রথম মানব-মানবী পিলচু হাড়াম এবং পিলচু বুঢি নামে পরিচিত হন। তাঁদের আদি মানব-মানবী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাঁদের বংশধারার মধ্য দিয়ে সাঁওতাল মানুষের উৎপত্তি ও বিস্তারের কাহিনি ব্যাখ্যা করা হয়।

    সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্বে প্রথম মানব-মানবী পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢির আবির্ভাবের পর তাঁদের জীবন ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, সরল ও নিষ্পাপ। তাঁদের কোনও লজ্জাবোধ ছিল না। তাঁরা বন্য ঘাস ও শস্যজাত খাদ্যের ওপর নির্ভর করতেন। এই আদিম জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যখন মারাং বুরু (সাঁওতাল ধর্মবিশ্বাসে অন্যতম প্রধান আত্মিক সত্তা) অথবা কিছু আখ্যানের ভাষ্যে লিতা তাঁদের কাছে উপস্থিত হন। মারাং বুরু তাঁদের কাছে এসে গাঁজনের উপকরণ এবং পাচওয়াই পদ্ধতির শিক্ষা দেন। পাঁচওয়াই তৈরির এই ঘটনাটি আখ্যানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢি চাল নিয়ে তা পিষে গাঁজনকারী উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে রাখেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা থেকে পানীয় প্রস্তুত করেন। প্রস্তুত পানীয়র একটি অংশ তিনটি পাতার পাত্রের একটিতে নিয়ে মারাং বুরুর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। অবশিষ্ট অংশ তাঁরা নিজেরা পা করেন। লক্ষণীয়, খাদ্যশস্যের রুপান্তর এখানে কেবল ব্যবহারিক বা প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন এবং মানুষের অংশগ্রহণ, যা একটি প্রাথমিক ধর্মীয় আচারের রূপ লাভ করে। এখানে সৃষ্টি কেবল পৃথিবী তৈরির ঘটনা নয়। এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের সূচনাও যুক্ত। মানুষ কোথা থেকে এল, তার পূর্বপুরুষ কারা, কীভাবে সে সমাজ গড়ে তুলল, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও বিনতি সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে এই ধরতি সৃজনকে একটি ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনি হিসেবে যেমন দেখা যায়, তেমনই এটি সাঁওতাল সমাজের নিজস্ব বিশ্বদৃষ্টির প্রকাশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

    পরিযায়নের লোকস্মৃতি


    খোজ কামান — শুদ্ধিকরণের স্মৃতি:
    সাঁওতালদের লোকবিশ্বাস ও মৌখিক ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁদের আদি পিতৃপুরুষ ও মাতৃপুরুষের সৃষ্টি হয়েছিল ‘হিহিড়ী পিপিড়ী’ নামক কোনও এক রহস্যময় আদিভূমিতে। ভাণ্ডান বিনতি আখ্যানের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই লোকস্মৃতি বয়ে চলেছে যে, কোনও এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটের কারণে তাঁদের পূর্বপুরুষদের সেই আদি বাসস্থান ছাড়তে হয়েছিল। হিহিড়ী পিপিড়ী ছাড়ার পর মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু একই সাথে সমাজে নানা অনাচার ও পাপ প্রবেশ করে। লোকস্মৃতি অনুযায়ী, পরমেশ্বর বা মারাং বুরু মানুষের এই পাপে ক্ষুব্ধ হয়ে পৃথিবী ধংস করার সিদ্ধান্ত নেন। ঈশ্বর টানা সাতদিন ও সাতরাত ধরে ‘সেঙ্গেল দাহ’ (আগুনের বৃষ্টি) বর্ষণ করেন। বিনতি অনুযায়ী, এই মহাপ্রলয় থেকে বাঁচতে সৎ পূর্বপুরুষরা ‘হারতা বুরু’ (হারতা পর্বত) বা কোনও এক গুহায় আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান। এই স্থানটি মানুষের চরিত্রশুদ্ধির বা আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবে লোকস্মৃতিতে রয়ে গেছে।

    সাসাঙ্গ বেদা — সামাজিক নিয়মের সূচনা:
    খোজ কামানের প্রলয় থেকে বেঁচে যাওয়ার পর মানুষের নতুন প্রজন্ম যেখানে এসে বসতি স্থাপন করে, তা ‘সাসাঙ্গ বেদা’ বা হলুদের মাঠ নামে পরিচিত। সাঁওতালি সংস্কৃতিতে এই স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই তাঁদের সমাজের প্রথম আইন-কানুন, প্রথা এবং গোত্র (Clans/Paris) বিভাজন করা হয়েছিল। কোন গোত্রের কী সামাজিক দায়িত্ব হবে এবং রক্তের সম্পর্কে অনুযায়ী কার সাথে কার বিবাহ হতে পারবে না (Exogamy), তাঁর বুনিয়াদ এই সাসাঙ্গ বেদাতেই তৈরি হয়।

    চায় চম্পা — সাঁওতালি সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ:
    পরিযায়নের পথে বিভিন্ন নদী ও পাহাড় পেরিয়ে সাঁওতালরা যখন ‘চায় চম্পা’ অঞ্চলে পৌঁছান, তখন সেখানে তাঁদের সভ্যতার বিকাশ ঘটে। লোকস্মৃতিতে এটিকে সাঁওতালদের স্বর্ণযুগ বা সমৃদ্ধির কাল বলা হয়। এখানে সাঁওতালরা শক্তিশালী রাজত্ব গড়ে তোলেন এবং সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন দুর্গ বা গড় নির্মাণ করেন (যেমন, চম্পাগড়, কোয়েন্ডাগড়, বাদোলীগড়)। এই দুর্গের স্মৃতিগুলি সাঁওতালদের বিভিন্ন লোকগীতি ও ভাণ্ডান বিনতিতে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

    চায় চম্পা ত্যাগ ও পরবর্তী স্থানান্তর:
    বহিরাগত আক্রমণ (কারো কারো মতে মোগল বা অন্য কোনও শাসকের আক্রমণ, যাকে লোকস্মৃতিতে ‘মাধো সিং’-এর আক্রমণ বলা হয়) এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাঁওতালদের এই চম্পাগড় ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। চায় চম্পা ছাড়ার পর তাঁরা তীব্র কষ্টের মধ্য দিয়ে একে একে ঝালদা, পাটায়ন, সিকরভুঁই বা শিকারভূম (বর্তমান পুরুলিয়া ও ঝাড়খণ্ডের অংশ) এবং পরবর্তীতে সাঁওতাল পরগনার দিকে অগ্রসর করেন।

    উল্লেখ্য, ভাণ্ডান বিনতি আখ্যানে এই স্থানগুলির নাম কেবল ভূগোলের অংশ হিসাবে আসে না, বরং প্রতিটি স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁদের সমাজের যে বিবর্তন ঘটেছে, যে যে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁদের, সেই সমস্ত যৌথ স্মৃতি ও বেদনাকে প্রবীণ বিনতি গুরু বা বিনতিকারেরা আচারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করেন।

    মৃত্যু ও পরলোক

    ভাণ্ডান বিনতির কেন্দ্রে রয়েছে মৃত্যু। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, সাঁওতাল সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যু জীবনের সম্পূর্ণ সমাপ্তি নয়। সাঁওতালরা এই দৃশ্যমান পৃথিবীকে বলেন ‘নোয়া পুরী’ এবং মৃত্যুর পরের জগতকে বলেন ‘হানা পুরী’। বিনতি অনুযায়ী, হানা পুরী কোনও কাল্পনিক স্বর্গ বা নরক নয়, এটি হল তাঁদের পূর্বপুরুষদের এক শান্তিময় দেশ। মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা বা ‘জীউ’ শরীর ছেড়ে বের হয়ে যায়। কিন্তু ভাণ্ডান অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত সেই আত্মা হানা পুরী বা পরলোকে প্রবেশাধিকার পায় না। সে নোয়া পুরী ও হানা পুরীর মাঝখানে অন্তর্বর্তী জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, যাকে এক ধরণের অতৃপ্ত অবস্থা বলা চলে।

    সাঁওতাল ধর্মে পূর্বপুরুষদের বা ‘হাপড়ামকো’-দের স্থান দেবতাদের ঠিক পরেই। বিশ্বাস করা হয়, পূর্বপুরুষরা পরলোক থেকে তাঁদের বংশধরদের সর্বদা রক্ষা করেন। ফলে ভাণ্ডান বিনতির মূল লক্ষ্যই হল মৃত ব্যক্তির আত্মাকে একা বা অসহায় অবস্থায় ছেড়ে না দিয়ে, তাঁকে সসম্মানে হানা পুরীতে তার নিজস্ব বংশের পূর্বপুরুষদের আত্মার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। যতক্ষণ না এই মিলন ঘটছে, ততক্ষণে মৃত ব্যক্তি তাঁর ‘পূর্বপুরুষত্ব’ বা দেবত্ব লাভ করতে পারে না। ভাণ্ডান সম্পন্ন হলে মৃত ব্যক্তিও একজন ‘হাপড়াম’ বা পূজনীয় পূর্বপুরুষে পরিণত হয় এবং পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর নামে তর্পণ বা পুজো করতে পারে।

    ভাণ্ডান অনুষ্ঠানের ওপার জগতের সাথে যোগাযোগের সবচেয়ে রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ‘রুম বোঙ্গা’ বা ভর হওয়া। বিনতি চলার মাঝেই মাঝরাতে বা শেষরাতে এই আচারটি সম্পন্ন হয়। গ্রামের নির্দিষ্ট তিনজন ব্যক্তির ওপর তিনটি বিশেষ আত্মার ‘ভর’ হয় — মৃত ব্যক্তির আত্মা, গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা বা ‘মাঝি হারাম’-এর আত্মা এবং মারাং বুরুর আত্মা। ‘ভর’ হওয়া ব্যক্তিদের অবচেতন অবস্থায় এনে তাঁদের বিশেষ কিছু প্রশ্ন করা হয়। যেমন,
    — “গাপা দাড়েয়া ওপার যাত্রায় আম তেঁহেঞ্‌ কষ্ট হেলায়?”
    (মৃত্যুর পর ওপার যাত্রায় আপনার কোনও কষ্ট হয়েছে?)
    — “আয়োড় পরিবার তে দান আর শ্রাদ্ধ রে সামগ্রী আম পেয়াওয়ানায় কি?”
    (পরিবারের দেওয়া দান ও শ্রাদ্ধের সামগ্রী আপনি পেয়েছেন?)
    — “আয়োড় পরিবার কিনা গাঁয়ের ওপোর আম তেঁহেঞ্‌ কোনও ক্ষোভ আয় কি?”
    (পরিবার বা গ্রামের ওপর আপনার কোনও ক্ষোভ আছে?)

    মৃত ব্যক্তির আত্মা (ভর হওয়া মানুষের মুখ দিয়ে) যখন জানায় যে সে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানে সন্তুষ্ট এবং সে পূর্বপুরুষদের সান্নিধ্য লাভ করেছে, তখনই পরিবারের মানুষ মানসিক শান্তি পায়। বিনতিকার তাঁর গানে উল্লেখ করেন, হানা পুরীতে যাওয়ার পর মানুষের জাগতিক ভালোমন্দের বিচার হয়, তবে তা কোনও শাস্তিমূলক নরক বা আগুনের ধারায় নয়। এটি মূলত আত্মার শুদ্ধিকরণ। ভাণ্ডান বিনতির মাধ্যমে মৃত আত্মাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে,
    — “নোয়া দিশোম রে তোর ওড়াক-বাড়ি, জমি-জায়গা, গোমকে-আয়ো আর হপনদের মায়া এখন ছাড়াও। নোয়া পুরী রে তোর মেয়াদ শেষ হেলায়। এখন হাপড়ামদের দিশোম রে যাও, সুখ আর শান্তিতে ঘুমাও।”
    (এই পৃথিবীতে তোমার ঘর-বাড়ি, জমি-জায়গা, স্ত্রী-সন্তানদের মায়া এবার ত্যাগ করো। তোমার নোয়া পুরীর মেয়াদ শেষ, এবার হাপড়ামদের দেশে সুখে ও শান্তিতে ঘুমাও।)
    অর্থাৎ, এখানে মৃত ব্যক্তি ধীরে ধীরে পারিবারিক পরিচয় থেকে পূর্বপুরুষের বৃহত্তর ধারায় যুক্ত হন। ফলে ভাণ্ডান আচার জীবিত ও মৃতের সম্পর্ককে নতুন সাংস্কৃতিক অর্থ দেয়।

    মৌখিক সাহিত্য

    যে কোনও মৌখিক ঐতিহ্যের (Oral Tradition) প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তার কোনও লিখিত দলিল থাকে না। সাঁওতালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হল তার মৌখিক ঐতিহ্য। লিপি বা লিখিত রূপের অনুপুস্থিতিতে (পরবর্তীকালে ওল চিকি লিপির আবিষ্কারের আগে) সাঁওতাল সমাজ তাদের হাজার বছরের ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে শুধু মুখের ভাষা এবং স্মৃতির ওপর নির্ভর করে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই মৌখিক জ্ঞানভাণ্ডারকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাঁদের সুনির্দিষ্ট পরম্পরা রয়েছে। সমাজের বিনতিকারেরা কেবল শুনে শুনে পুরো আখ্যান মুখস্ত করেন। গ্রামের আগ্রহী তরুণরা এই বিনতি গুরুদের সান্নিধ্যে এসে দীর্ঘ সময় ধরে বিনতির সুর, ছন্দ এবং এর ভিতরের গূঢ় অর্থ বা দর্শন শিক্ষা করে। এই শিখনপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং শ্রদ্ধানির্ভর। ভাবতে অবাক লাগে, ভাণ্ডান বিনতির মতো দীর্ঘ আখ্যান, যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাওয়া হয়, তা সম্পূর্ণভাবে মানুষের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে রয়েছে। তবে যে কোনও মৌখিক সাহিত্যই সবসময় এক ধরণের প্রবহমান রূপ ধারণ করে। ভাণ্ডান বিনতির ক্ষেত্রেও তাই। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের সময় বা সময়ের পরিবর্তনে বিনতির মূল ভাব বজায় থাকলেও তার ভাষার গঠনে পরিবর্তন এসেছে। আর এই পরিবর্তনশীলতাই সাঁওতালি ভাষাকে যুগে যুগে জীবন্ত এবং যুগোপযোগী রাখতে সাহায্য করেছে।

    এই মৌখিক সাহিত্য স্বতঃস্ফূর্ত এবং আচার-নির্ভর। একজন প্রবীণ বিনতিকার তাঁর জানা আখ্যান পরবর্তী প্রজন্মকে শোনান। তরুণেরা তা শোনে, মনে রাখে, ভবিষ্যতে আবার নিজেরা পরিবেশন করে। এইভাবে তৈরি হয় একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এক্ষেত্রে বিনতিকারের ভূমিকা কেবলমাত্র একজন গায়কের ভূমিকা নয়, তিনি একই সঙ্গে এই বিরাট ঐতিহ্যের ধারক, আখ্যানের স্মৃতিবাহক ও আর অন্যদিকে সামাজিক জ্ঞানের পরিবেশক। কারণ ভাণ্ডান বিনতি সাধারণ গান বা কবিতার মতো পরিবেশিত হয় না। এর জন্য বিশেষ জ্ঞান, স্মৃতিশক্তি ও পরিবেশন দক্ষতার প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বিনতিকার পরস্পরের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর বা সওয়াল-জবাবের ভঙ্গিতে আখ্যান পরিবেশন করেন। এই পদ্ধতিতে দীর্ঘ কাহিনি শ্রোতাদের কাছে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে সুর, ছন্দ, পুনরাবৃত্তি এবং সংলাপধর্মী উপস্থাপনা স্মরণশক্তিকে দৃঢ় করতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ সময় ধরে, কখনও রাতভর, এই আখ্যান পরিবেশিত হওয়ার ফলে এটি কখনও কখনও একটি বিশেষ শ্রবণ-অভিজ্ঞতায় উত্তীর্ণ হয়। শ্রোতা সেখানে নিছক দর্শক নয়, বরং সে নিজের সমাজের ইতিহাস, বিশ্বাস ও পূর্বপুরুষের স্মৃতির একজন অংশীদার হয়ে ওঠে।

    উন্মুক্ত শিক্ষা ও স্মৃতির আখ্যান

    ধর্মীয় আচার হলেও ভাণ্ডান বিনতির মধ্যে সামাজিক শিক্ষার একটি উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে। মানুষ কীভাবে সমাজে বসবাস করবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক কীভাবে রক্ষা করবে, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি কেমন আচরণ করবে, কোন কাজ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য, সামাজিক জীবনের এসব নানান দিক বিনতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করলে তার পরিণতি কী হতে পারে, অন্যায় ও পাপ থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন কেন, পারস্পরিক সহযোগিতা কেন জরুরি, এসব শিক্ষাও মৌখিক আখ্যানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়। ফলে ভাণ্ডান বিনতি এক ধরণের অনানুষ্ঠানিক সামাজিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে যা কোনও বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইকে মানে না।

    সবশেষে, ভাণ্ডান বিনতিকে বুঝতে হলে একে কেবল ‘মৃত্যুর আচার’ হিসেবে দেখলে চলবে না। একে দেখতে হবে একটি সমাজের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হিসেবে। এর মধ্যে সৃষ্টি ও মানুষের উৎপত্তি, পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢির আদি কাহিনি, পূর্বপুরুষদের দেশান্তরের লোকস্মৃতি, জীবন ও মৃত্যুর দর্শন, পরলোকের ধারণা, সামাজিক নিয়ম এবং নৈতিক শিক্ষার নানা স্তর একত্রিত হয়েছে। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। একজন বিনিতকারের কণ্ঠে যখন এই দীর্ঘ আখ্যান উচ্চারিত হয়, তখন সেখানে শুধু একটি মৃত মানুষের স্মরণ ঘটে না, একই সঙ্গে ফিরে আসে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সমাজের অতীত আর একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পৃথিবীকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি। এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে এই ধরণের মৌখিক সাহিত্যের সংরক্ষণ শুধু সাঁওতাল সমাজের জন্য নয়, সমগ্র ভারতীয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।



    তথ্য ঋণ:-
    ১. সাঁওতালি গান ও কবিতা সংকলন — অনুবাদ ও সম্পাদনা সুহৃদকুমার ভৌমিক
    ২. ভাণ্ডান বিনতি — ধীরেন্দ্রনাথ বাসকে ও জীতেন্দ্রনাথ মানডি
    ৩. KARAM BINTI — Dr. Barka Kisku
    8. Traditions and Institutions of the Santals — Lare Olsen Skrefsrud and Paul Olaf Bodding
    5. Indira Gandhi National Open University (IGNOU): Oral Narratives (Block 6), Unit 4.
    6. santals.com — The Santal Creation Story
    7. Santal Life-Cycle Rituals: From Birth to Death — Philosophy Institute
    8. A Study of Santals as Children of Nature in the light of Santal Folktales — Thadeus Hembrom
    9. A brief History of Santali Language and Literature — Gurudas Murmu
    10. The Awakened Wind: The Oral Poetry of the Indian Tribes — Sitakanta Mahapatra


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৭২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন।