

অলংকরণ: রমিত
১মঃ নমস্কার! আরে, এত্ত দর্শক, উরিত্তারা! এ যে শালা জ্যাকপট!
মাপ করবেন। সেই কোভিডের সময় থেকে অনেকদিন কেউ আমাদের নাটক দেখতে আসে না তো, তাই আপনাদের, মানে এত সব জ্ঞানীগুণী, মানে বিদ্বজ্জন, মানে কি যেন বলে— সাহিবান, মেহেরবান, কদরদান! ধ্যাৎ ! সুশীল সমাজ!
হ্যাঁ, সুশীল সমাজের লোকজন যেচে আমাদের নাটক দেখতে এসেছেন এতে আমরা কৃতজ্ঞ, অভিভূত, আমোদিত, আহ্লাদিত এবং আনন্দিত, এই আর কি!
নাটক কা নাম ? হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলছি বলছি। আমাদের আজকের নাটক ইঁদুর।
- ইঁদুর?
১মঃ হ্যাঁ, ইঁদুর। মানে মুষিক, চুহা, মুসুয়া।
রাগ করবেন না। কাল সন্ধ্যেতে পোস্টার সাঁটিয়েছিলাম ‘রোমিও জুলিয়েট’। আমার দল ভাল করে রিহার্সাল দিয়েছে। কিন্তু আজ ভোরবেলা স্বপ্নে দেখলাম আমি ইঁদুর হয়ে গেছি। আর কে না জানে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়।
- অ! তোমার মনে হল তুমি ইঁদুর আর অমনি স্ক্রিপ্ট বদলে দিলে?
- বেশ করেছ, কিন্তু পেছনে হাত দিয়ে দেখলে?
- ১মঃ কী দেখব?
- দেখবে তোমার লেজ বেরিয়েছে কিনা। আরে ইঁদুর হয়ে গেলে লেজ গজাবে না?
১মঃ শালা! আমার নাটক যখন শেষ হবে দেখবি সবার পেছনে লেজ বেরিয়েছে; তোর, আমার, তোর গার্লফ্রেন্ড। সব্বার।
- এঃ বিষ নেই, তায় কুলোপানা চক্কর!
কোথায় রোমিও জুলিয়েট! লাভ জিহাদ, তলোয়ারবাজি, রাস্তায় ক্যাচাল, বিষ খাওয়া-- তার বদলে এখন হবে ইঁদুরের কিচকিচ আর দৌড়োদৌড়ি। এ তো শালা মহাঢপ! আমি বাড়ি যাব, তার আগে টিকিটের পয়সা ফেরত চাই।
১মঃ কিন্তু এ নাটকে তো টিকিট নেই। আমাদের নাটক কেউ টিকিট কেটে দেখে না। তবে নাটকের শেষে আমরা দর্শকদের সামনে গামছা বিছিয়ে দিই। ভাল লাগলে যার যেমন মনে হয় দেবেন, নইলে দেবেন না।
- ফালতু রেলা নেবে না। টিকিট নাও নি তো কী হয়েছে? আমাদের সময়ের দাম নেই? আমরা মানুষের নাটক দেখতে এসেছি, ইঁদুর-বেড়ালের গপ্পো নয়। চলুন তো সবাই। চলুন বাড়ি গিয়ে সিরিয়াল দেখি। ‘চাঁদ-সদাগর’ আর ‘সিঁদুর নিও না মুছে’ ; দুটোই ঝক্কাস!
১মঃ এক মিনিট! আপনি মানুষের নাটক দেখতে চান? নিজেদের কথা শুনতে চান?
- (ভেঙিয়ে) তা কেন, ইঁদুর-বেড়ালের প্রেম মান অভিমান এই সব দেখব; তাই তো?
১মঃ ভুল বুঝছেন; আপনারা এই নাটকটাই দেখবেন, কারণ আপনি আমি সবাই ইঁদুর।
- দেখ হে ছোকরা, বাড়াবাড়ি কর না। তুমি ইঁদুর হতে পার, আমি না। আমি একজন সরকারি কর্মচারি। রীতিমত পরীক্ষা দিয়ে ঢুকেছি; এখন প্রমোশন পেয়ে অফিসার। তোমার মত বাপের অন্ন ধ্বংস করা বখাটে বেকার নই।
১মঃ-সত্যি কথাটা স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছেন কেন? বলছি আপনিও একজন ইঁদুর। আপনার সময়ে পরীক্ষা ক্যানসেল হত না? রেজাল্টে গণ্ডগোল? পার্টিকে তেল না দিয়ে এমনি এমনিই চাকরি পেয়েছিলেন?
- আচ্ছা-আ-আ!
বেশ, প্রমাণ কর; নইলে আমি কোর্টে যাব। মানহানির মামলা করব। সরকারি আধিকারিককে সর্বসমক্ষে ইঁদুর বলিয়া গালি দিয়া অপমান করা। এই এত্তজন সাক্ষী। কী হল? সব ফুস হয়ে গেল। চ্যালেঞ্জ নিবি না শালা?
- ১মঃ নেব। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনি অফিসে ইঁদুর দৌড়ে সামিল হন নি? বসের কাছে কলিগদের নামে চুকলি করেন নি? বসের জন্মদিনে গিফট পাঠান নি? ওঁর মেয়েকে শহরের নামি স্কুলে ভর্তি করতে জ্যাক লাগান নি? ওঁর স্ত্রীর বাপের বাড়ি যাবার সময় প্লেনের টিকিট কেটে দেন নি?
সন্নাটা! সন্নাটা।
১মঃ আমি জানি এবার আপনারা সবাই আমাদের নাটক দেখবেন। খোলা মনে দেখুন। কোন চাপ নেবেন না।
২য়ঃ হেব্বি দিয়েছ গুরু, ব্যাপক। ডারউইন সাহেবের এইসি কী ত্যায়সি করে দিলে। বাঁদর থেকে মানুষ; আবার মানুষ থেকে ইঁদুর।
৩য়ঃ ( ফিসফিস করে) কিন্তু স্ক্রিপ্ট কই? রিহার্সাল হয় নি, এবার ঝোলালে পাবলিক উদোম ক্যালাবে।
১মঃ (ফিসফিস করে) চাপ নিস না। আমরা আমাদের নিজেদের কথা বলব। (পাবলিককে) এক মিনিট।
[ওরা তিনজন দর্শকদের দিকে পিছন ফিরে খেলার মাঠে ম্যাচে নামার আগের মত গোল হয়ে জড়াজড়ি করে ফিসফিস করে; কুড়ি সেকেন্ড। তারপর দর্শকদের দিকে ফিরে বলেঃ]
১মঃ ধন্যবাদ! এবার আমাদের নাটক শুরু হচ্ছে—“ইঁদুর” অথবা মুষিক বা মুসুয়া। যার যে নাম পছন্দ। মহাকবি বলে গেছেন—নামে কী বা আসে যায়!
প্রথমে কোরাসের গান। (৩য়কে) নে; শুরু কর।
৩য়ঃ রাষ্ট্রগীত ইয়া রাষ্ট্রগান?
১মঃ আরে ওসব নাটকের শেষে। এখন নাটকের প্রস্তাবনা- পর রাষ্ট্রভাষা মেঁ; অব খুশ? লে, চালু হো জা।
৩য় সামনে এসে হাত জোড় করে শুরু করে। ও প্রথম লাইন গায়; বাকি দুজন দ্বিতীয় লাইন। এইভাবে চলতে থাকে।
কোরাসঃ
“ কহত কবীরা সুনো ভাই সাধো, ঘোর কলযুগ আয়া হ্যায়।
জব নাটক দেখনা ছোড়কে লোগোঁ ঘর মেঁ টিভি লায়া হ্যায়। ।
চালিয়ে টিভি হমার বিবি, রান্না করতে ভোলে,
বাচ্চা দুটো গাইছে দেখ –ওলে, ওলে, ওলে!
বাচ্চাদের আর দোষ কী বলুন, আমিই তো মদহোশ,
নেটফ্লিক্সে ফিলিম দেখে জাগে আমার জোশ।
কহত কবীরা--------।।
ইসীলিয়ে তো আপকে সামনে খেল রহে ইয়ে নাটক।
খুলেঁ বন্ধ অকল কে তালে, খুলে দিমাগ কা ফাটক।
ইস নাটক মেঁ আপ কে লিয়ে হ্যায় ভরপুর মনোরঞ্জন,
নয়ে দামাদ কো জ্যায়সে শাসু পরসে রোচক ব্যঞ্জন।
কহত কবীরা---।।
নাটক দেখে খারাপ লাগলে দেবেন কষে গালি,
শালী আখির হোতী হী হ্যায়—আধী ঘরওয়ালি।
অব ইস নাটক কো দেখ হী লৌগে তো ক্যা বিগড়েগী আপকা?
চিত ভী মেরী, পট ভী মেরী, আন্টা* মেরা বাপ কা!!
[ তিনজনে স্টেজের উপর ঘুরে ঘুরে ওই একটি লাইন বারবার বলতে থাকেঃ চিত ভী মেরী, পট ভী মেরী, আন্টা মেরা বাপ কা!! বলতে বলতে হটাৎ ঘুরে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে—সাবধান!]
১মঃ আরে এই হলে একগাদা ইঁদুর দৌড়ে চলে গেল, ওই যে লুকিয়ে পড়ল।
২য়ঃ খুব সাবধান। ওই ইঁদুর থেকে প্লেগ ছড়াচ্ছে—টাইটানিক না বিউবোনিক? না আরও কি কি!
[* টস করলে কয়েন যদি হেড বা টেল না হয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়ে তাকে হিন্দিতে বলে আন্টা।]
১মঃ প্রথমে গুজরাত, তারপরে মহারাষ্ট্র – লাতুরের ঘটনা ভুলে গেলেন! একবার যদি প্লেগ হয় তাহলে--
২য়ঃ বগলের লসিকা গ্রন্থি ফুলিয়া উঠিবে, প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা, গা বমি বমি ও জ্বর। ক্রমশঃ গাত্রতাপ বাড়িবে, জলপিপাসা বৃদ্ধি পাইবে, রোগী প্রলাপ বকিবে। তারপর ক্রমশঃ মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবে। ইহার লাক্ষণিক চিকিৎসা হয়, দেহের উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ দরকার।
১মঃ কিন্তু ইঁদুর থেকে রোগ ছড়াচ্ছে, মরা ইঁদুর দেখলেই মিউনিসিপ্যালিটিতে খবর দেবেন।
৩য়ঃ ফালতু আতংক মত ফ্যায়লাইয়ে ভাইজি। হমারি নগরপালিকা বহোত সক্রিয় হ্যায়। স্বচ্ছ ভারত যোজনা কে তহত শহর মেঁ সাফ সাফাই অতি উত্তম। কোই প্লেগ-বেগ কা চক্কর নহীঁ হ্যায়।
২য়ঃ গতকাল হইতে শহরের অলিগলিতে মরা ইঁদুর দেখা যাইতেছে। কে বা কাহারা ঘরের ভিতর ইঁদুর মারিয়া রাস্তায় ফেলিতেছে। ইহা বিপদজনক।
১মঃ কী মুশকিল! আমি তো এই হলের মধ্যেই ইঁদুরের চলাফেরা ফিসফাস দাঁত কিচকিচ দেখতে পাচ্ছি। এরা কি দলে দলে রাস্তাঘাট আস্তাকুঁড় থেকে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে? লক্ষণ ভাল মনে হচ্ছে না।
২য়ঃ আরে ওই যে! (একজন মহিলাকে) সরে দাঁড়ান তো, শিগগির সরে যান। এই এত্ত বড় মেঠো ইঁদুর! আপনার দু’পায়ের নীচে লুকিয়েছে!
[ব্যাপক হট্টগোল আর চেঁচামেচির মাঝখানে ৩য় স্টেজের উপর ধপ করে পড়ে যায়। ]
আরে কী হল?
১মঃ (দৌড়ে গিয়ে ওর মাথা কোলে তুলে নিয়ে মাটিতে বসে পড়ে।) এ কী ! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এমন করছিস কেন?
৩য়ঃ ভাইয়া, বহোত সর দুখ রহা হ্যায় অউর গলা সুখ রহা হ্যায়। পানি! থোড়া পানি!
১মঃ (দ্বিতীয়কে) যা না! শীগগির, যেখান থেকে হোক, নিয়ে আয়, খাবার জল। (৩য়কে) ভয় পাস না। (নিজের মনে) উফ্ গা তো বেশ গরম! বাড়ি ফিরে থার্মোমিটার দিয়ে দেখতে হবে।
৩য়ঃ ভাইয়া, মুঝে ডর লগ রহা হ্যায়। হম গাঁও লৌট জায়েঙ্গে। মম্মীজি কে হাথ কে কাড়া পিয়েঙ্গে। হমে ঘর লে চলো।(কাশতে থাকে, মুখ থেকে রক্তের ছিটে বেরোয়)।
২য়ঃ আরে, এ তো রক্ত ! বমিতে রক্তের দলা। তার মানে – তাহলে তো—তার মানে--। (হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে) তাড়াতাড়ি ! তাড়াতাড়ি কর! হাসপাতাল নিয়ে চল। অ্যাম্বুলেন্স ডাকো।
১মঃ (হাঁটু গেড়ে ওর পাশে বসে) ভয় পাস না ভাই, তোর কিচ্ছু হবে না। আমি আছি।
২য়ঃ (১মকে) আমরা একই পাড়ার। ওকে সঙ্গে করে এনেছি। হথবন্দ আইটি আই থেকে মেশিনিস্ট পাশ করেছে। একটা ইন্টারভিউ কল পেয়েছে, পরশু। ওর মাকে বলে এসেছিলাম। আমার সঙ্গে ফিরবে। এখন এই অবস্থায় তো— হঠাৎ করে এত জ্বর, মাথাব্যথা।
৩য় আচমকা পেট চেপে ওয়াক তুলে বমি করতে থাকে। ২য়া লাফিয়ে উঠে রওনা দেয়।
২য়ঃ যাচ্ছি, যাচ্ছি। এক্ষুণি জল নিয়ে আসছি। (বেরিয়ে যায়)।
[১মএর কোলে ৩য়; ১ম একবার দর্শকদের দিকে তাকায়, একবার উইংসের দিকে। ওর চেহারায় আতংক।]
১ম( স্বগতঃ) জল আনতে কতক্ষণ লাগে? শালা সেই যে গ্যাছে তো গ্যাছেই। একঘন্টা হয়ে গেল কোন পাত্তা নেই।
৩য়( বিড়বিড় করে) পানি! থোড়ি সী পানি!
১মঃ আসছে, তোর গাঁওবালে ভাইয়া জল নিয়ে আসছে। একটু ধৈর্য্য ধর বাপ! শালা কি কেটে পড়ল নাকি? ভয় পেয়েছে? কিসের ভয়? হুঁঃ যত্তোসব।
৩য় ( বিড়বিড় করে) পানি! খুব পানি। বহোত পানি।
১মঃ কী? কী বলছিস? না, না; ভয় পাওয়ার মত কিছু হয় নি। দেখ, তোর ভাইয়া পানি নিয়ে এল বলে। ডাক্তারও আসবে। দুই খুরাক দাওয়াই, ব্যস্; কাল নাগাদ গাঁয়ে ফিরে যাবি। দেখে নিস।
৩য়ঃ নহীঁ নহীঁ। মুঝে গাঁও নহীঁ লৌটনা হ্যায়। ওখানে কিচ্ছু নেই। পানি! পানি! এক ঘুঁট পানি। এক চুমুক জল দাও, দোহাই তোমাদের।
১মঃ এ তো বড় জ্বালা! বলছি তো, তোর ভাইয়া জল নিয়ে আসছে। থোড়া ধীরজ রাখো ভাই।
৩য়ঃ (প্রলাপ) চুহে, চুহে। চুহে অউর চুহিয়া। পর বিল্লি কৌন? চুহা হোগা, তো বিল্লি ভি হোগী। চুহা-বিল্লি খেল শুরু হোগা। খেলা হবে। সবাই দেখবে ইঁদুর বেড়াল খেলা।
আও আও! চুহে আও, চুহিয়া আও। আও মেরে বিরাদরিকে। আও, গম ভুলাতে আও; অব খুশি মনাতে আও। সব নাচতে গাতে আও, ব্যান্ড-বাজা কে সাথ আও।
আও খাল বিল অউর নালে সে, আও বন্দ গোদাম কে তালে সে। আও রসোই ঘর কে কোনে সে, আও খেত-খমার-কারখানে সে।
এস, এস আমার নিজের লোকজন, আমার জাতের। কোন ভয় নেই। আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। দিন বদলেছে। সবাই গর্ত থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে এস। জরা নাচকে দিখাও! সোহাগ চাঁদবদনী ধনী, নাচত দেখি!
১মঃ কহাঁ মর গয়া ইসকা গাঁওবালে ভাইয়া? জল নিয়ে কখন ফিরবে? আর টেট্রাসাইক্লিন কোথায়? প্লেগের ম্যাজিক দাওয়াই? এবার আমার ভয় করছে।
৩য়ঃ পানি ! পানি! বহোত পানি! বাঢ় কী পানি। পানি ঘুস রহে বিলোঁ মেঁ। বন্যার জল! সব গর্তে ঢুকছে। ডুবে যাচ্ছে! ডুবে যাচ্ছে! মাঠঘাট খেতখামার ঘরবাড়ি সব। বরবাদ হো জায়েঙ্গে হমারে বিরাদরি। বেচারে চুহে! কহাঁ জায়েঙ্গে। মরেঙ্গে, সব মরেঙ্গে!
(ছটফটাতে থাকে) ভাইয়া, ভাইয়া! বচা লো। বেচারে চুহে অউর চুহিয়া কো বচা লো! ভাইয়া ! বচা লো মুঝে, ভাইয়া—য়া-য়া! (খিঁচুনির সাথে শক্ত হয়ে যায়)।
[ ১ম বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ভূতগ্রস্তের মত উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোমরের উত্তরীয়টি খুলে মৃতদেহটি ঢেকে দেয়। ]
১ম (বিড়বিড় করে) জ্বর, মাথাব্যথা, বমি আর চলে যাওয়া। বিউবনিক না নিউমোনিক প্লেগ, কী যেন? এই শহরে প্লেগের প্রথম শিকার। এরপর আমার নম্বর। আমি চলে যাচ্ছি। হ্যাঁ, এখান থেকে যাচ্ছি। আমাকে গাল দেবেন? তা’ দিন। হ্যাঁ, আমি একে এখানে এইভাবে রেখে চলে যাচ্ছি। আমি বাঁচতে চাই।
খারাপ লাগছে? জানি আপনাদের খুব খারাপ লাগছে। আমার নাটকের দলের মৃতসাথীকে ছেড়ে দিয়ে পালাচ্ছি। আমাকে খুব নীচ স্বার্থপর ভাবছেন, তাই তো?
আমারই কি ভাল লাগছে ? কিন্তু কী করি বলুন তো? আর কী করতে পারতাম! ওর পাড়াতুতো দাদা ঢপ দিয়ে পালিয়ে গেল। আর আমি? ওর সঙ্গে মাত্র রিহার্সালের সময় আলাপ হয়েছে।
(চলে যেতে যেতে ফিরে এসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলে) অমন করে তাকিয়ে আছেন কেন? আরে, এটা একটা লাশ, প্লেগের মড়া। কোন মানুষ নয়। কেন? প্লেগের মড়া মাটিতে শুইয়ে চলে যাওয়া কি কোন অপরাধ? তাহলে আমার দিকে আঙুল তুলছেন কেন? এর শেষ কাজ? শ্মশান ক্রিয়া? কে করবে? আমি? কেন করব? ও আমার দলে নাটক করত, কিন্তু অন্য জাতের। নীচু জাতের মড়া ছুঁয়ে নিজের পাপের ঘড়া আরও --।
ও! বাজে কথা বলছি? কী বলছেন ? আমার উচিত ছিল প্লেগের মড়া কোলে নিয়ে অপেক্ষা করা যতক্ষণ কেউ না কেউ আসে? তা আমাকে এসব ফান্ডা না দিয়ে নিজে করে দেখান না ! আপনি আচরি ধর্ম!
আরে আমার বৌ আছে, দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আমি সমাজসেবা মানবহিত এর চক্করে ফেঁসে প্লেগ হয়ে টেঁসে গেলে ওদের কে দেখবে? আপনি? আপনারা? আরে কী দেখবেন, কত দেখবেন সব আমার জানা আছে। অল্পবয়েসি বিধবা, বীমা কোম্পানির টাকা। হুঁঃ!
হাসপাতালের অবস্থা তো দেখেছেন? অক্সিজেন সিলিণ্ডার কম পড়ছে। ওখানে কি একটা দুটো মরে পড়ে থাকা ইঁদুর পাওয়া যাবে না? বাজার থেকে টেট্রাসাইক্লিন আর সেপট্রান গায়েব।
আমি চললেম, ও রইল এই সাদা চাদরের নীচে; যাদের শখ আছে তারা-- যতক্ষণ কেউ না আসে-- এই মড়ার সঙ্গে বসে আলাপ চালিয়ে যান। নইলে ভালয় ভালয় কেটে পড়ুন।
[খানিকক্ষণ পরে স্টেজে নীল আলোর বৃত্তে মৃতদেহটি ধীরে ধীরে মুখের চাদর সরিয়ে উঠে বসে। ধীর লয়ে ওর মাথা নড়ে, ঘাড় ঘোরে এদিক ওদিক। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে মাপা পদক্ষেপে দর্শকদের দিকে এগিয়ে এসে ফ্যাকাশে হাসি হাসে।]
৩য়ঃ ভাগ গয়ে; সব শালে ভাগ গয়ে। মেরে গাঁওবালে ভাইয়া, মেরা নাটক কে ডায়রেক্টর; সব হারামখোর। পরিবার থেকেও কেউ আসেনি। কেউ খবর নেয় নি। কিন্তু ওরা বোকা, ভাবছে পালিয়ে বেঁচে যাবে।
আরে আমাকে মেরে ওরা বাঁচবে? বাঁচে কখনও? ভাইকে মেরে ভাই, পড়শিকে মেরে পড়শি? এককে মেরে অন্যে?
কিন্তু ওরা কি আর মানুষ রয়েছে? সব ইঁদুর হয়ে গেছে। লেজ তুলে নিজের নিজের গর্তে ঢুকে গেছে। তবু বাঁচতে পারবে না। এখন আমার পালা।
মরার পর আমি এখন প্লেগের ব্যাকটেরিয়া, একাধারে ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস আর প্যারচুরেলা পেস্টিস—নিউমোনিক ও বিউবোনিক প্লেগ। আমার নিঃশ্বাসে বিষ, আলিঙ্গনে মৃত্যু। প্রথমে জ্বর হবে, কাশি হবে। ফের বগলের গ্রন্থি ফুলে উঠবে। তারপর মুখ থুবড়ে মরে যাওয়া। কেউ বাঁচবে না। আমি এখন ঈশ্বর—এক থেকে বহু হয়ে ছড়িয়ে পড়ছি। চার দিকে ধ্বংসের উৎসব।
এস আমার কমরেডস্! আঘাত হানো! আঘাত হানো যত গর্তে সেঁদিয়ে থাকা, মুখ লুকিয়ে থাকা কাপুরুষ মানুষ জাতের উপর! এবার মনুষ্য রাজ খতম হয়ে মুষিক রাজ কায়েম হবে।
এস প্রিয় ইঁদুরের দল। এসো মুষিক বাহিনীর রেজিমেন্টস্! রোডেন্টস্ কম্যান্ডোর যোদ্ধারা! সাদা-কালো-ধূসর ইঁদুরের গেরিলা বাহিনী।
এস নালা-নর্দমা থেকে, ফুটপাথের কোনা থেকে। এস খেত খামার আর বালু ভরা মাঠ থেকে। এস মজুতদারের গুদাম থেকে! এস ঝুগগি-ঝুপড়ি ময়দান থেকে। বেরিয়ে এস পঞ্চায়েতের দফতর থেকে, এস ব্যাংকের লকার থেকে। এস নাচতে নাচতে, এস গাইতে গাইতে।
চারো অউর হমারী মুষিকবাহিনী কা হামলা শুরু হো গয়া। একের পর এক। দেখুন, দেখুন-ঈশানকোণ; হমারী ফৌজ বহাদুরি সে লড় রহে হ্যায়। অগ্নিকোণ মেঁ মনুষ্য ফৌজ হমারী গুরিল্লাবাহিনী কে সামনে হথিয়ার ডাল দিয়ে। মানবসমাজ কা অন্তিম ক্ষণ সন্নিকট। শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড!
আও, হল্লা বোলো! অব আখরী হামলা বোলো! গাও-- শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেডস্!
অন্য তিনজন দুই হাত মুখের সামনে নাকের উপর ধরে ইঁদুরের মুখ বানিয়ে উবু হয়ে বসে হাঁটু মুড়ে নাচতে নাচতে বৃত্তের এক দিক দিয়ে ঢুকে আর এক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ৩য় এক হাত শূন্যে তুলে এক একবার একেকদিকে দেখায় এবং ফ্রিজ হয়ে যায়। শেষে চিৎকার করেঃ মনুষ্যরাজ খতম করো; মুষিকরাজ কায়েম করো!
বেজে ওঠে তুরী ভেরী নাগাড়া। মুখোস পরা কয়েকটি ইঁদুর কিলবিলিয়ে এসে নাচতে থাকে। নাচের মাঝখানে ৩য় আকাশে মুঠো করা হাত তুলে ধরে ঘোষণা করেঃ
প্রথম হামলা সফল! শহরগুলো জনমানব শূন্য। লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালিয়েছে সবাই। মানুষের ফৌজ আমার মুষিক সেনার মোকাবিলা করতে ব্যর্থ। সবাই আমার সংগে বলঃ
রাজ করেগা চুহা, আগে রহা না কোঈ! মনুষ্যরাজ খতম কর! মুষিকরাজ কায়েম কর! গর্ব সে কহো হম চুহে হ্যাঁয়!