

অলংকরণ: রমিত
আবার কুকুরটা!
প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক থেকে নেমে বাঁদিকের পুকুরের পাশ দিয়ে আর একবার ডান দিকে ঘুরেই কুকুরটাকে দেখতে পায় রায়হানা। ঠিক শিউলি গাছটার নীচে বসে আছে। তার মানে আব্বা বাড়িতে ফেরেনি এখনো। তাই নিশ্চিন্তে কুকুরটা বসে আছে ওখানে।
যেদিন ইশকুলে ভর্তি হল রায়হানা, সেদিন থেকেই আব্বা এরকম হয়ে গেল। নিয়মিত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতো আগে। এগারটার মধ্যেই। ফেরবার সময় বাজার থেকে নিয়ে আসত আলু, কোন একটা আনাজ, লঙ্কা আর মাঝে মাঝে মাছও। মাছ থাকলে একটা পেঁয়াজ। বাড়িতে যদি চাল না থাকত আব্বা ঠিক মনে রাখত সে কথা। সেদিন সঙ্গে আনতো এক কিলো চাল। তারপর রান্না হয়ে গেলে বাপ-বেটিতে খেত একসঙ্গে। এক থালাতেই। খাওয়া হয়ে গেলে থালাটা আর রান্নার বাসনগুলো মেজে ধুয়ে পরিষ্কার করে ধুয়ে মুছে তুলে রাখত রায়হানা। রায়হানার বয়েস যেবার পাঁচ হল, অনেক কেঁদেকেটে সেবারই এই কাজটা আদায় করে সে, তার আগে আব্বা করতে দিত না কিছুতেই।
তবে আদায় করতে গিয়ে একটা কথা দিতে হয়েছিল তাকে। আর এক বছর পর যখন তার ছ' বছর বয়েস হবে, ইশকুলে ভর্তি হতে হবে তাকে। বড় হয়ে তাকে ইশকুলের দিদিমণি হতেই হবে।
যে মাকে রায়হানা প্রায় দেখেই নি তাকে নিয়ে ঝগড়া হল একদিন আব্বার সঙ্গে। আব্বা বলেছে, সে যখন মাত্র এক মাসের বাচ্চা তখনই চলে গেছে তার মা, সে ভীষণ পাজি।
চলে গেছে? কোথায় গেছে?
সে আমি জানব কী করে – জবাব দিয়েছে আব্বা – আমার জন্যে না হয় মন-কেমন না করুক, তোর জন্যেও তো করতে পারত! অনেক কেঁদেছিল আব্বা, কিন্তু মা আর ফেরেনি। তারপর মসজিদের মৌলভি সাহেবের কাছেও গিয়েছিল, কী তার গোস্তাকি আল্লার কাছে যে এক মাসের শিশুকে ফেলে দিয়ে চলে গেল তার মা? মৌলভি সাহেব বলেছিলেন আল্লার মর্জি কে আর বুঝতে পারে। তারপর রায়হানার মাথায় হাত দিয়ে অনেক দোয়া চেয়েছিলেন তিনি। ওর রায়হানা নামটা তাঁরই দেওয়া। বলেছিলেন, রায়হানা মানে ফুলের সুগন্ধ। তোর মেয়ে তো ফুল, ওর গন্ধ ছেড়ে আল্লা আর কোত্থাও যেতে পারবেন না। নিয়ে যা ওকে ঘরে। ও যেখানে থাকবে আল্লাও সেখানে থাকবেন।
ঝগড়া যেদিন হল তার পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আব্বাকে বলেছিল রায়হানা, আমি মাকে দেখেছি, একবার দেখেই চিনতে পেরেছি। মা কোথায় গেছে জান? বেহেশ্তে। মা আমাকে ডাকছিল। আমি বললুম, আমি আব্বাকে একলা ছেড়ে কী করে আসব? তুমি কালও এসো, আমার সঙ্গে গল্প করে যেও। তারপর আব্বাকে বলে একদিন তোমার সঙ্গে বেরিয়ে আসব।
আব্বা জড়িয়ে ধরেছিল রায়হানাকে, জড়িয়ে ধরে রায়হানার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিল তোর মা পাজি, নিষ্ঠুর। তোকে ফেলে রেখে এখন একলা একলা বেহেশ্তে গিয়ে মজা করা হচ্ছে!
রাগ হয়ে যায় রায়হানার। বলে, আমার মা মোটেও পাজি নয়। পাজি তোমার মা।
মেয়েকে আদর করতে করতে বলে আব্বা, আমার মাকে তো তুই দেখলিই না, তুই কীভাবে জানবি আর! মা আমাকে ছেড়ে কোথাও গেছে? কত কষ্ট করে, কত রকমের কাজ করে মানুষ করেছে আমাকে। তারপর আমাকে এই ভ্যান রিকশাটা কিনে দিয়ে তোর মার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তারপর মরল। তা-ও কি নিজের ইচ্ছেতে মরেছে? নেহাৎ শয়তান এসেছিল কুকুর সেজে, তাই।
শয়তান? কুকুর সেজে?
শয়তান না তো কী? নন্দীবাবুদের বাড়িতে অষ্টমী পুজোর দিন পাড়ার সবাইকে খেতে ডাকে। লুচি ধোকার ডালনা আর বড় বড় পান্তুয়া খাওয়ায় ফি বছর। মা ভারী ভালবাসতো ওই পুজোবাড়িতে যেতে। মুসলমানের বিটি, তবুও ও বাড়ির গিন্নীমার মতো লাল পাড় শাড়ি পরে মা যেত ফি বছর। তাই নিয়ে সবার কী হাসিঠাট্টা, তবুও বছরে ওই একদিন মা ওই শাড়িটা পরে যেতই। পুকুর থেকে সবে নেয়ে এসেছে সেজেগুজে যাবে বলে, পেছন থেকে ইয়া বড় একটা কুকুর দিল কামড়। শাড়ি ছিঁড়ে দাবনায় বসাল দাঁত। পাড়ার কুকুর নয়, কেউ কোনও দিন দেখেনি সেটাকে। কামড়েই পালালো কোথায় তা-ও কেউ জানেনা। কিন্তু মা আমার শুয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। হাশিম মিয়া ঝাড়ফুকের কাজ জানে, তাকে ডাকলুম। সে বললো, আমার বিদ্যের কাজ নয় রে, গরমেন্টের হাসপাতালে নিয়ে যা, ওই ক্যানিং ইষ্টিশানের কাছে। নিজের রিকশায় শুইয়ে দশ মাইল দূরে হাসপাতালে নিয়ে গেলুম। পুজোর দিন, হাসপাতাল ফাঁকা। একজন দিদিমণি ছিল, বললো, কুকুরের কামড়ের ইঞ্জেকশন ফুরিয়ে গেছে। কলকাতায় নাকি খবর গেছে, পুজো-টুজো কাটলে হয়তো আসবে। বাড়ি নিয়ে এলুম মাকে, রাত থেকে ধুম জ্বর আর মুখ থেকে গড়াচ্ছে লালা। ওই হাশিম মিয়াই ওষুধ-ফোষুধ দিল, কিন্তু সবই ফাঁকি। তিনদিন ছটফট করে মরলো মা।
তারপর শিউলি গাছের তলাতেই গোর দিলে দাদিকে?
শিউলি গাছ তখন কোথায় রে? গোরে মাটি চাপিয়ে তারপর লাগালুম শিউলি গাছটা। মা ভারী ভালবাসতো শিউলি। আশ্বিন মাসটাকেই ভালবাসতো খুব। পুজোর সময় খুব আনন্দ করত, ঠাকুর দেখত, আর নন্দীবাবুদের বাড়ির লুচি খাওয়া একদিন। তাই শিউলিই লাগালুম গোরের উপর।
দাদির কবরের ওপর শিউলি গাছের নীচে কুকুর এলে আব্বা কেন রেগে যায় রায়হানা তা জানে এখন।
রায়হানা এখন সাত। গত বছর তাকে ইশকুলে ভর্তি করে দিয়েছে আব্বা। বাড়ি থেকে পনের মিনিটের হাঁটা পথ। ঠিক বারটার সময় খেতে দেয় ইশকুলে। সব ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে বসে খায়। খিচুড়ি আর একটা তরকারি। মাঝে মাঝে বিলিতি বেগুনের চাটনিও। যেদিন চাটনি দেয় সেদিন তরকারির বদলে আধখানা ডিম। বড়দিদি ম্যাম সেদিন নিজে দাঁড়িয়ে থাকেন খাবার সময়। বলেন, বিলিতি বেগুন বলবি না। ওটার নাম টোমাটো। বেগুন আমাদের দেশে যেমন, বিলেতেও তাই। কোন তফাৎ নেই। বড় হলে তোরা বিলেত যাবি। নিজের চোখে দেখবি তখন।
ইশকুলের ছুটি হয় বেলা দুটোর সময়, তারপর প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতে বাড়ি ফেরে রায়হানা। দূর থেকে কুকুরটাকে দেখতে পেলে ও জানে আব্বা বাড়ি ফেরেনি। আব্বা থাকলে কুকুরটাকে ঠিকই তাড়িয়ে দিত, জানে রায়হানা। আজকাল অবিশ্যি ও নিজেও তাড়ায়, ওদের বাড়িতে কোন কুকুর ঢুকবে না, কোন দিনও না।
শিউলি গাছটা এ-বছর প্রথম ফু্ল দিয়েছে। ইশকুলে যাওয়ার সময় দাদির কবরের উপর অ্যাতো ফুল দেখে গেছে ও। ফিরে এসে তুলবে ভেবেছিল। কুকুরটা সব নষ্ট করলো।
দুপুরে খেতে না-আসা নিয়ে আব্বার সঙ্গে অনেকবার ঝগড়া করেছে ও। প্রত্যেকবারই আব্বা বলেছে বাইরে খেয়েছে; বলেই জামার পকেট থেকে অনেকগুলো টাকা-পয়সা বের করে দেখিয়েছে, বলেছে অনেক দূরের ভাড়া পেয়ে গিয়েছিল, তাই বাড়িতে খেতে আসবার সময় পায়নি। রায়হানা জানে এসব মিথ্যে কথা, আব্বার মিথ্যে কথা শুনলেই ও বুঝতে পারে। আব্বা নিজে না খেয়ে টাকা জমায়, অনেক টাকা লাগবে রায়হানাকে লেখাপড়া শিখিয়ে ইশকুলের দিদিমণি তৈরি করতে। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে ও, কাল থেকে ইশকুলে আর যাব না আমি, তখন দেখব কেমন বাড়ি না এসে পার। তুমি না এলে রান্না হবে না, তুমিও খাবে না আমিও খাব না, বলতে বলতেই আব্বার হাত থেকে এক মুঠো পয়সা তুলে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ও।
একটু পরেই ফের দৌড়োতে দৌড়োতে ফেরে রায়হানা, একটা মাটির খুরিতে করিম চাচার হোটেলের গোশ্ত্ আর খবরের কাগজে মোড়া দুখানা রুটি। আব্বাকে বলে, এখনও গরম আছে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, বলেই থালা এনে সাজাতে থাকে খাবার।
নীরবে ভালো ছেলের মতো খায় আব্বা আর তার দুচোখ ফেটে গাল বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা।
কাঁদছ কেন, আব্বা?
হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পায় আব্বা, দু হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে একটু হেসে বলে, ভয়ে।
কিসের ভয়?
এক পেট খেয়ে এলুম ইস্টিশানের পাশের হোটেল থেকে, তুই আবার এখন জোর করে খাওয়াচ্ছিস। এখন যদি পেটখারাপ হয়?
আবার মিথ্যে কথা! ও জানে, ও যখন আব্বাকে বকে, আব্বাকে ভালবাসে, তখন দাদির কথা মনে পড়ে যায় আব্বার। তাই আব্বার চোখে জল।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা যখন ফিরলো আব্বা, সঙ্গে করিম চাচার হোটেলের গোশ্ত্। আমি গোশ্ত্ খেলুম দুপুরে, বলে আব্বা, তুইও তো খেতে ভালবাসিস। তাই তোর জন্যে আনলুম।
তুমি কী খাবে?
আমার জন্যে কুমড়ো এনেছি। রাতে রুটি করব।
খাওয়া হয়ে গেলে শুয়ে পড়ে আব্বা। রায়হানা বলে, তুমি শুয়ে পড় আব্বা, আমার ইশকুলের অঙ্ক করতে হবে। কুপি আমি নিভিয়ে দেব।
দু পাতা হাতের লেখা শেষ হতে হতে একটু একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগে রায়হানার। শরৎ কালের রাত্তির, সূর্য ডুবলেই ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করে। সামনের খোলা দরজাটা ভেজিয়ে দেয় রায়হানা। দশটা অঙ্ক কষতে দিয়েছেন ম্যাম। একটা একটা করে শেষ করে কুপিটা নিভিয়ে কাঁথাটা গায়ে টেনে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ভোরে ঘুম ভাঙলো যখন, আব্বা তখন কী একটা বিড়বিড় করে পাশ ফিরে শুল। রায়হানা জানে, এবারই উঠে পড়বে আব্বা। কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে দরজাটা খুলে বাইরে যায় সে।
কিন্তু দাদির কবরের উপর ওটা কী?
পায়ের শব্দ পেয়ে অলস ভঙ্গিতে চোখ দুটো খোলে কুকুরটা। রায়হানাকে সে চেনে, দেখলেই তাড়ায় তাকে। কিন্তু আজ অন্যরকম। গুটিসুটি শুয়ে আছে কুকুরটা, পালানোর চেষ্টাও করে না। তার গা ঘেঁসে চার পায়ের মাঝখানে শুয়ে আছে চারটে বাচ্চা। কুকুর-মা আর তার বাচ্চারা মিলে একটাই যেন প্রাণী। আর, ওদের গা-মাথা যেন ঢেকে আছে সারা রাত ধরে ঝরতে-থাকা শিউলিতে।
ঘরের ভেতর থেকে আব্বার কাশির শব্দ শুনতে পায় রায়হানা। জানে, আব্বা এখন বাইরে আসবে। রোজকার মতো সে দৌড়ে যায় না আব্বার কাছে। দাঁড়িয়ে থাকে দাদির কবরের পাশে কুকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে, দেখি আব্বা কেমন তাড়ায় আজ ওদের!
kk | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫২743429