

আসল বংশ
থানায় কী একটা ভিড় জমেছে। ঘটনাটা সকাল সাড়ে দশটার হবে। একজন সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।জিজ্ঞাসা করল, "কী হয়েছে দাদা?"
- এক বুড়ো রিকশাওলাকে কে এক একজন চড় মেরেছে। রিকশাওয়ালা পুলিশের কাছে নালিশ করতে এসেছে।"
- ও রিকশাওয়ালা। বলে সাইকেল চালিয়ে লোকটা চলে গেল।
কিন্তু কিছু লোক যেতে পারে না। মজা দেখার আনন্দও নেয় অনেকে।
বিষয়টা তেমন কিছু নয়। আশিসবাবু লোকটাই বেয়াড়া টাইপের। সব সময় উঁচুগলা। ভাড়া ঠিক করেই রিকশায় চেপেছিলেন। কিন্ত মাঝরাস্তায় হঠাৎ নেমে যান। ভাড়া দিতে চান অর্ধেক। রিকশওয়ালা তা মানবে না। তার পুরো ভাড়া চাই। আশিসবাবুও একরোখা। একই কথা বলে চলেছেন চিৎকার করে,
- কেনো? আমি তো এখানে অনেক আগেই নেমে গেলাম। তার গলার স্বর সপ্তমে।
রিকশাওয়ালাও থামার পাত্র না।
- সে আপনি যত আগেই নাইমেন না ক্যান ভাড়া কম হইব না।
আশিসবাবু চিৎকার করছেন,
-মগের মুলুক নাকি। যা খুশি বললেই হল। আমি রিকশায় চড়ি না বলে কি তোদের চালাকি বুঝি না ভাবছিস।
- তুই তোকারি কইরবেন না বাবু। তাড়াতাড়ি টাকাটা দিয়া দ্যান। আমার লাইন মার যাইতাছে।
আশিসবাবু ভেঙচিয়ে বললেন, "লাইন মার যাইতাছে। যাচ্ছে তো যাচ্ছে। আমার কি? চুরি করবে আর বলা যাবে না।"
- খবরদার বাবু চোর কইবেন না। চুরি কইরতেছেন আপনে।
- কী বললি, আমি চোর? বলেই ঠাস করে এক চড় কষালেন বুড়ো রিকশাচালকের গালে।
এতক্ষণ অনেক লোকই এসে পড়েছিল। থামানোর চেষ্টাও করছিল। কিন্তু এবার কেস জটিল হয়ে গেল। রিকশাওলা বলে বসল, "মুই পুলিশির কাছে যামু। "
আর একজনও বোধহয় রিকশওয়ালা। বলল,
- ছাড়ো না বেচা কাকা। পুলিশ আমাদের কথা শুনবে না। লোকটাও চেঁচিয়ে বলল, "চল থানায়। ও আমাকে চোর বলেছে। আমি শুধুই তো একটা চড় মেরেছি। আগেকার দিন হলে --।"
পথচারী একজন বললেন, "আরে দাদা পয়সাটা দিয়ে ঝামেলা মেটান তো! " বুড়ো বলে বসল, "মুই আর অর থিক্যা টাকা নিমু না। থানায় যামু।" বলেই রিকশা চালিয়ে দিল। সম্ভবত থানার পথে। আশিসবাবুও একটা রিকশায় উঠতে গেলেন। রিকশওয়ালা বলল, "ভাড়া কিন্তু ঠিকঠাক দিতে হবে।"
তাচ্ছিল্যের স্বরে আশিসবাবু বললেন, "আমাকে চিনিস? খাঁটি কুলিন বামুন আমরা। টাকা দেখাস আমাকে।"
পুলিশ কিন্তু কেসটা শুনল। নাম ধামও জানল। রিকশাওয়ালার নাম বেচারাম বাগদি। মাঠপাড়ায় এতটুকুন বাড়ি আছে নাকি। তবে ওইটুকুই শুনল। ওই চড় মারা অবধি। তারপরই তড়বড়িয়ে বলে বসল,
- এ আর কী এমন সমস্যা। তুমি ওনার গালে একটা চড় মেরে দাও। যাও। শোধবোধ।
আশিসবাবু তো লাফিয়ে উঠলেন, "এটা কী ধরনের বিচার? ও আমাকে চোর বলল। আগেকার দিনে হলে ওর মুন্ডু টেনে ছিঁড়ে ফেলা হত। বেটা বাগদি! বামুনকে চোর বলা! বেটা বাপের বেজম্মা।"
বেচারাম বলে, " দ্যাখতাছেন স্যার! কি গালি দিতাছে। চোর আমারে আগে ওইই কইছিল।"
আশিসবাবু চিৎকার করে বললেন, "এই কীভাবে কথা কোস তুই বামুনের সাথে? চুরি করবে। আর বলা যাবে না। মুখ টেনে ছিঁড়ে ফেলব একেবারে।"
"আপনে যে আমারে চোর কইলেন, চড় মারলেন তার বিচের কী অইব?"
"আমার আবার কী হবে ? তাছাড়া বামুনের লাথি খেলেই তোদের ভালো। সোজা স্বর্গে যাবি।"
এস আই তো হাঁ। বলে কি লোকটা! কোন যুগে বাস করে! মাঠপাড়ার লোক গরিব ঠিকই। কিন্তু চোর জোচ্চর নয়। বরং ওদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। মাস্টার এমন কি ডাক্তারও হয়েছে কেউ কেউ। তারা এসে পড়লে তো আরও ঝামেলা বেঁধে যাবে। এস আই ধমকে উঠলেন, "চুপ। আর একটা কথা বললে না সোজা ফাটকে। বুঝলেন?"
- উঃ, অত সোজা। আমাকে চেনেন না। একটা ফোনেই---।
এস আই সোজা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, "এটা আপনার বাড়ির ড্রয়িংরুম না। এটা থানা। যান তো এবার এখান থেকে। কাজ সামলে পারছি না। যত ফালতু ব্যাপার।"
-ফালতু ব্যাপার? আপনাদের মত লোকেদের জন্যই ছোটোলোকগুলো মাথায় উঠেছে, বুঝলেন। মনুর যুগে পড়ে থাকত গ্রামের বাইরে। লোকের ফেলেদেওয়া ভাত খুঁটে খেত। ওদের ছায়া মাড়ালে স্নান করত আমার ঠাকুমা।"
এই সময় হঠাৎ সব পুলিশকর্মিরা সাবধান ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। এক পুলিশ, অফিসারই হবেন, দ্রুত হেঁটে ঢুকলেন থানায়। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা ওসির চেম্বারে ঢুকে গেলেন। আশিসবাবু দেখলেন ওসির চেয়ারেই বসে পড়লেন। তারমানে উনিই অফিস ইনচার্জ। তবে তার বুকে লাগানো নেমপ্লেটটা দেখেছেন তিনি।মানে পড়েছেন। সুকান্ত মন্ডল। মন্ডল হয়েছে ওসি। একে বলে লাভ হবে নাকি! ও তো বাগদিটার কথাই শুনবে। স্বজাত বলে কথা। কী করা! থমকালেন তিনি একটু। এস আইও তার কাজে চলে গেছে। কনস্টেবলরা যে যার মত এদিক ওদিক। ফাটকে একটা লোক মেঝেতে বসে। অলসভাবে। বেচারাম বাগদি কই? থানার বাইরে আম গাছটার তলায়। গামছা দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। তিনিও বাইরে চলে এলেন। হাত নেড়ে ডাকলেন তাকে। ঠান্ডা গলায় বললেন, "জামতলায় যাবি?"
"তুই তোকারি না কইরলে যামু।"
" আচ্ছা তাহলে চলো।" বলে রিকশায় উঠে বসলেন আশিসবাবু।
"পুরাভাড়া দিতে অইব।"
"দেবো রে বাবা দেবো। আমারা কে জানিস, সরি জানো, একেবারে কুলিন--।"
"মনিষ্যি। আমিও একটা মনিষ্যি।" বলে প্যাডেলে পা দিয়ে চাপ দিল বেচারাম।
"তুমিও মনিষ্যি? হা হা হা।"
"হ। তয় এট্টা কতা জিগামু?" সাহস করে বলে বসে বেচারাম।
"হ জিগাও।"
"কুলিন কারে কয়?"
"কুলিন? অ্যাই মরেচে। কুলিন মানে ওই খাঁটি ধর। আসল।"
"তয় আমি ক্যান কুলিন না? আমিও তো আসল।"
নিশ্বাস ছেড়ে আশিসবাবু বললেন, " আসলে কি বলতো, আসলে আসল হল বংশ, কাজ মানে পেশা, শিক্ষা --।"
"তয় বাগদি বংশডা তো আসলই বাবু,কাজটাও আসল, রিকশা চালাই এহন, আগে তো সব চাষের কাম করত না, আমি তো তাই হুনছি। অমিতাভ বচ্চন পয্যন্ত কইছে অরা চাষি আছিল। সেইদিনই শুনতেছিলাম। আমীর খান সেও নাকি চাষি ছিল। আসলে ওইডাই তো আসল কাম। আমার নাতি কইতাছিল দুনিয়ার সব মনিষ্যিও নাকি চাষের কামই কইরত, তো সব সেই চাষার বংশ তো আসলই বংশ হল কিনা ---।" বকবক করে যায় বেচারাম।আর পায়ের উপর পা তুলে বসে আশিসবাবু হা হা করে হাসতে থাকেন।
আচ্ছা, মনুসংহিতা খানা কোথায় গেলো ? দেখেছেন কেউ?
--------------
অষ্টম অধ্যায়
শ্লোক : ২৬৭ --
ব্রাহ্মণকে (চোর বলে) গাল দিলে ক্ষত্রিয় দণ্ডনীয় হয়, বৈশ্য, শূদ্র কিন্তু বধ্য হবে।
-------