

ছবি: ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
“ছিলো”!
আমাদের বাড়ির গলি থেকে বেরিয়েই একটা বাঁদিক আর একটা ডানদিকের মোড় ঘুরলেই, মনুজেঠুদের বাড়ির পেছনে, ছিলো, কাঠগোলার পুকুর। সেই পুকুরের একদিকে একটা গাছ হেলে জলের সাথে মিশে গেছে, নিচের দিকের পাতাগুলো অল্প পচে পচে হলদেটে বাদামি, সেটা পেরুলে একটা ঘাটমতন, ঠিক বাঁধানো বলা যায় না, কিন্তু ঐ আর কী। আরও পার ধরে ধরে এগোলে প্রায় উল্টোদিকে আরেকটা ঘাট, আরেকটু বাঁধানো। এর মাঝে ঝোপঝাড়-আদাড়বাদাড়, কোথাও লোকে এঁটো ফেলত, কোথাও বাচ্চারা হাসিহাসিমুখে অ্যা করত, আর ঘাটে লোকে কাপড়টাপড় কাচত। সাবানের ফেনায় আর তেলেঝোলে ঐদিকে জলে একরকমের আবছা খুব ছোট্ট রামধনুমতন একটা বুদবুদ হত। কয়েক সেকেণ্ডের দৃশ্য।
তো ঐ যে বাঁধানোমতন কিন্তু ঠিক যেন বাঁধানো নয়, ঐ ঘাটেই পাড়ার কতিপয় বাচ্চা ও কাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করলেন খোকাকাকু। "খোকা" অবশ্য যে কোনো পাড়ায় অত্যন্ত কমন নাউন, একজনের মুদির দোকান, একজনের হয়ত ইলেক্ট্রিকের, এবং সবাই স্বতন্ত্র ব্যাপার, তাই এঁর নাম আমি মনে মনে রেখেছিলাম সাঁতারখোকা। যাই হোক, সাঁতারখোকাকাকুর জীবিকা ইত্যাদি কী আমি জানতাম না। হয়ত চাকরি করতেন কিছু, অথবা স্বাধীন, জানি না। তবে, ভারী উৎসাহে তিনিই আমাদের পাড়ার অপোগণ্ড ছেলেপিলেদের "মানুষ" করার ভার নিতেন। কেউ সাইকেল চালাতে জানে না, কেউ সাঁতার জানে না, কেউ ঘুড়ি ওড়াতে পারে না, কেউ হয়ত সব পারে, কিন্তু তুবড়ি বানাতে জানে না। এবং এইসব না শিখে দুম করে একদিন বড়বাবু ম্যাঞ্জার হয়ে গেলে আর তো লজ্জার শেষ থাকে না। তাই, খোকাকাকু।
এটা সম্ভবতঃ ক্লাস সেভেনের কথা। নাকি সিক্স, মনে নেই। ঐসব-ই আসলে একটাই টানা গরমের ছুটি। একটাই টানা যেন গল্পের বই, ফেলুদা ঢুকে পড়ছেন জুল ভার্নের দুনিয়ায়। যাইহোক, গরমের ছুটিতে ঠিক হ'ল আমরা ক'জন ঐ পুকুরেই সাঁতার শিখবো। শেখার পদ্ধতি আসলে খুবই সহজ। একটা ফাঁকা জ্যারিকেনের হ্যাণ্ডল দুইহাতে শক্ত করে অথবা বুকের কাছে জাপ্টে ধরে সেটাকে জলের নিচে চেপে ধরে ডুবিয়ে দিলেই উল্টো ধাক্কায় সেজোমামার আধখানা ভেসে উঠবে, তখন বাকি আধখানাকে ভাসানোর লাগি তুমুল বিক্রমে পা দাপাতে হবে। যেন পা নয়, গাধাবোটের এঞ্জিন। এতেই জলবিদ্যুতটিদ্যুত তইরি হয়ে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আর সম্বল ছিল একটা ঘাটের কাছেই বাঁশের খুঁটি, সেটাকেও ঐ দুইহাতে ধরে পেছনে পা মেলে দাপালে একটা ভাসমান ব্যাপার আসত।
আমার সামান্য বড়লোক বন্ধুরা লেক কী হেদোফেদোয় গিয়ে বাটারফ্লাই আর ব্রেস্টস্ট্রোকফোক শিখেছে বটে, কিন্তু এই কেরোসিনের জারিকেন-সম্বলিত খোকাস্কুলের সাঁতারুদের দেখলে বুঝত সখা buoy কারে কয়? হুঁঃ।
যাইহোক, সব কথায় এত শ্রেণিচেতনাটেতনা ঢুকিয়ে দেওয়া ভালো না। তো সেই সাতানব্বই কি আটানব্বই সালে, আমরা ঐ জ্যারিকেনের ভরসায় পা ছুঁড়ছিলাম এবং মাঝেমাঝে খোকাকাকু এসে জারিকেন কেড়ে নিয়ে কিয়ৎক্ষণ আমাদের সত্যিকারের সাঁতার কাটাচ্ছিলেন, কিয়ৎক্ষণ মানে সেকেণ্ড তিরিশেক হয়ত, থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী যা অবশ্য ঘন্টাখানেকের সমান।
ও হ্যাঁ, আর মাঝে মাঝে সাপ দেখতাম, একটা এঁকাবেঁকা লাইন যেন জলের উপর দিয়ে সুড়ুৎ করে চলে গেল। এগুলো অবশ্য ভালো সাপ। কিছু করে না।
তো এই করেই অতি শ্লথগতিতে আমার সরল সাঁতারু জীবন এগুচ্ছিল, কিন্তু হ'ল কী, একদিন ঐরকম রোববার দুপুরেই স্বতঃভাসমান অবস্থায় একইসাথে কনফিডেন্স এবং বিদ্রোহ কিক-ইন করল। মনে হ'ল, অনেকদিন তো নেট প্র্যাকটিস হ'ল, যাই আজকে একটু সাঁতরে দেখি ঐপার কদ্দূর।
এরপর শুধু মনে পড়ে ডুবে যাওয়ার স্মৃতি। এবং এও মনে পড়ে যে ডুবতে ডুবতেই বেশ আশ্চর্য লাগা যে একেবারে ভুস করে মানুষ ডোবে না - চোখের সামনে জলের রঙ হাল্কা সবুজ থেকে গাঢ় হতে হতে একদম প্রায় অন্ধকার কালো ... কিন্তু পরের মুহূর্তেই কী করে যেন আবার ভেসে উঠে এক সেকেণ্ডের জন্য আলো। সেই এক সেকেণ্ডে দেখছি ঘাটের কাছে অনেকেই, কিন্তু কেউ-ই আমার দিকে দেখছে না। চেঁচাতে চাইছি, কিন্তু আমার-ও গলায় আওয়াজ নেই।
কেউ নিশ্চয়ই দেখেছিল, না হলে আর এখন বসে গপ্পোটা করছি কী করে? তবে আমি জানি যে ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ডুবে যাওয়া খুব সোজা, কারণ ঐ মূহুর্তে ইচ্ছে হয় প্রাণপণে জাপ্টে ধরি। খোকাকাকুই শিখিয়েছিল, টেনে তুলতে তুলতেই, তাও মনে আছে। আর মনে আছে যে পুকুরের পচা জলটল খেয়ে বেশ পেট ফেঁপেছিল দুদিন। তবে এ ব্যতীত আর কোনো দুর্যোগ হয়নি। আমার আত্মবিশ্বাসে একটু চিড় ধরেছিল বটে, তবে, দুর্বল স্মৃতির মানুষের সবথেকে বড় সুবিধে যে সে প্রচণ্ড ভয়ের জিনিষও অচিরাৎ বিস্মৃত হয়।
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই আমার সাঁতার শেখা বন্ধ হয়ে যায়, এখন আর ভালো মনে নেই কেন। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছিল, যেমন হয়। সব কথা কী আর গল্পে লেখার? সেই খোকাকাকুই বা কোথায় কে জানে? শীতকালে যখন যাই একমাসের সফরে, দেখি না আর। এখনকার বাচ্চাদের কে শেখায় এইসব? কে জানে!
তো সাঁতার আমার ঐ অব্দি। আমার অ্যাডভাইজার বলতেন, “জলে ফেলে দিলে একেবারে পাথরের মত ডুবে যাব না, কিছুক্ষণ সংগ্রাম করব”। আমিও প্রায় তাই। তবে, সংগ্রাম-ও নয়, মৃদু অনুযোগ করেই হয়ত ডুবে যাব।
তাও তো জলে নামি। জল টানে। একবার গোয়ায় গেছি। এম-স্ট্যাট সেকেণ্ড ইয়ার। ওখানে কী একটা ভেলামতন পাওয়া যায় – কায়াকিং বলতে ইচ্ছে করছে, তবে সে জিনিষ কায়াহীন বললেই হয়ত মানায় বেশি। তো তার একটায় আমি আর আমার বেস্টফ্রেণ্ড পানু। আর একটায় গুণ্ডা আর জনৈক বাহাদুর জুনিয়র - রোহিত প্যাটেল। ঠিক হল ঐ ভেলায় চড়ে আমরা সমুদ্দুরের এত দূর যাব যেখান থেকে আর তটভূমির চিহ্ন দেখা না যায়। যেন মনে হয় চারিদিকে জল আর জল ছাড়া কিছুই নেই। সেইরকম "মাঝদরিয়ায়" গিয়ে আমরা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে একটা সিগারেট খাবো। কাউন্টারে। এর উপকরণ হিশাবে সিগারেট ও দেশলাই কিছু একটা করে প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে আমার লাইফ-জ্যাকেটের মধ্যে। আমি সামনে বাইছি, পানু পেছনে – আর অন্য ভেলাটা দেখি তরতর করে এগুচ্ছে যেন বাইচ রেস। ব্যবস্থার এমনি সব-ই ঠিক, খালি, সমস্যার মধ্যে আমি ছাড়া সবাই সাঁতারপটু। পটু মানে পটু, পানু গঙ্গা এপার-ওপার করতে পারে এক নিমেষে। বাকিরাও লেক কিংবা পুলের সাক্ষাৎ মাইকেল ফেল্পস। আমারও তাই, বেয়ে যেতে যেতে মাঝেমাঝেই ভয় করছে এই বোধহয় সলিলসমাধি হবে, কিন্তু পেছন থেকে আমার বেস্টফ্রেণ্ড বলছে ডুবলে কিন্তু বারুদ ও তম্বাকু ভিজে যাবে, তাই ডুবিস না।
জেনে আনন্দ পাবেন যে, সেই প্ল্যান ভেস্তে যায় নি। গোয়ার সমুদ্রে ভেসে সেই স্যাঁতসেঁতে তামাক ঘষেটষে একটা সিগারেট আমরা চারজনে কাউন্টার করে খেয়েছিলাম সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে। দুটো ভেলা পাশাপাশি ঠেকিয়ে। আহা!
যদিও তার একটু পরেই বোধোদয় হয় যে এক, সূর্যাস্তের পরেই সব ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, মানে নিচে তাকালে ভেলাও অদৃশ্য, আর উপরে দুটো মিটমিটে তারা, আর চোখে নিজের কিংবা সমুদ্রের নোনাজল। আর দুই, সৈকত দেখতে না পেলে ঐ গভীর জলে কোনদিকে বাইলে যে ঠিক কোন দিকে যাচ্ছি, এও বোঝার কোনই উপায় নেই। যে যুগের কথা হচ্ছে সে যুগে মোবাইল ছিলো না, থাকলেও ঐ জলের মিনারের মধ্যে টাওয়ার জাগানো যেত কী না কে জানে। আমার সহ-নৌকাম্যান এতেও অবশ্য অবিচল ছিলেন। আমাকে প্যানিক করতে দেখে পানু বলল, আরে উত্তরপানে না গিয়ে দক্ষিণে গেলে মালদ্বীপ কী লাক্ষাদ্বীপ কিছু একটা হিট করে যাবি, তুই বাইতে থাক জেডি, থামিস না!
বলাই বাহুল্য, সে যাত্রাও ডুবিনি। ডুবলে কী আর এই আষাঢ়ে গল্প বলতাম?
এমনিও আর বলতাম কী না জানি না, তবে, আজ দুপুরে এক বন্ধুকে ফোন করে এইসব গল্প করছিলাম। সেও আমারই মতন। অধ্যাপক ও ব্যর্থ সাঁতারু। ঐরকম কিছুদিনের সাধনার পরে নাকানিচোবানি খেয়েটেয়ে, সাঁতারিচ্ছা জলাঞ্জলি দিয়ে, সে-ও, আমারই মতন প্লবমান থাকার চেয়ে উড্ডীন অবস্থায় স্বচ্ছন্দ আজকাল।
তার-ও বয়স আমার-ই মতন, বেয়াল্লিশ নাকি তেতাল্লিশ। আমার-ই মতন বুড়োটে হয়ে গেছে অকালে। এখন আমরা সারাদিন হুহু করে ছুটতে ছুটতে, মাঝে-মাঝে রিয়ার-ভিউ উইণ্ডোয় পেছনপানে তাকাই আর ভাবি:
“ছিলো!”
kk | ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৫০743209
হীরেন সিংহরায় | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:১২743235