এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • টুইঙ্কল নয় উইঙ্কল 

    SoumyaPratik লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ৯০ বার পঠিত
  • টুইঙ্কল নয় উইঙ্কল
    সৌম্য প্রতীক মুখোপাধ্যায়

    কোনো পারফর্মিং আর্টস প্রথম দর্শনে আকর্ষণীয় মনে হলেও বেশ কিছুদিন পরে যখন স্মৃতি ঝাপসা হতে শুরু করে, আতসকাঁচের তলায় কাঁটাছেঁড়া করতে করতে অনেক অসঙ্গতি বার করার খেলায় মন মেতে উঠে - বোধহয় তখনই সেই সৃষ্টির যথাযথ নান্দনিক ও চিরন্তন মূল্যায়ন সম্ভব। এই লেখার শিরোনাম দেখেই পাঠক বুঝতে পারছেন বিষয়বস্তু কোন চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে! সেটি মুক্তি পাওয়ার এক মাস পরেই তাই কলম ধরা!

    “উইঙ্কল টুইঙ্কল” এই শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে মঞ্চস্থ হওয়া একটি cult নাটক। সুতরাং এই সিনেমা নিয়ে দর্শকের মনে এক বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। অবধারিত ভাবেই নাটকের সাথে তুলনামূলক আলোচনা চলে আসা ন্যায়সঙ্গত।

    প্রথমেই বলে রাখি সেই নাটকটি আমার প্রবাস জীবনে দেখা হয়ে উঠে নি। এটি অবশ্যই কোনো সাফাই নয়। একটি তথ্য মাত্র। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি আমাকে হয়তো সুযোগ করে দিয়েছে একদম শূন্য থেকে বিচার করার। সংবাদপত্রে বা ইন্টারনেটে যে কটি সমালোচনা পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে সেই সমস্ত সমালোচনা যেন নাটকটির মোহে এখনও আচ্ছন্ন। থেকে থেকে তাদের লেখা মন্তব্যের মধ্যে সেই বিশ বছর আগেকার পুরোনো নাটকের কুশীলবদের নাম উল্লেখিত হয়েছে।

    প্রথমেই হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গার কাজটি করে বিষয়টিকে সোজাসাপটা উপস্থিত করাই মনে হয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই যুগের বাংলা সিনেমার অন্যতম নামকরা পরিচালক। কিন্তু সৃজিত বাবুর এই প্রচেষ্টাটাটি ব্যক্তিগত ভাবে অত্যন্ত নীরস ও দুর্বল বলে মনে হয়েছে। মূল গল্পের দিকে খুব একটা যাচ্ছি না, কারণ উপাদান হিসাবে নাটকের বিষয়বস্তু ও সমস্ত সংলাপ তার কাছে উপলব্ধ।

    “উইঙ্কল টুইঙ্কল” চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন সাদামাটা। টেকনোলজির সাহায্য নিয়ে পুরোনো দিনের পুনর্নিমান অতি সহজেই, স্বল্প খরচে করা সম্ভব। দুই একটি পোস্টার, দেওয়াল লিখন দেখিয়ে দায়সারাভাবে বিশ বছর আগের কলকাতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এককথায় থিয়েটারের ক্যানভাস থেকে পরিচালক যেন বেরিয়ে আসতে অসমর্থ।

    সৃজিতবাবুর গল্প বলার দক্ষতার স্বাক্ষর আমরা অতীতে পেয়েছি। প্রয়োজন ছিল নাটকটিকে নিয়ে ভাঙাচোরা করার। দেখে শুনে যা মনে হল সেদিকে তিনি বিশেষ হাঁটেন নি। আর যদিও কখনো কখনো হেঁটে থাকেন তবে সেই হাঁটা টলোমলো পায়ে। প্রত্যয়ের অভাবে সে মনের মধ্যে কোনো ছাপ ফেলে না। এর থেকে অনেক বেশী চমক, বেশী মৌলিক চিন্তা ভাবনা প্রত্যাশিত ছিল। সন্দেহ হয় পরিচালক বোধহয় সস্তায় বাজিমাত করতে চেয়েছেন। একমাত্র উদ্দেশ্য- যেন, নাটকের নাম “ভাঁড়িয়ে” বক্স অফিসের বৈতরণী পার হওয়া !

    চিত্রনাট্য বা গল্পের পর আসে অভিনয়ের কথা। অনেক সাধারণ চিত্রনাট্য স্রেফ অভিনয়ের জোরে অনেক সময়ে উতরে দেয় চলচ্চিত্রকে। এর উদাহরণ ভুরি ভুরি আছে আমাদের আশেপাশেই। সৃজিত বাবুর উইঙ্কলে তার দেখা পেলাম কই।

    ৠতিক সম্বন্ধে একটি কথাই বলা যেতে পারে, তিনি সব্যসাচী হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই ভাবে অন্যদের সাহায্য পান নি। পার্থ ভৌমিক খুব সম্ভবতঃ খুঁটির জোরে ঢুকে পড়েছেন। প্রায় ক্লাস ফোরের বাচ্চা যেভাবে মাস্টারের সামনে পড়া বলে, সেইভাবে যেন তার সংলাপ। কিন্তু বিশেষ ভাবে হতাশ করেছেন পরমব্রত।

    পরমব্রতের চরিত্রে যে ধরণের স্পার্ক এর দরকার ছিল, তার ছিঁটেফোঁটাও দেখা যায় নি। পরমব্রতের ইন্দ্রর বয়েস ও ক্লান্তির ছাপ চোখে-মুখে, চলাফেরায়; এই চরিত্রায়ণ নিঃসন্দেহে এই সিনেমার অন্যতম দুর্বল দিক। প্রয়োজন ছিল তাজা মুখের কোনো protagonist এর; Flamboyance এর অনুপস্থিতি বিশেষ ভাবে অনুভূত হয়। বাকি সব চরিত্রায়ন মোটামুটি গতানুগতিক।

    নাটককে ভিত্তি করেই চলচ্চিত্রের পথ শুরু। দেশে বিদেশে অনেক নাটকের সফল চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে বা ভবিষ্যতেও হবে। আমাদের বাংলাতেই এর উদাহরণ মিলবে। যেমন জে বি প্রিসলের “ইন্সপেক্টর কলস”-এর অবলম্বনে নির্মিত “থানা থেকে আসছি”। উত্তমকুমার সেই তিনকড়ি হালদারকে রূপালি পর্দায় নিয়ে আসেন অত্যন্ত সাফল্যের সাথে; অন্যান্য চরিত্র অভিনেতারাও সমান উজ্জ্বল। কিংবা হাল আমলের “বল্লভগড়ের রূপকথা”। অনির্বাণ ভট্টাচার্য ঝুঁকি নিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন নাটকটির প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থেকে। এমনকি সত্যজিৎ রায়ের “গণশত্রু” ইবসেনের “এনিমি অফ পিউপিল” নাটককে অবলম্বন করে। ! যদিও সেটিকে সত্যজিতের অনান্য সৃষ্টির থেকে একটু কম মার্কস দেওয়া হয়, তা সত্ত্বেও তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা দিতে গিয়ে সিনেমার বৈশিষ্ট্য রাখতে অনেকটা সক্ষম হয়েছিলেন এবং অভিনেতা চয়নের বিষয়ে তিনি কোনও ফাঁক রাখেন নি।

    কোনো কোনো সিনেমা অনেক সময়ে মনের মধ্যে ছাপ ফেলে যায় স্রেফ বিশেষ কোনো মুহূর্তের জন্যে, গানের জন্যে। “উইঙ্কলে” কিন্তু সেইরকম “টুইঙ্কল” দেখাতে পারেন নি সৃজিতবাবু। একমাত্র রাজেনের সাথে সব্যসাচীর ছাদের উপরের দৃশ্যটি কিছুটা দাগ কেটে যায়। একটি “মৃত” মানুষের বাড়ি ফিরে আসার পর তার আপনজনের হাবভাব বাস্তবতা থেকে অনেক যোজন দূরে, যেন স্ক্রিপ্টেড সব চালচলন। এমনকি সব্যসাচীর বয়স যে এক বছরও বাড়ে নি, সে নিয়েও তাদের প্রতিক্রিয়া যেন অনেকটাই মিনমিনে। গোটা ঘটনা যদিও ফ্যান্টাসি মাত্র, কিন্তু দর্শকদের প্রথমেই তা বুঝতে দেওয়া কেন! হতেও তো পারত কোনো প্রতারক তাদের ঠকানোর জন্যে আবির্ভূত হয়েছে। পরিচালক যেন ধরেই নিয়েছেন পাবলিক নাটকটি দেখে বা তার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবগত হয়েই গাঁটের কড়ি খরচ করে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করবেন!

    রাজনৈতিক বিষয়বস্তু কালের পরিবর্তনের সাথে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। আজকের যে জেনারেশন বেশী সিনেমা হলে যাবে বা যেতে পারে, তারা কেউ নকশাল আমল দেখে নি। অনেকেই জরুরী অবস্থা দেখেননি; দেখেননি বাম জমানার কান্ড কারখানা। দর্শক চিরকালই বড় নির্মম। পুরো বিষয়টি সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু ভিন্ন চিন্তার, ভিন্ন সাব প্লটের, এমনকি নতুন চরিত্রের অবতারণা করে পুনর্নিমান করলে আরও যুগোপযোগী হয়ে উঠত। সেই সাহস পরিচালক দেখাতে পারেন নি। আর সাহসী না হলে সফল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র উপস্থাপন করার চিন্তা নিরর্থক।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন।