অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই ইতিহাস আমরা যেন ভুলে না যাই!
এঁদেরই একজন অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।
হে মৃত্যুঞ্জয় মহাপ্রাণ; আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম!
--------------------------------------------------------------------
শহীদ অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য: এক মৃত্যুঞ্জয় প্রাণ
ছাত্রজীবনের কৃতিত্ব, মেধা ও পেশাগত দক্ষতার কারণে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। কলম্বো প্ল্যানের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁর লন্ডন যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। নির্ধারিত ছিল ২৬ মার্চ ১৯৭১ রাতে লন্ডনের ফ্লাইট ধরার কথা। কিন্তু ইতিহাস তাঁর জন্য অন্য এক নির্মম পরিণতি লিখে রেখেছিল।
অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ছিলেন তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা দিগেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক এবং মা রাজলক্ষ্মী দেবী। দেশ তখন উত্তাল। চারদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা। এই পরিস্থিতিতে মাকে দেখতে তিনি গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অধ্যাপক অজয় রায়ের স্মৃতিচারণে জানা যায়, সম্ভবত ১৯ মার্চ ১৯৭১ তারিখে শহীদ অনুদ্বৈপায়নের সঙ্গে তাঁর শেষ আলাপ হয়েছিল। সে সময় অনুদ্বৈপায়ন জানিয়েছিলেন, তিনি মাকে দেখতে বাড়ি যাচ্ছেন এবং সম্ভবত ২৪ বা ২৫ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসবেন। অন্য বর্ণনায় তাঁর ২০ মার্চ বাড়ি যাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ছিল হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের জন্তরী গ্রামে।
বাড়িতে তখন অপেক্ষায় ছিলেন বাবা-মা। বড় ছেলে বাড়ি ফেরায় পরিবারে কিছুটা স্বস্তি নেমে এসেছিল। কিন্তু ২৪ মার্চ মা রাজলক্ষ্মী দেবী ছেলেকে বারবার বাড়িতে থেকে যেতে বলেছিলেন।
পরবর্তীকালে বিভিন্ন তথ্য ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, অনুদ্বৈপায়ন ২৫ মার্চ সকালের দিকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যান বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিতে। কারণ পরদিনই তাঁর লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল।
ক্লাব থেকে ফেরার পথে তিনি সহকর্মী শিক্ষক অধ্যাপক জালালুর রহমানের বাসায় যান। বিদায়ের সময় তিনি তাঁকে বলেছিলেন—“হলে যেতে কেন জানি ভয় করছে!”
সেই কথাটি পরবর্তী জীবনে অধ্যাপক জালালুর রহমানকে গভীর অনুশোচনায় পুড়িয়েছে। কারণ তিনি জানতেন না, অনুদ্বৈপায়নের সেই আশঙ্কা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হবে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে কালরাত্রি। ঐদিন রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। গণহত্যার প্রথম দিকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষার্থী ও আবাসিকদের আবাসস্থল জগন্নাথ হল আক্রান্ত হয় ভয়াবহভাবে।
সেই কালরাতে জগন্নাথ হলের অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারী হত্যার শিকার হন। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন তরুণ শিক্ষক অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।
জগন্নাথ হল সংসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পরিমল গুহ ম্যানহোলে প্রায় ১৯ ঘণ্টা আত্মগোপন করে সেই রাতের হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পাকিস্তানি বাহিনী রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে জগন্নাথ হলে আক্রমণ শুরু করে। তাণ্ডবের পর ভোরে তারা জীবিতদের খুঁজতে থাকে। সেই সময় অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যও তাদের হাতে বন্দী হন।
২৬ মার্চ ভোরে তাঁকে জগন্নাথ হলের সংসদ ভবনের সামনের একটি ফাঁকা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তখন অস্পষ্টভাবে কিছু বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
অনুদ্বৈপায়নের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছিলেন জগন্নাথ হল সংসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পরিমল গুহ, শোভা পাল এবং বইবিক্রেতা ইদু মিয়া। জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক গোপাল কৃষ্ণনাথও তাঁর বাসার জানালা থেকে হত্যাকাণ্ডটি দেখেছিলেন। পরে পাকিস্তানি বাহিনী জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে গর্ত খুঁড়ে অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, প্রখ্যাত দার্শনিক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবসহ অসংখ্য ছাত্র ও কর্মচারীর মরদেহ গণকবরে সমাহিত করে।
অধ্যাপক অজয় রায়ের স্মৃতিচারণে আরও জানা যায়, ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে তিনি জগন্নাথ হলে সহকর্মী ও ছাত্রদের অবস্থা দেখতে যান। সেখানে দক্ষিণ বাড়ির দারোয়ান মাখনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মাখনও অনুদ্বৈপায়নের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি জানান, হানাদার বাহিনী অনুদ্বৈপায়নকে ধরে নিয়ে গিয়ে দক্ষিণ বাড়ির সামনে আরও কয়েকজনের সঙ্গে হত্যা করে। মাখন নিজের ঘর থেকে লুকিয়ে সেই ঘটনা দেখেছিলেন।
অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য শহীদ হওয়ার পরও তাঁর পরিবারের কাছে দীর্ঘদিন তাঁর মৃত্যুর নিশ্চিত সংবাদ পৌঁছায়নি। আরও বেদনাদায়ক বিষয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে তাঁর মৃত্যুর খবরে আমল না নিয়ে তাঁকে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে অনুদ্বৈপায়নের গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় কাজে যোগদানের নোটিশ পাঠান। এমনকি কাজে যোগ না দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে বরখাস্তও করা হয়। অথচ ততদিনে তাঁর মরদেহ জগন্নাথ হলের গণকবরে সমাহিত। পরে বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এস. এম. ফজলুর রহমান ১৬ অক্টোবর ১৯৭১ তারিখে উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে জানান যে তাঁর সহকর্মী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ২৫ মার্চ রাতেই নিহত হয়েছেন।
১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে পাঠানো দুই হাজার টাকার একটি চেক তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার কথাও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এই চিঠিই শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারের বহুদিনের অপেক্ষা ও আশার অবসান ঘটায়। এতদিন বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ছেলের মৃত্যুর খবর শোনা গেলেও পরিবারে ক্ষীণ আশা ছিল—হয়তো তিনি বেঁচে আছেন, হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে পৌঁছে গেছেন। চিঠির মাধ্যমে সেই আশারও সমাপ্তি ঘটে। তাঁর বাবা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে রমনা থানা থেকে ছেলের মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করেন।
স্বাধীনতার পর শহীদ অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে স্মরণ করে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বাংলাদেশ সরকারের ডাকবিভাগ তাঁর নামে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। জগন্নাথ হলের একটি পাঠকক্ষের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ অনুদ্বৈপায়ন স্মৃতি পাঠকক্ষ’। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের অক্টোবরে জগন্নাথ হলের ৪৬ নম্বর আবাসিক শিক্ষক ভবনের নাম রাখা হয় ‘অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য আবাসিক শিক্ষক ভবন’।
স্বাধীনতার পর জগন্নাথ হলের সংসদ ভবনের নামও একসময় ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবন’ রাখা হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে ১৯৮৫ সালে সেই ভবনটি ভেঙে পড়ে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যু ঘটে। তাঁদের স্মরণে সেখানে পরবর্তীতে ‘অক্টোবর স্মৃতি হল’-এর মতো উদ্যোগের কথাও উঠে আসে।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, তাঁর জন্মস্থান নবীগঞ্জেও তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর নবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তাঁর গ্রামের দিকে যাওয়া সড়কের নামকরণ করা হয় ‘অনুদ্বৈপায়ন সড়ক’, যা পরবর্তীকালে ‘কলেজ সড়ক’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং পুরোনো নামের ফলকটি একসময় মাটিচাপা পড়ে যায়। তাঁর পরিবারের সহযোগিতায় তাঁর নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে নবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও জন্তরী গ্রামের ত্রিমুখী রাস্তার মিলনস্থলের পাশে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।
তাঁর পরিবারের ইতিহাসও গভীর বেদনার। তাঁর একমাত্র জীবিত স্বজন ছোট বোন পরবর্তীকালে ১৯৮০-এর দশকে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের জীবন ছিল জ্ঞান, মেধা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আরও বড় পরিসরে জ্ঞানচর্চার সুযোগ তাঁর সামনে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল বাংলাদেশের সেই অগ্নিঝরা সময়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেমে যায়।
তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন, আত্মত্যাগ এবং স্মৃতি আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হল এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
শহীদ অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
তাঁর আত্মত্যাগ ও স্মৃতি চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকুক।
তথ্যসূত্র:
অধ্যাপক অজয় রায়ের স্মৃতিচারণ; স্মৃতি : ১৯৭১ দ্বিতীয় খণ্ড
প্রথম আলো, ৪ নভেম্বর ২০১৬
শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ—আলী মো. আবু নাঈম ও ফাহিয়া কানিজ লাভা।