
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক NFHS-6, অর্থাৎ, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের ফ্যাক্ট-শীট প্রকাশ করেছেন বেশ কিছুদিন আগে। এই বছরের সার্ভেতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বদল হয়েছে। মোট ইন্ডিকেটরের সংখ্যাই কমেছে, NFHS-5-এর ১৩১টি থেকে NFHS-6-এ দাঁড়িয়েছে ১০১টিতে। বেশ কিছু ইণ্ডিকেটর (সূচক) বাদ পড়েছে, যেমন অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত তথ্য, যা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ও শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সার্ভেতে এবারই প্রথম অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত গোটা সেকশনটাই বাদ পড়ল। সরকারি সূত্রে প্রকাশ, মেথডোলজি অর্থাৎ পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে ঐ তথ্যটি প্রকাশ করার কিছু সমস্যা আছে। আগের পর্বগুলোয় ক্যাপিলারি অর্থাৎ আঙুলের ডগা থেকে রক্ত নিয়ে হিমোগ্লোবিন মাপা হতো, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল নির্ভুলতার দিক থেকে। সরকারের বক্তব্য, ভবিষ্যতে ভিনাস ব্লাড স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে ICMR-এর Diet and Biomarkers Survey-র (এখন যার নাম SAMPADA = Survey for Assessment of Markers of Population Health, Activity, Diet and Anthropometry) মাধ্যমে অ্যানিমিয়ার তথ্য প্রকাশিত হবে, যা অনেক বেশি নির্ভুল বলে গণ্য করা হয়।
অ্যানিমিয়া একাই নয়। শিশুমৃত্যুর হার (IMR, NMR ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার), ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং HIV সংক্রান্ত সচেতনতার সূচকও NFHS-6-এর ফ্যাক্টশিট থেকে বাদ পড়েছে। উজ্জ্বলা যোজনার অধীনে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্যও এবার অনুপস্থিত, এইটি এর আগে NFHS-5-এ প্রকল্পের দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক প্রকাশ্যে এনেছিল। সরকারি ব্যাখ্যা, এই সূচকগুলো এখন অন্য নির্দিষ্ট সার্ভে বা প্রশাসনিক ডেটাবেসের মাধ্যমে নজরে রাখা হচ্ছে, যেমন শিশুমৃত্যুর হারের জন্য Sample Registration System। সমালোচকদের একটি অংশের বক্তব্য, SRS জাতীয় ও রাজ্যস্তরের হিসাব দিলেও, NFHS যেভাবে জেলাস্তরে এবং সামাজিক-আর্থিক বিভাজনে তথ্য দিত, তা এখন অধরা থেকে যাচ্ছে। সরকারি সূত্র অবশ্য এই ব্যাখ্যাও দিয়েছে যে নতুন কিছু সূচকও এই পর্বে যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আছে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক গঠন, প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের ব্যবহার, টিকাকরণের হার এবং ডায়ারিয়ার তীব্রতা সংক্রান্ত তথ্য।
এই বাদ পড়াগুলোকে দুটো আলাদা ভাবে দেখা যায়। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি তথ্যের মান (ডেটা কোয়ালিটি) বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া (প্রতিটি সূচককে তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসে সরিয়ে দেওয়া), এবং ফ্যাক্টশিট তথ্য প্রকাশের প্রথম স্তর মাত্র, পূর্ণ জাতীয় রিপোর্ট পরে প্রকাশিত হবে। অন্য একটি ব্যাখ্যায়, কিছু সাংবাদিক ও বিশ্লেষক এই বাদ পড়াগুলোকে একটি পুরনো প্যাটার্নের অংশ বলে মনে করছেন, বিশেষত যেহেতু ঠিক যে দুটি বিষয়ে (অ্যানিমিয়া ও উজ্জ্বলা) আগের সরকারের দাবির সাথে NFHS-5-এর তথ্যের অসঙ্গতি প্রকাশ্যে এসেছিল, সেগুলোই এবার অনুপস্থিত। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি একটি বিতর্কিত অবস্থান, প্রমাণিত সত্য নয়, কিন্তু আলোচনায় উল্লেখযোগ্য। সত্যি যাই হোক, ফলাফল একই: বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যে সূচক নিয়ে এই মূহুর্তে হাতে কোনো সাম্প্রতিক তথ্য নেই।
এই প্রসঙ্গে একটু পুরনো ইতিহাসও মনে করাও জরুরি। The Federal-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সার্ভে পরিচালনাকারী সংস্থা IIPS-এর ডিরেক্টর কে এস জেমসকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি অ্যানিমিয়ার তথ্য "রিভাইজ" করার জন্য চাপের সামনে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন বলে অভিযোগ; এই ঘটনার এক মাস পরেই ওঁকে সরানো হয়। (এই নিয়ে গুরুতেই সেই সময় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, “হয়েছে ব্যথা, কেটে ফ্যালো মাথা”!)
আপাতত, এই সার্ভের অনেকগুলি সূচক থেকে বাছাই করে শুধু স্বাস্থ্য, এবং নারী এবং শিশুকল্যাণের কয়েকটি সূচকের জন্য পশ্চিমবঙ্গ আর গোটা দেশের সার্বিক গড়ের তুলনা করবো। একশো-একটা ইন্ডিকেটর থেকে বেছে গোটা দশেক বের করা কঠিন কাজ, এবং কিছু একদেশদর্শিতা থেকেই যাবে। তার আগে খুব ছোট্ট করে বলতে গেলে, রাজ্য জনকল্যাণমূলক পরিকাঠামো গড়ে তোলায় যতটা দক্ষ হয়ে উঠেছে, সামাজিক পরিবর্তনে ততটাই ধীরে এগিয়েছে। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিমা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অ্যান্টিনেটাল কেয়ার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অন্যদিকে চাইল্ড ম্যারেজ, মহিলাদের শিক্ষার নিম্ন হার এবং এনসিডির বর্ধনশীল বোঝা একই গতিতে এগোয়নি। দুটো ধারা পাশাপাশি রাখলে যা বোঝা যায়, তা হলো: কল্যাণ প্রকল্প পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো যত দ্রুত তৈরি হয়েছে, সামাজিক পরিবর্তন (অথবা প্রগতি) তার সাথে তাল রাখতে পারেনি।
কোথায় এগিয়ে?
প্রথমত, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও সার্ভিসের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ধারাবাহিকভাবে জাতীয় গড়ের চেয়ে এগিয়ে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবধান অনেক বেশি। প্রায় সর্বজনীন অ্যান্টিনেটাল কেয়ার, ইন্সটিটিউশনাল ডেলিভারির হার-ও বেশি। স্বাস্থ্যবিমার কভারেজ জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ, বিগত দশকে রাজ্য সরকার পাবলিক হেলথ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিমার কভারেজের হার আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার মতো। ৮৮.২ শতাংশ পরিবার কভারেজের তুলনায় জাতীয় হার ৬০.২ শতাংশ। পুরো এন-এফ-এইচ-এস সার্ভে দেখলে এইটি পশ্চিমবঙ্গ ও গোটা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানগুলোর একটি, এবং সম্ভবত এর অন্যতম কারণ রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। নতুন সরকারের আমলে এই কভারেজের মাত্রা বজায় রাখে কি না, সেটি পরের NFHS পর্বেই স্পষ্ট হবে। এই একটি সংখ্যার উপর রাজ্যের আপেক্ষিক সুবিধা কতটা নির্ভরশীল, তা মাথায় রেখে বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রেও কাগজে-কলমে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে স্টানটিং কমে হয়েছে ২২.৪ শতাংশ, যা জাতীয় ২৯.৩ শতাংশের চেয়ে যথেষ্ট কম, এবং রাজ্যের নিজের NFHS-5-এর ৩৩.৮ শতাংশ থেকেও বড় উন্নতি। আন্ডারওয়েটের হারেও একই রকম, যদিও কিছুটা কম, উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু ওয়েস্টিং-এর হার খুব বেশি বদলায়নি। মনে রাখা উচিত, ওয়েস্টিং শিশু পুষ্টির তিনটি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাদ্য-সংবেদনশীল, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ক্রনিক নয়, বরং অ্যাকিউট অর্থাত তীক্ষ্ণ অভাবের প্রতিফলন। NFHS-5-এ পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্টিং হার ছিল ২০.৩ শতাংশ, NFHS-6-এও ঠিক ২০.৩ শতাংশ, দশমিকের ঘর পর্যন্ত অপরিবর্তিত, ওদিকে স্টানটিং ও আন্ডারওয়েট দুটোই উন্নতি দেখিয়েছে। এটা কেন সেটা ভাববার বিষয়। 
গার্হস্থ্য হিংসার দিকে তাকালে, রাজ্যের অবস্থা বাকি দেশের থেকে সামান্যই ভালো। ১৮-৪৯ বছর বয়সসীমায় এভার-ম্যারেড মহিলাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১৯% মহিলা গার্হস্থ্য হিংসার (স্পাউজাল ভায়োলেন্স) অভিজ্ঞতা আছে, দেশের সার্বিক গড় এখানে ২২.৩%। NFHS-5-এর তুলনায় একটু হলেও উন্নতি, কারণ রাজ্যের হার তখন ছিল ২৬.৯%, জাতীয় গড় ২৯.২%। তবে "সামান্য ভালো" বলার আরেকটি কারণ আছে: গার্হস্থ্য হিংসার ক্ষেত্রে আন্ডার-রিপোর্টিং একটি সুপরিচিত সমস্যা (শুধুমাত্র যাঁরা রিপোর্ট করেছেন তাঁদের তথ্য পাওয়া যায়), তাই বাস্তব ছবিটা সম্ভবত এই সংখ্যার চেয়ে কিছুটা খারাপ হতে পারে রাজ্যে এবং দেশে দুটোতেই। 
নারী ক্ষমতায়নের অন্য একটি সূচক কতজন মহিলার নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। রাজ্যের ক্ষেত্রে NFHS-5 থেকে NFHS-6-এর মধ্যে এইটি ৭৬.৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫.৩%। এটা বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, বলতে বাধা নেই। গোটা দেশের সার্বিক গড়ের-ও এই এক-ই সময়ে উন্নতি হয়েছে, ৭৮.৬% থেকে ৮৯%। সহজ পাটিগণিত বলে দেবে, এই সূচকে বৃদ্ধির হার রাজ্যে অনেকগুণ বেশি। 
কোথায় পিছিয়ে?
কিন্তু এই কয়েকটি আপাত উন্নতির বাইরে তাকালে বোঝা যায় কোথায় রাজ্য পিছিয়ে - সমাজ কোথায় তাল মেলাতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ (চাইল্ড ম্যারেজের) হার ৩৬.৪ শতাংশ, সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে এই অংশের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে, যা জাতীয় হার ২০.১ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। লক্ষণীয়, NFHS-4 (২০১৫-১৬) থেকে NFHS-5 পর্যন্ত এই হার একই জায়গায় থমকে ছিল, ৪১.৬ শতাংশ; সাম্প্রতিক সার্ভেতে একটু উন্নতি হয়েছে, প্রায় ৫% কমে বাল্যবিবাহের হার ৩৬.৪ শতাংশে নেমেছে। 
বাল্যবিবাহের সরাসরি পরিণতি টিনেজ প্রেগন্যান্সি: পশ্চিমবঙ্গের ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মহিলাদের ১৬.৬ শতাংশ সমীক্ষার সময় ইতিমধ্যে মা হয়েছেন বা গর্ভবতী ছিলেন, যেখানে জাতীয় হার ৬.৭ শতাংশ। এই সংখ্যাটিও বিগত দশকের, NFHS-4, NFHS-5, ও NFHS-6 তিনটি সার্ভের সময়কালে কার্যত অপরিবর্তিত, NFHS-4-এ ১৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এখন ১৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার সামান্য কমলেও টিনেজ প্রেগন্যান্সি সমান হারে কমেনি। লেখার শেষে সারণীতে তিনটে সার্ভের জন্যই, এই দুটো সূচকের মান দিলাম। সেটা দেখলে ট্রেণ্ডটা একটু স্পষ্ট হতে পারে। 
মহিলাদের শিক্ষার হারও একই গল্প, একটু অন্যভাবে। পশ্চিমবঙ্গ নিজেকে শিক্ষায় অগ্রণী রাজ্য বলে মনে করলেও, মাত্র ৪০.০ শতাংশ মহিলা ১০ বা তার বেশি বছর শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ করেছেন, যেখানে জাতীয় হার ৪৬.৪ শতাংশ। মহিলাদের ইন্টারনেট ব্যবহারও জাতীয় গড়ের চেয়ে কম, ৫৯.৩ শতাংশ বনাম ৬৪.৩ শতাংশ, যদিও NFHS-5-এর তুলনায় দুটো সূচকেই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। স্কুলে কখনও না যাওয়া মহিলাদের অনুপাতে (২১.৮%) পশ্চিমবঙ্গ বরং জাতীয় গড়ের (২৬.৩%) চেয়ে ভালো অবস্থানে, যদিও কেরালার (৩.৪%) ধারেকাছেও নেই।
এই সূচকগুলোর কোনোটাই চটজলদি বদলানো শক্ত, সমাজকল্যাণ প্রকল্পের কিছু সদর্থক প্রভাব থাকে না তা নয়, তবুও অন্যান্য বাধাবিপত্তি অথবা বিপর্যয় থাকে। কোভিড-১৯-এর পরবর্তী স্কুলছুটের ব্যাপক হার বা লার্নিং গ্যাপ এক্ষেত্রে কতটা দরকারি সেটাও ভাববার বিষয়। এই যেমন নিচের ছবিতে সবকটি রাজ্যের জন্য এই দুটো একসাথে প্লট করেছি। এর থেকে একটা হাল্কা ট্রেণ্ড দেখা যাচ্ছে, যে চাইল্ড ম্যারেজ আর স্কুলছুটের হারের আন্তঃসম্পর্ক আছে (r = 0.51), একটা বাড়লে আরেকটাও বাড়বে। লক্ষণীয়, যে এই প্লটেও পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরা, লাইনের বেশ কিছুটা উপরে, দুটো রাজ্যই কিছুটা 'আউটলায়ার'। এ-ও ভাববার ব্যাপার। 
চাইল্ড ম্যারেজের নেপথ্যে অজস্র আর্থসামাজিক কারণ থাকে, যেমন দারিদ্র্য, পণপ্রথার চাপ, এবং কিশোরী মেয়েদের জন্য নিরাপদ বিকল্পের অভাবের ধারণা। এমন পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে সুসংহত সামাজিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই বদলানো সম্ভব এমন আশা করা অন্যায় নয়, যদি না সেইসব প্রকল্প বহু প্রান্তিক মানুষকে নথিপত্রের অভাব বা অন্য কারণে বাদ দিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের ৯৫ শতাংশ মহিলার কাছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও, এক-তৃতীয়াংশের বেশি ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়, এই দ্বন্দ্বই হয়তো আগামী দিনের অন্যতম দরকারি প্রশ্ন হবে।
তবে, সমস্যার শেষ এইখানেই নয়। বোঝার উপর শাকের আঁটির মত এই অসম্পূর্ণ পরিবর্তনের উপর চেপে বসেছে এন-সি-ডি অর্থাৎ নন-কমিউনিকেবল ডিজ়িজ়ের সমস্যা, যা ইতিমধ্যে বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে হাই ব্লাড শুগারের হার বেশি (রাজ্যের ২২.৭ শতাংশ বনাম দেশের ১৭.৮ শতাংশ), হাইপারটেনশনও বেশি (২৪.৩ শতাংশ বনাম ১৯.৪ শতাংশ), এবং ওভারওয়েট বা ওবেসিটির হারও জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি (৩৪.৬ শতাংশ বনাম ৩০.৭ শতাংশ)। এই শতাংশগুলো দুশ্চিন্তার ব্যাপার, কারণ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে, ওজন বাড়লে, ডায়াবিটিস, কিডনির অসুখ, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ় ইত্যাদিও অবশ্যম্ভাবী।
একই সঙ্গে, ঠিক এর উল্টো দিকে, স্বাভাবিকের নিচে BMI-যুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের অংশ ১৫.১ শতাংশ, জাতীয় ১৯.৭ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম। এই দুটো তথ্য একসাথে রাখলে যে প্যাটার্নটি স্পষ্ট হয়, তাকে পাবলিক হেলথ গবেষকরা বলেন অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা: এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা অপুষ্টি (ম্যালনিউট্রিশন) থেকে অতিপুষ্টির (ওভারনিউট্রিশন) দিকে সরে যাচ্ছে, প্রথম সমস্যাটি সম্পূর্ণভাবে সমাধান না করেই। এই ‘সরে যাওয়ার হার’ দেখলে পশ্চিমবঙ্গ দেশের সার্বিক গড়ের চেয়ে এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, নগরায়ন, এবং রাজ্যের ভাত-নির্ভর খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক অর্থনীতি (মিড-ডে-মিল থেকে মা ক্যান্টিন)। মিড-ডে মিলের নতুন মেন্যু নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই অপুষ্টি-অতিপুষ্টির ব্যাপারটাও হয়তো আলাদা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এনসিডির এই প্রবণতার পাশাপাশি আরও একটি সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ১১.২ শতাংশ, যা জাতীয় ৮.৪ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। এর পাশাপাশি পুরুষদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি, ৪৬.২ শতাংশ, জাতীয় ৩৬.৩ শতাংশের তুলনায়। এনসিডির রিস্ক বা ঝুঁকি যেখানে নারী ও পুরুষ দুই ক্ষেত্রেই বাড়ছে, তামাক ব্যবহারের ধরণ কিছুটা বুঝতে সাহায্য করে সেই ঝুঁকি কার কতটা।
লেখার শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই পর্বের তথ্যের কিছু বড় ফাঁক রয়ে গেছে, যার অন্যতম অ্যানিমিয়ার অনুপস্থিতি। প্রজননক্ষম বয়সের মহিলাদের মধ্যে অ্যানিমিয়া ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী পাবলিক হেলথ সমস্যাগুলোর একটি। রক্তাল্পতা মাতৃস্বাস্থ্যের ফলাফল খারাপ করে, শিশু অপুষ্টিকে আরও গুরুতর করে তোলে, এবং খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পের গঠন দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়। এই ফাঁক পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গের পুষ্টিগত স্বাস্থ্যের যে কোনো মূল্যায়ন, কিছুটা হলেও অসম্পূর্ণ থেকে যাবেই।
আগেই লিখেছি, এই সার্ভের মোট সূচকের সংখ্যা ১০১। আমরা তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি দেখেছি, মূলত নারী ও শিশুকল্যাণ বিষয়ক। আরও অনেক বাদ রয়ে গেলো, সেইগুলোও আশা করি পরের কোনো কিস্তিতে দেখা হবে, বা অন্য কেউ দেখবেন। এন-এফ-এইচ-এসের এই কটি সূচকের তথ্য-উপাত্ত থেকে যা দাঁড়ায় তা হ’ল এই যে, পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো সত্যিই শক্তিশালী (ছিল), কিন্তু বহু প্রজন্মের সঞ্চিত সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক সমস্যা তার উপর চেপে বসে আছে, যা শুধু পরিকাঠামো দিয়ে সমাধান করা কঠিন। স্বাস্থ্যবিমা বা ব্যাংকিংয়ের দিক থেকে রাজ্যের ফল প্রশংসার্হ। অন্যদিকে, চাইল্ড ম্যারেজের ব্যবধান কমানো যায় নি, এবং পুষ্টির পরিবর্তন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হাজির হয়েছে ব্লাড-শুগার, ওবেসিটির মত এনসিডির বোঝা। এই দিকগুলিতে বিগত দশকে রাজ্যের রিপোর্ট কার্ড ততোটা ভালো নয়। নিঃসন্দেহে এই কাজগুলি অনেক বেশি কঠিন, এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বিনিয়োগের এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার ফলে কাঁটা হয়তো সামান্য সরতে পারে। আশা করা যায়, এখন থেকে যত্নশীল হলে, আগামী এক দশকে বোঝা যাবে রাজ্য এই ফাঁকগুলো আসলেই কমাচ্ছে, নাকি অবনতিশীল জাতীয় পরিস্থিতির বিপরীতে কেবল স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে, না আরও অন্ধকারের দিকে যাত্রাই তার ভবিতব্য?
| সূচক | NFHS-4 (২০১৫-১৬) পশ্চিমবঙ্গ | NFHS-4 (২০১৫-১৬) ভারত | NFHS-5 পশ্চিমবঙ্গ | NFHS-5 ভারত | NFHS-6 পশ্চিমবঙ্গ | NFHS-6 ভারত |
|---|---|---|---|---|---|---|
| চাইল্ড ম্যারেজ | ৪১.৬% | ২৬.৮% | ৪১.৬%¹ | ২৩.৩% | ৩৬.৪% | ২০.১% |
| টিনেজ প্রেগন্যান্সি | ১৮.৩% | ৭.৯% | ১৬.৪% | ৬.৮% | ১৬.৬% | ৬.৭% |
অরিন | ২৭ জুন ২০২৬ ১১:২২741441
অরিন | ২৯ জুন ২০২৬ ০১:৩৪741514
Swati Ray | ৩০ জুন ২০২৬ ২০:১৩741549