

অলংকরণ: রমিত
আজ পরী বিয়েবাড়ি সেরে ফিরে এল। তার একটা ডানার অনেকটা ভেঙে গেছে।
- ওমা বেশ তো হাসতে হাসতে টেম্পোয় উঠলি। রঙটঙ চড়িয়ে দিব্যি চেহারাটা খোলতাই হয়েছে। তা ডানা ভাঙলি কি করে! সরস্বতী শুধোলো।
- আর বোলো না সরোদিদি। সেই কোন ধ্যাধধেরে গোবিন্দপুর যেতে যেতে আমার হাড়মাস আলাদা হয়ে যাবার যোগাড়। তারপর রঙ চড়িয়ে বিয়েবাড়ির গেটে আমাকে তো দাঁড় করালো।ভালোই লাগছিল। গাঁগঞ্জের মেয়েরাও আজকাল বিউটি পার্লার থেকে সেজে আসে গো। সেসব দেখছিলাম। তবে তোমার আর লক্ষ্মীদিদির রূপের কাছে সেসব কিছুই নয়।
- তুই বা কম কিসের রে!
- আরে ছাড়ো। বরযাত্রীদের দলে দুটো বিচ্ছু বদমাশ ছেলে আমাকে গোল গোল করে ঘুরে খেলতে গিয়ে ধাক্কা মারল। আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম। বাঁদিকের ডানাটা ভেঙেই গেল! আর আমার কোথাও জায়গা হবে না গো!
- মনখারাপ করিস না পরী। পুজো আসছে। তারপরে শীতের মেলা। কোথাও নাই কোথাও ঠিক তোর জায়গা হবে। চাচা এসে আবার তোর ডানা জুড়ে দেবে।দেখিস, তুই আবার আগের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি।
পরী ভাবল, আর আকাশ! স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আকাশ আমার থেকে কতদূরে চলে গেছে! বাচ্ছারা শুধু কার্টুনে আমার আকাশে ওড়ার গল্প দেখে। আচ্ছা, ইস্কুল থেকে মায়ের হাত ধরে ফেরার সময় যে বাচ্ছাটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, সে কি আমার গল্প শুনতে ভালোবাসে। তার স্বপ্নে কি আমার আসাযাওয়া আছে! যদি থাকে, তবে আমার ভাঙা ডানাতেও এখনো একটুকরো আকাশ রয়ে গেছে!
- কি এত ভাবছিস রে! তুই তো তবু বিয়েবাড়ি যাস, মেলায় ঘুরিস। আমাকে গেলবার যেখানে নিয়ে গেছিল তারা কালো টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছে। আমাকে রাখল তারা বাগানে সাজিয়ে। ঠাকুরঘরে রূপোর লক্ষ্মীর পুজো হ'ল। ছ্যা ছ্যা!আমার মনে হল যেন আমাকে দিয়ে তারা অলক্ষ্মী বিদেয় করছে!
মাঝে মাঝে আমার কেমন যেন মনে হয় কোন লক্ষ্মীটা আসলে আমি! ঠাকুরঘরের আসনে যে আদরে বসে থাকে সে না এই যে ফুটপাতে রোদে পুড়ে জলে ভিজে বিবর্ণ হওয়া আমি!
- কেউ না, কেউ না। আমরা সবই মায়ার পুত্তলিকা! এ জগৎ মিথ্যা। নাম, রূপ, গৌরব—সবই ক্ষণস্থায়ী। ব্রহ্মই একমাত্র চিরন্তন সত্য।"
অর্ধনিমীলিত নয়নে ধ্যানমুদ্রায় বসা জটাজুটধারী ঋষিটি বলে উঠলেন। চাচা তাঁকে আদিগুরু শংকরাচার্যের আদলেই বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুজোমন্ডপে কখনো তিনি ব্যাসদেব কখনো বা বাল্মীকি !
- এ জগৎ মিথ্যা একথা আপনি বলতে পারেন না মান্যবর। ব্রহ্ম চিরন্তন সত্য, কিন্তু এই জগৎই মানুষের কর্মভূমি। জগৎকে মিথ্যা বললে মানুষের প্রতি দায়িত্বও মিথ্যা হয়ে যায়।
গম্ভীর কণ্ঠে একথা যিনি বললেন, তাঁর নাম রাজা রামমোহন রায়।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে স্থবির হয়ে বসে আছেন। গত বসন্তে তাঁর পাগড়ির ভাঁজে কাক তার গেরস্থালি পেতে ছিল। কাক উড়ে গেছে, ছানারাও ডানা মেলেছে, কিন্তু বাসাটা এখনও রয়ে গেছে। চার বছর আগে এঁনার আড়াইশোতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাতারাতি চাচা এই মূর্তিটি গড়েছিল। তখন কত মণ্ডপ, কত অনুষ্ঠানে ঘুরেছেন তিনি!
সরস্বতী এতক্ষণ দুটি ফুটফুটে, চঞ্চল এঞ্জেলকে ধরে বসিয়ে পড়াচ্ছিলেন। কিন্তু কান ছিল তাঁর এই আলোচনায়। তিনি ঝাঁঝিয়ে বলে উঠলেন,
- এত যে ব্রহ্ম নিয়ে তর্কবিতর্ক, ব্রহ্মবাদিনীকে ক'জন মনে রাখে! আমাকে দেড় দিনের জন্যে এখান থেকে তুলে নিয়ে যায় তারপর শ্বেতশুভ্রা সরস্বতীকে ভুলে গিয়ে যা খুশি আমার গায়ে রঙ চড়ায়। পড়াশোনার কথা আর না বলাই ভালো!
- আমার ধবধবে সাদা গাউনকে তো লাল রঙের শাড়ি করে দিয়েছিল! কোলের ভেড়াটিকে কালো রঙের ছাগল ! বড়দিনের জন্যে চাচা আমায় তৈরি করেছিল। দোলের মেলায় আমি গ্রামের মেয়ে হয়ে গেলাম! কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল সেন্ট অ্যাগনেস।
- আমাদের গায়ে যে রং, তা খসে যায়; যে ডানা, তা ভেঙে যায়; যে গৌরব, তাও একদিন ধুলো হয়। তবু মানুষ আমাদের কিনে নিয়ে যায়, কারণ তারা আসলে নিজেদেরই স্বপ্ন কিনতে চায়। স্বপ্ন ফুরোলেই আমরা আবার ফুটপাতে ফিরে আসি।
মাথায় পাগড়ি, কাঁধে চাদর প্রাজ্ঞ মানুষ রামমোহন ধীরে ধীরে একথা বলে সেদিন সবাইকে শান্ত করলেন। একটু দূরে বসে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেব স্মিত হাসলেন। কিচ্ছুটি বললেন না। ফুটপাতের সংসার থেকে ছোটো বড় দুই গণেশ সেজেগুজে সবাইকে টা টা জানিয়ে আগেই টেম্পো চড়ে বিদায় নিয়েছে। সামনেই গণেশ পুজো।
সেদিন রাতে অসময়ে প্রচন্ড ঝড় এলো। ঝড় থামলে প্রবল বৃষ্টি। গোটা শহর যেন ধুয়ে যাচ্ছে। বুড়ো সুলেমান চাচা কোনো রকমে একটা ত্রিপল এনে ফুটপাতের মহাপুরুষদের মাথায় একটা আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করল।
পরদিন সকালের রোদে বিবর্ণ মূর্তিগুলোর শ্রীহীনতা আরও স্পষ্ট। চাচা দেখল তারা একে অন্যের গায়ে হেলে পড়েছে। কারোর মাথা গেছে তো,কারোর হাত। "যাক গে, ধীরে ধীরে আবার সবাইকে আগের মত করে দেব। পুজো আসছে, তারপরে শীত। সবাই আবার রঙচঙে সুন্দর হয়ে উঠবে তোমরা। চিন্তা কোরো না।" মূর্তিগুলোর গায়ে পরম আদরে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল সুলেমান চাচা।
একসপ্তাহ পরেই এ শহরে দিল্লি থেকে মন্ত্রী আসবেন। শহর ঢেলে সাজানো হচ্ছে। দেওয়ালে দেওয়ালে রঙের পোঁচ। ভেঙে যাওয়া আলোর বাতিদানে নতুন বাল্ব। চেয়ারম্যানের বড় ব্যস্ততা এখন। কোথাও যেন এতটুকু নোংরা না পড়ে থাকে!
- বড় রাস্তার ফুটপাতে এই বিচ্ছিরি, রঙচটা মূর্তিগুলোকে বিদেয় করতো।
- স্যর, এখানে এগুলো অনেকদিন ধরে আছে। সুলেমান বলে একজন বুড়ো মানুষ এগুলো তৈরি করে এখানেই রেখে দেয়। তারপর দরকার মত পুজোমন্ডপ বা মেলায় এগুলো সাজানো হয়।
- না,না বড় রাস্তার ফুটপাত দখল করে এসব চলবে না। বুড়োকে কিছু পয়সা দিয়ে এসব সরা এখান থেকে। ডিসগাস্টিং!
কোনো তালিকা তৈরি হল না, কোনো হিসেবও নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফুটপাতের এই বাসিন্দারা শুধু 'অপসারণযোগ্য বস্তু' হয়ে গেল।
ট্রাকে চড়ে সেন্ট অ্যাগনেস, বুদ্ধদেব,পরী, রামমোহন, দেবশিশু, কোথায় চলল সুলেমান তার ঠিকানা জানে না। নিজের হাতে গড়া এই মূর্তিগুলো যেন তার আত্মার আত্মীয়। ফুটপাতের পথচারীরা, দোকানদারেরা দেখছে বুড়ো মানুষটা সেখানে উবু হয়ে বসে আছে। তার মাথায় হাত। কাঁধের গামছা দিয়ে সুলেমান চোখের জল মোছে আর বিড়বিড় করে বলে আমার ডেরার পাশে যদি একফালি জমি থাকত তাহলে তোমাদের সব্বাইকে রেখে দিতাম!
ট্রাকে উঠে পরী দুটি বাচ্চা এঞ্জেলকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, ভাঙা ডানাতেও তো একটুকরো আকাশ ছিল। এবার সেই আকাশটাই যে কোথায় হারিয়ে যেতে চলেছে!
ঠিক তখনই শহরজুড়ে নেমে এল অঝোর ভাদুরে বৃষ্টি। সেই ধারাজলে ঝাপসা হয়ে গেল রাস্তা, ট্রাক, সুলেমানের দৃষ্টি আর পরীর একটুকরো আকাশ।