এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব

  • মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব

    মৌ চক্রবর্তী
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৫৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • অলংকরণ: রমিত



    ৪। । আ ইস্তোরিয়া দোজ ভিদ্রাসেইরুশ


    ঘরে ঢুকেই রূপসীর চোখ দুটো কৌতূহলে বড় হয়ে গেল। ঘরটা খুব বড় নয়। বেশি ছোট। ছোট নয় ঘিঞ্জি অগোছালো, নোংরা। কত যে পুরোনো তার সীমা নেই। হবে ইংরেজি আমলের। এই দেওয়াল ঘেঁষেই একটা পুরোনো কাঠের টেবিল। যার রঙ কাঠের কিনা পায়া না দেখলে বোঝা দায়। বিচ্ছিরি প্লাস্টিক ছড়ানো। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কত রকমের ছোট ছোট জিনিস। রঙ নেই এদের। খুব কাছে থেকে না দেখলে বোঝা যাবে না, এগুলো কি। এরাও যেন নিজেদের আলাদা করে দেখাতে চায় না। কাচের টুকরোর রঙ মেঘের চেয়েও কালো। কোনো একটা ধাতব ফ্রেম তামা হবে রূপসী বুঝতে চাইছে। আর অনেক সরু স্ক্রু, বিচিত্র মাপের স্ক্রু-ড্রাইভার। এক কোণে একটা পুরোনো ঘষার চাকা। টেবিলের গায়ে কোথাও ধুলোর মতো গুঁড়ো পড়ে। একপাশে জলের সঙ্গে মিশে কাচের মিহি গুঁড়ো জমে কাদা হয়ে আছে। রূপসী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সব দেখল।

    এটা দোকান নয়। আবার একেবারে কারখানাও নয়। যেন একটা কাজের ঘর। বহু বছর ধরে মানুষ এখানে বসে কাজ করেছে, আর কাজ করতে করতে জিনিসগুলো নিজেরাই নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।

    রূপসী বৃদ্ধের ছোট ছেলেটার পাশে গিয়ে বসল।

    —তুমি আমাকে একটা একটা করে বলবে? কোনটা কী?

    ছেলেটা হেসে বলল, —সব জানতে চান? এসব তো পুরোনো দিনের কথা। এখন তো মানুষ মূলত প্লাস্টিকের চশমা পরে। আর সেসব আসে অন্য দেশ থেকে, চীন থেকে সস্তায় জলের দরে ইমপোর্ট হয়।

    কথাটা বলেই ছেলেটা টেবিলের ওপর জমে থাকা একটা প্লাস্টিকের সস্তা ফ্রেমে আঙুল দিয়ে ঠুকঠুক করল।

    বৃদ্ধ একটা ঠান্ডা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —হ্যাঁ মা, এই চায়না বাজার আমাদের চশমাপট্টির পেট চালানোটাই বন্ধ করে দেওয়ার জোগাড় করেছে। আগে যে ফ্রেম আর লেন্স বানাতে কারিগরদের দিনের পর দিন ঘাম ঝরাতে হতো, এখন সেগুলো রেডিমেড হাজার হাজার পিস কন্টেনারে ভেসে চলে আসছে। ফিনিশিং চকচকে, দেখতে বাহারি, আর দাম এত কম যে দেশি চশমার দোকানদাররা আর আমাদের দিয়ে কাজ করায় না। সরাসরি ওই ইমপোর্ট করা মাল তুলে দেয় খদ্দেরের হাতে।

    ছেলেটা লেন্স ঘষার জল গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, আজকাল আমাদের কাজগুলো তাই অনেক কমে গেছে বোন। একটা সময় এই গলির মোড় থেকে রাধাবাজারের মোড় পর্যন্ত ভোর থেকেই কাচ কাটার খসখস আর গ্রাইন্ডিং হুইলের ঝনঝন শব্দ পাওয়া যেত। শত শত কারিগরের রুটিরুজি চলত এতে। আর এখন? দোকানে কেউ হঠাৎ পুরোনো ফ্রেম ফিটিং করাতে এলে বা জরুরি কোনও সারাইয়ের কাজ থাকলে তবেই আমাদের ডাক পড়ে। সস্তা ওয়ান-টাইম ইউজ চশমার দাপটে এই শিল্পটার আর কদরই রইল না।

    কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটার হাত দুটো যেন আরও কিছুটা শ্লথ হয়ে এল।

    রূপসী শুনছিল। সে তখন টেবিলের ওপর থেকে একটা সরু ধাতব পেন তুলে নিল। — এইটা কী?

    বৃদ্ধ দরজার কাছে দাঁড়িয়েই বললেন, —ওটা ডায়মন্ড পেন।

    রূপসী পেনটার মাথার দিকে তাকাল।

    —ডায়মন্ড আছে?

    —হিরের ডগা আছে। খুব ছোট। চোখে ঠিক করে না দেখলে বোঝাই যাবে না।

    ছেলেটা একটা কাচের টুকরো হাতে নিল। পেনটার মাথা দিয়ে কাচের গায়ে সরু একটা দাগ টেনে দিল। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো।

    রূপসী ঝুঁকে এল।

    —এইটুকু দিয়ে কাচ কাটা যায়?
    —দাগ কাটা যায়। তারপর ওই দাগ ধরে কাচটা আলাদা করতে হয়। আসল কাজটা তখনই।
    —হাত দিয়ে?
    —হাত দিয়েই। তবে হাতের জোর নয়, মাপটা ঠিক থাকা চাই। একটু এদিক-ওদিক হলেই লেন্স নষ্ট।

    রূপসী কাচটার দিকে তাকিয়ে রইল।
    —মানে, কাচের সঙ্গে হাতেরও একটা বোঝাপড়া লাগে?

    ছেলেটা এবার হেসে বলল, —অনেক দিনের অভ্যাস হলে লাগে।

    বৃদ্ধ বললেন, —আগে তো যন্ত্রও এত ছিল না মা। হাত দিয়েই সব বুঝতে হতো। কোথায় চাপ দিতে হবে, কোথায় থামতে হবে—হাত নিজেই শিখে যেত।

    ছেলেটা একটা বাঁকানো জিনিস তুলে নিল। —এটা গ্রোজিয়ার প্লায়ার্স। কাচে দাগ কাটার পর বাড়তি অংশটা একটু একটু করে ভাঙতে কাজে লাগে।

    সে একটা পুরোনো লেন্স প্লায়ার্সে ধরল। খুব সামান্য চাপ দিল। টক। একটা ছোট্ট কাচের টুকরো উঠে এল।

    রূপসী চমকে তাকাল।
    —এত সহজ?
    —দেখতে সহজ। বেশি চাপ দিলে কিন্তু ফাটল চলে যাবে। তখন পুরো লেন্সটাই নষ্ট।

    রূপসী এবার টেবিলের ওপর রাখা স্ক্রু-ড্রাইভারগুলোর দিকে হাত বাড়াল।
    —এত ছোট ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার কেন?
    —চশমার ফ্রেমের স্ক্রুগুলোও তো ছোট। সে একটা তুলে দেখাল।
    —সব স্ক্রু এক মাপের নয়। তাই ড্রাইভারও আলাদা। আর এইটা— সে আর-একটা সরু প্লায়ার্স তুলে নিল।
    —নোজ-প্যাডের জন্য। নাকের ওপর যে ছোট প্যাডটা থাকে, সেটা ঠিক করে বসাতে হয়।

    রূপসী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাইরে থেকে একটা চশমাকে কত সহজ মনে হয়। একটা ফ্রেম। দুটো কাচ। দুটো ডাঁটি। কিন্তু এখানে এসে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটা ছোট অংশের জন্য আলাদা কাজ আছে। আলাদা হাত। আলাদা অভ্যাস।

    রূপসীর চোখ এবার ঘরের কোণের দিকে গেল। —ওটা কী? —গ্রাইন্ডিং হুইল।

    ছেলেটা উঠে গিয়ে চাকাটার পাশে দাঁড়াল। —কাচ কেটে নেওয়ার পর ধারটা ঠিক করতে হয়। মাপ অনুযায়ী ঘষে ঘষে আকার দিতে হয়। —জল দিয়ে? —জল না দিলে কাচ বেশি গরম হয়ে যায়। ধুলোও উড়বে। তাই জল দিয়ে ঘষি।

    রূপসী নিচু হয়ে দেখল। জলের সঙ্গে কাচের মিহি গুঁড়ো মিশে আছে। —এই গুঁড়োটা? —কাজের সময় বেরোয়।

    বৃদ্ধ এবার একটু হেসে বললেন, —এই গুঁড়ো আমাদের সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত যায়।

    রূপসী বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তিনি আর কিছু বললেন না।

    টেবিলের এক পাশে রাখা আর-একটা পুরোনো যন্ত্র দেখিয়ে রূপসী জিজ্ঞেস করল, —ওটা? —লেন্সের কার্ভ মাপার যন্ত্র। লেন্স শুধু গোল হলেই তো হয় না। চোখের পাওয়ার অনুযায়ী তার বাঁকটাও ঠিক থাকতে হবে।

    রূপসী মাথা নাড়ল। তারপর টেবিলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, —এই সব জিনিস তোমরা কোথা থেকে আনো?

    বৃদ্ধ বললেন, —ক্যানিং স্ট্রিট, রাধাবাজার, বড়বাজার—ওইসব বাজারে পাওয়া যায়। বড় ব্যবসায়ীরা বাইরে থেকে মাল আনায়। আমরা যেটুকু দরকার, সেটুকু নিই। —সব এখানেই তৈরি হয়? —না। এখন অনেক কিছুই বাইরে থেকে আসে। ফ্রেম আসে, লেন্স আসে। তৈরি জিনিসও আসে। আমাদের কাজটা অনেকটাই বদলে গেছে।

    রূপসী শুনছিল। —কীভাবে?

    বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বললেন, —আগে ফ্রেমের কাজও ছিল। এখন দোকান থেকে তৈরি ফ্রেম আসে, চায়না লেন্স আসে। আমরা শুধু তাদের দেওয়া মাপমতো কাটি, ঘষি আর বসাই। ভেঙে গেলে সারাই করি। আগে একটা জিনিস তৈরি করার মধ্যে যতগুলো কাজ ছিল, হাতের যে নৈপুণ্য ছিল—এখন তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

    ছেলেটা কথাটা ধরল। —আমাদের কাছে এখন যেটুকু কাজ আসে, তা আসে দোকান থেকে। দোকানে কেউ চশমা বানাতে দিল, ওরা ফ্রেম আর পাওয়ারের হিসেব পাঠিয়ে দেয়। আমরা এখানে লেন্স কেটে বসিয়ে দিই। কাজ শেষ হলে নিয়ে যায়। —সব দোকান থেকেই আসে? —বেশিরভাগ। কারও সঙ্গে বহুদিনের পরিচয় থাকে। কেউ আবার অন্যের মাধ্যমে কাজ দেয়। এই লাইনে সবাই সবাইকে চেনে।

    রূপসী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, —তোমাদের মাইনে?

    ছেলেটা হেসে ফেলল। —মাইনে নয়। —তাহলে? —কাজের টাকা। —মানে? —পিস রেট।

    রূপসী শব্দটা শুনে তাকিয়ে রইল।

    ছেলেটা বুঝিয়ে বলল, —যত কাজ, তত টাকা। একটা সাধারণ কাজের জন্য একরকম। কঠিন কাজ হলে বেশি।

    বৃদ্ধ বললেন, —সাধারণ কাজ হলে পনেরো, কুড়ি, তিরিশ টাকা। কাজ একটু কঠিন হলে বেশি। রিমলেস হলে, ড্রিল করতে হলে, গ্রুভ কাটতে হলে—পঞ্চাশ, ষাট, কখনও আশিও হয়।
    রূপসী অবাক হয়ে বলল, —একদিনে কত কাজ হয়? —দিন ভালো গেলে পনেরো-কুড়িটা। সব কাজ তো একরকম নয়। তিনশো-চারশো টাকা উঠতে পারে। কখনও পাঁচশোও। আবার কাজ কম থাকলে তার অর্ধেকও হয় না।

    রূপসী মনে মনে হিসেব করছিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, —আর দোকানে সেই চশমা কত দামে বিক্রি হয়?

    ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকাল। —সেটা তো দোকানের ব্যাপার।

    বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, —আমরা কাচটা হাতে নিয়ে বসে থাকি। দোকানে গেলে সেই কাচই চশমা হয়ে যায়।

    কথাটা খুব সহজ করে বললেন তিনি। কিন্তু রূপসী আর কিছু বলল না।

    সে এবার ধীরপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে গলিটার দিকে এগোতে লাগল। বৃদ্ধ আগের মতোই টেবিলের পাশে বসে রইলেন।

    শুধু এই একটা ঘর নয়, নিচু বারান্দাটা দু’পাশে আরও দুটো ছোট ছোট ঘরে গিয়ে মিশেছে। রূপসী পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

    সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা একটা খালি হলুদ বাল্বের আলোয় পাশাপাশি চার-পাঁচজন মানুষ বসে আছে। কারও কাঁধ টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, কারও হাত ঘুরছে ঘষার চাকায়, কেউ আবার চোখে কাচ ঠেকিয়ে সূক্ষ্ম কাজ করছে। দরজায় এসে দাঁড়ালেও কাচ ঘষার একটানা শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। কেউ মাথা তুলে রূপসীর দিকে তাকালও না। যেন মানুষ নয়, নিশ্চল মোমের কিছু মূর্তি, শুধু হাত দুটো নির্দিষ্ট ছন্দে চলে যাচ্ছে।

    বাইরে রোদ উঠল না বৃষ্টি নামল, দিন গড়িয়ে রাত এল—এই বন্ধ ঘরের ভেতর তার কোনো চিহ্ন নেই। এদের হিসাব কেবল চশমার পাওয়ার আর জমা হওয়া কাজের সংখ্যায়।

    রূপসী এক পা পিছিয়ে এসে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, —ওদের শরীর খারাপ হয় না? এত কাচের গুঁড়ো বাতাসে উড়ছে...

    বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —হয় না আবার? এই গুঁড়ো বুকে গিয়ে জমে। চল্লিশ পেরোলেই হাঁপানি হয়, পিঠ বেঁকে যায়। আর চোখের আলোও কমতে থাকে।

    —তাহলে ডাক্তার দেখায় না?

    ছেলেটা তিতা হেসে বলল, —একদিন কাজ বন্ধ রাখা মানে পিস-রেটের টাকাটা গায়েব। ওষুধ কিনব না সংসারের চাল-ডাল?

    বৃদ্ধ কাঠের গরাদের একফালি আলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, —শুধু শরীর নয় মা, সামাজিক জীবন বলেও কিছু থাকে না। আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া নেই, উৎসবে একটা ভালো জামা পরা নেই। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এই কারখানায় বসে কাজ করি। বউ-ছেলেমেয়ের সাথে খিটিমিটি লেগেই থাকে। আমরা যেন মোমের মতো পুতুল হয়ে কাজ করি, আর বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। লোকের চোখের আলোর জন্য কাজ করি, আর নিজেদের জীবনটাই অন্ধকারে থেকে গেল।

    রূপসী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। পিস-রেটের সামান্য কিছু টাকার বদলে কীভাবে এদের শরীর আর জীবন ক্ষয়ে যাচ্ছে, তা এই বদ্ধ বাতাসে স্পষ্ট।

    তার চোখ আবার ডায়মন্ড পেনটার দিকে চলে গেল। এত ছোট একটা জিনিস। তার মাথায় একটুকরো হিরে। সেই দিয়ে প্রথম দাগ কাটা হয়। তারপর প্লায়ার্স। তারপর ঘষার চাকা। তারপর মাপ। তারপর বসানো।

    শেষে একটা চশমা।

    দোকানের কাচের আলমারিতে রাখা হলে সেটাকে আর কেউ এইভাবে দেখে না। তখন সেটা একটা পণ্য। দাম লেখা থাকে। ক্রেতা দেখে, পছন্দ করে, কিনে নিয়ে চলে যায়।

    কিন্তু এই ছোট ঘরে বসে রূপসী এখন জানে, সেই চশমার ভিতরে আরও অনেক কিছু থাকে—মানুষের হাত, বহু বছরের অভ্যাস, পিস-রেটের হিসেব, আর ফুসফুসে জমে থাকা কাচের মিহি গুঁড়ো।

    বৃদ্ধ এবার ধীর গলায় বলে উঠলেন, —আমাদের সময়ে টাকার হিসাব অন্য ছিল মা। তখন লেন্স কাটার লোক দিনে আট আনা, বারো আনা পেত। খুব নামী ওস্তাদ হলে এক টাকা, এক টাকা চার আনাও পেত।

    রূপসী বৃদ্ধের দিকে তাকাল। —আট আনা? —হ্যাঁ। —এত কম!

    বৃদ্ধ হেসে ফেললেন। —কম তো ছিলই। কিন্তু তখনকার টাকা আর এখনকার টাকা এক নয়।

    রূপসী একটু চুপ করে থেকে বলল, —এখনও তো খুব বেশি নয়।

    বৃদ্ধ এবার হাসলেন না।

    ছেলেটার হাত তখনও চলছে। লেন্সটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। জল পড়ছে। পাথরের সঙ্গে কাচ ঘষা লাগার মিহি শব্দ উঠছে। রূপসী এতক্ষণে বুঝতে পারছিল, এই ঘরে শুধু চশমা তৈরি হয় না—এখানে একটা সময়কেও ঘষে ঘষে ছোট করা হয়েছে। একসময় যারা কাচ কাটত, ফ্রেম বানাত, হাতের কাজ দিয়ে একটা চশমাকে তৈরি করত, তাদের কাজ এখন ধীরে ধীরে বদলে গেছে। তৈরি জিনিস আসে বাইরে থেকে। এই ঘরের মানুষের হাতে থেকে যায় শেষটুকু কাজ—কাটা, ঘষা, বসানো, সারানো।

    রেলিংয়ে বৃষ্টির জলের ঝাপটা তখনও আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ বাইরে থেকে দুজন লোক একদম ভিজে চপচপ হয়ে ভেতরে ঢুকে এল।

    বৃদ্ধ তাঁদের দিকে তাকালেন। তাঁদের একজন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, —উফ, যে ঝড় হলো গো! কত গাছ পড়ে গেছে রাস্তায় আজকে। কী যে হচ্ছে কলকাতায়... মনে হচ্ছে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। ওদিকের দুটো দোকান তো পড়ে গেছে। গাছ চাপা পড়ে কত দোকান চলে গেল, দুজন মানুষ জখম!

    রূপসী আঁতকে উঠে বলল, —সে কী?

    রূপসীর কথার মাঝেই বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার কাঠের ফ্রেমে হেলান দিলেন। —তাহলে এই বাড়িটাও আর বাঁচবে না। এমনিতেই তো কলকাতা কর্পোরেশন থেকে ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। আজ আর রক্ষে নেই মনে হচ্ছে। কিন্তু উপরওয়ালারা যে কোনো কথাই বলছেন না? ওরা কি জানেন না বাড়িটার অবস্থা...

    লোকটা বলল, —আমাদের এখান থেকে সরে পড়তেই হবে। এরপর এই বাড়ি ভেঙে পড়ুক শীলেদের মাথায়!

    রূপসী সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া করে বলল, —শীল? কারা শীল?

    হঠাৎ এক প্রচণ্ড মড়মড় শব্দে পুরোনো বাড়িখানার ভিত্তিপ্রস্তর যেন কেঁপে উঠল। কারখানার লাগোয়া পুরোনো চুনকামের কার্নিশ ভেঙে উঠোনে আছড়ে পড়ার বিকট শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিকের মেইন সুইচে স্পার্ক হয়ে দপ করে নিভে গেল ঘরের একমাত্র হলুদ বাল্বটা।

    এক নিমেষে ঘোর অন্ধকার।

    ছেলেটা ড্রয়ারের ভেতরে দেশলাই আর আধপোড়া একটা মোমবাতি খুঁজতে খুঁজতে বলল, —আজকে আর বেরোনো যাবে না বোন। বাইরে রাস্তায় হাঁটুজল জমে গেছে, তার ওপর ছিঁড়ে পড়া কারেন্টের তারের ভয়। ঝড় একটু না থামলে এখান থেকে বেরোনো বিপদ।

    মোমবাতির শিখাটা জ্বলে উঠতেই পুরোনো সুড়ঙ্গমতো ঘরটায় এক অদ্ভুত ছায়ার নাচ শুরু হলো। মোমের সেই লালচে-হলুদ আলোয় কারিগরদের মুখগুলোকে আরও করুণ আর ভৌতিক লাগছিল। টেবিলের ওপর জমে থাকা কাচের মিহি গুঁড়োগুলো অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করে উঠল।

    রূপসী টেবিলের পাশেই কাঠের বেঞ্চিটায় গুটিয়ে বসল।

    দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ বাইরের উঠোনের আঁধারের দিকে চেয়ে হঠাৎ ঘরে বসে থাকা কারখানার ছোকরাটাকে ডেকে বললেন, —একবার সাবধানে দৌড়ে যা তো রে ! পাশের গলির মোড়ে শীলবাবুদের ওই পুরোনো বৈঠকখানার তলায় দেখে আয় তো। বুড়োবাবু একা মানুষ, ওদিকে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ল নাকি! ছাদের কার্নিশটা আগের ঝড়ে পড়েছিল, আজকের ঝড়ে বাঁচল কি না খবর নিয়ে আয়।

    ছোকরাটা একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের শিট মাথায় চাপিয়ে ঝড়ের অন্ধকারে বেরিয়ে গেল।

    রূপসী নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, —শীলবাবু?

    হ্যাঁ, এই জীর্ণ বাড়িটা যে ওদেরই।

    দাদু, তুমি ঠিক জানো?

    হ্যাঁ, ব্বাবা হ্যাঁ। আমি জানি মানে। আমরা যে এখানেই টিকে রয়েছি। ওদের শয়তানির গরাদে। ওঁরা কারা দাদু?

    বৃদ্ধ নিজের মোছা চশমাটা আর-একবার গামছায় ঘষে চোখে পরে ধীরগলায় বলতে লাগলেন, —এ তল্লাটে শীলদের যারা পরে এল, এই জমিদারির অংশ পেল।

    উত্তেজনায় লাফিয়ে দাদুর হাত ধরে ফেলল রূপসী। বলল, দাদু, আমি যে কিভাবে এটাই খুঁজে চলেছিলাম। উফ, সকাল থেকে আমি চক্কর দিচ্ছি। দাদু আমি তমায় যে কি বলে ধন্যবাদ জানাব।

    দাদু কিছুই বুঝতে পারছেন না। উনি অন্ধকারের মধ্যেই জিজ্ঞেস করলেন, মানে তুমি বুঝিয়ে বলো দিদিমণি।

    ো বলল, আমি এই বাড়ির হদিশ করতে করতেই কলকাতা ছেনে ফেলেছি। সকাল থেকে ঘুরছি। আর তাই তো এপার ওপার করছিলাম। সারা সকাল ঘুরেছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি। আর গেলাস গেলাস চা খেয়েছি। লোকের ধাক্কা খেয়েছি। পচা গন্ধে বমি করেছি। সরি সরি দাদু, আমি এটা বলতে চাইনি।

    বুঝেছি। বৃদ্ধ ধীর গলায় বললেন। কিন্তু, দিদিভাই কেন খুঁজছ? তুমি কি ওদের কেউ? নাকি শীলবাড়ির কেউ?

    বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করতে রূপসী বলল, দাদু আমি রিসার্চ করি। লিখি। পুরোনো কলকাতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার শীলবাড়ির তথ্য চাই। বাড়ির ঠিকানা আছে। কিন্তু বাড়িটাই নেই। মানে পাচ্ছি না।

    দাদু বললেন, কলকাতা আমি খুব একটা চিনি না। কিন্তু আমি একটু চিনি। বলো কোন বাড়ি?

    ২২/১ কানাইলাল শীল স্ট্রিট। শীল ভবন।

    বৃদ্ধ বললেন, এটা শীলদের বাড়ি ছিল বলেই জানি। কিন্তু বাড়ির নাম্বার তো …।

    ওটা একটু এদিক -ওদিক হতে পারে। আমার কাছে এই শীলদের খানিকটা ইতিহাস আছে।

    বৃদ্ধ বললেন, তাই, ভালো ভালো। শীলদের সম্পত্তি তো হাতছাড়া হয়ে গেছে। তাই না?

    না, দাদু না। আমি ওদের নিয়ে রিসার্চ করছি। ওদের হাতছাড়া সম্পত্তির ভেতরে অনেক গল্প আছে।

    আমাকে বলবে দিদিভাই। আমার গল্প শুনতে খুব ভাল লাগে। বিশেষত রাজাদের। বৃদ্ধ হাসছিলেন। রূপসী বুঝতে পারছে এই অন্ধকারেও।

    ও বলল, "ওরা রাজা ছিল না। কিন্তু হ্যাঁ, জমিদার বলা যায়। কারণ ওদের অনেক জমি ছিল। আসলে ওরা ছিল বণিক।"

    কথাটা বলেই রূপসী একটু থামল। বাইরে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ চমকাল। জানলার কাঠের খড়খড়িগুলো এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল। কানাই শীল স্ট্রিটের ১৮৯০ সালে নির্মিত এই পুরনো তিনতলা দালানটি যেন সেই বাজের শব্দে কেঁপে উঠল। ১৮৯০-এর দশকে তৈরি উত্তর ও মধ্য কলকাতার অন্যান্য ঔপনিবেশিক বহুতল দালানের মতোই এতে রয়েছে ইট-চুন-সুরকির পুরনো গাঁথুনি আর কাঠের খড়খড়ি। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাইরের প্লাস্টার খসে পড়েছে, জীর্ণতা ফুটে উঠেছে সর্বত্র। ঠিক যেমন কলকাতার পৌরসংস্থার বিপজ্জনক বা 'কনডেমড' ইমারতগুলোর অবস্থা হয়।

    বৃদ্ধ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, "বণিক?"

    "হ্যাঁ," রূপসী মাথা নাড়ল। "বণিক মানে তো ব্যবসায়ী। কিন্তু শীলদের ব্যবসা সাধারণ ছিল না। ওদের ব্যবসার ধরন ছিল বিশাল। সময়টা ধরুন ওই গডফাদারের আমল। সেই সময়ে শীলরা কলকাতায় ব্যবসা ফাঁদে। ক্যানিং স্ট্রিট, রাধাবাজার, বড়বাজার—চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ওদের কারবার।"

    বৃদ্ধ ও ওঁর ছেলে দুজনেই চুপ করে শুনছিলেন।

    রূপসী বলতে শুরু করল, "তবে কলকাতা বলতে তখন কিন্তু আজকের এই বিরাট শহর ছিল না। সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলিকাতা—এই তিনটি গ্রাম মিলে যে শহরের সূচনা, উনিশ শতকের শুরুতে তার ভৌগোলিক বিস্তার ছিল মূলত লালদিঘি, ধর্মতলা, বড়বাজার, চিত্পুর আর গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলটুকু ঘিরেই। কিন্তু ওইটুকু শহরের বুকেই তখন বিপুল অর্থের কারবার হতো। আর মতিলাল শীলই একা পুরো কলকাতায় ব্যবসা করতেন, তা নয়। উনিশ শতকের সেই উত্তাল ও রূপান্তরের কলকাতার অর্থনীতি সামলাচ্ছিলেন আরও অনেক দিগ্গজ বানিয়ান ও মার্চেন্ট। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ—প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর! কার ঠাকুর অ্যাণ্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করে দ্বারকানাথ তখন কয়লাখনি, চা-বাগান, শিপিং কোম্পানি থেকে শুরু করে ইউরোপীয়দের সাথে সমান তালে যৌথ মূলধনী কারবারে শহরের একচ্ছত্র সম্রাট। অন্যদিকে রামদুলাল দে (সরকার), রুস্তমজি কাওয়াসজি, আনন্দলাল শীল কিংবা বসাক পরিবারের ধনী বণিকরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছায়ায় তৎকালীন কলকাতার বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাঙালি ও ভারতীয় সুবর্ণবণিকদের আধিপত্য তখন তুঙ্গে।"

    ছেলেটা বিস্ময় নিয়ে শুধাল, "সবই ওই শীল আর তৎকালীন বানিয়ানদের?"

    "হ্যাঁ," রূপসী বলল। "আর সেই আমলের সুবর্ণবণিকদের মধ্যে শীলরা ছিল সেরা। এই শীল পরিবারের মূল আদিপুরুষ যিনি—যাঁর হাত ধরে এত বড় সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল—তাঁর নাম বাবু মতিলাল শীল। ১৭৯২ সালে ওঁর জন্ম। উনিশ শতকের শুরুতে মতিলাল শীল যখন বাণিজ্যে নামেন, তখন মতিলাল শীলদের মতো বানিয়ানদের দাপটে কাঁপত শহর। মতিলাল শীল প্রথমে ছিলেন এক বিলেতি সওদাগরি কুঠির সাধারণ কর্মচারী। কিন্তু ওঁর বুদ্ধি আর ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ছিল মারাত্মক।"

    বাইরে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ চমকাল। স্যাঁতসেঁতে নীলচে দেওয়ালটার ওপর আলো এসে পড়ল। রূপসী দেওয়ালের সেই আলো-ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

    ও ধীরস্বরে বলতে শুরু করল, "ওই স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালটার দিকে তাকালে যেন সেই আমলটা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। উনিশ শতকের একজন সুবর্ণবণিক, গোঁফে তা দিয়ে চাবুক-আঁকা ভিক্টোরিয়া জুড়ি গাড়িতে চেপে কাদা ছিটানো কলকাতার রাস্তায় চলেছেন। কখনো বা পালকি থেকে নেমে ঢুকছেন সওদাগরি কুঠিতে। চলার পথে চোখ মেপে নিচ্ছেন কলকাতার কোথায় কত জমি কেনা যায়। একে একে শত শত বিঘা জমির দলিল সই হচ্ছে, আর শহরে শীলদের সম্পত্তি বেড়েই চলেছে।"

    বৃদ্ধ ও ওঁর ছেলে নিস্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন।

    রূপসী আবার বলল, "মতিলাল শীল ব্যবসা শুরু করেছিলেন সুতো, কাঠ, আর চিনির কেনাবেচা দিয়ে। কিন্তু আসল ভাগ্যের চাকা ঘুরল যখন উনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর নীলচাষে নামলেন। উনি হয়ে উঠলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের বড় 'বানিয়ান'। ফরাসি, ইংরেজ আর বেলজিয়ামের বড় বড় সওদাগরি কুঠির সঙ্গে উনি চুক্তি করতেন। হুগলি নদীতে যে নীলকরদের বিশাল বিশাল জাহাজ এসে ভিড়ত, তার সমস্ত মাল ওঠানো-নামানোর রফা সামলাতেন তিনি। তা ছাড়া ছিল মহাজনি ব্যবসা—যেখানে শহরের নামজাদা বাবু থেকে শুরু করে কেল্লার ইংরেজ সাহেবরাও টাকা ধার নিতে আসত।"

    "টাকা ধার দিয়ে কী করতেন?" কারখানার ছেলেটি শুধাল।

    "জমি বন্ধক রাখতেন," রূপসী উত্তর দিল। "আর সেই সূত্রে উনি তৈরি করলেন বিশাল এক আবাসন ও জমিজমার সাম্রাজ্য। ক্যানিং স্ট্রিট, বড়বাজার, বউবাজার, কলুটোলা—যেদিকে তাকাবেন, শীলদের শত শত বিঘা জমি আর প্রাসাদোপম সব ভবন। ১৮৪৮-৪৯ সাল নাগাদ মতিলাল শীল তৈরি করালেন ওঁর ঐতিহাসিক বাসভবন—কলুটোলার ৬০ নম্বর শশীল ভবন। বিশালাকার ঠাকুরদালান, নাটমন্দির, ইটের উঁচুপাচীর আর সিংহদুয়ার! উনি প্রচুর দানধ্যানও করতেন। দাতব্য চিকিৎসালয়, হিন্দু কলেজের অংশ হিসেবে অর্থসাহায্য এবং পরবর্তীতে শীলস ফ্রি কলেজ তৈরি—সব মিলে শহরের সেরা সমাজপতি হয়ে উঠলেন তিনি।"

    বাইরে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ চমকাল।

    রূপসী বলতে লাগল, "১৮৫৪ সালের ২০ মে মতিলাল শীল মারা গেলেন। ওঁর স্ত্রী ছিলেন আনন্দময়ী দাসী। মৃত্যুর পর মতিলাল শীলের অঢেল সম্পত্তি ওঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে সমানভাগে পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে গেল। সেই পাঁচ ভাই হলেন—হীরালাল শীল, চুনিলাল শীল, পান্নালাল শীল, গোপাললাল শীল আর সবার ছোট কানাইলাল শীল।"

    "কানাইলাল শীল?" বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন, "যাঁরা নামে এই রাস্তা?"

    "একদম," রূপসী বলল। "কানাইলাল শীল ছিলেন মতিলাল শীলের কনিষ্ঠ পুত্র। ওঁর স্ত্রীর নাম ছিল যোগমায়া দাসী। কানাইলাল শীলও বাবার মতো ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। বাবার থেকে এক-পঞ্চমাংশ (১/৫ অংশ) সম্পত্তি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। সেই আমলের কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি প্রভাবশালী ও দানশীল বণিকদের সম্মানে রাস্তার নামকরণ করত, সেই সূত্রেই এই গলির নাম হয় 'কানাই শীল স্ট্রিট'। এই যে ২১/এ কানাই শীল স্ট্রিটের ১৮ ৯০ সালের জীর্ণ ইমারতটি দেখছেন, এটাও কিন্তু ওঁর সেই ঐতিহাসিক বসতি ও ব্যবসার কোনো কাছারি বা কোয়ার্টারেরই প্রাচীন অংশ।"

    "তাহলে ওনার ছেলেপুলেরা কী করল?"

    "সেখানেই তো কাহিনীর আসল প্যাঁচ!" রূপসী গলা নিচু করল। "কানাইলাল শীল মারা যান ১৮৮৪ সালে। মৃত্যুর সময় উনি রেখে যান ওঁর একমাত্র পুত্র গোপাললাল শীল এবং দুই বিবাহিত কন্যা—সুকুমারী দাসী ও হেমকুমারী দাসী। কানাইলাল মারা যাওয়ার পর ওঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলেন ওঁর একমাত্র ছেলে গোপাললাল শীল। কিন্তু গোপাললাল শীলও বেশিদিন বাঁচেননি। ২৫ মে ১৯০২ সালে উনি সন্তানহীন (নিঃসন্তান) অবস্থায় মারা যান। উনি কোনো উইল রেখে যাননি। ওঁর মৃত্যুর সাথেই শীল পরিবারের ওই মূল বংশের পুরুষ উত্তরাধিকারের ধারা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল!"

    বাইরে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ চমকাল।

    "গোপাললাল শীলের পর সম্পত্তি কোথায় গেল?" ছেলেটি আড়ষ্ট গলায় শুধাল।

    "গোপাললাল শীল রেখে গিয়েছিলেন ওঁর দুই বিধবা স্ত্রী—কুমুদিনী দাসী ও নয়নমঞ্জরী দাসী (যাঁদের মধ্যে নয়নমঞ্জরী দাসী মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন)।" রূপসী বলতে লাগল, "হিন্দু দায়ভাগ আইন অনুযায়ী স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার ও ভোগদখল চলে গেল এই দুই বিধবা স্ত্রীর হাতে। ১৯০২ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত দুই বিধবা সম্পত্তি সামলালেন। ১৯১৭ সালের ২১ নভেম্বর কুমুদিনী দাসী মারা গেলেন। নয়নমঞ্জরী জীবিত বিধবা হিসেবে রইলেন। কিন্তু কানাইলাল শীলের রক্তের তো কোনো সরাসরি পুরুষ নাতি বা ছেলে রইল না!"
    বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন, "তাহলে জমিজমা কি সরকারের হাতে চলে গেল?"

    "না," রূপসী বলল, "চলে গেল মেয়েদের সন্তানদের হাতে, অর্থাৎ কানাইলাল শীলের দৌহিত্রদের কাছে। কানাইলালের দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছিল শহরের নামজাদা পরিবারে। বড় মেয়ে সুকুমারী দাসীর বিয়ে হয়েছিল মল্লিক পরিবারের কানাইলাল বা হেমকুমার মল্লিকের (আইনি নথিতে কান্তামোহন মল্লিক) সঙ্গে। আর ছোট মেয়ে হেমকুমারী দাসীর বিয়ে হয়েছিল রজনীমোহন সেনের সঙ্গে। ১৯১৮ সালের ২৮ মার্চের এক আইনি সমঝোতা ডিক্রি এবং পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় বিধবার মৃত্যুর পর, কানাইলাল শীলের যাবতীয় বিশাল সম্পত্তি স্থানান্তরিত হয়ে গেল ওঁর ৫ জন নাতির কাছে! সুকুমারীর চার ছেলে—যোগেন্দ্র, কান্তমোহন, গিরিমোহন ও গৌরমোহন মল্লিক এবং পঞ্চানন মল্লিক। আর হেমকুমারীর একমাত্র ছেলে—রজনীমোহন সেনের পুত্র।"

    রূপসী কাঠ খোদাইয়ের মতো শক্ত হয়ে বসল।

    "রক্ত আর নাম রাতারাতি পাল্টে গেল। আদি পুরুষ শীল, সম্পত্তি শীলদের, কিন্তু আইনি মালিক হয়ে বসলেন মল্লিক পরিবারের এই নাতিরা! 'শীল এস্টেট' হয়ে গেল 'মল্লিকদের সম্পত্তি'। কিন্তু বাটোয়ারা আর পারিবারিক বিবাদ থামল না। এরপরেই শুরু হলো আদালতের দীর্ঘ ও জটিল লড়াই।"

    "কিসের লড়াই?"

    "পারিবারিক দেবতা শ্রী শ্রী শ্রীধর জিউ-কে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক মামলা!" রূপসী বলল। "কলুটোলার ৬০ নম্বর সেই বিশাল শীল ভবনে ১৮৪৮ সাল থেকে পারিবারিক ঠাকুরবাড়িতে শ্রীধর জিউ বিগ্রহের নিত্যপুজো ও সেবা হয়ে আসছিল। ১৯৪৫ সালে কানাইলাল শীলের ওই ৫ জন নাতি ঠিক করলেন, কলুটোলার প্রাসাদোপম বাড়িটা নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা (Partition) করে নেবেন এবং বিক্রি বা লিজ দেবেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্রই দেবোত্তর সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংকট তৈরি হলো। চুক্তি হওয়ার মাত্র তিন মাস পরেই সেবাইতদের মাধ্যমে স্বয়ং বিগ্রহ ও দেবতার পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হলো—'Sree Sree Sreedhar Jew vs Kanta Mohan Mullick And Ors.'"

    "আদালতে কী আইনি তর্ক হলো?"

    "দেবী-দেবতার পক্ষের প্রথিতযশা উকিলরা আদালতে তীব্র যুক্ত পেশ করে দাবি করলেন যে, ১৮৪৮ সাল থেকে বিগ্রহ ওই ঠাকুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত এবং ওঁর নামেই সম্পত্তি উৎসর্গীকৃত। সুতরাং পুরো ৬০ নম্বর কলুটোলা স্ট্রিটের বাড়িটি একটি নিছক 'দেবোত্তর সম্পত্তি' এবং আইনত একে কোনো শরিকি বাটোয়ারা বা খণ্ড-বিখণ্ড করা যাবে না। কিন্তু মল্লিক পরিবারের নাতিদের পক্ষের আইনজীবীরা পাল্টা দাবি উত্থাপন করে বললেন, মতিলাল শীল বা কানাইলাল শীল কেউই পুরো ৬০ কলুটোলা স্ট্রিটের বাড়িটি দেবতার নামে উৎসর্গ করে যাননি; এটি মূলত কানাইলাল শীলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল, যেখানে দেবসেবার বিধান থাকলেও এটি পুরোপুরি দেবোত্তর নয়। দীর্ঘ শুনানির পর, ১৯৪৫ সালের ১৯ জুলাই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জাস্টিস জেন্টল তাঁর ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করলেন যে, বাড়িটি সম্পূর্ণ দেবোত্তর সম্পত্তি নয়; এটি কানাইলাল শীলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। ফলে আইনত নাতিদের মধ্যে বাটোয়ারা বা বিভাগের অনুমতি বহাল রইল, শুধু রায়ে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হলো যে বাটোয়ারা হলেও দেবতার পুজো, সেবা ও নিত্য ভোগ যেন কোনো অবস্থাতেই বিঘ্নিত না হয়।"

    বাইরে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ চমকাল।

    "আদালতের ওই রায়ের পরেই ক্ষয়ের চূড়ান্ত পথ তৈরি হলো।" রূপসী গম্ভীর গলায় বলল, "আইনি অনুমতি পেতেই বিশালাকার বাড়িটি বিভিন্ন শরিকের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে কেটে বাটোয়ারা হয়ে গেল। কলুটোলার মূল অন্দরমহলে মল্লিক পরিবার থেকে গেলেন (যেখানে আজও কার্তিক চন্দ্র মল্লিকের বিধবা স্ত্রী তারা সুন্দর মল্লিক ও তাঁর বংশধরেরা বাস করছেন)। আর ক্যানিং স্ট্রিট, বউবাজার ও কানাই শীল স্ট্রিটের দিকে থাকা শীল এস্টেটের পুরোনো কাছারিবাড়ি, খাজাঞ্চিখানা আর শরিকি ঘরগুলো লিজ দেওয়া শুরু হলো পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে।"
    রূপসী চুপ।

    বৃদ্ধ বললেন, "তারপর শুরু হলো রূপান্তর। দেশভাগের পর আদি মালিকেরা সরে গেলেন। নিচতলায় পাগড়ি প্রথায় ঢুকে পড়ল লেন্স ও ফ্রেমের বড় বড় পাইকারি অপটিক্যাল ব্যবসায়ী। আর ওপরের যে বড় বড় অন্দরমহলে এককালে বানিয়ান মতিলাল শীল আর কানাইলাল শীলের খাজাঞ্চিরা বসে কোটি টাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব লিখত, ইউরোপীয় জাহাজের চুক্তিপত্র সই করত—সেই ঘরগুলোকে ছোট ছোট অংশে কেটে মেসবাড়ি আর চশমার লেন্স কাটার কারখানায় বদলে ফেলা হলো!"

    রূপসী, বৃদ্ধ ও তাঁর ছেলে তিনজনেই এক অদ্ভুত ইতিহাসের মধ্যে। বৃষ্টির শব্দ নেই। বাজ পড়ার শব্দের মুহুর্মুহু কেঁপে উঠছে বাড়িটা। বিদ্যুতের ঝলক ওদের মুখ ছুঁয়ে প্রাণপাখি যেন উড়িয়েই দেবে। এমন অবস্থায় বৃদ্ধের কাশঈর শব্দ যেন বুঝিয়ে দিল, এখন এই বাড়িতে কারা থাকেন। বৃদ্ধ বললেন, "আজ আমরা মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ থেকে এসে জড়ো হয়েছি এই ভাঙা জরাজীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে। সামান্য পিস-রেটে চশমার লেন্স ঘষছে কত চোখ।

    দাদু, রূপসী ডাকল। “ এর নাম কানাই শীল স্ট্রিট। শীলদের নাম মুছে এসেছে মল্লিকদের আইনি দখল। হাইকোর্টের বাটোয়ারা মামলা। আর শেষমেশ এই চশমাপট্টির মেসবাড়ি আর কারখানা। শত বছরের রাজত্ব, কোটি টাকার নীল আর জাহাজের ব্যবসা—সব ধুয়ে মুছে গিয়ে পড়ে রইল শুধু কিছু আইনি দলিল, আর হাতে থাকা এই চশমার কাচের গুঁড়ো!"
    আর শ্বাসকষ্টের রোগীরা। বৃদ্ধ বললেন।

    অন্ধকার যেন আলোর শিখা নিভিয়ে নেচে উঠবে। বা গলা রোধ করবে। থমথমে সেই মুহূর্তে একমাত্র দীর্ঘ নির্ভর যেন নিশ্বাস।

    বৃদ্ধ বললেন, কে জানে কেন এমন করে মানুষ। আমার গুড ফাদারের বাড়িটাও এভাবেই। মেরি পিসির মেয়েদের দোষ দিই না। তাঁদেরই সব। আমি বাইরের ছিলাম। তাড়িয়ে দিএয়ছে তাই। কিন্তু গুড ফাদারকে? কেন তাড়াল ওরা? কেন একটা অন্ধ মানুষকে চলে আসতে হল আমার সঙ্গে? অদ্ভুত নেশা এই সম্পত্তির।

    রূপসী বলল, হ্যাঁ, অনেক বাড়ি ঘুরে দেখছি তো। সব বাড়িতেই একটা নেশাখোরের গল্প আছে। যে, সম্পত্তি খেয়ে নিচ্ছে ক্রমাগত। কিন্তু দাদু, পরে দেখেছি, সে নিজেও বাঁচেনি।

    বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ। সেই দুই ভাগ্নেই ছিলেন বংশসূত্রে মল্লিক! শীলদের যে আসল প্রপার্টি। শত বিঘার জমি—সব ক্রমে ওই মল্লিক ভাগ্নেদের হাতেই চলে এল। তাঁরাই এস্টেট সামলাতে শুরু করলেন। জমি-বাড়ির ট্রাস্টি তৈরি হল।

    বৃদ্ধ বাইরে ঝোড়ো হাওয়ার দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন, —আর ওই ভাগ্নে মল্লিকদের জমানাতেই এই বিশাল বাড়ির ভাঙন শুরু হয় মা। নিজেদের শরিকি কোন্দল, পাইকারি বাজারের কদর বাড়া। এইসময়ের কিছু কথা আমি জানি দিদিমণি। সাহেবদের চলে যাওয়ার পর চল্লিশের দশকে কম ভাড়ায় ঘর দেওয়ার ধান্দা। শীলবাড়ির প্রকাণ্ড বৈঠকখানা আর আস্তাবলগুলো ছোট ছোট খোপে ভাগ হয়ে গেল। মল্লিকবাবুরা নিচতলার হাঁসফাঁস করা ঘরগুলো একে একে কম ভাড়ায় চশমার কারিগর, লেন্স ফিটার আর পালিশওয়ালাদের হাতে তুলে দিলেন। আমাদের হাতে।

    রূপসী বলল, হ্যাঁ। সবটা নয়।

    বৃদ্ধ দরজার একপাশে এসে চেপে বসলেন। —ওই জন্যই তো বুড়ো মল্লিকবাবু আজও ধসে পড়া বারান্দায় বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। শীলদের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি মল্লিকদের হাতে এসেও রক্ষা পেল না। আইনি প্যাঁচ আর কর্পোরেশনের নোটিশে পুরো মল্লিক এস্টেটটাই আজ জরাজীর্ণ কঙ্কাল। আজও আটকে থেকে গেছে এই অন্ধ ঘরের বিষাক্ত লাল গুঁড়ো, মোমের মতো নিঃশব্দ কিছু মানুষ, আর কয়েকটা সামান্য পিস-রেটের কড়াক্রান্তি।

    কিছু ভাঙার বিকট শব্দ হল।

    রূপসী অন্ধকার ঘরটার দেওয়াল ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

    বাইরের ঝোড়ো হাওয়া যেন সেই নোনাধরা ইটের খাঁজে খাঁজে জমে থাকা বহু দশকের দীর্ঘশ্বাসগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল শহরের বুকে।

    রূপসী জানে, কাল সকালে হয়তো বৃষ্টি থামবে, রোদ উঠবে, দোকানে দোকানে চশমার কাচের আলমারিগুলো আবার পণ্য আর দামের স্টিকারে সেজে উঠবে। কিন্তু এই অন্ধকার ঘরের গভীরে ক্ষয়ে যাওয়া জীবনগুলোর গল্প কোনো কাচের ফ্রেমে বাঁধানো থাকবে না।

    সেই ক্ষয়ের ইতিহাস বুকপকেটে নিয়ে, ঝড়ের গর্জনের মাঝেই রূপসী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

    এই শীল পরিবারের ইতিহাসের সন্ধান করতেই বেরিয়েছিল রূপসী। ঠিকানা—২২/১, কানাইলাল শীল স্ট্রিট না না লেন, কলকাতা-১২।

    হঠাৎই আর-একটা বিকট শব্দে রূপসীর হুঁশ ফিরল। রূপসী তখন সেই অন্ধকার বিপজ্জনক বাড়িটার মধ্যে দাঁড়িয়ে। বাইরে ক্রমাগত বাজ পড়ছে। পুরোনো বারান্দার লোহার রেলিং কেঁপে উঠছে। বাড়ির একটা অংশ হঠাৎ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তেই ভিতরের লোকেরা আর ঝুঁকি নিল না। কারখানারই এক তরুণ ছেলে রূপসীকে একপ্রকার জোর করেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনল।

    ঝড়জলের রাতে হুড়মুড় করে রাস্তায় নেমে এসেও রূপসীর মনটা আটকে রইল ওই ভাঙাচোরা ঘরগুলোতে।

    রূপসী বুকের ধড়ফড়ানি এখনও কমেনি। ও যে কীভাবে বেঁচে ফিরল। ওকে দেখে গলির দোকানিরা সাদা আলো জ্বেলে ধরল। রূপসীর পাশে অনেকেই দাঁড়িয়ে। বুঝতে চাইছিল, ও ঠিক আছে কিনা। আর এই গলির মাথা থেকে ঢেকে যাওয়া অন্ধকারে বাড়িটার অস্তিত্ব শূন্য বলেই মনে হচ্ছে।

    ওদের নাম? ওদের ফোন নম্বর? ওদের কিছুই যে নেওয়া হলো না। ওদের নিয়ে লিখতে হবে। আর তার জন্য চোখের জলের ইতিহাস, চশমাপট্টির কথা। সম্বিত ফিরল রূপসীর।
    ওই যে ভিতরের মানুষগুলো—ওদের কী হবে? এই প্রবল দুর্যোগে অতগুলো মানুষ, অতগুলো অসহায় জীবন কী করবে?

    আকুল রূপসী। গলির মোড় থেকে আবার উল্টো ঘুরে ভেতরে ছুটতে গেল। তখনই স্থানীয় দোকানের লোক তাকে আটকে দিল।

    —ভেতরে যাবেন না, প্লিজ!

    রূপসী আকুল হয়ে বলল, —কিন্তু ওরা যে ভেতরে আটকে!

    দোকানের লোকটি গম্ভীর মুখে বললেন, — এটা বহু পুরোনো বাড়ি। ওপাশের অংশ ভেঙে পড়ছে এই কিছুক্ষণ আগে। এটা বিপজ্জনক বাড়ি। সেটা ওখানে থাকা লোকগুলোও খুব ভালো করেই জানে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৫৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন।