

অলংকরণ: রমিত
এ জনপদে আজ জিমূতবাহনের পূজা। আশ্বিনের কৃষ্ণ অষ্টমীর এই দিনটি জিতাষ্টমী। মেঘের দেবতা? নাকি দানবীর রাজা? কে এই জীমূতবাহন, তাই নিয়ে নানা গল্প। সহজিয়া কৌম ভাবনায় বুঝি মেঘের দেবতাকেই আগে আসন দেওয়া হয়, উর্বরতার আদিম শর্তে। মেঘরাজকে আমরাও আগে রাখি না হয় আজ? তবে তাঁকে 'দেবরাজ’ বা 'ইন্দ্র’ বলে ডাকা না ডাকায় তেমন কিছু যায় আসেনা বুঝি এ উৎসবে। ‘ইন্দ্র’ দেবতাদের একটা সরকারী উঁচু পদ, যার উচ্চাকাঙ্খী দাবীদার বহু। মেঘরাজ হাঁটেন আমাদের বাঁচা মরার সাথে সাথে "ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে"!
সন্তানহীন রাজা শালিবানের দুঃখী রানী স্বপন পেলেন। হাঁসের পিঠে সওয়ার দেবতা এসে বললেন জীমূতবাহনের পুজো করলে ছেলেপুলে হবে। সেইমত পুজো করে তাঁরা জনক জননী হলেন একটি ছেলে আর একটি মেয়ের। ছেলের নাম দিলেন জিমূতবাহন আর মেয়ের নাম সুশীলা। তারপর গল্পের সুতো চলতে থাকে আরও পথ --- শালিবানের বৌমা রাজকন্যেটি মসকরা করে শাউড়ির সাথে ব্রতটি নিয়ে, তাই বুঝি ছেলেপুলে সব মরে যায় তার। পরে সে শাউড়িকে মেনে ব্রত করে। আর তার ছেলেপুলে মরেনা। শালিবানের দানবীর সুশীল ছেলেকেই আবার কেউ কেউ মেঘের দেবতার সাথে এক করে দেখতে ভালোবাসে বুঝি। আবার এ পূজা মা ষষ্ঠীর ও। কুড়মালি ভাষায় জিতিআ -মানে তো মা জননী! আর্য অনার্য এক হয়ে গেছে এ রক্ত মৃত্তিকায়।
পরদিন, অর্থাৎ কৃষ্ণ নবমী থেকেই শুরু হবে মায়ের বোধন। এ প্রাচীন জনপদে হাজার বছর ধরে এটাই রীত। মা মৃন্ময়ী এখানে পূজা পান পনেরো দিন ধরে। তারপর দুর্গাষ্টমীর সন্ধী পুজোর কামানের তোপে সারা শহর কেঁপে উঠবে গুমগুম করে। ঢাকের বোলে, কাঁসর ঘণ্টার শব্দে,ধূপ ধুনা গুগগুলের ধোঁয়ায় মায়ের মুখটি আবছা হয়ে আসবে। চিৎকার উঠবে ভক্ত মানুষের নাভিমূল থেকে: মা মা! নবমীর রাতে চোখে জল আসবে, মায়ের চোখও ছলছল। দশমীর ঘট বিসর্জনের পালকির দুপাশে তরোয়াল ধরে এগোবে কিশোর, শোভাযাত্রার মাঝখানটিতে। মায়ের মূর্তি সেদিন বিসর্জন হয়না। আর মা মৃন্ময়ীতো সদাই অধিষ্ঠিত তাঁর রাজাসনে। এ শহর লাল, এ শহর জঙ্গুলে, এখানে ভূমি রুক্ষ, অসমান।
কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে আজ আলো এসে পড়েছে চিলুবিলু ঘাস গজানো এক চিলতে উঠানে। গুঁড়ো গুঁড়ো সোনা ভাসতে থাকে সেই আলোর চওড়া রেখায়। আসলে ওরা জলের গুঁড়ো। তেমন জোর আর তাদের এখন নেই যে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। শেষ বেলায় যেটুকু পারে হেথায় হোথায় হঠাৎ ঢেলে দিয়ে যায়। কয়দিন আগেই জন্মাষ্টমী পার হয়েছে, তখনও মেঘের কি ডাক, জলের কি দাপ ! শনশন হাওয়া ছুটেছে সারা রাত। শঙ্খ উলুতে কেস্ট ঠাকুর জন্ম নিলো ঘরে। তালের বড়া, লুচির গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। তার ঘরে ওসব পাট চুকেছে। গাছের কাঁঠাল গাছে পেকেছে। লোক ডেকে বিলিয়েছে। সবাই নিতে চায়নি।
এখন এই ঝুরো জলের মধ্যে রোদের ওম মাথায় নিয়ে সে উবু হয়ে বসে পোষা গাপ্পি মাছগুলোকে খাবার দিচ্ছে। মাছগুলো কিলবিল করতে করতে মুখ বাড়িয়ে আসছে আর ডুব দিচ্ছে গামলাটার গভীরে। মাছ খাইয়ে সে এসে দাঁড়ায় টগর ঝোপের ধারে। কালচে সবুজ ঘন পাতার কার্পেটে রাশি রাশি বরফ সাদা ফুল। আহা! পাশে সেই নীল ফড়িং। আবার সেই মেঘের ছায়ায় শ্যাওলা কালো পাঁচিলের পটে, কচি কলাপাতা রঙ এর কচি পুঁই পাতার ধারটি আটকে ঝুলছে সে, ঠিক যেমন সেই আশ্চর্য ক্যামেরায় ধরা আছে। সাদামাঠা কম দামের ক্যামেরা। কিন্তু যার চোখ দিয়ে সে দেখতো সেতো অপার্থিবকে ধরে আনতো পার্থিবের ঘরে! ধরা আছে জলের মাঝে শালুক ফুলটি,উড়ন্ত বকগুলি, বাঁধের ধারে বাতাসে বেঁকে যাওয়া কাশের ফুল, বিকনার হাটে শীতের পড়ন্ত রোদমাখা সারি সারি ডোকরা পুতুল। কেনার সাধ্য নাই। সাধ্য নাই বলে ইচ্ছাও জাগেনি। বিত্তহীনের সন্তানরা ইচ্ছাকে বশ করতে জানে সেই বালক বেলা থেকেই।
হাতের বাইরে যা, হাতের নাগালে বুঝি তার চেয়েও ঢের বেশি জিনিস! তাই আনন্দের ঘরে বসত করা তার মত হালকা আর কে ছিল? তার চেয়ে ধনী? মাটির দোচালা ঘরে খুশি উপচে পড়ত তাই নতুন নতুন সৃষ্টিতে। জল রংএ, ফুলে, পাতায়, নাম না জানা কীটপতঙ্গ পাখপাখালীতে। সেই কবে যেন এক প্যাঁচার ছানা, চোখ ফোটেনি, সেও এলো, রইলো কিছুদিন। মুরগির মাংস এলে তার থেকে আবার দুটি টুকরো তুলে রাখতে হত। কুচি কুচি করে সে ছানার খাবার জোগানো। সে ছানা একটু বড় হলো, চোখ ফুটলো। উড়িয়ে দিলে তাকে। গা শির শির প্রাণীগুলোতেও কি মায়া! কালো কুচকুচে ট্যারানটুলা মাঝে মধ্যে এদিকেও মেলে। গায়ে লোম ভর্তি, গা কেমন করে! তাকে কৌটোতে ভরলো অতি যত্নে, জঙ্গলে ছেড়ে এলে। ভয়ে মরে যে মা, তার কোনো হুঁশ নেই। কোথাকার কোন ভাঙ্গা প্রাসাদের শেষে কোন সে জঙ্গল, কী সে গাছ, পাতায় রঙ্গোলি পোকা, পুরোনো ঘাটের ফাটলে কারা থাকে, ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দেওয়া পাখি! সেই বুঝি পুরোটা জানত। এই পুরোনো শহরের প্রতিটি কোনা, লাল ধুলোর প্রতিটা কণা বুঝি অপেক্ষা করত তার জন্য। সে আসবে, গল্প করবে,শুনবে তাদের কথাগুলি, যা কেউ তেমন আজ শুনতে পায়না, চায়ও না বুঝি।
তার আঁকা ছবির পাখি, গাছপালা, ভেঙে পড়া পুরোনো প্রসাদ, মন্দির, ক্যামেরায় ধরা দেওয়া নীল নবঘন আষাঢ় গগন, ভাদ্রের আকাশে রংএর খেলা... দূরের মানুষকে ডেকে আনে এ শহরে। সে তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কত না জায়গায়। আদর পায়,স্নেহ পায়। আরও কত জায়গায় সঙ্গী হয় তাদের —নীল সাগর, বরফ ঢাকা পর্বত দেখার সুযোগ মেলে তার। দূর বিদেশী, প্রবাসী স্বদেশী তাকে নেমন্তন্ন করে যায় বিদেশ দেখার। ধরা গতের বাঁধা পথে তাকে দেখতে না পেয়ে, ভিনদেশী ঝকঝকে মানুষজনের পাশে তাকে দেখে পড়শিদের মাথায় ব্যথা করে। তারা কামকাজের কথা, রোজগারের কথা পাড়ে চিন্তিত মুখে, তাদের চেনা চৌহদ্দির মধ্যে। এমনি করেই দিন যায়। মানে যেত।
ফি শীতে এখনও সরকারি মেলা বসে এ শহরে, তার ইতিহাসকে সামনে ধরে। কত মানুষ, কত আলো, কত শব্দ, হুল্লোড়, বাজি, জলসা ঘোষণা --- কিন্তু ইতিহাস?-- সে ঢাকা পড়ে যায় অন্ধকারে। রাজবাড়ীর পেছনে হাওয়া মহলের দিক থেকে শিরশিরে বাতাস ছাড়ে। হয়তো সেই ভাঙাচোরা জানালা, ঝুল বারান্দা তার কথা মনে করে!
সে শীত ঘুরে আসতে তো এখনও কিছুটা দেরি আছে। এখন বাতাসে এলোমেলো ঋতু সংকট। এক ঝলক বর্ষা বাতাস তো আরেক ঝলক শুকনো। আজ ঘরে ঘরে রাতের প্রতি প্রহরে জিমূতবাহনের পূজা। উঠোনের মাঝে ছোট্ট পুকুর খুঁড়ে, কলা,হলুদ,বেলের শিকড়শুদ্ধু চারা পুঁতে সন্তানের জন্য কামনা করবে আজ সধবারা। কুমারী বা বিধবাদের ছেলে হতে নেই, সে খুব লজ্জার, তাই তারা এ ব্রত রাখেনা। এয়োরা ধন্যবাদ জানাবে মেঘের দেবতাকে। মা ষষ্ঠীর কাছে হাতে পো কাঁখে পোর আবদার রাখবে। মড়কের প্রতীক, কাচ্চা বাচ্চা তুলে নিয়ে যাওয়া শিয়াল আর শকুনের মাটির পুতুলকে পুজোর পর কাল জলে ফেলবে গেরস্থের দল। ডাকবে সুস্থ ঋতুর, ফসলের সুদিনকে। ছেলেপুলের দল গোটা গোটা বোঁটা সমেত শসা আর ছোলা-মটর চিবোতে চিবোতে জলে ডুব দেবে,ছড়া কাটবে : শিয়াল গেলো জলে, শুকনি গেল ডালে। তাদের দেখতে দেখতে মায়েরা গর্ব, আবার হালকা শঙ্কায় দুই হাত কপালে ঠেকাবে। তরুণী বউদের মধ্যে কেউ কোলেরটিকে নিয়ে দোলা দেবে, অনাগত সন্তানের আশায় কারোর চোখের পাতা বুঝি থির থির করে কাঁপবে। আবার কেউ বা বেশ কয়েক বছর ধরে বিফল মনোরথ,তাই বুঝি তাদের চোখের কোলে অনিশ্চয়তার ক্লান্তির ছায়া! লাল হলুদ ফুল ছাপ শাড়ি, শাঁখা -পলা সিঁদুরের প্রকট রূপের আড়ালে লুকোনো শ্রেণি ভাগ? অথচ এরাই আবার এক হয়ে যায় সালওয়ার, জিন্স টপের উচ্ছ্বাসে,স্বামীদের সাথে দলবেঁধে দিঘা,পুরী দার্জিলিঙ কিম্বা দাপুটে নারী দিবসের পালনে। কিন্তু সংসারের আদিম দাবী --আবাল্য লালিত সংস্কার বুঝি তাদের প্ররোচিত করে জঠরের উর্বরতা প্রমাণের মধ্য দিয়েই নিজ মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে! বা বাধ্য করে। মাতৃশক্তিকে কেবল হাল চাষের জমির সাথে গুলিয়ে ফেলার ভাবনাটি বাদ দিলে এ উৎসব বড় মধুর --- "ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে" - মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি ও সন্তানের সুস্থতা কামনার শর্তে।
বড় ষষ্ঠীর পূজায় রাঢ় বাংলার এই কোনে হিঙ্গুলের পুতুল দেয় মায়েরা। এক আঙুলে মাটির পুতুল, রক্ত রাঙ্গা ড্যাবরা চোখ। সস্তা। আগে নাকি পাতের এঁঠো ভাত দিলেই হাঘরে হাভাতে ছেলে পুলেরা এমনি দিয়ে যেত। এখন এ পুতুল তার এলেবেলে গণ্ডি ছাড়িয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে খবরে ওঠে, তার মূল্য পায়।
রক্ত তো জীবনের কথা বলে। নতুনের আসা, পুরোনোর বিনাশ। হিঙ্গুলের পুতুল কাঠের তাকে সাজানো আছে। কবে কোন জিতাষ্টমী ব্রতের আগের দিন বাজারে সঙ্গী হয়েছিল সে। পাঁচ বছরেরটি তখন। তার জন্যও বাড়তি গুটি কয়েক কিনতে হয়েছিল। যা পেতো বড় যত্নে রাখতো সাজিয়ে। তাকিয়ে আছে সেগুলো মায়ের দিকে এখন বোকার মত ড্যাব ড্যাব করে। সহ্য হয়না! ফেলতেও পারেনা। জিতাষ্টমীর আর ডাক নেই তার। তাই উর্বর আগামীর হলুদ, শাপলা, ছোলা, মটর, শসার সন্ধানে তাকে আর ব্যস্ত হতে হয়না। বাঁচা গেছে! সে শুকনো চোখে ঠোঁট ফাঁক করে — অনেকটা হাসির মত দেখায়। তার চুলগুলি, মুখের চামড়াও শুকনো। সে উবু হয়ে আবার গাপ্পি মাছের খেলা দেখতে থাকে।
মাড়োয়ারিদের পাঁপড় কারখানায় আজ ছুটি। পাঁপড় বেলার পঁচিশ টাকাও তাই আজ নেই। নেই তো নেই। আজ চাট্টি মুড়ি খাবে সে, ফুলুরি দিয়ে। রাঁধারাঁধির ঝামেলায় নেই। ঘরের মানুষ হোটেলের কাজ সেরে ঢুকবে অনেক রাতে। আবার বেলাবেলি বেরিয়েও আসতে পারে। তবে ঘরে সে ঢুকবে কিনা জানেনা। সাইকেলটি চেপে সে হয়তো তারই মত শুকনো চুল আর শুকনো চোখ নিয়ে ঘুরতে থাকবে পথে ঘাটে, কোনো একটা বাঁধের আঘাটায় বসে থাকতে পারে। ভয় হয়। এখনও তো তেনারা ঘুমোতে যাননি, বরং ঘুমের আগের ছটফটানি বেশি। ওমা বিষহরি, রক্ষা কর!
রক্ষা তো হয়নি আগে। কোন বিষ যে এসে ঢুকেছিল সেই ছিপছিপে দীঘল শরীরে সেই কি আর জানত? সারা পায়ে কী সব বেরোলো, নিশ্বাসে কষ্ট। কোন জঙ্গলে কোন রেণু, কোন পতঙ্গের নিশ্বাস লাগলো --- কত ঘুরলে কত ডাক্তার ---! কবে যে সে এত নিস্তেজ হল! ভুল হয়ে গেছিল কারো কোথাও সেই মহামারি কালে? সকালে সেদিন কি রোদের তেজ! বিকেলে জোর ঝড় উঠল। তারপর সব চুপচাপ। আগুন নিভে গিয়েছিল চৈত্র শেষের বৃষ্টিতে।
বেশ কয়েকদিন পর বাড়িতে পুলিশ এসেছিল। মাঝ রাতে পাড়ায় উপদ্রবের অভিযোগ করেছিল কারা যেন। দুপুর রাতে তার ঘর থেকে তীব্র হাহাকার ওঠে, লোকে সহ্য করতে পারেনা! সে বাখান পাড়ে পড়ার ডাক্তারকে। তারাই বা ছেড়ে দেবে কেন? ওদিকের অন্ধকার ঠেক থেকে কেউ গুটখার পিক ফেলে নেশা জড়ানো গলায় বলে:" শালী পাগলি!" এদের বাপ ঠাকুদ্দা, মা ঠাকুমার দল রোজকার কাজিয়া কোন্দল,বার ব্রতর সাথে সাথেই যে কোনও মৃত্যুতে একসাথে সবাই বুক চাপড়েছে একদা।
এখন যৌথ যাপনের দিনগুলি কেবল উৎসবকে ঘিরেই বুঝি জেগে ওঠে। তখন টাকা ওড়ে বাতাসে। উৎসব তো এখন আর সাধারণের সমবেত অপেক্ষার নিরীহ উদযাপন মাত্র নয়! তাকে ছাঁচে ফেলে সাজানো হয়। লতায় পাতায় তার অনেক কড়কড়ে রাজনৈতিক আত্মীয়। সাবেকি যৌথ যাপনের অনেক ইকড়ি মিকড়ি, না বলা কথা, বেহিসেবী মন, চোরা টান ফেকলু মেরে যায় তাই তীব্র আলো, শব্দ, টাকার ফরফরানি আর উত্তেজকে!
শোকের যৌথ যাপনে তেমন কোনও প্রাপ্তি নেই, শুধু তেতো দায়িত্ব। কার আর খামোকা ভালো লাগে, সারাদিনের শেষে একটু মৌতাতের সময়? তাই পুলিশ আসে। পুলিশ অবাক হয়, চলেও যায়। মা জ্বালা ধরা গলায় আবার বাখান পাড়ে। ওদিক থেকেও ভেসে আসে তেতো প্রত্যুত্তর।
কোনও কোনও মা ঘুমন্ত সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বুকের মাঝে অজানা পাপবোধে কেঁপে ওঠে। ছায়া কেঁপে কেঁপে ওঠে ল্যাম্প পোস্টের টিমটিমে হলুদ আলো এসে পড়া মন্দিরের ধাপে, পুরোনো নাট মন্দিরের শানের উপর। আর ওদের ঘরে আলকাতরা মারা কাঠের তাকের উপর থেকে হিঙ্গুলের লাল লাল পুতুলগুলি ড্যাবরা কাজল চোখে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে।
এখন মা চুপচাপ। আর সে চিৎকার করেনা। শুধু মাছেদের খাওয়ায়, গাছগুলিতে জল দেয় আর পাঁপড় বেলতে যায়। টুকটাক ফলস পিকোর কাজও শুরু করেছে। তবে লোকে তেমন দিতে চায়না। কবে যে ফেরত দেবে তার তো ঠিকঠিকানা নেই। বউ ঝিরা আড্ডার মাঝে থেমে যায় তাকে দেখলে। থেমে যাওয়া জীবনকে কেই বা আর সহ্য করতে পারে?
আজ বুঝি সেও আর সহ্য করতে পারেনা, তাই বেরিয়ে পরে রাস্তায়। চান হয়নি, চুলোও নেই আজ তার। হাঁটতে হাঁটতে বাঁধের এক নির্জন কোণে এসে বসে। খরার দেশের রাজা দেবতার নামে মানুষকে তৃষ্ণার জল দিতে চেয়েছিল বুঝি। তাই তিন দিকে লাল মাটির উঁচু পাড় দিয়ে ভূমিজল রক্ষা করা টলটলে দিঘিগুলি এখনো মানুষকে স্বস্তি দেয়। একদিকে তাদের খোলা, জল গড়িয়ে এসে জমা হয় সেদিক দিয়ে। শরতের শিরশিরে হাওয়ায় সাগরের ফেনা ওঠে যেন। ঝোপঝাড়ের আড়ালে সে বসে থাকে ভিজে মাটিতে জলের মাঝে পা দুটি মেলে দিয়ে। কারো দৃষ্টি এখন আর তাকে মাপতে পারবেনা, কি মজা! তার শুকনো চোখে ভেজা বাতাস লাগে। আহা, কবে জানি এ দীঘির জলে এক মা আর তার দুধের ছেলেটিকে শেকলে বেঁধে ডুবিয়ে মেরেছিল এ শহরের মানুষ! তাদের ঘরেও তো শিশু ছিলোগো মায়ের কোলে? একলা দুর্বলের অপরাধ সবসময় দলবদ্ধ মানুষের থেকে বেশি হয় বুঝি। তার উপর যদি ঈর্ষার কোনো উপাদান রয়ে যায় তার মধ্যে তো অপরাধ বেড়ে ওঠে চক্রবৃদ্ধি হারে! সে বাইজী মেয়ে সুন্দরী ছিল, ধম্ম ছিল তার ভিন্ন, রাজাকে সে নাকি বশ করেছিল! যাকগে, ছেলের সাথে সেও ডুবেছিল! বেঁচেছিল।
এখন বুড়ো আঙুল দিয়ে সে গর্ত করতে থাকে বালুময় ভিজে কাদায় আর ঢেউ এর ফ্যানা এসে ভরিয়ে দিতে থাকে সে গর্ত। আকাশে সাদা মেঘেরা খেলে বেড়ায়। চিল ওড়ে। সময় এখন থেমে আছে এই গড়িয়ে আসা দুপুরে। ঢাক ঢোল, শঙ্খ,উলু,গাড়ির হর্ন সব কিছু অনেক দূরে। এমন সময় ছপ ছপ শব্দে সে মুখ ফেরায়। দুই বুড়ী এসে জলে নামে চ্যালা কাঠ আর শালপাতার বোঝা নামিয়ে। হাঁটু পর্যন্ত তোলা রং চটা শতছিন্ন শাড়ি, শীর্ণ কাঁধের থেকে নেমে আসা ঢলঢলে জীর্ণ ব্লাউজ। মুখে চোখে মাথায় জল ছিটোতে থাকে তারা, দু আঁজলা খায় ও। সেও নামে এবার জলে। মুখে মাথায় ছেটাতে থাকে জল, আরও গভীরে যেতে থাকে, যাতে মাথা পর্যন্ত ডুবিয়ে ঠান্ডা করতে পারে যত তাপ। দুই বুড়ী হঠাৎ : হাই দ্যাখো কেনে! স্বর তুলে ছপছপিয়ে সাঁতার জলে ভেসে যায়, টেনে আনে তাকে ভিজে ডাঙায়। চুল নিংড়ে জল বার করে। ভেজা শাড়ি নিংড়োয়। আঁচল মেলে দেয় রোদে হাওয়ায়। শাড়ি গায়ে শুকায় সবার। কেউ কোনো কথা বলেনা আর। বসে থাকে। তার পর শুয়ে পড়ে দুই বুড়ী। গুন গুন করে গল্প শুরু করে সংসারের --- অভাবের, ঠকে যাওয়ার, লোকের নিষ্ঠুর ব্যবহারের; আফশোষ করে অসময়ে কারোর মরে যাওয়ার। সে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে। শোনেনা, নাকি শোনে? বসে বসে কাঁদতে থাকে তারপর। শুয়ে শুয়েই তার কোমরে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় এক বুড়ী। বেলা পড়ে আসে। তারা ওঠে। তাকেও ওঠায়। পড়ন্ত রোদে লাল ধুলোর উদাসী পথ পাড়ি দিয়ে তারা চলে যায় বাজারের দিকে, তাকে ঘরের পথে এগিয়ে দিয়ে যায় খানিকটা।
তার জিমূতবাহন কোথাও হারায়নি। হৃৎপিণ্ড খামচে আটকে আছে সে। মাঝে মাঝে সে বোঝা বড্ড ভারী হয়ে ওঠে। একটু জল ঝরাতে কাতর অনুনয় করে সে তখন তার মেঘরাজকে। আজ একটু হালকা তাই। তার জিমূতবাহনকে বুকে নিয়ে আজকে বাড়ি ফিরছে সন্তানবতী সে। পিদিম জ্বালবে উঠোনে আজ। তারপর হিঙ্গুল পুতুলগুলি নিয়ে,
আর আর যা যা আছে সম্ভার
সে হাসি খেলার---
চিত্রিত,অঙ্কিত, চারুকলা তার ---
আলোকচিত্রগুলি,
ফেলে দেওয়া জিনিসের অপূর্ব প্রয়োগ --মাছ, গাছ, ফুল, লতা পাখি ও পতঙ্গ,
সংগৃহীত বীজ ও পাথরে,
সঞ্চারিত বহু রূপে প্রাণ,
মায়ের শাড়িতে আঁকা পাঁচমুড়া হাতি আর ঘোড়া,
আশ্চর্য জলজ বা কাঁটা গাছগুলি --- অপার্থিব ফুল যার।
লেখাগুলি — শুককীট, মূককীট, ডানা মেলা প্রজাপতি, পরিযায়ী পাখি আর চিতল হরিণ,
আশ্চর্য জীবনের সন্ধানগুলি ---
অন্তর্জাল, ছোট ছোট ছাপা দুনিয়ায় ---
সেথা কত পরিচিত রসিক সুজন
আত্মার আত্মীয় ---
খুঁজবে তাদের।
শুরু হবে হৃদিমূলে সজল মেঘের পূজা
অন্যতর সৃষ্টিশীল রূপে।
প্রচলিত সত্য থেকে অন্যতর আরও সত্য পথে।