

অলংকরণ: রমিত
রোদজ্বলা গ্রীষ্মের দুপুরে কয়েক মিনিটের পথচলাকেও বুঝি ঘণ্টার মতো দীর্ঘ সময় মনে হয়। কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জলের বোতলটা স্পর্শ করতে গিয়েও থেমে যায়। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস নেয়। নাঃ, অতটা তেষ্টা পায়নি এখনো। এই একটা বোতলের জল দিয়ে কতক্ষণ চালাতে হবে, সে ব্যাপারে ঠিক নিশ্চিত নয়।
কতক্ষণ ধরে যেন সে এই পথে হেঁটে চলেছে? তা প্রায় ঘণ্টাখানেক তো হবেই। না কি আরো বেশী? কে জানে। ফেলে আসা রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখে একবার। বিশাল এক ফাঁকা মাঠের মাঝখান দিয়ে বিষণ্ণ একফালি মাটির পথ, নিত্যযাত্রীদের পায়ে পায়ে আঁকাবাঁকা সরু রেখার মত আকার নিয়েছে। ঘাড় যতটা ঘোরানো যায় ততটা ঘুরিয়েও পেছনে তাকিয়ে যে বাস-স্টপে সে বাস থেকে নেমেছিল, তা আর দেখা যাচ্ছিল না।
একটু দাঁড়িয়ে আবার হাঁটা শুরু করল বরুণ। হাতের মোবাইল ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল সিগন্যাল নেই। ফোনের ঘড়িতে যা সময় দেখাচ্ছে তাতে এখনো পর্যন্ত মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট ধরে সে হেঁটেছে। শহর হলে একে হয়ত দীর্ঘ পথ বলত লোকে, কিন্তু সে জানে এইসব গ্রামীণ এলাকার দুরত্বের হিসেবে এ কিছুই নয়।
বাসের কন্ডাক্টর বলেছিল, মাঠের মাঝবরাবর ধরে হাঁটতে শুরু করলে তার গন্তব্য গুরগালা গ্রামে পৌঁছাতে বিশ মিনিট মত সময় লাগবে। তাই শুনে মনে মনে অবশ্য সময়টা দ্বিগুণ হবে বলে ধরে নিয়েছিল। নানা কাজে তাকে এই ধরণের অজ গ্রামের দিকেই বেশী ঘোরাঘুরি করতে হয়, তাই জানা আছে যে গ্রামদেশে দূরত্ব এবং তা অতিক্রম করার সময়ের হিসেবটা কিছুটা আপেক্ষিক। মূলত সেটা স্থানীয়দের নিজস্ব উপলব্ধি, আন্দাজ এবং ব্যক্তি বিশেষের চলার গতির ওপর নির্ভর করে, আর তা সাধারণত গড় শহরবাসীর থেকে বেশী কম, যা খুশী হতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়েও কন্ডাক্টর প্রায় দার্শনিকের মতই নির্লিপ্ত সুরে জানিয়েছিল যে এসব এলাকায় বিএসএনএল ছাড়া আর কিছুই কাজ করে না।
আশেপাশে জনবসতির কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছেনা। গন্তব্য নিশ্চয়ই এখনও অনেকটাই দূরে। মেঠো জমির ওপরের ভাগটা শক্ত কঠিন হওয়ার দরুন তা থেকে মাটির চুল্লির মতো তাপ ছড়াচ্ছিল; তার পায়ের পাতলা ক্যানভাসের চটিজুতো সেই তাপের আঁচ মোকাবিলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার দরুন চলা ক্রমশ মুশকিল হয়ে পড়ছিল।
সাবধানে পা ফেলে সে চেষ্টা করল অত্যধিক গরম স্থানগুলো এড়িয়ে চলার, আর এতে তার হাঁটার গতি আরো আস্তে হয়ে এল। এ ধরনের পথে হাঁটার জন্য পায়ে স্নিকার্স বা কেডস পরলে বোধহয় সুবিধে হতো। কথাটা এখন মনে হল, অথচ আগে এ নিয়ে একদমই ভাবেনি। শহরে তার ঘরে এক জোড়া নতুন স্নিকার্স রাখা আছে, সেটা পরলে কি সুবিধে হত? কেন জানি ঢাকা জুতো পরে হাঁটতে সে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।
কিছুকাল আগে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামগুলোতে জলবায়ু বিষয়ক এক গবেষণার কাজে এক বিদেশিকে ও সাহায্য করেছিল। পঞ্চাশোর্ধ্ব সেই বিজ্ঞানী ছিল অত্যন্ত হাসিখুশি ও স্নেহশীল। এই দেশ সম্পর্কে তার জ্ঞানও ছিল অগাধ। এমন সব তথ্য ও পরিসংখ্যান তার কাছে ছিল, যা এ দেশের বাসিন্দা হয়েও বরুণের ধারণার একেবারে বাইরে ছিল। এমনকি খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের খবরেও এসব কখনো সে দেখেনি বা শোনেনি। সে যাত্রা ওনার সাথে নানা প্রান্তিক অঞ্চলে ঘুরতে হয়েছিল, বেশীরভাগ এলাকাতেই ছিল এরকম এবড়োখেবড়ো মাটির কাদার রাস্তা। সেইসব রাস্তায় বরুণকে সাধারণ চটি পরে হাঁটতে দেখে ওনার খারাপ লাগে।শহরে ফিরে তাকে এক জোড়া দামী বিদেশী ব্র্যান্ডের স্নিকার্স কিনে উপহার দিয়েছিলেন।
ওনার আন্তরিকতায় বরুণ এতটাই মুগ্ধ হয় যে উপহারটি সে কখনো হাতছাড়া করতে পারেনি।আবার অনভ্যাসের জন্যে ওরকম দামী জুতো ব্যবহার করতেও সাহস হয়নি, যদি কাজে বেরিয়ে হাঁটতে অসুবিধে হয়, মাঝরাস্তায় সমস্যায় পড়ে যেতে পারে।শহরে ওর নিজের এক চিলতে ছোট ঘরের তাকের ওপর মূল্যবান এক সম্পদের মত সেই উপহার সযত্নে তুলে রেখে দিয়েছে।
অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এলেও, দূর দূর পর্যন্ত সেরকম ছায়া হয় এমন ডালপাতাভরা গাছের কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় না। বরুণদের গ্রামের বাড়িতে, মাঠে, ক্ষেতের সীমানা বরাবর ঘন ছায়ার গাছপালা থাকে। সংখ্যায় বেশি না হলেও, ক্ষেতের চাষিদের গাছের ছায়ায় বসে দুপুরের খাবার খাওয়া বা ক্ষণিক বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে তা যথেষ্ট।
এই রকম একটা বিশাল মাঠের আশেপাশে সেরকম কিছু না দেখতে পেয়ে সে একটু অবাক হল।হতে পারে তাদের গ্রামে মূলত ধানের চাষ হয়, হয়ত ওদিককার ফসল ফলানোর জন্য ছায়ার প্রয়োজন হয়। এ দিককার ফসলের ধরন ও জীবনচক্র আলাদা, সেখানে ছায়ার প্রয়োজন নেই, আর সম্ভবত সেই কারণেই কাছেপিঠে সেরকম গাছ দেখা যাচ্ছেনা, যার ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেওয়া যায়।
প্রখর গরমের মধ্যে পথ হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বাড়ির কথা মনে করে প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল বরুণের। তাদের ছোটবেলায় দেখত গ্রামে বড় বড় গাছের ঘন ছায়া, চারিদিক জুড়ে পুকুর আর ডোবার ঘনঘটায়, গ্রীষ্মকালভর আবহাওয়া গরম হলেও সহনীয় থাকত। এখানকার মতো গরম কাল এলে শাকসবজি শুকিয়ে যেত না বা সবজি আনাজের এত আক্রা হত না।
তবে গ্রামের গ্রীষ্মকাল তার ছোটবেলার মত আজও একইরকম আছে কিনা কে জানে। আজ প্রায় দশ বছর হল সে বাড়িছাড়া, অনেকদিন হল গরমকালে বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনা, এইসময়টাই কাজের চাপ বেশী থাকে। আজকাল পৃথিবীর সব জায়গায় যেরকম জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, তার গ্রামের আবহাওয়াও সম্ভবত আর আগের মত নেই। কদিন আগেই ফোনে মা বলছিল পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব আর ঋতুভিত্তিক আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্যে চাষের নানা সমস্যার কথা।
বরুণদের গ্রামের বাড়ির প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে মৈলী নামের একটি ছোট নদী আছে। শৈশবে ও কৈশোরে, সে আর তার বন্ধুরা গ্রীষ্মের অনেক বিকেল সেই নদীতে সাঁতার কেটে, ছোটখাটো মাছ ধরে, মজায় কাটিয়েছে। মা বলছিল মৈলী নাকি আজকাল গরমকালে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়, অন্যসময়ও জল প্রায় না থাকার মত। টিউবয়েলের পানীয় জল আসার আগে, তাদের পাড়ার সবাই মৈলীর জল খেত, নদীর তলদেশের সাদা বালুচরের ওপরের স্ফটিকের মত স্বচ্ছ শীতল জল। শেষবার গিয়ে দেখেছিল, কাছের শহরগুলোর বালি ব্যবসায়ীরা নদীতটকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। জল কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেছে, নোংরা হলদেটে বালি!
জুলাই মাসের মাঝামাঝি হয়ে গেল, এই সব এলাকায় এখনো এক পশলাও বৃষ্টি হল না।গত বছর এবং তার আগের বছরগুলোর মত যথারীতি সরকার এবারেও আবার খরা ঘোষণা করেছে। তাদের সংস্থা সরকারী বরাত পেয়ে কর্মীদের কাজ দিয়েছে, বিভিন্ন এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গিয়ে গ্রামবাসীদের শেখাতে হবে, কীভাবে জলের ব্যবহার কমানো যায়, জল বাঁচানো যায়, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা যায় ইত্যাদি।
কাজের কথা মনে হতেই গতকাল সন্ধ্যার ওই ঘটনার কথা মনে পড়ল, আর এক ধরনের অস্বস্তি এসে ঘিরে ধরল বরুণকে। সেই অনুভূতিকে কাটিয়ে উঠতে সে এবার হাঁটার গতি বাড়ায়।
গতকাল সকালের ট্রেনে ওরা তিনজন জেলা শহরে এসে পৌঁছে একটা ছোট গেস্ট হাউসে ওঠে রাতে থাকার জন্যে। সারাদিন ধরে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে আলোচনা ও অনুমতিপত্র এইসব ব্যবস্থা করতে গিয়ে নানা ব্যস্ততায় সময় কাটিয়ে, প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যায় ওদের গেস্টহাউসে ফিরতে ফিরতে। আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের জল দপ্তর থেকে তাদের মত কিছু এনজিওদের সারা দেশে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, জল জীবন প্রকল্পের অন্তর্গত একটি প্রজেক্ট হিসেবে।স্থানীয় সরকারি সাহায্য ছাড়া এইসব অপরিচিত জায়গায় গিয়ে বাইরের লোকের কাজ করা সম্ভব নয়, তাই তাদের জানিয়ে অনুমতিপত্র নেওয়া জরুরী।
ফিরে স্নানটান করে ওরা গেস্ট হাউসের কাছেই একটা চায়ের দোকানে চা ও জলখাবার নিয়ে বসে আড্ডা মারছিল। সেখানে নিত্য খদ্দেরদের ভিড়ে শহরের একদল যুবকও বসেছিল, প্রায় ওদেরই বয়সী সব। আলাপ আলোচনা, হালকা গল্প কথাবার্তা শুরু হল, যেমনটা মফস্বল শহরে হয় আর কী।তার থেকে কথায় কথায় ওদের আসার উদ্দেশ্য জেনে গেল উপস্থিত সবাই।
একজন যুবক, যাকে দেখে বরুণের একাধারে শান্ত ও রাগী বলে মনে হয়েছিল, সে প্রথমে চুপচাপ একটু দূর থেকে এক কোণে বসে সবার কথা শুনছিল। কথাবার্তা এগোতে থাকলে, ছেলেটি একসময় হঠাৎ খানিক উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে,
“আপনারা কি মনে করেন এদিককার খরা-কবলিত এই গ্রামগুলোর দরিদ্র বাসিন্দাদের জল অপচয় করার মতো বিলাসিতা আছে? যদি জলের ব্যবহারে তারা সত্যিই মিতব্যয়ী না হতো, তবে কি তারা বছরের পর বছর খরা কাটিয়ে টিকে থাকতে পারত? আপনারা এসবে সময় আর অর্থ নষ্ট না করে খরার আসল কারণগুলো নিয়ে কবে কাজ শুরু করবেন, বলতে পারেন?”
বরুণ প্রথমে ছেলেটির রাগের কারণ ঠিকমত আন্দাজ করতে না পেরে ওর সংস্থা পরিবেশ নিয়ে যা কাজ করে বা সরকারী কিছু উদ্যোগ সম্পর্কে বলতে চেষ্টা করতে, ছেলেটি এবার কার্যত খোলাখুলি রাগ দেখিয়েই বলে,
“গ্রামবাসীদের জল ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে শেখানোর পেছনে পয়সা খরচ না করে কোনো প্রকৃত সমাধানের জন্য, বা পরিবেশ সংরক্ষণের খাতে সেই টাকা খরচ করছে না কেন সরকার? যেমন ধরুন ভূগর্ভস্থ জলের স্তর উন্নত করার জন্যে নীতি নির্ধারণ করে তার সঠিক রূপায়ণ করা। সারা বছর ধরে আখের চাষের জন্যে এই অঞ্চলের মাটির নীচের জলের স্তর নেমে যাচ্ছে, প্রতি বছর শুখা পড়ে। সেসব দিকে কারো খেয়াল নেই। বড় বড় নেতা মন্ত্রীদের ব্যবসা, কে কী বলবে এ নিয়ে। পরিবেশ পরিবর্তন নিয়ে আসলে কারোর কোনো মাথা ব্যথা নেই।যদি সত্যিই চিন্তা থাকত, তাহলে দেশে পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে উন্নতমানের গবেষণা হত, বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে, যাতে এইসব সমস্যার কিছুটা স্থায়ী সমাধান করা যায়। এধরণের নানা উদ্যোগে পরিবেশ সমস্যার সমাধানও হত আর দেশের শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হত। সেসব না করে প্রতি বছর কিছু ছুটছাট ব্যান্ড এড প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়ে যান আপনারা, যা দিয়ে গ্রামবাসীদের কোনো সঠিক উপকারই হয় না।আসলে এ দেশে কেউ মাটির জন্যেও ভাবেনা, সেই মাটির মানুষদের জন্যেও নয়। প্রকৃতির সব নিয়মকানুন উলটে পালটে দিয়ে পরিবেশ নিয়ে এভাবে যা খুশী করতে থাকলে একদিন যখন প্রকৃতি বিরূপ হয়ে তার সৃষ্টির সবটুকু ধ্বংস করে দেবে, সেদিন কারুর আর কিছু করার থাকবে না।”
বরুণ ও তাঁর সহকর্মীরা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেছিল, হাল্কা আলোচনা এত গুরুগম্ভীর আকার ধারণ করবে বুঝতে পারেনি। এই কর্মসূচিগুলোর মধ্যে যে কেবল লোক দেখানো বা নামমাত্র কাজের প্রবণতা রয়েছে এবং এগুলো যে প্রকৃত অর্থে দীর্ঘকালীন সমাধান দিতে অক্ষম, তা কি আর ওরা জানেনা? কিন্তু ওদেরই বা কী করার আছে?
ছেলেটির ক্ষোভ যেন উপস্থিত জনতার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, এক বিষাদময় ও অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় কালকের সন্ধ্যে।ছেলেটিই সবার আগে দোকান ছেড়ে উঠে যায়। ওখানে উপস্থিত ওর বন্ধুজনেরা তখন জানায়, ও নাকি কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে মাস্টার্স করেছে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোনো চাকরি পায় নি। সরকারী বেশীরভাগ চাকরি আজকাল সুপারিশ বা টাকা ছাড়া হয় না, বেসরকারীতে এসব বিষয়ে তেমন সুযোগ নেই, সেখানে কে আর লাভ লোকসানের হিসেব ছেড়ে পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করতে যায়।
গেস্ট হাউসে ফিরেও ওরা ছেলেটির বক্তব্য নিয়েই আলোচনা করতে থাকে। বরুণের এক সহকর্মী মুকেশ উত্তরপ্রদেশের কৃষক পরিবারের ছেলে; ওদের কিছু জমিজমা আছে, ওর বাবাদাদারা নিজেরা চাষ করে, জমিতে নানা ধরনের ফসল হয়। ওদের ওখানকার চাষিদের সমস্যার কথা যা বাড়িতে শুনেছে সেই সম্পর্কিত টুকটাক খবর জানালো।
“ছেলেটি যে সমস্যা গুলোর কথা বলেছে, তা কিন্ত আসলেই অত্যন্ত বাস্তবোচিত সমস্যা। দেশে অনেক জায়গাতেই মরশুমি বৃষ্টিপাত আজকাল বেশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমাদের ওদিকেও আখ চাষ হয়, শুগার বেল্ট, এদিককার মতই। অনেক জমিতে আজকাল ভূগর্ভস্থ জলের স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে চাষাবাদের জন্য আর পর্যাপ্ত জল পাওয়া যাচ্ছে না।চাষিরা সেখানে এদিককার মত এতটা না হলেও জলের সমস্যা ভালোই টের পাচ্ছে আজকাল।
আসলে আমরা, এই পৃথিবীর মানুষরা, পরিবেশ প্রকৃতির সাথে দীর্ঘদিন ধরে ছিনিমিনি খেলে আসছি, যা খুশী তাই করে চলেছি, গাছ কাটছি, পাহাড় নদী ধ্বংস করছি, জলহাওয়া বিষিয়ে দিচ্ছি। সহ্যেরও তো একটা সীমা থাকে, হয়ত প্রকৃতি সেই সীমা পেরিয়ে গিয়ে, তার মত করে প্রতিদান দিচ্ছে এখন, অসময়ের খরা, বৃষ্টি, বন্যা এসব নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে।”
বরুণ আদতে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিল, কিন্তু গ্রামের ছেলে হওয়ায় জমি ফসল এসব বিষয়ে কিছু সাধারণ জ্ঞান তারও আছে, গ্রামে বড় বুড়োদের মুখে এসব আলোচনা শুনে এসেছে ছোট থেকে। বন্ধুর কথার সাথে একমত হয়ে সেও বলে,
“এছাড়াও আমার মনে হয় আমাদের দেশে কৃষিক্ষেত্রে সরকারী পরিকল্পনায় গোড়াতেই কিছু গলদ হয়ে গেছে। শুরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে আমরা ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন ক্রমশ বাড়িয়েছি। আগে অধিকাংশ ফসলই ছিল মরশুমি এবং জলের প্রয়োজন মেটাত মরশুমের বৃষ্টি। সবুজ বিপ্লব এনে সেই নিয়ম অনেকটা বদলে দেওয়া হয়। বেমরশুমেও চাষ করে আমরা এখন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করছি ঠিকই, কিন্তু তার ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমে গিয়ে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আসলে প্রয়োজন ছিল কৃষি উৎপাদনে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। ছেলেটি ঠিকই বলেছে, হয় আমাদের কোনো সেরকম সুপরিকল্পিত নীতিই ছিল না, অথবা নীতি থেকে থাকলেও তা ঠিকমত বাস্তবায়িত হয়নি। জানিনা, এখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে আশা ছাড়লে হবে না, এ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত সর্বক্ষণ, এবং সাধ্যমতো যার যা করনীয়, সব পক্ষকে তা করে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে!”
আরো বেশ খানিকটা হাঁটার পর, একটু দূরে কয়েকটা গাছের সারির ছায়ার মত কিছু দেখতে পেল সে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন পরপর গাছ দিয়ে মাঠের সীমানা করা হয়েছে, হয়ত এটাই গ্রামের সীমানা। বরুণ তার শার্টের হাতা দিয়ে কপাল থেকে ঘাম মুছে নিল। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেখল, সূর্যের সোনালি আভার ফাঁকে এক কোণে যেন আবছা ধূসর মত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।
“ওটা কি মেঘের রেখা নাকি”?
আর একটু এগিয়ে যখন গাছের সারির প্রায় কাছে এসে পড়েছে, ঠিক তখনই নজরে পড়ল একধারে একটা পাতাশূন্য গাছের নিচে ছোট্ট চেহারার এক মানুষ। তার দৃষ্টি ওপরের দিকে, আকাশপানে, আর তার দুই হাতের তালু দিয়ে সে সজোরে কোনো একটা জিনিসকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। বরুণ আরেকটু কাছে যেতে দৃশ্যাবলীটি আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল—ছোট মানুষটি আসলে একটি আট দশ বছরের বাচ্চা ছেলে, আর তার শক্ত হাতে ধরা জিনিসটি হল ঘুড়ির লাটাই!
ছেলেটির চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে আকাশের দিকে চোখ রাখে সে, উড়ন্ত ঘুড়িটিকে দেখে মনে হল সেটি সাধারণত যেমন হয় তেমনি রঙিন কাগজের ঘুড়ি নয়। আরেকটু ঠাহর করে দেখে বুঝল আসলে পুরনো নানা কাগজের জোড়াতালি দিয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত ঘরোয়া বা সাদামাটা ঘুড়ি। ওড়ার ধরণ দেখে সে এও বুঝতে পারল যে ঘুড়িটি যেমন তেমন কাগজ দিয়ে বানালেও তার গঠন অতি নিখুঁত, এবং ওড়ার ভঙ্গিটি অসাধারণ।
একসময় গ্রামে ঘুড়ি ওড়ানোর খেলার চ্যাম্পিয়ন ছিল বরুণ। ঘুড়ির প্রতি তার আগ্রহ আজও অটুট। নিজের অবস্থান ভুলে মুগ্ধ বিস্ময়ে সে আকাশের গায়ে ঘুড়ির অনায়াস চারণ দেখতে থাকে। জিনিসটি ও তার মালিক, উভয়েরই বাহ্যিক গঠন বেশ জীর্ণ মনে হলেও যেমন ঘুড়িটি বেশ উচ্চতায় সহজ সাবলীলভাবে উড়ছে, তেমনি তার লাটাই ধরে রাখা হাত দুটি সরু হলেও বেশ দৃঢ় ও স্থিরসংকল্প।
ছেলেটির মনোযোগ ঘুড়ি ওড়ানোর কাজে নিবদ্ধ থাকলেও আগন্তুককে সে পুরোপুরি উপেক্ষা করে না। আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই সে সহজ গলায় জানতে চায়,
"আপনি এখানে নতুন মনে হচ্ছে, কোথায় যাবেন?"
বরুণেরও মনোযোগ তখন ঘুড়ির দিকে, সেও তখন ঘুড়ি খেলার উত্তেজনার অংশীদার হয়ে পড়েছে। তাই এমন ভ্যাপসা গরমের দুপুরে রোদে মাঠের মাঝে একা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো অদ্ভুত বিষয়টি তার নজর এড়িয়ে যায়।
সে একই উদাসীনতায় জবাব দেয়,
"হ্যাঁ। গুরগালা যাব। তুমি কি গুরগালা গ্রামের নাকি? তোমার হাত তো বেশ পাকা, ঘুড়িটা ভালো উড়ছে।"
একটু নড়াচড়ার মত আভাস হয়, হাল্কা হাওয়া বয়, ছেলেটি নিপুণ হাতে লাটাইটা সামলে নিয়ে, গলা নামিয়ে গোপনীয় কথা বলছে এমন স্বরে জানায়,
"সেকি, আপনি দেখে কিছু বুঝতে পারছেন না? এটা তো ঘুড়ি নয়। এটা আসলে একটা চিঠি।"
চিঠি? এ আবার কী কথা? এমন কথা কাউকে কখনো বলতে শুনেছে বলে তো মনে হয় না।
বরুণের দৃষ্টি এবার আকাশ থেকে নেমে মাটিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট মানুষটির ওপর ফিরে আসে।
ওহ, এই ব্যাপার! ছেলেটির নির্ঘাত মাথার কোনো সমস্যা আছে।তাই জন্যেই এই ভর দুপুরে গরমে এভাবে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।
এখানে থেকে একে উৎসাহ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। ঘুড়ির উত্তেজনা স্তিমিত হতেই আবার গরমটা বেশী করে মালুম হতে থাকে। অকারণে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। বাচ্চাটাকে বকে বাড়ি পাঠিয়ে সে নিজেও এবার সোজা গ্রামের দিকে চলে যাবে। খুব ঘেমে গেছে, গরমে আর ঘুড়ি দেখার উত্তেজনায়; গ্রামের ভেতরে কোনো ঠান্ডা জায়গায় বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নিজের কাজে লেগে পড়তে হবে। নষ্ট করার মতো সময় তার হাতে নেই; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম তাকে ঘুরে দেখতে হবে।
কিন্তু এগিয়ে চলে যেতে গিয়েও ঠিক যেতে পারে না। তার অন্তরের একেবারে অন্দরের কোনো এক সত্তা, গভীরে কোথাও লুকিয়ে থাকা সেই চির-কৌতূহলী বালকটি যেন তাকে থামিয়ে দেয়।
“আকাশে ঘুড়ির মাধ্যমে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারটা তো বেশ নতুন, এমনটা আগে কখনো শুনিনি। ” সে বিড়বিড় করে বলে ওঠে। কাকে সেটা ঠিক বোঝা যায়না, হয়ত বা তার মনের মাঝের সেই বালকটির উদ্দেশ্যেই হবে।
বলেই তার খেয়াল হয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির দিকে। সম্বিত ফিরে পেয়ে সে এবার বালকটিকে লক্ষ্য করে গলাটা একটু তুলে বলে,
“তাই বুঝি? ঘুড়ি আসলে ঘুড়ি নয়, চিঠি। বেশ অভিনব চিন্তাধারা তো? তা চিঠিটা কার কাছে পাঠাচ্ছো? আর তুমিই বা কে?”
লাটাইটার ওজন সেটি যে হাতের মুঠোয় ধরা তার থেকে অনেক ভারীই হবে মনে হয়। কিন্তু কী চমৎকার দক্ষতায় যে ওটা সামলায় ছেলেটি! সুতো ছাড়ার গতি একদম নিখুঁত, আর ঘুড়িটা অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত ছন্দে ক্রমশ আরও উঁচুতে উঠে যেতে থাকে!
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে তার কথার কোনো উত্তর দিল না। শুধু সুতো ছাড়াটা একটু ঠিকঠাক সামলে নিয়ে একাগ্র দৃষ্টিতে ঘুড়িটার ওড়ার দিকে চোখ তার। তবুও কেন জানি বরুণের মনে হয় ছেলেটি কথা বলতে কম আগ্রহী নয়। হয়ত বা কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বলাটা ঠিক হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় আছে!
অবশেষে ঘুড়িটা যখন মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রিত গতিতে নিজের মতই উড়ছে, লাটাইটার ভার খানিক হাল্কা হয়েছে, তখন ছেলেটি এবার আগন্তুকের দিকে সোজাসুজি তাকালো। মনের কথা খুলে বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন একটা ভাব করে সে বরুণের দিকে একটু এগিয়ে ফিসফিস করে জানায়,
“এই ঘুড়িটা আসলে ভগবানের কাছে লেখা একটা চিঠি।”
“ভগবানের কাছে চিঠি। আমাদের এখানে বৃষ্টি পাঠানোর জন্য আবেদন জানিয়ে,” সে কথাটার পুনরাবৃত্তি করে, সম্ভবত কারণটা যাতে শ্রোতা ভালো করে বুঝতে পারে, তাই।
কারণ শুনে বরুণের আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা হলেও সে তা বাইরে প্রকাশ করে না। উলটে বরং বেশ প্রশংসার সুরেই বলে,
“তাই নাকি! ঘুড়ির মাধ্যমে ভগবানকে চিঠি? বুদ্ধিটা সত্যি দারুণ অভিনব। আমার মনে হয়, ভগবানের কাছে পৌঁছানোর এর চেয়ে সহজ আর দ্রুত উপায় আর হয় না। আগে আমাদের কারও মাথায় কেন যে এই বুদ্ধিটা এল না, তাই ভাবছি।”
এমন প্রশংসা শুনে ছোট্ট ছেলেটির মুখে খুশির ঝিলিক খেলে যায়। যদিও ওপর থেকে দেখলে তাকে খুব একটা আবেগপ্রবণ বলে মনে হয় না, মুখে কিছু বলেও না। তবু বরুণ তার মুখের রেখার পরিবর্তন আর চোয়ালের সামান্য নড়াচড়ার আড়ালে ফুটে ওঠা মৃদু হাসিটা ঠিকই টের পেল।
এবার পকেট থেকে একটা লজেন্স বের করে নতুন বন্ধুটির হাতে দিল বরুণ। তার কাজে তাকে অনেকসময় এরকম কঠিন আবহাওয়ায় আর অজানা রাস্তায় চলতে হয় বলে সে দ্রুত তৃষ্ণা মেটাতে আর চিনির শক্তির জন্যে সবসময় পকেটে মিষ্টি লজেন্স রাখে। ছেলেটি এরকম আকস্মিক একটি উপহারে বেশ আপ্লুত হলো। এর ফলে দুজনের কথাবার্তা আর একটু সহজ হয়ে এল,
“জানো তো, গ্রামের লোকেরা সেদিন বৃষ্টির জন্য পূজো আর যজ্ঞ করেছিল। মা বলে, আমাদের ওসব করার অনুমতি নেই। আমরা যদি অন্যদের মতো করে পূজো করি, তবে ওই গ্রামের লোকেরা তো বটেই, ভগবান নিজেও খুবই অসন্তুষ্ট হবেন এবং নিয়ম ভেঙেছি বলে আমাদের হয়তো ধ্বংসই করে দেবেন।
তাই আমি খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে আমার খুব তেষ্টা পায়। যখন খুব কষ্ট হয়, আর কিছুতেই সামলাতে পারিনা তখন আমি মায়ের কাছে জল চাই। মা তখন খুব কাঁদে, আবার কখনো কখনো জমানো জল থেকে আমাকে আর আমার বোনকে এক-দু’চুমুক জল দেয়। বাবা আর আমাদের পাড়ার অন্যরা যখন শহরে যায়, তখন ওরা কিছুটা জল নিয়ে আসে।সে জল পরিষ্কার, আর খেতেও খুব সুস্বাদু; ওটা শুধু আমাদের খাবার জন্যই রাখা হয়, খুব সাবধানে অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে অনেকদিন ধরে খাওয়ার জন্য!”
"মাঝে মাঝে আমি খুব কাঁদতে চেষ্টা করি, চোখের জলটুকু জমিয়ে খাব বলে।কিন্তু কান্না সেরকম আসে না, তেষ্টার সময় তো নয়ই। একবার অনেক তেষ্টায় আমি আমার বোনকেও বলেছিলাম কাঁদতে, যাতে ওর চোখের জল আমি খেতে পারি। সেও অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটাও জল বার হলো না।"
বরুণের পেটে একটা অস্বস্তি, গা গুলোনো ভাব যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তার চোখের সামনে গতকাল সন্ধ্যার সেই তরুণটির মুখটা ভেসে ওঠে। সেই চোখে তখন আর রক্তঝরানো রাগ নেই, আছে শুধু অপার এক বিষণ্ণতা, যেন বলতে চাইছে,
"যারা চোখের জল জমিয়ে পান করার কথা ভাবছে, তাদের আপনি আপনাদের পুঁথির ভাষায় জল বাঁচানোর উপায় শেখাবেন!"
কথার মাঝে ঘুড়িওয়ালা ছেলেটি তার শ্রোতার মনের এই ভাবান্তর খেয়াল করে না। সে যেন তখন ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে নিজের মনেই কথা বলছে।অথবা হয়তো এ তার ভগবানের সাথে কথোপকথন চলছে।
"আমি ভগবানকে চিঠি লিখেছি মনে করিয়ে দিয়ে যে আমাদের এলাকাতেও যেন তিনি বৃষ্টি পাঠান। বৃষ্টিতে যদি শুধু ওদের কুয়ো আর পুকুরই ভরে, তাতে আমাদের কোনো লাভ নেই; কারণ ওসব জায়গা থেকে জল নেওয়ার অনুমতি তো আমাদের নেই। আমাদের নিজেদের আলাদা জল চাই, আমাদের নিজেদের বৃষ্টি।
ওদের মতো আমরা হয়তো ধুমধাম করে পুজো করতে পারি না, কিন্তু মা রোজ প্রার্থনা করে, তাকে অনেক ডাকে, ভগবান যেন সেটাও মনে রাখেন।
মাঝে মাঝে কোনো বিশেষ কিছুর জন্য ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানাতে চাইলে আমরা অনেক দক্ষিণে, ওই ছোট জঙ্গলটার দিকে হেঁটে যাই। সেখানে একটা পুরনো গাছ আছে।বাবা বলেন ওটাই আমাদের দেবতা। আমরা সেখানে পুজো দিই। ওদের মতো নানা রকম উপাদেয় খাবার বা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন আমাদের থাকে না। তবে নৈবেদ্যে ফল আর কিছুটা গুড় থাকে, সেগুলোও খেতে বেশ ভালো।
এখন এই প্রচণ্ড গরম আর বুকের মধ্যে এত তেষ্টা নিয়ে অতটা পথ হেঁটে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া মা বলে যে এখন পুজো দেওয়ার মতো কোনো উপকরণ আমাদের কাছে নেই। তাই আমি ঠিক করলাম, তার চেয়ে বরং ভগবানকে চিঠি লিখি।
আমি না খুব ভালো ঘুড়ি ওড়াতে পারি। বাবা বলে আমি ঘুড়ি এত উঁচুতে ওড়াই যে তা আকাশের ওপারে ঈশ্বরের বাসস্থানেও পৌঁছে যেতে পারে!
মাঝে মাঝে গ্রামের অন্য বাচ্চারা আমার কাছে ঘুড়ি ওড়ানো আর সুতোর কৌশল শিখতে আসে, অবশ্য তাদের বড়দের লুকিয়ে। আমার বাবা মাও এটা পছন্দ করে না। কী যেন বিপদের আশঙ্কায় তারা ভয় পায়, যদিও আমি সেসবের কোনো মানে বুঝি না। এই ছেলেরা যখন আমাকে ওদের ইস্কুলের কথা বা তারা যা যা পড়ে সেসবের কথা বলে, তা শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি ওদের জন্য ঘুড়ি বানিয়ে দিই, আর বিনিময়ে ওরা আমাকে পেন্সিল আর ছবি আঁকার কাগজ দেয়।
আমি তো লিখতে-পড়তে জানি না, তবে ছবি আঁকতে পারি। আসলে, আমি ছবির মাধ্যমেই ভগবানের কাছে চিঠি লিখেছি। যেমন আমাদের সবার ছবি, বৃষ্টি, জল, আমাদের বাড়ির আর পাড়ার অবস্থানও ভালো করে এঁকে দিয়েছি।
আপনার কি মনে হয়, ভগবান ঠিকঠাক বুঝতে পারবেন আমার আঁকা চিঠি?"
অসুস্থতার অনুভূতিটা বরুণের শরীরে চারিয়ে গিয়ে এক ধরণের অসাড়তার রূপ নিচ্ছিল, সাথে যোগ হয়েছিল সামান্য বমি বমি ভাব। প্রশ্নটা তাকে ঠিক সময়ে মূর্ছা যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। একটু সামলে নিয়ে কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে বরুণ বলে,
"হ্যাঁ, আমার মনে হয় ভগবান তোমার বার্তা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছেন। ওই দ্যাখো, আকাশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মেঘের মতো কী একটা দেখা যাচ্ছে। আর মনে হয় তুমি এবার ঘুড়িটা ছেড়ে দিতে পারো। আমাকেও এখন যেতে হবে। তুমি কি আমাকে গুরগালার পথটা একটু দেখিয়ে দিতে পারবে?"
দূর আকাশে সূর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কালো রেখা তারও চোখে পড়েছিল, আর তাই ছোট্ট মানুষটির চোখমুখ আনন্দে যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সে ঘুড়িটি ছেড়ে দিয়ে সুতো গুটিয়ে নিতে শুরু করল।
“বৃষ্টি নামলে প্রথমেই আমি স্নান করব। আর আমার একটা শার্ট আছে যেটা আমি শুধু বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যেই পরি। স্নান করে ওটা পরে আমি ইস্কুলে যাওয়ার মত করে তৈরি হব, খুব মজা হবে। আর বাড়িতে যদি কিছু চাল থাকে, তাহলে মা হয়তো ভাত রাঁধবে। অনেকদিন হল জল বেশী লাগে এমন কোনো রান্না মা করতে পারে না। ভাতের গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগে।”
ছেলেটি গাছের সারির দিকে হাঁটতে শুরু করে বরুণকে তার পিছু পিছু আসার জন্যে ইঙ্গিত করে। কয়েক পা এগিয়ে সীমানার একেবারে কাছে এসে থেমে গিয়ে, ওপারটা দেখিয়ে দেয় হাতের ইশারায়।
“ওই দিকটায়, এই গাছের সারির ওপারে গিয়ে কাঁচা রাস্তাটা পেরিয়ে একটু গেলেই একটা মন্দির চোখে পড়বে। আর মন্দিরের ঠিক পেছনেই দেখতে পাবে গ্রামপ্রধানের ইটের তৈরি বাড়িটা, পুরো এলাকায় ওটাই একমাত্র দোতলা পাকাবাড়ি।”
বরুণ সোজা পথ দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে ধন্যবাদ জানাবে বলে ছেলেটির দিকে ফিরতে গিয়ে দেখল সে ততক্ষণে পাশের জঙ্গলের রাস্তা ধরেছে। বরুণ ডেকে ওঠে,
“কিন্তু তুমি ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? তোমার বাড়ি কোথায়? তুমি গুরগালা গ্রামের বাসিন্দা নও?”
ছেলেটি যেতে যেতেই একটু গলাটা তুলে উত্তর দেয়।
“আমার বাবা বলে, গুরগালা আমাদেরও গ্রাম। কিন্তু গাছের সারি দিয়ে ঘেরা ওই সীমানার ভেতরে, ওদিকটায় ঢোকার অনুমতি আমাদের নেই।”
বরুণ দাঁড়িয়ে দেখল কেমন করে যেন এক পলকে তার সেই সদ্য আলাপ হওয়া খুদে বন্ধুটি উল্টোদিকের জঙ্গলের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
ছেলেটির চলে যাওয়ার ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে তার কিরকম যেন একটা ঘোরের মত মনে হয়, অবিশ্বাস্য লাগে ব্যাপারটা।
সবটাই কি তবে মায়া নাকি? গরমে এতটা পথ হেঁটে কাহিল হয়ে সে কি পুরো ঘটনাটা আসলে দিবাস্বপ্ন দেখছিল? ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসা এক সুপ্ত কিশোর মন হয়ত ঘিরেছিল তার ভাবনায়। হয়তো বা শীঘ্রই তার ঘুম ভাঙবে আর নিজেকে সে কোনো এক অদ্ভুত জায়গায় আবিষ্কার করবে!
হাঁটতে হাঁটতে পাঁচ মিনিটেই সে গ্রামের মন্দিরে পৌঁছে গেল। মন্দিরের পিছন দিকে প্রধানের বাড়িটিও সহজেই খুঁজে পেল। তার আসার খবর গ্রামবাসীদের কাছে ছিল। এসেছে শুনে এক এক করে মাতব্বররা সবাই তার চারপাশে জড়ো হয়ে খরা নিয়ে নানা অভিযোগ জানাতে শুরু করল।
তবে এর মধ্যে একটা ভালো খবরও ছিল। দূরের কিছু কিছু এলাকায় গতকাল রাতে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে এমনটা শোনা যাচ্ছে।
“পরশু আমরা এক অত্যন্ত শক্তিশালী যজ্ঞ করেছিলাম, তার ফল তো পাওয়া যাবেই।”
গ্রাম প্রধান আত্মতুষ্টির সাথে মাথা নাড়ে, গর্বে তার এবং উপস্থিত আরো অনেকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের দীর্ঘ গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে বরুণ নির্বিবাদে কাজ করার জন্য বেশ ভালো জায়গা পেয়ে গেল। শিক্ষকদের ঘরটিতে তার নিজের থাকার ব্যবস্থাও যথেষ্ট ভালো।অনেক জায়গায় গিয়ে বিশেষ করে একটু দূর গ্রামে সেরকম থাকার জায়গাও জোটে না। এমন আস্ত স্কুলবাড়িও এদিকে কম জায়গাতেই দেখা যায়। প্রধানের যে সহকারী তাকে পথ দেখিয়ে স্কুলে নিয়ে এসেছিল, সব দেখিয়ে শুনিয়ে দিয়ে সে জানতে চাইল বরুণ ব্রাহ্মণ কি না।
“তাহলে তো আমরা আপনাকে খাবার দিতে পারব না, এগ্রামে একঘরও আপনার স্বজাতি নেই। তবে আমি আপনাকে রান্নার শুকনো উপকরণ সব এনে দেব। এখানে একটা তোলা উনুন আছে, আপনাকে নিজে রান্না করে নিতে হবে।”
এ ব্যবস্থাতে বরুণের কোনো সমস্যা ছিল না। সে নিজের রান্না নিজেই করতে অভ্যস্ত এবং সাধারণত এসব ক্ষেত্রে সব কিছু একসাথে সেদ্ধ করে সহজ খিচুড়ি জাতীয় খাবারই সে তৈরি করে থাকে, খাবার ব্যাপারে তার খুব একটা বাছাবাছি নেই। লোকটি তার জন্য মাটির পাত্রে জলও এনে দিল।
“জলটা খুব একটা পরিষ্কার নয়, তাই সাবধানে ওপরের অংশটুকু ছেঁকে নিয়ে পান করবেন। এখন এই জলসংকটের মাঝে আমাদের খুব একটা নিয়মিত স্নান করা হয়ে ওঠে না।কাছেই নদী আছে বটে, কিন্তু তার জল প্রায় শুকিয়ে গেছে, মাঝ বরাবর গেলে ঘোলা জল দেখা যায়। গ্রামে একটা কুয়োতে জল আছে, যা আমরা পানীয় জলের জন্য ব্যবহার করি, কিন্তু পঞ্চায়েতের বেঁধে দেওয়া পরিমাণের চেয়ে বেশি জল তোলার অনুমতি কারো নেই।”
বরুণ ভেবে দেখল যে তার কাছে যে এক বোতল জল ছিল তার প্রায় পুরোটাই এখনো অক্ষুণ্ণ আছে। চা ও রান্নার কাজে এখানকার জল ব্যবহার করলে ওই জল দিয়েই হয়তো দুদিন চলে যাবে।
সে রাতে গুরগালা ও তার আশপাশ এলাকায় আকাশজুড়ে বৃষ্টি এল। সে বর্ষণ এমনই প্রবল যে মনে হলো যেন আকাশটাই বুঝি ছিঁড়ে পড়ছে। ঘুমের ঘোরে বরুণ বৃষ্টির শব্দ আর এতদিনের শুখায় শক্ত জমাট মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক গোঙানির মতো আওয়াজ শুনতে পেল। মনে হলো যেন দীর্ঘ বিরহের পর ধরিত্রী-নারীর তার পুরুষ-সঙ্গীর সাথে সঙ্গম ঘটছে, দুটি শক্তির সংঘাতের মতো তীব্র, জোরালো ও আবেগময় এক মিলন।
পরদিন বরুণের ক্লাসে খুব কম সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিল। পুরুষরা কেউই ছিলনা, শুধু অল্পবয়সী কয়েকজন আর কিছু নিতান্ত বালক ছাড়া। মাঠের অবস্থা দেখার জন্য সবাই বেরিয়ে পড়েছিল। আগের দিনের সেই লোকটি সকালে শুধু একবার এসে তাকে কিছু খাবার দিয়ে গেল। তার একগাল হাসি, খুব খুশি দেখাচ্ছিল তাকে।
“আর কয়েক দিন যদি ভালো বৃষ্টি হয়, তাহলে আমরা জমিতে কাজ শুরু করতে পারব। আপনি স্যর আমাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছেন। আপনি গ্রামে এলেন আর এই দীর্ঘ খরার পর এতদিনে বৃষ্টি এল, আপনি আমাদের বারিষওয়ালা, কিম্বা আপনিই আসলে বৃষ্টির দেবতা।”
স্কুলের ছোট্ট খেলার মাঠের মাঝে একটা উঁচু ইঁটের তৈরি চাতাল মত আছে, যেখানে সাধারণত স্কুলের নানা অনুষ্ঠান হয়। এখন সেটাই জলের ওপর টিকে থাকা একমাত্র কাঠামো। বরুণ তার ওপরে দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে, যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল।
গুরগালা গ্রামে এটি তার চতুর্থ দিন। অবিরাম বৃষ্টি আর দক্ষিণের কয়েকটি বাঁধ থেকে জল ছেড়ে দেওয়ার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আচমকা বন্যা পরিস্থিতি হয়েছে। সরকার বা মানুষজন দুপক্ষই ছিল সম্পূর্ণভাবে অপ্রস্তুত, সবাই দিশাহারা হয়ে পড়েছে। দু-দিন আগেও যে বিস্তীর্ণ শুকনো মাঠ সে পার হয়ে এসেছিল, তা এখন এক বিশাল সমুদ্রের আকার নিয়েছে।
গ্রামপ্রধানের বাড়ি থেকে পাওয়া একটা প্লাস্টিকের চাদরে নিজের ঝোলা ব্যাগটা মুড়ে ভালো করে শরীরের সাথে বেঁধে আর হাতে একটা লাঠি নিয়ে সে ফিরতি যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল। এই গ্রামে এভাবে আটকে থাকার কোনো মানে হয় না। কোনোমতে জেলা শহরে ফিরতে পারলে সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে, তারপরে নিজের অফিসে ফোন করে পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
গুরগালা সদর থেকে বেশী দূরে না হলেও এই দুদিনে এখনো ত্রাণ ইত্যাদি সেরকম কিছু এসে পৌঁছয় নি। হয়ত পরিস্থিতি খরা থেকে হঠাৎ বিপরীত বন্যার রূপ নেওয়ায় সবাই চমকে গেছে, আর সেই কারণে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি নিতেও কিছুটা সময় লাগছে। বাইরের জগতে কী ঘটছে, তা জানার কোনো উপায় নেই। বিদ্যুৎ নেই টানা দুদিন, প্রধানের ঘরের টিভিও তাই চালু নেই। এদিকে মোবাইল ফোনগুলোতে সিগন্যাল আসা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল, খবর আসার আর অন্য কোনো উৎস রইল না।
প্রধানের সহকারী লোকটি তাকে বিদায় জানাতে এসেছিল, সাঁতরে স্কুলবাড়ির চাতালটায় এসে উঠে বরুণের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিছুটা সতর্কবার্তা আর অনেকটা পরামর্শের সুরে বলল,
“মাঠের ভেতর বরাবর সাবধানে ধীরেপায়ে হাঁটবেন, অসুবিধা হবে না। আমি সকালেই ওদিকে গিয়েছিলাম; জল দু এক জায়গায় বড়জোর কাঁধ সমান গভীর, বাকি কোমর জল। যদি সাঁতরে যেতে পারেন, তাহলে একই দূরত্ব দ্রুত পার হতে পারবেন, অবশ্য তাতে হয়তো অনেক সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, সেটা এই অবস্থায় বিপজ্জনক হতে পারে।”
বরুণ লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, সামনে জলের দিকে তাকিয়ে তার ওই সাবধানবাণীর কথা শুনে একটু করুণ হাসি হাসে।
“চিন্তা করবেন না, আমি খুব ভালো সাঁতার জানি। এছাড়া নিজের গ্রামে ও আরো নানা জায়গায় কাজ করতে গিয়ে বহুবার বন্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে আমার।যদিও এভাবে এত জল ভেঙে হাঁটিনি এর আগে কখনো, তবু মনে হয় সমস্যা হবে না।”
“তা বেশ। তবে সাবধানে থাকবেন, আর সঠিক দিকটা খেয়াল রাখবেন। এই বৃষ্টি আর জলের মধ্যে একটানা এক দিকে দৃষ্টি স্থির রাখা খুব কঠিন। কোথাও বাঁকবেন না, দৃষ্টি সোজা রেখে এগিয়ে যাবেন। আর অবশ্যই দক্ষিণ দিকটা এড়িয়ে চলবেন, ওদিকেই নদীখাত।”
জলে নেমে একবার চলতে শুরু করে প্রথমে অন্তত কাজটা খুব একটা কঠিন মনে হল না। ধীরে ধীরে, এক পা এক পা করে জলের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে; শরীরের ওপরের অংশ যতটা সম্ভব জলের ওপরে রাখার চেষ্টা করে। কয়েক দিন আগে প্রখর রোদের মাঝে যা দেড় ঘণ্টার পথ ছিল, এখন তার ধারণা সঠিক হলে, যদি এই গতিতে চলতে পারে, তিন থেকে চার ঘণ্টা লেগে যাবে বড় রাস্তায় পৌঁছতে। বরুণের আশা ছিল যে বড় রাস্তায় পৌঁছতে পারলে, সেখান থেকে শহরে যাওয়ার কোনো গাড়ি বা কোনো উদ্ধারকারী নৌকা, কোনো একটা যানবাহন সে ঠিক পেয়ে যাবে, অবশ্য যদি না বাস চলাচলের রাস্তাটিও জলের নিচে তলিয়ে থাকে।
পা পিছলে জলের তীব্র স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঠিক কোন মুহূর্তে এমনটা ঘটেছিল, তা তখন তেমন করে মনে করতে পারেনি। পরে বিষয়টি নিয়ে কখনো ভাবার সময় মনে হয়েছে হয়ত বা সে জলে সাঁতার দিতে দিতে, স্রোত যেখানে বেশী ছিল আর জল গভীর, সেখানে দিক হারিয়ে নদীর দিকে চলে যায়।
জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করল একটি বাঁধের দেয়ালের ওপরে বাঁধানো চাতালের মেঝের ওপর শুয়ে; আর এদিক ওদিক থেকে জড়সড় চারটি উদ্বিগ্ন মুখ তাঁর দিকে উৎকণ্ঠায় তাকিয়ে আছে!
প্রাথমিক ঘোরটা কেটে মাথাটা খানিক পরিস্কার হলে ওর মধ্যে একটি মুখ তার চেনা লাগল। অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে একে আগে কোথায় দেখেছে। প্রথম ধন্দ কেটে গিয়ে শেষে মনে পড়ে গেল – তাই তো, এ তো সেই চিঠি ঘুড়ি ওড়ানো গুরগালার সীমানায় প্রথম পরিচয়ের ছোট্ট বন্ধু তার!
এরপরই বরুণ চেষ্টা করে উঠে বসতে, একটি সবল হাত তাকে বাধা দিয়ে চোখের মিনতিতে শুয়ে থাকতে বলে। দুর্বল ভাব আছে উঠতে চেষ্টা করতেই বরুণ টের পায়, আর তাই আধশোয়া হয়েই একটু মৃদু পরিচিতের হাসি হেসে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।তাই দেখে আশ্বস্ত হয়ে দলটি একটু তফাতে সরে যায়। মহিলা কিছুটা দূরে গিয়ে তার ভেজা শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকে, বাচ্চা মেয়েটি উঠে গিয়ে তার মায়ের পেছনে লুকোয়। পুরুষটি, যে সম্ভবত ছেলেটির বাবা, সে এই প্রথম কথা বলে ওঠে,
“ভগবানকে ধন্যবাদ আপনি জেগে উঠেছেন, আমরা চিন্তায় ছিলাম আপনার জ্ঞান ফিরতে এত সময় লাগছে দেখে।”
বরুণ পরিস্থিতিটা বুঝে নিতে ঘটনার ক্রম মনে করার চেষ্টা করে।
“তোমরাই কি আমাকে জল থেকে উদ্ধার করেছ? আমি সম্ভবত সাঁতার কাটতে গিয়ে পা পিছলে ভেসে গিয়েছিলাম।”
“সেই হবে, নিশ্চয়ই পথ হারিয়ে নদীর দিকে চলে এসেছিলেন। আমি এখানে এই বাঁধের ওপরে গত দুদিন ধরে সপরিবারে আছি। তাই আপনাকে দেখতে পেলাম, নাহলে কী যে হত।” লোকটি বরুণের কথার উত্তর দিয়ে আরো বলতে থাকে,
“আমি দুদিন আগেই বুঝেছিলাম যে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে, একদিকে এই তুমুল বৃষ্টি আর ওদিকে বাঁধের জল ছেড়েছে। আমাদের বেড়ার ঘর একদিনের বৃষ্টিতেই ধ্বসে গেছিল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলে আমরা আর বেরিয়ে আসতে পারতাম না।“
“গ্রামে প্রধানের ঘরের ছাতে যে আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে ওখানে যাওনি কেন তোমরা?এখানে এই বাচ্চাদের নিয়ে, এলে কী করে? এরপর ত্রাণসামগ্রী এলে সেসব তো এখানে বসে পাবেনা তোমরা। খাবে কী?”
“কী যে বলেন স্যর। ওই আশ্রয়কেন্দ্র তো উঁচু জাতির লোকেদের জন্যে, ওখানে আমাদের জায়গা হয় না। এমনকি ত্রাণের খাবারের প্যাকেট আমাদের দিকে এলেও তা আমাদের নিতে দেওয়া হবে না। আমাদের পাড়ার অন্যরা শহরের বড় রাস্তায় পৌঁছানোর জন্য উত্তর দিকের পথ ধরেছে। শহরে গেলে যদি কিছু পাওয়া যায়, ওখানে আমাদের লোকে অত চিনবে না, কোন জাতের লোক। আমার মেয়ে ছোট, বউয়েরও পায়ে সমস্যা, ওরা অত হাঁটতে পারত না। জল তখনো কম ছিল, আমরা রাতে সবার চোখ এড়িয়ে গ্রামের পিছন দিক দিয়ে বাঁধের ওপর আসি। অবশ্য গ্রামের লোকেরা দেখতে পেলে এদিকেও আসতে দিত না। রাস্তা থেকে বাঁধের উচ্চতা বেশি হলেও বাঁধের পাঁচিল সরু তো, পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে, আর তাছাড়া কেউ নদী পেরিয়ে এদিকে আসার ঝুঁকিও নেবে না।ভেবেছিলাম এখানে অন্যরা আসবে না তাই যখন ওপর থেকে ত্রাণের প্যাকেট ফেলা হবে, তখন সেসব খাবার আমরা সহজেই পেয়ে যাব। আমার মেয়েই আপনাকে প্রথম দেখতে পায়। আমরা ভেবেছিলাম আপনি মরে গেছেন, কিন্তু ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম যে অচেতন অবস্থায়ও আপনি স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তাই বুঝলাম আপনি বেঁচে আছেন; তখন আমি আর আমার স্ত্রী দুজনেই জলে ঝাঁপ দিয়ে আপনাকে তুলে নিয়ে এলাম।”
কিছুক্ষণ পর শরীরটা আর একটু চাঙ্গা মনে হওয়ায় বরুণ উঠে বসল। তার চারপাশে তাকিয়ে পুরো পরিবারটিকে ভালো করে দেখে। কী চমৎকার এক পরিবার, আমাদের দেশের সাচ্চা নাগরিক।বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিনিয়ত এদের লড়াই করতে হয়, কতশত ধরণের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তবু কী সরল নিস্পাপ চাহনি, নির্মল হাসি। অক্লেশে দুটো বাচ্চার কথা না ভেবে স্বামীস্ত্রী দুজনে জলে ঝাঁপ দিল এক অপরিচিত মানুষকে বাঁচাতে এই বর্ষার ভীষণ স্রোতস্বিনী নদীর বুকে, একটুও দ্বিধা না করে। এমন প্রকৃত মানুষ, এমন দেশবাসীর জন্য ওর চোখ কান্নায় আর বুক গর্বে ভরে এল।
“তাহলে, এখন আমরা কী করব?” মন একটু শান্ত হলে বরুণ হাল্কা চালে লোকটির কাছে জানতে চায়।যেন সেও এই মানুষটিকে দলপতি হিসেবে মেনে নিয়েছে, সে ওদেরই একজন
“আমরা অপেক্ষা করব, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, উতলা হয়ে কোনো হঠকারীতা করা যাবেনা।”
“বাঁধের এই সরু দেয়ালের ওপর বসে আমরা কিসের অপেক্ষা করব? উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের?” টেলিভিশনের খবরে দেখা সাহসিকতার নানা দৃশ্য মনে পড়ে যায় তার।
শহরের বাবুর অজ্ঞতায় অবাক হয়ে লোকটি এবার আরও বিশদে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলে,
“উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার? না, না, সে কী জিনিস আমরা জানিওনা। আমরা অপেক্ষা করব বৃষ্টি থামার আর জলস্তর কমার। এর মধ্যে যদি আকাশ থেকে ত্রাণ বিলি হয় তাহলে আমরা ত্রাণের প্যাকেট সংগ্রহ করতে চেষ্টা করব। তারপর জল একটু কমলে আমরা আপনাকে বাসরাস্তায় পৌঁছে দেব এবং বিদায় জানাব।আশা করি সব ভালোভাবেই হবে, বড়দেবতা আমাদের সহায়।”
একজন সাধারণ মানুষ, সমাজে অস্পৃশ্য গ্রামবাসীর চিন্তাধারা কতটা সরল ও বাস্তববাদী হতে পারে, তা দেখে বরুণ অবাক হয়ে গেল। এদের জীবনে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা সরকারি বন্যাত্রাণ নীতির মতো বড় বড় নাগরিক ধারণার কোনো স্থান নেই, এদের সব নিয়ম এদের মতই সাদাসাপটা।
বরুণের ঝোলা ব্যাগটি তখনও তার শরীরের সাথে জড়িয়ে অক্ষত ছিল। বাঁধনটা হয়ত খুব শক্ত হয়েছিল, তাই শরীর থেকে আলাদা হয়ে ভেসে যায়নি। ব্যাগে বিস্কুটের একটা প্যাকেট ছিল; সে সেটি বের করে দলের অন্য চার সদস্যের সাথে ভাগ করে নেয়। এই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে প্রত্যেকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সবাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে, এভাবেই সেই স্যাঁতসেঁতে বিস্কুট খায়।
“আরেব্বাস, তুমি তো দেখি ঘুড়ির লাটাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ। আমার ব্যাগে কিছু কাগজ আছে। তা তুমি কি তাহলে ভগবানের কাছে আর একবার চিঠি উড়িয়ে পাঠাবে নাকি, এবার তাড়াতাড়ি যেন বৃষ্টিটা থামিয়ে দেন, সেই অনুরোধ করে?” বরুণ তার ছোট্ট বন্ধুটির হাতের লাটাই দেখে মজা করে বলে।
ছেলেটি একটু লাজুক হাসি হেসে মৃদু স্বরে ‘না’ সূচক উত্তর দিতে বরুণ অবাক হল এবং কিছুটা যেন বিভ্রান্তও বোধ করল। হাসিমুখেই সে প্রস্তাবটা আবার দিয়ে এবার জানতে চায়,
“কেন নয়? বৃষ্টি থেমে ঘরে ফিরতে চাওনা?”
বাবা তাকায় তার সন্তানের পানে, চোখে অনিশ্চয়তা আর ভালোবাসা মেশানো যেন এক আলতো ছোঁয়া আবেগের নরম চাহনি। কী ভেবে কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে যায়। এদিকে ছেলেটি এই অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝে নিজেকে আরও একটু মায়ের কোলের দিকে সরিয়ে নিল। ধীরে ধীরে বাবা অন্য দিকে মুখ ফেরায় আর তারপর একটু থেমে থেমে উদাস গলায় কথা বলে ওঠে, তার গভীর সেই কণ্ঠস্বর যেন চারপাশের নিস্তব্ধতাকে গ্রাস করে নেয়।
“আসলে কী জানেন স্যর, এই বন্যা না আমাদের জন্য খুব একটা খারাপ ঘটনা নয়। বন্যার জল নেমে যাওয়ার পরে যখন চারদিকে পশুপাখির মরা দেহ পড়ে থাকবে, তখন আমাদের অনেক কাজ জুটবে। অনেকেই এমনকি সরকারি লোকজনও আমাদের ডাকবে সেই আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য।
তাতে যা আয় হবে, তাই দিয়ে বেশ কিছুদিন সংসার চলে যাবে, আবার কিছু টাকা জমানোও যাবে। আমার ছেলেটা ইস্কুলে যেতে চায়, কিন্তু এখানকার কোনো ইস্কুলই তাকে ভর্তি নেবে না। অনেক দূরের এক গ্রামে একটা বোর্ডিং ইস্কুল আছে, যেখানে আমাদের সম্প্রদায়ের ছাত্রদের ভর্তি নেওয়া হয়। পড়াশোনাটা বিনামূল্যে, কিন্তু থাকার খরচ আছে। তাই এই বন্যার থেকে উপার্জনের টাকা দিয়ে এবার ভেবেছি...” বাক্যটা আর শেষ করে না।একটু থেমে আবার বলে,
“সেদিক থেকে বন্যাটা একটা আশীর্বাদই বটে...অন্তত আমাদের মত লোকেদের জন্যে!”
এরকম কঠিন অথচ রূঢ় এক বাস্তবের কথা এমন সহজভাবে আগে কাউকে বলতে শোনেনি বরুণ। প্রথমটায় কেমন যেন ধাক্কা খায়। কোন অসহ্য নীরব বেদনায় মানুষগুলোর দিকে তাকাতে না পেরে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। একটু পরে ধীরে ধীরে চেষ্টা করে আবার নিষ্পাপ, স্বচ্ছ ও নির্মল ওই মুখগুলোর দিকে ফিরে তাকায়; সরলতার মধ্যে যে অদ্ভুত কঠিন এক জোর আছে তা যেন সে জীবনে প্রথমবার অনুভব করে।
একবার নদীর জলকে দেখে আর তারপর উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে যেন ঘুড়িচিঠিই পাঠায়, তবে শুধু বৃষ্টি থামাতে নয়।
বন্যা যেন সত্যিকারের আশীর্বাদ হয়ে পৃথিবীর সমস্ত আবর্জনা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে আমাদের পৃথিবীকে এইসব মানুষের বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
আবহাওয়া না বদলে সমস্ত বিভেদ ঘুচিয়ে মানুষের এই পৃথিবীটাই যেন বদলে যায় শীগগির।
kk | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৩৯743340