এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • সল্টলেক

    সমরজিৎ চক্রবর্তী
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১২ বার পঠিত
  • অলংকরণ: রমিত



    আজ যে আমরা ঝাঁ চকচকে সল্টলেক দেখছি, দুরন্ত যৌবনের চোখ-ঝলসানো রূপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তার শরীরি ভাঁজ, সেক্টর। রূপ-লাস্যময়ী তরঙ্গে এই সেক্টর শব্দটাই তার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা অনাবিল রহস্য উন্মোচনের পাসওয়ার্ড। জীবন ও জীবিকার অন্যতম বিন্দু। আবার কোনোদিন হয়ত এই জীবন ও জীবিকার বর্তমান পাসওয়ার্ডই হয়ে যাবে ফরগেট পাসওয়ার্ড। আধুনিকতার মায়াময় যাদুপরশে যেমন খোয়া গিয়েছে তার পুরনো এন্টার Key জলট্যাঙ্ক। হ্যাঁ জলট্যাঙ্কই হল ফ্রক পরা সল্টলেকের পরিচিতি।

    জলট্যাঙ্কের আধো আধো কথাবলা সল্টিকে চিনতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে। লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনে তিনটি মুখ্য চরিত্র। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, জিতেন মল্লিক আর মাধব পোল্লে। প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি নদীর প্রবল জলোচ্ছ্বাস।

    বিদ্যাধরী নদী তার প্রবল গতিবেগে পথ হারিয়ে গোঁত্তা খেয়ে আছড়ে পড়ল সুন্দরবন অঞ্চলে কৃষ্ণপুর মৌজার বিস্তীর্ণ এক জলাভূমিতে। হাজার হাজার তরঙ্গরাশির এক ব্যাপক আলোড়নে জন্ম নিল অসংখ্য লোনাজলের ভেড়ি। মাছচাষীরা সেই ভেড়িতে শুরু করল মাছের চাষ। তাদের রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমে জমে উঠল মাছের ব্যবসা। আনাগোনা বাড়ল বাইরের লোকের। জলপয়সায় গজিয়ে উঠল এক নতুন শ্রেণির অর্থলোলুপ পয়সাওলা। ভেড়িতে নামেই মেছুনি বা মেয়ে-মজুর কাম করে। খড় বা হোগলা পাতার ছাউনি দেওয়া গোলঘরে পর্দার পিছনে দেদার ফূর্তি আর আনন্দ।

    অসামাজিকতার রঙমিলান্তি বেশীদিন ঢেকে রাখা যায় না। বাতাসে তা গুবচুপ গুবচুপ হয়ই। দেদার ফূর্তি আর আনন্দ পারস্পরিক হয়ে থাকলে অশান্তি সেখানে মধ্যমণি থাকবেই। নিত্য সে কথা কানে পৌঁছাল বাংলার রূপকার তথা মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের। সেচদপ্তরের পক্ষ থেকে এ অশান্তি দূর করার জন্য ভেড়িগুলো ইজারা দিয়ে দেওয়া হল স্থানীয় সরকার, নস্কর ও প্রামানিকদের। জেলেরা ছিল, এবার তৈরী হল ভেড়ির আল পাহারা দেওয়ার জন্য আলা।

    উদ্বাস্তু মানুষের নিদারুণ চাপে কলকাতার তখন নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। চাই মাথার গোঁজার জন্য সামান্য একটু ঠাঁই। পাগলের মতন দিগবিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে বাস্তুহারা অগণিত মানুষ। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের তখন একটাই চিন্তা বাস্তুহারা এতগুলো মানুষের ঠাঁই নিয়ে। প্রবল জনস্রোতকে সুসংহত ভাবে প্রবাহের সুযোগ না দিলে একদিন না একদিন এক বিরাট বিধ্বংসী জনবন্যার প্লাবনে সমস্ত মহানগরীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

    একদিন হঠাৎই তাঁর মনে উদয় হল, আচ্ছা লোনাজলের ওই ভেড়িগুলো যদি ভরাট করে নিই তাহলেই তো সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। চালু করা যায় নতুন একটা কলকাতা। চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে উঠল মনের কোণে সযত্নে লালিত সেই স্বপ্ন। ১৯৫৬ সালে ইউরোপ সফরের সময় জার্মানির রাইন নদীর তীরে সুন্দর ছবির মতন বন (Bonn) শহরটা দেখে মনেমনে আক্ষেপ করেছিলেন, এমন শহর যদি আমার শহরে করতে পারতাম।

    না করতে পারার তীব্র হাহাকার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল সেদিন তাঁর বুক থেকে। তবুও যেন স্বপ্নটা রয়ে গিয়েছিল মনের কোণে। সন্ধান করতে শুরু করলেন ভেড়ি ভরাট করার জন্য বিশ্বস্ত ঠিকাদারের। অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেলো সুদূর যুগোশ্লাভিয়ায়। IRAN MULTIVONIC COMPANY (INPORT INVEST)।

    IRAN MULTIVONIC COMPANY (INPORT INVEST) কোম্পানীর সঙ্গে সরকারের কথাবার্তা চলাকালীনই শুরু হয়ে গেল ধিতাং ধিতাং, লোনাজলের ভেড়ি ভরাট করার পর তার ওপর বাড়ি তৈরী করলে সেটা যে কোনো সময় ধ্বসে গিয়ে মাটির নীচে চাপা পড়ে যেতে পারে। সে হবে এক মারাত্মক ধ্বংসলীলা। জেনেবুঝে মানুষকে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। ভাগ্যিস সে সময় টিভির নিউজ চ্যানেলগুলোর হুড়োহুড়ি ছিল না। তাহলে গলার শিরা ফুলিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে জনদরদী হয়ে উঠত। তারাই তো সমাজের ঠেকেদার। সন্ধ্যে হতে না হতেই চ্যানেলে চ্যানেলে বসে যেত খাপ পঞ্চায়েত।

    বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন একরোখা জেদি প্রকৃতির ব্যক্তিত্ব। তিনি আমল দিলেন না। কারণ তিনি নিজে ইউরোপ সফরের সময় হল্যান্ডে গিয়ে Land Reclamation পদ্ধতি দেখেছেন। এখানে কথা বলেছেন IRAN MULTIVONIC COMPANY-র সঙ্গে। কোম্পানী জানিয়েছে, তাদের নিজেদের দেশেই এই রকমই বিশাল জলাশয় ভরাট করে জন্মদিয়েছে নতুন একটি শহরের। নদী থেকে ড্রেজারের সাহায্যে মাটি তুলে ভরাট করা হয়েছিল সেই জলাশয়। যার উপর নির্মাণ করা হয়েছে আকাশচুম্বী বিল্ডিং (Multi-Storied) তথা ফ্ল্যাট।

    তিনি বিধানচন্দ্র রায়। পরখ করে নেওয়া ব্যক্তিত্ব। নদীর পলিমাটি দিয়ে ভরাট করা জলাশয়ের উপর আকাশচুম্বী অট্টালিকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কিনা তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখার জন্য একদল ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠালেন। তাঁরা ফিরে এসে সন্তোষজনক রিপোর্ট দিতেই তিনি ৩.৭৫ বর্গ মাইল লোনাজলের ভেড়ি ভরাট করার জন্য চুক্তি করলেন যুগোশ্লাভিয়ার IRAN MULTIVONIC COMPANY-র সঙ্গে।

    কোম্পানীর নাম IRAN মানে মাসুদ পেজেসকিয়ানের বা খোমেয়িনির ইরান নয়, IRAN হলেন যুগোশ্লাভিয়ার মুক্তিযুদ্ধের এক মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য কোম্পানীর নামকরণ করা হয় IRAN MULTIVONIC। কোম্পানীর প্রধান ইঞ্জিনিয়ার হলেন M. Spiric.

    এরপর একদিন হঠাৎই দেখা গেল গঙ্গার বুকে ছড়িয়ে পড়েছে ১১টি জাহাজ, ২টি ড্রেজার ও ২টি পুশ ট্যাগ। হাওড়া ব্রীজ ও বিবেকানন্দ ব্রীজের মধ্যবর্তী বিশাল অঞ্চল থেকে গঙ্গার তলদেশ পলি কেটে করে তোলা হবে। ড্রেজারের সাহায্যে সেই পলিমাটি তুলে ফেলা হবে বার্জের মধ্যে। সেখান থেকে ভাসমান পাম্পের সাহায্যে চলে যাবে বাগবাজার লক্‌গেটে। তারপর সেখান থেকে সল্টলেক ভেড়ি।

    পলিমাটির ঘন-জমাটি কাদার স্ত্রোত যখনই পাম্প-মোটর আর টেনে তুলতে না পেরে, আর পারছিনা আর পারছিনা করে হাঁপিয়ে উঠে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো তখনই পথের মাঝে রাখা স্ট্যান্ডবাই বুস্টার পাম্প বাড়িয়ে দিত সাহায্যের হাত। বুস্টার পাম্পের তীব্র কম্পনে (ভাইব্রেটার) পলিমাটির ঘন জমাটি কাদা তরল হয়ে যেত।

    ভেড়ি ভরাট হয়ে যাওয়ার পর পরিসংখ্যানবিদ তথা বিজ্ঞানীদের চলল অনেক হিসেবনিকেশ। জানা গেল করে ৩.৭৫ বর্গ মাইল জলাশয় ভরাট করতে তোলা হয়েছে ৮৩,০০০,০০০ ঘন ফুট পলিমাটি। তারজন্য ব্যয় হয়েছে ৩৮ কোটি টাকা।

    ভরাট করা ভেড়ি অঞ্চলে গিয়ে দাঁড়ালে, যতদূর চোখ যায়, চারিদিকে শুধু ধূ ধূ করছে বালি বালি। যেন মরুভূমি। লোকমুখে নাম হয়ে গেলো ‘বালুর মাঠ’।

    ভগীরথ আবাহন করে পতিত পাবনী গঙ্গাকে এনেছিলেন, দূরদর্শী বিধানচন্দ্র রায় নিয়ে এলেন গঙ্গার বালি, মাটি আর জল। জন্ম হবে নতুন এক কলকাতার। শত শত গৃহহীন পরিবারের বুকে মঙ্গল-শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে জেগে উঠল একটু খানিক আশা। বাঁধা যাবে ছোট্ট একটি ঘর নতুন এই কলকাতার বুকে।

    সরকারিভাবে বসতি স্থাপনের আয়োজন পাকাপোক্ত। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তাঁর মনের কোণে সযত্নে লালিত নতুন কলকাতার। সেই সময় বিষফোঁড়ার মতন দেখা দিল এক নতুন সমস্যা,

    লোকালয় থেকে দূরে নিঝুম নিস্তব্দ পরিবেশ। লোকজনের সেরকম আনাগোনা নেই বললেই চলে। জলশন্ডীর দেশে যতদূর চোখ যায়, চারিদিকে শুধু বিস্তৃর্ণ জলরাশির সমাহার। আল পাহারা দেওয়ার কাজে নিযুক্ত আলাজনের হাতে অখন্ড অবসর। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। আবির্ভাব হলো শয়তানের। তৈরী হল চোলাই মদ তৈরীর শাল বা ঠেক (কারখানা) আর সেই চোলাই চালান দেওয়ার জন্য সাপ্লাই চেন। তারই পাশে গড়ে উঠল গাঁজাখোরদের আখড়া। মাছ ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে ক্রমশই এদের বাড়বাড়ন্ত শুরু হলো।

    এই সুযোগে হাজির হলেন কয়েকজন সাধুবাবা গোছের লোক। ভক্ত জুটতে সময় নিল না। অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভক্তবৃন্দ জড়ো হয়ে গেল। কেষ্টপুর খালের পারে, এখন যেখানে এ-ই ব্লক বর্তমান, সেখানে ভেড়ির পাশে আস্তে আস্তে গজিয়ে উঠল একটি মন্দির। মাটির গাঁথুনি দেওয়া ইটের পাকা দেওয়ালে টিনের ছাদ। কালো পাথরের বাবা ভোলেনাথ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হলেন। ভেড়িতে যারা কাজ করতো সেই জেলেজন, মেয়ে মজদুর ও আলাজনদের শুরু হলো আনাগোনা।

    এরপরেই সাধুদের মধ্যে একজন স্কোয়ার-ড্রাইভ করে বল পাঠালেন বাউন্ডারি লাইনের বাইরে। শিবরাত্রি ব্রত আর চৈত্র সংক্রান্তির গাজনের মেলায় জমে গেলেন বাবা ভোলেনাথ। হরেকরকমের পণ্যসামগ্রী আর পর্দার পিছনে নিশিকুটুম্ব। আশপাশ গ্রাম থেকে ভক্তজনের আনাগোনায় ভরপুর হয়ে উঠল পরিবেশ। মন্দিরের সৌষ্ঠব ক্রমশ পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি হতে শুরু করল। আর তার পাশাপাশি যেমন চলছিল তেমনি চলতে লাগল গাঁজারিদের আখড়া।

    এই বাবা ভোলানাথের মন্দিরই হয়ে দাঁড়াল নতুন কলকাতার ভিত্তিস্থাপনের জটিল এক সমস্যা। অগণিত ভক্তের ব্যোমধ্বনি আর গাঁজা-গুলিখোরদের দম মারো দম ধোঁয়ার জালে বাবা ভোলেনাথ বেশ জব্বরভাবে জাঁকিয়ে বসেছেন।

    জিতেন চক্রবর্তী ছিলেন সেচবিভাগের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক। বিধানচন্দ্র রায় সুষ্ঠভাবে মন্দির অপসারণের দায়িত্ব দিলেন তাঁকে। কাগজপত্র সমেত দলবল নিয়ে জিতেন চক্রবর্তী একদিন হাজির হলেন মন্দিরে। সাধু তথা পুরোহিত মাধব পোল্লে ভক্তদের মাঝে বসে আছেন। তখনও চোখ তার ঢুলুঢুলু। সরকারি অফিসার মনেমনে ভাবলেন, গতকাল রাত্রের গঞ্জিকা সেবনের প্রভাব বোধহয়। সেসবে গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি প্রস্তাব রাখলেন যে, টাকা নাও কিংবা জমি, মন্দির এখান থেকে তুলে নিয়ে চলে যাও।

    সরকারি অনুদান নিতে সম্মত হলেন মাধব পোল্লে তবে জলমাপার জন্যে গরমাগরম বক্তৃতা দিলেন ভক্তদের মাঝে। তারপর ভোলেবাবাকে বগলদাবা করে অশ্রুসিক্ত চোখে চলে গেলেন। ধর্ম বিগর্হিত কাজের জন্য সমবেত ভক্তেরা অভিশাপ দিলেন সরকারকে। সল্টলেক অথরিটি ভাবলেন, যাক ভালোয় ভালোয় আপদ বিদায় হল। এত সহজে পাততাড়ি গোটাবে ভাবা যায়নি।

    অথরিটি যখন এইভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন বিধাতা তখন অলক্ষ্যে হাসছিলেন। মাধব পোল্লে তখন ফিরে আসার আলো খুঁজছেন। ভক্তদের উদ্দীপনা দেখেছেন। সরকারি উদারতায় তিনি সরকারের দুর্বলতাই দেখেছেন। চাইলে আরও বেশীকিছু পাওয়া যেতে পারে।

    পরের দিন সকাল হতে না হতেই ভোলেবাবাকে নিয়ে ফিরে এলেন মাধব পোল্লে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই সঙ্গসঙ্গে ভক্তরাও ছুটে এলো তার পাশে। ভোলেবাবা তাকে স্বপ্নাদেশে জানিয়েছেন যে বাস্তুহারাদের মতন তিনি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে পারবেন না। খাল পাড়ে ভেড়ির এই জায়গায়ই তাঁর আসল জায়গা, ভক্তদের পীঠস্থান, বলে পোল্লেমশাই জাগ্রত মহেশ্বরকে নিয়ে মন্দিরের মধ্যে গুছিয়ে বসলেন। ঘোষণা করলেন, সরকারের এ জুলুম চলবে না, তাদের পুজো যেরকম চলছিল সেইরকমই চলবে। সঙ্গসঙ্গে জয়ধ্বনি পড়ে গেলো চারিদিকে।

    সল্টলেক অথরিটি প্রমাদ গুনলেন। সিঁন্দুরে মেঘ সত্যি হলো তাহলে! আবার রুদ্ধদ্বার আলোচনা। পোল্লে আর শিবঠাকুরের কি করা যায়! বিহিত করার জন্য লালবাজার থেকে পাঠানো হলো বিশাল ফৌজ। তারা মাধব পোল্লের গরম গরম বক্তৃতা শুনে সাহসই পেল না বাবা ভোলানাথের গায়ে হাত দেওয়ার।

    মন্দির জমে উঠল আগের মতনই গাঁজা খোর আর চোলাই মদের উছ্বাসে। সরকার বিব্রত। মিটিংয়ের পর মিটিং। ফাইল বগলদাবা করে অফিসারদের ছোটাছুটি। নিজেদের মধ্যে দোষাদুষি। তারপর তাঁরা একটা শেষ চেষ্টা করার জন্য মরীয়া হয়ে সদলবলে হাজির হলেন মাধব পোল্লের দরবারে। আরও বেশী টাকা, সঙ্গে জমি।

    মাধব পোল্লে সুচতুর। সহজে ঘাড় কাত করার ব্যক্তি নন। টাকা, জমি ও মন্দির তিনটেই চাই তার। অনেক অনুরোধ উপরোধ করার পর শেষে স্থির হল ধাপা পাম্পিং স্টেশনের কাছে দশ কাঠা জমির ওপর আধুনিক স্থাপত্যের মন্দির নির্মাণ করে দেওয়া হবে। তারপর মাধব পোল্লে এখান থেকে সরে গিয়ে ভোলেবাবাকে প্রতিষ্ঠা করবে সেই মন্দিরে।

    ভোলেবাবাকে অবলম্বন করে মাধব পোল্লে পেলেন দশ হাজার টাকা আর দশ কাঠা জমির উপর কংক্রিটের মন্দির।

    লোনাজলের ভেড়ি ভরাট করার পর সেই জলাভূমি বা লবণহ্রদ জলাভূমির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘বালুর মাঠ’। তারপর ধীরে ধীরে শিল্পীর নিপুণ তুলির টানে তৈরী হল এক সুন্দর সুঠাম ও পরিচ্ছন্ন শহর। বালুর মাঠ ভরে উঠল সবুজের আস্তরণে। সৃষ্টি হল সুন্দর পরিবেশের। রাস্তার দুপাশে শোভা পেল দেবদারু আর কৃষ্ণচূড়ার গাছ।

    ২৪ পরগণা জেলার সুন্দরবন পরগণায় কৃষ্ণপুর মৌজায় জন্ম হল আরেক কলকাতার, সল্টলেক সিটি। ১৯৬২ সালে ১৬ এপ্রিল। বাস্তববাদী দূরদর্শী বিধানচন্দ্র রায় তাঁর জীবনের শেষলগ্নে পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য করে দিয়ে গেলেন আরও একটি মহৎকাজ। মাত্র কয়েক মাস পরেই তিনি যাত্রা করেন চিরশান্তির দেশে ১৯৬২ সালে ১ জুলাই।

    ১৯৭২ সালে জাতীয় কংগ্রেসের ৭৪তম অধিবেশনের সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকার সর্বদলীয় বৈঠকে বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে সল্টলেক সিটি-র নামকরণ করে বিধাননগর। ভারতীয় রেলওয়ে জাতীয় কংগ্রেসের এই অধিবেশন উপলক্ষে ১৮৬২ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের স্থাপিত ‘উল্টোডাঙা হল্ট’ বা উল্টোডাঙা স্টেশনের নাম বদল করে দেয়। নতুন নামকরণ করে বিধাননগর রোড।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন।